বাঙালি সংস্কৃতিতে যেকোনও সম্পর্কের উদযাপন সবসময়ই সুমধুর। সে জামাই ষষ্ঠী হোক বা ভাইফোঁটা। বাঙালীর ঐতিহ্যবাহী এক সংস্কৃতিক লৌকিক আচার হল জামাই ষষ্ঠী। বাঙালির ঘরে ও সংস্কৃতিতে জামাইদের স্থান শুরু থেকেই অতি উচ্চে। জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লা ষষ্ঠী তিথিতে উদযাপিত হয় বাঙালির চিরকালীন এই ঐতিহ্যবাহী উৎসব। তবে কালের ফেরে কখনও কখনও জৈষ্ঠ মাসের পরিবর্তে অন্য মাসেও জামাই ষষ্ঠি পালনের তিথি পড়ে বটে। যেমন চলতি বছর অর্থাৎ বাংলা সাল ১৪৩৩-এর আষাঢ় মাসে সেই শুভ মুহূর্ত রয়েছে। লৌকিক মতে, মা ষষ্ঠীর পুজো করে জামাইয়ের দীর্ঘায়ু ও কল্যাণ কামনা করা হয় এই দিনে। বাড়ির জামাইকে ঘিরে শ্বশুরবাড়ির অফুরন্ত আদর-আপ্যায়ন থাকে তুঙ্গে। কিন্তু ঘরের লক্ষ্মী অর্থাৎ বাড়ির বৌমাদের জন্য কী আছে এই সমাজে?
“জামাই ষষ্ঠীর জামাই ভোজ,
এমন দিন আসে না রোজ”
জামাই ষষ্ঠী হোক বা অন্য যেকোনও সময় বাড়িতে জামাই এলে একটা হইহই ব্যাপার পড়ে যায় বাড়িতে। সবাই আনন্দে মুখর থাকে। যেমন থাকে উপচে পড়া খুশির মহল তেমনই এলাহি খাওয়া দাওয়া চোখে পড়ার মতো। উচ্চবিত্ত হোক বা মধবিত্ত প্রত্যেকে নিজেদের সাধ্যমত নিজেদের জামাই এর জন্য আয়োজন করতে ব্যস্ত থাকেন। জামাইরাও এই বিষয়টাকে খুব সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করেন। জামাই ষষ্ঠিতেই সব থেকে বেশি আদর যত্ন পান জামাইরা। বছরের অন্য দিনগুলিতে আদর আপ্পায়ন ভাল পেলেও জামাই ষষ্ঠিতে প্রত্যেকটা জামাইয়ের আশা থাকে অনেক উঁচুতে। সবার কাছে এটাই স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু বাড়ির লক্ষ্মীদের কি? তাঁদের জন্য না বাপের বাড়িতে কোনও বিশেষ উদ্যোগ চোখে পড়ে, আর না শ্বশুর বাড়িতে কোনও বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বাড়ির মেয়েদের কাছেও এটাই স্বাভাবিক বিষয়। কারণ শুরুর সময় থেকে সবাই এটাই দেখে দেখে অভ্যস্ত। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে যেমন মানুষ ডিজিটাল যুগে পা দিয়েছে, যেমন উন্নত চিন্তাভাবনা দিয়ে এআই বা রোবটের সাহায্যে নিজেদের কাজকে আরও সহজভাবে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তেমনই এই উন্নত সমাজে বাড়ির লক্ষ্মী অর্থাৎ বাড়ির বৌমাদের সম্মান-মর্যাদা ও গুরুত্বকে প্রাধান্য দিতে তাঁদের জন্য বিশেষ দিনের সূচনা করে আরও একধাপ আধুনিকতার দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে।

কেন ব্রাত্য ঘরের লক্ষ্মীরা?
জামাই ষষ্ঠীতে জামাই-এর জন্য এলাহি ব্যবস্থা করেন শ্বশুর বাড়ির লোক। নতুন ধুতি-পাঞ্জাবি, আম-লিচু-মিষ্টির বিপুল সম্ভার। সেই সঙ্গে অবশ্যই থাকে থালা সাজানো ইলিশ, চিংড়ি বা খাসির মাংস। জামাইকে খুশি করতে শ্বশুর-শাশুড়ি নিজেদের সাধ্যের সর্বোচ্চ উজাড় করে দেন। শুধু জামাই ষষ্ঠীই নয়, বছরের যেকোনও অনুষ্ঠানে, পুজো-পার্বণে বা অন্য সময়ে শ্বশুরবাড়িতে পা রাখলে জামাইয়ের স্থান হয় সবার ওপরে। তাঁকে ঘিরে বাড়ির সবার মধ্যে এক রাজকীয় ব্যস্ততা তৈরি হয়। এই আদর, এই ভালবাসা বাঙালির পারিবারিক বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু এই চেনা ছবির উল্টো পিঠেই লুকিয়ে আছে এক উপেক্ষা ও একাকীত্বের গল্প। বিয়ের পর একটি মেয়ে যখন নিজের বাড়ি, চেনা পরিবেশ, চেনা মানুষগুলোকে ছেড়ে সম্পূর্ণ এক নতুন পরিবারে পা রাখে, তখন তাকে বধূ বরণ করে মহা আয়োজনের সঙ্গে ঘরে তোলা হয়। আলতা-দুধের থালায় পা রেখে, বরণ ডালা ছুঁয়ে, ঘরের লক্ষ্মী হিসেবে তাঁকে বরণ করে নেওয়ার সেই মুহূর্তটি অত্যন্ত আবেগঘন এবং উৎসবমুখর। বাস্তবতা কিন্তু এখানেই থেমে থাকে।
সেই একদিনের রাজকীয় বরণের পর আর থাকে না সেই আরম্বর। বাড়ির গৃহলক্ষ্মীটি হয়ে ওঠে সংসারের মূল চালিকাশক্তি। সকালের চা থেকে শুরু করে রাতের বিছানা গোছানো, শ্বশুর-শাশুড়ির ওষুধপত্র, অতিথি আপ্যায়ন-সহ সংসারের খুঁটিনাটি সবকিছু সে নিজের কাঁধে তুলে নেয় বা তাঁর কাঁধে তুলে দেওয়া হয়। সে নিজের পরিবারকে একপ্রকার ভুলে গিয়ে স্বামীর পরিবারকে আপন করে নেয়। অথচ, যে মেয়েটি প্রতিদিন পুরো পরিবারকে আগলে রাখছে, তাঁকে আলাদা করে ধন্যবাদ জানানোর বা তাঁর উপস্থিতি উদযাপনের কোনও বিশেষ দিন আমাদের সংস্কৃতিতে নেই। জামাই বছরে কয়েকদিন এসে যে খাতির পায়, ঘরের বৌমা ৩৬৫ দিন হাড়ভাঙা খাটুনি খেটেও অনেক সময় সেই নূন্যতম সম্মান বা স্বীকৃতিটুকুও পায় না। সময় বদলেছে, আর সময়ের সাথেই বদলানো উচিত আমাদের মানসিকতার। জামাই ষষ্ঠী যদি জামাইকে ভালবাসার দিন হয়। তাহলে যে মেয়েটি নিজের বাপের বাড়ি ছেড়ে এসে এই বাড়িটাকে আগলে রাখছে, তাঁর জন্য কেন একটা বিশেষ দিন থাকবে না?Raise Your Concern About this Content
‘অরণ্যষষ্ঠী’ থেকে ‘জামাইষষ্ঠী’ হয়ে ওঠার ইতিহাস:
মূলত জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লা তিথি ধরে আয়োজিত ‘অরণ্যষষ্ঠী’-ই সময়ের ফেরে আজকের জামাইষষ্ঠী-তে রূপান্তরিত হয়েছে, বলা ভাল রূপান্তরিত করা হয়েছে। এই রূপান্তরের পেছনে রয়েছে এক গভীর সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক ইতিহাস রয়েছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
একসময় জ্যৈষ্ঠের দাবদাহে যখন মাঠ-ঘাট শুকিয়ে যেত, তখন মেয়েরা বৃষ্টি ও উত্তম ফসলের কামনায় বনে গিয়ে গান গেয়ে বনদেবীকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করতো। তারপর অরণ্যের দেবীই হয়ে উঠলেন প্রজনন ও সন্তান রক্ষয়িত্রী দেবী। রাঢ় অঞ্চলে কৃষি জমি ও ষষ্ঠীপুজো একসঙ্গে হতো, যার নাম ‘গাবরষষ্ঠী’। রঘুনন্দনের তিথিতত্ত্ব অনুযায়ী, মহিলারা অরণ্যে গিয়ে পাখা হাতে ‘বিন্দ্যবাসিনী স্কন্দ ষষ্ঠী’-র পুজো করতেন। বন বা অরণ্যে এই পুজো হতো বলেই এর নাম অরণ্যষষ্ঠী।

অনেক সময় শ্বশুরবাড়িতে অধিকাংশ নারীর কপালে জুটত তুমুল লাঞ্ছনা-গঞ্জনা। বিশেষ করে সন্তান জন্ম দিতে না পারলে অত্যাচারের মাত্রা চরম পর্যায়ে পৌঁছে যেত। বর্তমানে সেই বিষয় লক্ষ্য করা গেলেও পরিমাণটা কমেছে। এই নিষ্ঠুর সামাজিক পরিস্থিতিতে মেয়েকে অত্যাচার থেকে বাঁচাতে এবং জামাইকে খুশি রাখতে ‘জামাইকে তোয়াজ করার’ প্রথাটি চালু হয় বলেও উল্লেখ পাওয়া যায়। শ্বশুর-শাশুড়ির কাছে জামাতাও এক প্রকার সন্তান তুল্য। জামাই সাধারণত বাইরে থাকার কারণে, জ্যৈষ্ঠ মাসের এই বিশেষ তিথিতে তাঁকে সসম্মানে নিমন্ত্রণ করে আনার রেওয়াজ তৈরি হয়। গবেষকদের মতে, জ্যৈষ্ঠ মাসের কৃষ্ণপক্ষের সাবিত্রী চতুর্দশীতে স্ত্রীরা স্বামীদের দীর্ঘজীবন কামনা করে যমের আরাধনা করতেন। এই লোকচারের সূত্র ধরেই কলকাতার বাবু সংস্কৃতিতে জ্যৈষ্ঠের শুক্লা ষষ্ঠীতে ‘জামাইষষ্ঠী’-র অনুপ্রবেশ ঘটে। ১৮-১৯ শতকের বাংলায় বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহের ব্যাপক প্রচলন ছিল। যার ফলশ্রুতি ছিল অসংখ্য বালবিধবা ও সতীদাহের মতো ঘটনা। তৎকালীন ওই অনিশ্চয়তার মাঝে জামাইদের দীর্ঘজীবন কামনা করা বাঙালি মা এবং মেয়ের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। সন্তানের মঙ্গলকামনার চেয়েও জামাতার আয়ু বৃদ্ধির গুরুত্ব কোনও কোনও ক্ষেত্রে বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ইতিহাসে বারংবার দেখা গিয়েছে, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্যে প্রয়োজন অনুযায়ী সমাজ তার পুরনো আচার-অনুষ্ঠানগুলোকে সংশোধন করে নেয়। অরণ্যষষ্ঠীও ঠিক একইভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। কন্যার ভবিষ্যৎ এবং সন্তানের কল্যাণ নিয়ে উদ্বিগ্ন বাঙালি মায়েরা প্রাচীন অরণ্যষষ্ঠীর ব্রতটিকেও পরিবর্তন করে জামাইয়ের জন্য ভূরিভোজ ও আদরের উৎসব অর্থাৎ জামাইষষ্ঠী-তে রূপান্তর করেছেন।
উপসংহার:
আধুনিক যুগে একান্ন পরিবার প্রায় বিলুপ্ত। এখন একক পরিবারের দাপট। এই যুগে সম্পর্কের সমীকরণগুলো অনেকটাই বদলেছে। ব্যস্ততার কারণে হয়তো অনেক সময় তিথি মেনে উৎসব পালন করাও সম্ভব হয় না। কিন্তু জামাইষষ্ঠীর মতো উৎসব আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, এই লৌকিক আচারের মূল উদ্দেশ্য হল দুটি ভিন্ন পরিবারের মধ্যে ভালবাসার সেতুটি মজবুত রাখা। আর এমনভাবেই বৌমা ষষ্ঠীর মাধ্যমে বৌমা ও শ্বশুর-শ্বাশুড়ির মধ্যেও সম্পর্ক আরও মধুর হতে পারে। তাই বাড়ির লক্ষ্মী অর্থাৎ বৌমাদের আরও আপন করার জন্যও এটা একটা ভাল পদ্ধতি হিসাবেও কাজ করতে পারে।

ওপরের ইতিহাসে যদি সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে পারে। অরণ্যষষ্ঠী থেকে জামাই ষষ্ঠী হতে পারে। তাহলে বর্তমান আধুনিক সমাজে জামাই ষষ্ঠীর পাশাপাশি বৌমা ষষ্ঠী পালন করে কেন কঠিন হবে? আসুন, আমরাই এই অচলায়তন ভাঙি। জামাই ষষ্ঠীর মতোই একটি দিন নির্বাচন করে আমরা বৌমা ষষ্ঠি পালন করি। বর্তমানে হাতে গোনার মতো কয়েকটা বউমা ষষ্ঠীর মিষ্টি মুহূর্ত সামনে এলেও তা নিতান্ত্যই অল্প সংখ্যক।
নারীর ক্ষমতায়ন বা সাম্যের কথা শুধু মুখে বললেই হয় না, তা নিজেদের ঘর থেকে শুরু করতে হয়। জামাই ষষ্ঠীর আনন্দ যেমন খাঁটি, বৌমা ষষ্ঠী-র মতো ভাবনাকে বাস্তবায়িত করা তেমনই জরুরি। ঘরের লক্ষ্মীকে তাঁর প্রাপ্য সম্মান, ভালবাসা ও একটু বিশ্রামের সুযোগ করে দেওয়া কোনও দয়া নয়, এটা তাঁর অধিকার। আসুন, আমরা আধুনিক সমাজকে আরও একধাপ আধুনিকতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। ঘরের লক্ষ্মীকে তাঁর ষথাষথ মর্যাদা ও সম্মান দেওয়া শুরু করি।
তথ্যসূত্র :
উইকিপিডিয়া
সমবাংলায় লেখালেখি
জি ২৪ ঘন্টা- প্রতিবেদন
ঐমুহুর্তের প্রতিবেদন
অন্যান্য প্রতিবেদন




