এই প্রবন্ধে মানব দেহের মধ্যে বিদ্যমান নাড়ীসমূহ এবং ওই সকল নাড়ী কি ভাবে আমাদের আধ্যাত্মিক জীবনকে প্রভাবিত করে সেই প্রসঙ্গে কিছু আলোচনা করা যাক।
নাড়ী শব্দের অর্থ বাহক। আমাদের শরীরে ৭২ হাজার নাড়ী আছে আর এই সমস্ত নাড়ী সমূহের মাধ্যমে তরল ও বায়বীয় তত্ত্ব সমূহ শরীরে প্রবাহিত হয়।
সকল নাড়ীর মধ্যে – ইড়া, পিঙ্গলা এবং সুষুম্না নাড়ী ৩ টি সর্বাধিক তাৎপর্য্যপূর্ণ। ইহারা উর্ধগামিনী।
হস্তীজিহ্বা, গান্ধারী এবং প্রসবা নাড়ী ৩টি সমস্ত শরীরে ব্যাপ্ত।
অলম্বুষা ও যশা নাড়ী ২টি শরীরের দক্ষিণ অঙ্গে এবং শঙ্খিনী ও কুহু নাড়ী ২টি বাম অঙ্গে ব্যাপ্ত।

উচ্চকোটির সাধক ও যোগীগণ এই সকল নাড়ী বিষয়ে জ্ঞাত হয়ে এবং শাস্ত্র সম্মত প্রাণায়াম ও সাধনা প্রক্রিয়ার দ্বারা এই সকল নাড়ীর সাহাজ্যে সিদ্ধ্যি লাভে সমর্থ হন।
মানব শরীরের পৃষ্ঠদেশে মেরুদণ্ডের বামদিক থেকে ইড়া এবং দক্ষিণদিক থেকে পিঙ্গলা নাড়ীর সূচনা। এই দুই নাড়ীর মধ্যবর্তী মেরুদণ্ডের ভিতর মেরুদণ্ডের একদম নীচে থেকে আর একটি নাড়ী সরল রেখার মতো মস্তক পর্যন্ত পরিব্যাপ্ত। এই নাড়ীটি সুষুম্না নাড়ী।
আমাদের শ্বাস প্রশ্বাস অব্যাহত থাকা হলো প্রাণ ধারণের প্রমান। আর এই শ্বাস প্রশ্বাসএর সঙ্গে উপরিউক্ত নাড়ী ৩টি ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। প্রতিনিয়ত আমাদের শ্বাস প্রশ্বাস আমাদের অজান্তে কিছুক্ষন বাম নাসারন্ধ্রে, এবং কিছু সময় দক্ষিণ নাসারন্ধ্রে আর খুব অল্পক্ষনের জন্য মধ্যভাগে প্রবাহিত হয়।
অর্থাৎ যখন বাম নাসারন্ধ্রে শ্বাস প্রবাহিত হয় তখন ইড়া নাড়ীতে, যখন দক্ষিণ নাসারন্ধ্রে তখন পিঙ্গলা নাড়ীতে। এই হলো পার্থিব সংসার প্রবাহ।
কিন্তু এরই মধ্যে এক নাসারন্ধ্র থেকে অপর নাসারন্ধ্রে যাওয়ার মধ্যবৰ্তী সময়ে খুব স্বল্প ক্ষণএর জন্য সুষুম্না নাড়ীতে শ্বাস অবস্থান করে।

এই সমস্ত কিছু তো প্রকৃতির নিয়মে ও দেহতত্ত্ব অনুযায়ী গঠিত। তাহলে এই বিষয়ে আলোচনার তাৎপর্য্য কি? সনাতন শাস্ত্রে অত্যন্ত যত্ন সহকারে উল্লেখ করা হয়েছে যে মানব জীবন ধারণের প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো জন্ম মৃত্যুর চক্র থেকে আত্মার মুক্তি – পরমাত্মাতে লীন হওয়া।
কিন্তু এই মুক্তি সহজলভ্য নয়, অনেক সাধনার দ্বারা, আত্মাকে পরিপূর্ণরূপে ঈশ্বরকে সমর্পনের মাধ্যমেই তা সম্ভব।
মানুষ ইড়া পিঙ্গলার মধ্যে শ্বাসক্রিয়ার জন্যই পার্থিব সংসারে বদ্ধ হয়ে থাকে, সুষম্না নাড়ীকে উন্মুক্ত না করে।
ইড়া, পিঙ্গলা এবং সুষম্না নাড়ীর সন্ধিস্থান সকল এক একটি চক্ররূপে জ্ঞাত।
নাড়ী পরিবর্তনের সময়ে শ্বাস নিজের থেকেই খুব স্বল্প সময়ের জন্য সুষুম্না তে অবস্থান করে আমরা জেনেছি। শ্বাস অর্থাৎ প্রাণবায়ু যখন সুষম্নাতে প্রবেশ করে তখন বাহ্যিক ভাবের নাশ হয়। ইন্দ্রিয়াদির ভোগেচ্ছা লোপ পেতে থাকে।Raise Your Concern About this Content
এই অবস্থায় মানুষের (সাধক বা সাধিকা) শিবতত্ত্ব উপলব্ধি হতে আরম্ভ হয়। সুষুম্না দ্বার উন্মুক্ত হয়। সাধনমার্গে উন্নতি হতে থাকে। এই সুষুম্না নাড়ীতেই ষট্চক্র অবস্থিত। কিন্তু প্রাণবায়ুর সুষুম্না স্থিতি নিজের থেকে হয় না। এই অবস্থা প্রাপ্তির জন্য সাধক বা সাধিকাকে নিষ্ঠার সহিত নিয়মিত জপ্ ধ্যান ইত্যাদি সাধনা করতে হয়।
দুই ভ্রূ মধ্যে ইড়া , পিঙ্গলা এবং সুষুম্না নাড়ীর মিলন কে ত্রিবেণী সঙ্গম মান্য করা হয়। এই স্থান শিব ও শক্তির মিলনক্ষেত্র।
অনেক সাধনবলে অথবা দৈব শক্তির আশীর্বাদে সাধক বা সাধিকা দুই ভ্রু মধ্যে সুষুম্না নাড়িতে প্রাণবায়ুকে ধারণে সক্ষম হতে পারলে যোগী সিদ্ধি লাভ করে ত্রিকালদর্শী হয়ে থাকেন । তখন তাঁর ব্রহ্মদর্শন বা আত্মোপলব্ধি হয়। এই প্রবন্ধে মানব জীবনের আধ্যাত্মিক প্রগতিতে নাড়ী সমূহের ভূমিকা কোনো গূঢ় তত্ত্ব ব্যতীত সংক্ষিপ্ত ভাবে বর্ণনা করার প্রচেষ্টা করলাম।




