Homeপার্বণীসারনাথ, গৌতম বুদ্ধ ও গুরু পূর্ণিমা

সারনাথ, গৌতম বুদ্ধ ও গুরু পূর্ণিমা

হিন্দু শাস্ত্র মতে প্রত্যের পূর্ণিমার বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। গুরু পূর্ণিমাও তার ব্যতিক্রম নয়। লোকমুখে প্রচলিত, গুরু পূর্ণিমার পুণ্য তিথিতে মুনি পরাশর এবং মাতা সত্যবতীর ঘরে জন্মগ্রহণ করেন মহর্ষি বেদব্যাস। পরবর্তীকালে যিনি রচনা করেন মহাভারত। ব্যাসদেবকে ১৮ টি মহাপুরাণ রচনার কৃতিত্বও দেওয়া হয়। পুরাণগুলি ভারতীয় সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ, যেখানে ধর্ম, দর্শন, সৃষ্টিতত্ত্ব, ইতিহাস, বংশপরম্পরা, দেব-দেবীর উপাখ্যান, নীতিশিক্ষা, তীর্থ, আচার-অনুষ্ঠান এবং মানবজীবনের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে গভীর আলোচনা রয়েছে। 

গুরু পূর্ণিমা কী?  

হিন্দু শাস্ত্রে মহর্ষি বেদব্যাস জন্মতিথি উপলক্ষে গুরু পূর্ণিমা পালন করা হয়। তাই এই পূর্ণিমাকে ব্যস পূর্ণিমাও বলা হয়। আষাঢ় মাসে এই তিথি পড়ে।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

গুরু পূর্ণিমার তাৎপর্য

গুরু পূর্ণিমার দিন শিষ্যরা তাঁদের গুরু বা শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং জ্ঞান, শিক্ষা ও আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। ভারতীয় সংস্কৃতিতে এই উৎসব গুরু-শিষ্য পরম্পরার চিরন্তন মূল্যবোধ ও জ্ঞানের প্রতি শ্রদ্ধার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।

বৌদ্ধ ধর্মে গুরু পূর্ণিমা

বৌদ্ধধর্মে গুরু পূর্ণিমার বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে।  প্রচলিত রয়েছে, বোধগয়ায় বোধিলাভের প্রায় পাঁচ সপ্তাহ পরে গৌতম বুদ্ধ সারনাথে চলে আসেন। বোধিলাভের পূর্বে তিনি কঠোর তপস্যা পরিত্যাগ করেছিলেন। সেই সময় তাঁর পাঁচজন প্রাক্তন সঙ্গী যাঁদের পঞ্চবর্গীয় ভিক্ষু বলা হয়, গৌতম বুদ্ধকে ত্যাগ করে সারনাথের ঋষিপতনে চলে যান।

বোধিলাভের পর গৌতম বুদ্ধ উরুবিল্বা বর্তমান বোধগয়া থেকে সারনাথে শিষ্যদের কাছে যান। তাঁর আধ্যাত্মিক জ্ঞানের মাধ্যমে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, এই পাঁচজন শিষ্য খুব দ্রুত ধর্মের প্রকৃত অর্থ উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন। সারনাথে যাওয়ার পথে তাঁকে গঙ্গা নদী পার হতে হয়। রাজা বিম্বিসার এই সংবাদ পেয়ে সন্ন্যাসী ও তপস্বীদের জন্য গঙ্গা পারাপারের কর বা শুল্ক তুলে দেন।

সারনাথে পৌঁছে গৌতম বুদ্ধ তাঁর পাঁচ প্রাক্তন সঙ্গীকে ধর্মচক্র প্রবর্তন সূত্রের উপদেশ দেন। ‘ধর্মচক্র প্রবর্তন সূত্র’ (ধম্মচক্কপবত্তন সুত্ত) নামে পরিচিত এই উপদেশের মাধ্যমে তিনি তাঁর প্রথম শিষ্যদের কাছে ধর্মের মূল শিক্ষা তুলে ধরেন।  এই ধর্মাদেশ শুনে তাঁরা ধর্ম উপলব্ধি করেন এবং জ্ঞানপ্রাপ্ত হন। আষাঢ় মাসের পূর্ণিমা তিথিতেই এই ঘটনার মাধ্যমে বৌদ্ধ ভিক্ষু সংঘ-এর আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠা হয়।এই ঘটনাকেই বৌদ্ধধর্মের আনুষ্ঠানিক সূচনা এবং বুদ্ধের বাণী বিশ্বজুড়ে বিস্তারের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

এরপর গৌতম বুদ্ধ সারনাথের মূলগন্ধকুটি-তে তাঁর প্রথম বর্ষাবাস (বৃষ্টি ঋতুর সাধনাকাল) অতিবাহিত করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই ভিক্ষু সংঘের সদস্যসংখ্যা ৬০-এ পৌঁছে যায়। তখন বুদ্ধ তাঁদের নির্দেশ দেন, যেন তাঁরা বিভিন্ন দিকে একাকী ভ্রমণ করে ধর্ম প্রচার করেন এবং মানবকল্যাণে বুদ্ধের বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দেন।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

সারনাথ ও বৌদ্ধ ধর্মের গুরুত্ব

বৌদ্ধ ধর্মমতে সারনাথ হল বৌদ্ধ মহা তীর্থস্থানের অন্যতম। প্রথমটি লুম্বিনী, গৌতম বুদ্ধের জন্মস্থান। দ্বিতীয়টি হল বুদ্ধগয়া, প্রচলিত রয়েছে এখানে বুদ্ধের সম্যক জ্ঞানলাভ, তথা বুদ্ধত্ব প্রাপ্তি। তৃতীয় সারনাথ, বৌদ্ধধর্ম এবং বৌদ্ধসংঘের জন্মস্থান। চতুর্থ কুশিনগর, যেখানে ভগবান বুদ্ধ মহানির্বাণ লাভ করেন। সারনাথের মিউজিয়ামে রক্ষিত একটি পাথরে পর পর খোদিত এই চারটি তীর্থস্থানের উল্লেখ পাওয়া যায়। 

সারনাথকে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্যও মনোনীত করা হয়েছে।

জানেন কি গৌতম বুদ্ধ প্রথম পাঁচ শিষ্যের নাম?

গৌতম বুদ্ধের প্রথম পাঁচ শিষ্য হলেন কৌণ্ডিন্য, অশ্বজি, ভদ্দিয়া, বাপ্পা এবং মহানাম। 

ইতিহাস

খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৬০০ থেকে ২০০ অব্দের মধ্যে, অর্থাৎ ভারতের দ্বিতীয় নগরায়ণের যুগে, সারনাথে বৌদ্ধধর্ম দ্রুত বিকশিত হয়। মহাজনপদ যুগ, নন্দ সাম্রাজ্য এবং পরবর্তীকালে মৌর্য সাম্রাজ্যের সময় বারাণসীর রাজা ও ধনী বণিকদের পৃষ্ঠপোষকতায় সারনাথ বৌদ্ধ শিক্ষা ও ধর্মচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। মৌর্যযুগে অশোকের আমল থেকে সারনাথের বৈভব শুরু হয়। 

খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতাব্দীতে সারনাথ সাম্মাতীয় নামে পরিচিত প্রাচীন বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে এটি বৌদ্ধ শিল্প, স্থাপত্য এবং ভাস্কর্যেরও একটি উল্লেখযোগ্য কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

সারনাথে হেরুক ও তারা দেবতার মূর্তি আবিষ্কৃত হওয়ায় জানা যায় যে, পরবর্তী সময়ে এখানে বজ্রযান বৌদ্ধধর্মেরও চর্চা প্রচলিত ছিল। পাশাপাশি এখানে শিব ও ব্রহ্মা-র মূর্তিও পাওয়া গেছে, যা হিন্দুধর্মের উপস্থিতির প্রমাণ বহন করে। এছাড়া ধামেক স্তূপ-এর খুব কাছেই একটি জৈন মন্দির অবস্থিত ছিল, যা এই অঞ্চলে বিভিন্ন ধর্মের সহাবস্থানের নিদর্শন।

গুপ্ত সাম্রাজ্যের (চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ শতাব্দী) সময়ে বৌদ্ধধর্ম রেশম পথ ধরে ভারতের সীমানা অতিক্রম করে এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। এই সময়ে চীনের জিন রাজবংশের বৌদ্ধ ভিক্ষু ফা-হিয়েন  ৪০০ থেকে ৪১১ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ভ্রমণ করেন। সারনাথ সম্পর্কে তাঁর বিবরণে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, সেখানে তিনি চারটি বৃহৎ স্তম্ভসদৃশ স্থাপনা এবং দুটি বিহার দেখেছিলেন, যেখানে বহু বৌদ্ধ ভিক্ষু বসবাস ও ধর্মচর্চা করতেন।

দর্শনীয় স্থান

ধামেক স্তূপ 

ধামেক স্তূপকে সেই স্থান হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যেখানে গৌতম বুদ্ধ বোধিলাভের পর তাঁর প্রথম ধর্মদেশনা প্রদান করেছিলেন। গবেষকদের মতে, ‘ধামেক’ নামটি সম্ভবত ‘ধর্মচক্র’ শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘ধর্মচক্রের প্রবর্তন’ বা ‘ধর্মের চাকা ঘোরানো’।

বর্তমানে ধামেক স্তূপের উচ্চতা প্রায় ৩৯ মিটার (১২৮ ফুট) এবং ব্যাস প্রায় ২৮ মিটার (৯২ ফুট)। এটি সারনাথের অন্যতম দর্শনীয় স্থান।

ধর্মরাজিকা স্তূপ 

ধর্মরাজিকা স্তূপ সারনাথে অবস্থিত অশোক-পূর্ব যুগের অতি অল্প কয়েকটি স্তূপের অন্যতম। বর্তমানে এর কেবল ভিত্তিভাগই অবশিষ্ট রয়েছে। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে বিংশ শতাব্দীর প্রথমভাগ পর্যন্ত এই স্তূপ বহুবার ধ্বংস, লুণ্ঠন ও প্রত্নতাত্ত্বিক খননের সম্মুখীন হয়েছে।

অশোক স্তম্ভ

সম্রাট অশোক সারনাথে যে বিখ্যাত স্তম্ভ স্থাপন করেছিলেন, দ্বাদশ শতাব্দীর আক্রমণের সময় সেটি ভেঙে যায়। তবে স্তম্ভটির বহু অংশ এখনও মূল স্থানে সংরক্ষিত রয়েছে।

এই স্তম্ভের শীর্ষে ছিল বিখ্যাত অশোকের সিংহস্তম্ভ এবং তার উপর স্থাপিত ছিল ৩২টি আরাযুক্ত বেলেপাথরের ধর্মচক্র। বর্তমানে সিংহস্তম্ভ ও ধর্মচক্র সারনাথ প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে।

মূলগন্ধকুটি বিহার 

এই বিহারের ধ্বংসাবশেষ সেই স্থানকে চিহ্নিত করে, যেখানে গৌতম বুদ্ধ তাঁর প্রথম বর্ষাবাস (বৃষ্টি ঋতুর সাধনাকাল) কাটিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে এখানেই সারনাথের প্রধান মন্দির গড়ে ওঠে এবং এর সম্মুখেই অশোক স্তম্ভ স্থাপিত হয়েছিল।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

চৌখণ্ডী স্তূপ

ডিয়ার পার্ক বা মৃগদায় থেকে প্রায় ৮০০ মিটার দূরে অবস্থিত চৌখণ্ডী স্তূপ সেই স্থানকে স্মরণ করে, যেখানে বোধিলাভের পর গৌতম বুদ্ধ তাঁর প্রথম পাঁচ শিষ্যের সঙ্গে পুনরায় সাক্ষাৎ করেছিলেন। 

স্তূপটির শীর্ষে একটি অষ্টভুজাকার ইটের মিনার রয়েছে, যা মুঘল সম্রাট আকবর ১৫৮৮ সালে তাঁর পিতা সম্রাট হুমায়ূনের স্মৃতিতে নির্মাণ করেন।

সারনাথ প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর 

সারনাথ প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে অশোকের বিখ্যাত সিংহস্তম্ভ, যা অশোক স্তম্ভের প্রায় ১৪ মিটার (৪৫ ফুট) উচ্চতা থেকে মাটিতে পড়েও অক্ষত অবস্থায় টিকে ছিল। পরবর্তীকালে এটিই ভারতের জাতীয় প্রতীক হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।

এছাড়াও জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে পঞ্চম শতাব্দীর বেলেপাথরে নির্মিত ‘বুদ্ধের প্রথম ধর্মদেশনা’-র অসাধারণ ভাস্কর্য এবং কুমারদেবীর শিলালিপি, যা সারনাথের ইতিহাস ও বৌদ্ধ ঐতিহ্যের মূল্যবান নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত।Raise Your Concern About this Content

ধর্মচক্র জিন বিহার

এটি একটি বিশাল বৌদ্ধ বিহার ও ভিক্ষুদের আবাসস্থল। ধারণা করা হয়, দ্বাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে গোবিন্দচন্দ্রের পত্নী কুমারদেবীর উদ্যোগে এটি নির্মিত অথবা পুনর্নির্মিত হয়েছিল।

উপসংহার

বৌদ্ধধর্মের পাশাপাশি সারনাথে হিন্দু ও জৈন ধর্মের ঐতিহ্যেরও সুস্পষ্ট উপস্থিতি ভারতের বহুধর্মীয় ও বহুসাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পরিচয় বহন করে। প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অসংখ্য ভক্ত, গবেষক ও পর্যটক এই পবিত্র তীর্থক্ষেত্রে আসেন শান্তি, জ্ঞান ও ইতিহাসের স্পর্শ অনুভব করতে। 

তথ্যসূত্র

১. গুরু পূর্ণিমা
২. সারনাথ
৩. গুরু পূর্ণিমা ২০২৬: তারিখ, সময়, ইতিহাস ও তাৎপর্য
৪. গুরু পূর্ণিমা ২০২৬-এর তারিখ ও সময়: এই শুভ উপলক্ষটির তিথি, ইতিহাস ও তাৎপর্য জেনে নিন।
৫. মহাতীর্থ সারনাথ – Maha Tirtha Saranath

বিশ্বয়নী দত্ত
বিশ্বয়নী দত্ত
কলকাতা বিশ্ববিদ্য়ালয় থেকে জার্নালিজম এবং মাস কমিউনিকেশনে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। গত কয়েক বছর ধরে জাতীয় প্রতিষ্ঠানে সাংবাদিকতা ও কন্টেট রাইটিং-এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। লেখালেখির প্রতি তাঁর বিশেষ অনুরাগ রয়েছে । ব্যস্ত জীবনের একঘেয়েমি কাটাতে মাঝেমধ্যে পাহাড়ে ঘুরতে যেতে ভালবাসেন।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

বাংলা ক্যালেন্ডার

- বিজ্ঞাপন -spot_img

Most Popular

Recent Comments