Homeভ্রমণবর্ষায় সবুজে ঘেরা পুরুলিয়া 

বর্ষায় সবুজে ঘেরা পুরুলিয়া 

এবছর বর্ষা প্রায় শেষের পথে। বিশ্বউস্নায়ন জনিত সমস্যার কারণে এই সেপ্টেম্বরেও বানভাসী দেখা যাচ্ছে ভারতবর্ষের বিভিন্ন ভূখণ্ডে। যাঁরা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন বা দুর্দশায় সময় কাটাচ্ছেন তাদের জন্য আমরা মর্মাহত। তবে আশাকরি সবাই এই দুঃসময় কাটিয়ে উঠবেন। আর আগামী বছরের বর্ষা ঋতু ভরপূর উপভোগ করতে আপনি প্ল্যান করতে পারেন আগেভাগেই। তাই অকালে এই লেখাটা প্ৰতিস্থাপন করলাম, কেমন লাগলো জানাবেন। 

ছোটবেলায় প্রিয় ঋতু নিয়ে রচনা লিখতে বললেই বারবার বর্ষাকালের কথা লিখে আসতাম। কেন জানি না বর্ষার সঙ্গে অদ্ভূত এক মায়া লেগে থাকে। খুব মন খারাপ হলে যখন অনুভূতিগুলো ভাষায় প্রকাশ করা যায় না, তখন চোখ দিয়ে যেমন অনবরত জল পড়ে বর্ষাকাল ঠিক তেমন। আমার মনে হয় বর্ষাকাল আসলে যখন প্রকৃতির মন খারাপ করে, খুব কষ্ট হয়, তখন সেই দুঃখগুলো অবারিতভাবে ঝড়ে পড়ে অসংখ্য জলকণার আকারে।

বর্ষা আর জলবায়ু পরিবর্তন 

প্রকৃতির এই স্নিগ্ধ রূপ সৌন্দর্য্যকে বাঁচিয়ে রাখতে আমাদের এবার দায়িত্বশীল হয়ে উঠতে হবে কারণ আজকাল বর্ষাকাল কেমন যেন ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে। বর্ষা আর বন্যাকে আলাদা করা যাচ্ছে না। প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পিছনে আমাদের ভূমিকা কতখানি তা কি আমরা ভেবে দেখেছি………

কয়েক বছর ধরে উত্তরাখণ্ড, হিমাচল, পঞ্জাব সিকিম থেকে বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, বীরভূমের বেশ কিছু গ্রামের মতো দেশ তথা পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গা, জেলা বেশি বৃষ্টি, হরপা বান- ধসে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে।  অনিয়ন্ত্রিত বৃষ্টি থেকে ঘনিয়ে আসছে বিপদ। কয়েক বছর ধরেই বৃষ্টিতে পাহাড়ে বারবার ধস নামতে দেখা যাচ্ছে। ভারতের বন্যা পরিস্থিতির নেপথ্যে অতিবৃষ্টি, বিভিন্ন নদীর জলস্তর বৃদ্ধি তথা একাধিক কারণ রয়েছে। 

নগরায়নের জন্য নির্বিচারে চলছে গাছ কাটা, যেখানে সেখানে ফেলা হচ্ছে প্লাস্টিক। পুকুরে নদীতে প্লাস্টিক জমা পড়ছে, ফলস্বরূপ জলজ বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। আমাদের অসচেতনতা,বেলাগাম জীবনযাপন প্রকৃতিকে আরও বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে আমাদের জীবনে। তাই প্রকৃতিকে সুন্দর রাখতে আমাদেরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। যেখানে আমরা থাকি তা সুন্দর হয়ে উঠলে, সুন্দর হয়ে উঠবে আমাদের জীবনও।

বর্ষায় পুরুলিয়া 

আবহাওয়াবিদদের মতে এখনই বিদায় নিচ্ছে না বর্ষা। আরও কিছুদিন বর্ষাকে নিয়ে থাকতে হবে আমাদের। এই বর্ষায় কলকাতার কাদা প্যাচপ্যাচে জীবনে একটু ফুরফুরে হাওয়া আনতে কলকাতা ছেড়ে দু’দিনের জন্য পুরুলিয়ায় ঘুরে আসতে পারেন। পলাশে মোড়া পুরুলিয়ার রূপ অনেকে দেখলেও, অন্য আরেক অপরূপ সৌন্দর্য্যের সাক্ষী থাকতে একবারের জন্য বর্ষায় ঘুরে আসতে হবে পুরুলিয়া।  

আকাশে মেঘ, ঘন জঙ্গল আর সবুজে ঘেরা অযোধ্যা পাহাড়, ঝরণা, লেক সবমিলিয়ে চোখ ফেরাতে পারবেন না। উপরি পাওনা এখানকার স্থানীয় মানুষদের জীবনযাত্রা খুব কাছ থেকে উপলব্ধি করার সুযোগ।

সবুজে ঘেরা অযোধ্যা । কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

অযোধ্যা পাহাড়

আপনার ‘চাঁদের পাহাড়’ যেতে ইচ্ছা করে কিন্তু সাধ আর সাধ্যের অদৃশ্য শিকলে বাঁধা পড়তে হচ্ছে আপনাকেও । তাহলে চিন্তা না করে পুরুলিয়ার ‘চাঁদের পাহাড়’ থেকে কিন্তু অনায়াসেই ঘুরে আসতে পারেন এই বর্ষায়। ছোট্ট ছোট্ট পায়ে ঠিক পৌঁছে যাবেন চাঁদের পাহাড়। বুনিপ বা হীরের খনির সন্ধান না পেলেও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে অযোধ্যা আফ্রিকাকেও বলে বলে গোল দিতে পারে। বিশ্বাস করুন আমি একটুও বাড়িয়ে বলছি না।

ঝাড়খণ্ড, বিহার, ওড়িশা, পশ্চিমবঙ্গের বেশ কিছুু এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে ছোটোনাগপুর মালভূমি। এই মালভূমির অন্তর্গত পুরুলিয়ার সবথেকে বড় পাহাড়শ্রেণি অযোধ্যা। এই পাহাড়ের সবথেকে বড় বৈশিষ্ট্য এর মাথা এক্কেবারে সমতল যা হিলটপ নামেই পরিচিত। 

মার্বেল লেক

অযোধ্যা পাহাড়ের কোলে রয়েছে মার্বেল লেক। ছোট্ট একটা হাইকিং-এর রাস্তা পেরিয়ে যেতে হয়। নীল-সবুজ জল চোখে আরাম দেয়।  এই লেক স্থানীয়দের কাছে পটল ড্যাম বা টারপানিয়া লেক নামেও পরিচিত। 

বামনী ফলস্

অযোধ্যা পাহাড়ে একটি সুন্দর ঝরণা রয়েছে যার নাম বামনী ফলস্। ছোটো ছোটো পাহাড়ে  ঘেরা,  তার মাঝখানে বয়ে চলা বারিধারা আর অজানা পাখির কিচিরমিচিরের আওয়াজ,  সব মিলিয়ে সে সৌন্দর্য্য বর্ণনা করা যাবেনা। তার উপর যদি হয় বর্ষাকাল তাহলে সে রূপ আরও মোহময়ী। যেদিকে তাকাবেন সেদিকে সবুজ আর তার সঙ্গে হালকা ঝিরিঝিরি বৃষ্টি যদি হয় আপনার সঙ্গী তবে কংক্রীটেরজঙ্গল থেকে দূরে সে এক অজানা দেশ। এই ঝরণার পাশেই একটা রাস্তা পাহাড়ের পাদদেশে নীচে লেকে পৌঁছোয়। আঁকাবাঁকা রাস্তায় আস্তে আস্তে নেমে যেতে পারেন লেকের কাছে, চোখ ভরে সেই সৌন্দর্য্যকে সঙ্গে করে নিয়ে আসতে পারেন আপনার শহুরে ব্যস্ততায়। মন উদাস হয়ে উঠলেই স্মৃতির খাতা থেকে পুরুলিয়ার সেই বৃষ্টি ভেজা গল্প বের করে আরও একবার ঝালিয়ে নেবেন, তাহলেই দেখবেন সব মনখারাপ এক্কেবারে ম্যাজিকের মতো হাওয়া হয়ে যাবে।

অবারিত জলধারা ।
কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

টুরগা ফলস্ 

বামনী ফলস থেকে আরেকটু গেলে দেখতে পাবেন টুরগা ফলস্।দুটি পাহাড়ের গা ঘেষে ঠিক মাঝ বরাবর বয়ে চলেছে ঝরণা। জলের সেই আওয়াজ আপনার মনকে সতেজ করে দেবে, সারাদিনের ক্লান্তি অনায়াসে ফিকে হয়ে যাবে।

অযোধ্যা পাহাড়ের উপরে কংসাবতী নদীতে দুটি ড্যাম রয়েছে, আপার ড্যাম ও লোয়ার ড্যাম। লোয়ার ড্যাম থেকে অস্ত যাওয়া লালরঙা সূর্যের আলোকে গায়ে মাখলে  অনায়াসে ভুলে যাবেন মনের মধ্যে থাকা সেই নাপাওয়ার দুঃখগুলোকে।

আপার ড্যাম ও লোয়ার ড্যাম

লোয়ার ড্যামের গাঘেষা  পাহাড় উঠে গেছে আপার ড্যাম পর্যন্ত।  আপার ড্যাম জল সঞ্চয় করা হয়, সেখান থেকে  টারবাইনের মাধ্যমে বিদ্যূৎ তৈরি হয় আর জল পৌঁছে যায় লোয়ার ড্যামে। 

আপার ড্যাম থেকে আরো এক কিলোমিটার পথ পেরিয়ে আরো একটা পাহাড় দেখতে পাবেন, শোনা যায় এক সময় এখানে ময়ূর দেখা যেত তাই পাহাড়ের নাম ময়ূর পাহাড়। এই পাহাড়ের উপরে একটা হনুমান মন্দির আছে। হাতে সময় থাকলে গাড়ি থামিয়ে একবার হনুমানজির দর্শন সেরে নিন।

এক এক ঋতুতে অযোধ্যা এক এক রূপে সাজে।  নভেম্বর- ডিসেম্বর কিংবা বসন্তে পলাশে ঢাকা অযোধ্যা যেমন বর্ষাকালের অযোধ্যার সঙ্গে তার কোনও মিল নেই। যদি আপনি অন্য সময়ে পুরুলিয়াঅযোধ্যা পাহাড় বেড়াতে গিয়েও থাকেন তাঁদেরকেও বলব বৃষ্টিতে একবার অযোধ্যা ঘুরে আসুন, খালি হাতে ফিরে আসবেন না।   

পঞ্চকোট বা পাঞ্চেত পাহাড়

‘খোকা ঘুমালো পাড়া জুড়ালো, বর্গী এল দেশে’ ছোটবেলা মা-ঠাকুমার কাছে এই গান শুনে কতবার ঘুমের কোলে ঢোলে পড়েছি। সেই বর্গীদের আক্রমণে কিছু ধ্বংসাবশেষ আজও নিজের অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে। পুরুলিয়া ঘোরার দ্বিতীয় দিনে তাই ঘুরে আসতে পারেন পাঞ্চেত বা গড় পঞ্চকোট। এই গড়পঞ্চকোট দূর্গটি নির্মিত হয়েছে সিং দেও রাজত্বকালে। জনশ্রুতি অনুযায়ী পাঁচটি গোষ্ঠী বা কোটের সাহায্যে গড়ে ওঠে এই দূর্গ তাই নাম রাখা হয় গড় পঞ্চকোট। সেই ঐতিহাসিক গড় পঞ্চকোটের ধ্বংসাবশেষের গায়ে লেগে রয়েছে পঞ্চকোট রাজবংশের ইতিহাস। এই দূর্গে হয়েছে প্রকৃতি আর ইতিহাসের মেলবন্ধন। চারিপাশে সবুজ, দূরে একটা দুটো টিলা দেখা যায়। Raise Your Concern About this Content

ইতিহাস বুকে করে দাঁড়িয়ে আছে গড় পঞ্চকোট । কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

পঞ্চরত্ন রাস মন্দির 

এখানে একটি মন্দিরও রয়েছে। পঞ্চকোট রাস মন্দিরকে নতুন করে সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছিল তৎকালীন রাজ্য সরকারের তথ্য সংস্কৃতি দপ্তর। মন্দিরের পাঁচটি চূড়া রয়েছে। মন্দিরে কৃষ্ণের বিগ্রহ আছে। 

নজরমিনার 

কিছুটা দূরে দেখা যায় নজরমিনার। তারপরেই পাহাড়ি পথ এঁকেবেঁকে উঠে গেছে। জানা যায়, নজরমিনার থেকেই শত্রুদের উপর নজর রাখতো সৈন্যরা। 

কীভাবে যাবেন?

হাওড়া থেকে পুরুলিয়াগামী যেকোনো ট্রেনে পুরুলিয়া। পুরুলিয়া থেকে অযোধ্যা পাহাড় যাওয়ার  গাড়ি পাওয়া যায়। একদিন অযোধ্যা ও পাশ্ববর্তী এলাকা ঘুরে দেখুন। অন্যদিন বরাকর হয়ে চলে যান গড়পঞ্চকোট। বরাকর থেকে প্রায় ঊনিশ কিলোমিটার দূরে গড়পঞ্চকোট অবস্থিত। 

কোথায় থাকবেন?

আপার বা লোয়ার অযোধ্যায় থাকা ভালো। গোর্গাবুরি পাহাড়ের সামনে নীল সবুজ ইকো রিসর্ট রয়েছে। অযোধ্যা পাহাড়ের কাছে মাঠাবুরু ইকো রিসর্ট রয়েছে। (ph no- 8016861375)

গড়পঞ্চকোটের কাছে পাঞ্চেত রিসোর্ট রয়েছে। পাহাড়ের ভিউ নিয়ে এই রিসোর্টে নিরিবিলিতে সময় কাটিয়ে আসতে পারেন। এখানে হেঁসেল ঘরে খাবারের স্বাদ অসাধারণ।

বর্ষায় পুরুলিয়া এক অনন্য সৌন্দর্য্যের রূপ ধারণ করে। সবুজে ঘেরা পাহাড় যেন নতুন প্রাণ ফিরিয়ে দেয় লাল মাটির দেশকে। তাই বর্ষাকালে পুরুলিয়াকে নতুন ভাবে জানতে, চিনতে গ্রাম্য জীবনের ছন্দ খুঁজে পেতে, একবারের জন্য ঘুরে আসতে হবে। 

এবছর বর্ষা প্রায় শেষের পথে। বিশ্ব উষ্ণায়নজনিত সমস্যার কারণে এই সেপ্টেম্বরেও বানভাসী দেখা যাচ্ছে ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চল। যাঁরা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন বা দুর্দশায় সময় কাটাচ্ছেন তাদের জন্য আমরা মর্মাহত। তবে আশাকরি সবাই এই দুঃসময় কাটিয়ে উঠবেন। আর আগামী বছরের বর্ষা ঋতু ভরপুর উপভোগ করতে আপনি প্ল্যান করতে পারেন আগেভাগেই। তাই অকালে এই লেখাটা প্ৰতিস্থাপন করলাম, কেমন লাগলো জানাবেন। 

- বিজ্ঞাপন -
বিশ্বয়নী দত্ত
বিশ্বয়নী দত্ত
কলকাতা বিশ্ববিদ্য়ালয় থেকে জার্নালিজম এবং মাস কমিউনিকেশনে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। গত কয়েক বছর ধরে জাতীয় প্রতিষ্ঠানে সাংবাদিকতা ও কন্টেট রাইটিং-এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। লেখালেখির প্রতি তাঁর বিশেষ অনুরাগ রয়েছে । ব্যস্ত জীবনের একঘেয়েমি কাটাতে মাঝেমধ্যে পাহাড়ে ঘুরতে যেতে ভালবাসেন।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

বাংলা ক্যালেন্ডার

- বিজ্ঞাপন -spot_img

Most Popular

Recent Comments