বাঙালির সেরা উৎসব দুর্গাপুজো। রাজ্য বা রাজ্যের বাইরে, দেশ হোক বা দেশের বাইরে বাঙালিরা যেখানে থাকুক দুর্গাপুজোর ৪ দিন তাঁরা আনন্দে মেতে ওঠে। দুর্গাপুজো আসলেই বিশ্বজনীন। এই উৎসব আসলে ঘরের মেয়ের ঘরে ফেরা, পরিবারের সঙ্গে সুন্দর মুহূর্ত ভাগ করে নেওয়া।
দুর্গাপুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাঙালির আবেগ, ঐতিহ্য, অস্তিত্ব, সংস্কৃতি। শরতের আকাশে পেঁজা তুলো, কাশফুলের সমারোহ, ঢাকের আওয়াজ সব মিলিয়ে বাঙালির মনে দুর্গাপুজোর বিশেষ জায়গা রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ থেকে কয়েক লক্ষ কিলোমিটার দূরে দুর্গাপুজো উদযাপনের মাধ্যমে বাঙালির নিজের শিকড়ের টানকে নতুন করে উপলব্ধি করে। লন্ডন, সিডনি, নিয়ইয়র্ক, দুবাই,টরেন্টো, সিঙ্গাপুর বাঙালিরা যেখানেই যায়, আশ্বিনের শারদ প্রাতে সেখানেই গড়ে ওঠে একটুকরো বাংলা।
দেশের বাইরে পুজোর প্রস্তুতি
পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য জেলা ও কলকাতার মতো বিদেশেও বেশ কিছু মাস আগে থেকেই দুর্গাপুজোর প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। পুজোর আয়োজনে গড়ে তোলা হয় কোনও বাঙালি কমিটি , সাংস্কৃতিক সংগঠন। অনেক সময় আমেরিকা, লন্ডনে প্রবাসী বাঙালিরা একসঙ্গে কোনও সংগঠন তৈরি করে পুজোর আয়োজন করে।
বিদেশে বেশিরভাগক্ষেত্রে সপ্তাহান্তে পুজোর দিনগুলি ফেলা হয়। কর্মব্যস্ততার জন্য অনেকের পক্ষেই ছুটি পাওয়া সম্ভব হয় না। তাই কোনওভাবেই যাতে পুজোর ছুটির আনন্দে কোনওরকম খামতি না পড়ে তাই এই ব্যবস্থা। কোথাও আবার দুই দিনের মধ্যেই গোটা দুর্গাপুজোর যাবতীয় আয়োজন সেরে ফেলা হয়।
দুর্গাপ্রতিমা আনার জন্য একমাত্র দেশের উপরই ভরসা। তাই অনেক আগে প্রতিমা শিল্পীকে বরাত দিতে হয়, মূর্তি তৈরির পর তা ফের বিদেশে পাঠানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জড়িয়ে রয়েছে। পুজোর দিনক্ষণ স্থির করা, পুরোহিতের সঙ্গে যোগাযোগ, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন এবং সকলের জন্য খাবারের ব্যবস্থা, এই সবকিছুই অনেক আগে থেকে পরিকল্পনা করতে হয়।
কলকাতার মতো থিমের আড়ম্বর হয়তো নেই, বিশাল প্যান্ডেল তৈরিও হয়তো সম্ভব নয়। কোনও কমিউনিটি হলই একমাত্র অপশন যেখানে সেজে ওঠে মণ্ডপ, জায়গা করে নেন মা দুর্গা। এখানে প্যান্ডেল,মণ্ডপসজ্জা, প্রতিমাসজ্জাকেও পিছনে ফেলে দেয় প্রবাসী বাঙালিদের আবেগ। সেখানে এতটুকু ফাঁক থাকেনা। এটাই তো আসলে শিকড়ের টান, নিজেদের অস্তিত্বের বহিঃপ্রকাশ। প্রবাসের মাটিতেই যেন এক টুকরো বাংলার প্রতিষ্ঠা করেন তাঁরা।
দূর দেশ থেকেই আসে প্রতিমা
আগেই বললাম, নানা কারন প্রতিমা তো আর প্রবাসে তৈরি করা সম্ভব হয়ে ওঠেনা, তাই দেশ থেকে মৃৎশিল্পীদের তৈরি করা প্রতিমা নিয়ে যাওয়া হয় বেশিরভাগ জাগাতেই। প্রতিমা পৌঁছানোর পর শুরু হয় মণ্ডপসজ্জা। দুর্গাপ্রতিমা মুখমণ্ডলের দিকে তাকিয়ে ফেলে আসা সময় আর মানুষগুলোকে আরও একবার আঁকড়ে ধরেন প্রবাসী বাঙালিরা। বন্ধু দের সঙ্গে আড্ডা, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, সবই থাকে, আবার কিছুই থাকেনা, শুধু নিজেদের বলতে থাকে মা দুর্গা।
প্রবাসীদের মিলনস্থল
অচেনা জায়গায় তারা তৈরি করে তাদের চেনা পরিবেশ। লন্ডন বা সিডনি বা সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাঙালিরা জড়ো হয়। এই পুজোমণ্ডপই হয়ে ওঠে প্রবাসীদের মিলনস্থল। কিছু সময়ের জন্য তাদের কথা বলার মাধ্যম হয়ে ওঠে শুধুই বাংলা। অ, আ, ক, খ থেকে রবীন্দ্রনাথের গানই হয়ে ওঠে তাদের অনুভূতি আদানপ্রদানের একমাত্র হাতিয়ার।
তাদের হয়তো অনেকেই বেশ কয়েক বছর পুজোর সময় কলকাতা ফিরতে পারেনি। কেউ কেউ হয়তো বহুবছর পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে পারেনি । এই দুর্গাপুজোর সময় তাঁরা আবারও ফিরে যায় স্মৃতিচারণে। মণ্ডপে বসেই হয়তো কেউ নিজের মায়ের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলে নেয়। কারোর হয়তো বন্ধুদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর্ব চলে। খুদেদের চলে প্রবাসে থেকে বাংলাকে চেনানোর পাঠশালা।
বিদেশের মাটিতে জন্ম নেওয়া কোনও শিশুর সঙ্গে হয়তো বাংলা সংস্কৃতির পরিচয় হয়। তারা জানার চেষ্টা করে, বোঝার চেষ্টা করে ধুনুচি নাচ, অঞ্জলি, পুজোর রীতি-নীতিকে। কোথাও কোথাও আবার বাংলা ভাষায় কিছু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজনও করা হয়। বাংলায় গান গাওয়া হয়, রবীন্দ্রনৃত্য পরিবেশন করা হয়। শক্তি, সুনীল থেকে জীবনানন্দ দাশের কবিতা পাঠ করা হয়। আনন্দ, আনন্দ, আর অপরিসীম আনন্দই হয়ে ওঠে তাদের গোটা বছরটা কাটানোর রসদ।
বাঙালির পেটপুজো
বাঙালি আর পেটপুজো তো একে অপরের পরিপূরক। উৎসব মানেই হচ্ছে বাঙালি খাবার। সাদা ভাত, ডাল, আলুভাজা, সুক্ত, পাঁঠার মাংস ছাড়া কি আর বাঙালির উৎসব শুরু হয়? তার উপর যদি পুজোর ভোগে খিচুড়ি,লাবড়া, পায়েস, চাটনি থাকে তাহলে পেটপুজো একেবারে জমে যাবে। প্রবাসের মাটিতে এই খাবার পাওয়া হাতে স্বর্গ পাওয়ার থেকে কম কিছু নয়।
তবে বাঙালি খানাপিনার জন্য প্রায় বেশকিছুদিন আগে থেকে প্রস্তুতি নেওয়া হয়। দেশের থেকে কোনও রাঁধুনিকে কয়েকদিনের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁর উপরই দায়িত্ব পড়ে প্রবাসীদের মুখে অন্ন জোগানোর।
প্রযুক্তির বর
প্রবাসের মাটিতে বাঙালির এই উৎসবের যুক্ত হচ্ছে এই দেশের তথা পশ্চিমবঙ্গের মানুষও। সোশ্যাল মিডিয়ায় আনন্দ ভাগ করে নিচ্ছে। লাইভের মাধ্যমে বিদেশের দুর্গাুজোর উদয়াপনের সঙ্গে মেতে উঠছেন। দেশ-বিদেশের মধ্যে তৈরি হচ্ছে আনন্দের তথা সাংস্কৃতিক উদযাপনের সেতু ।
পরিধান
দুর্গাপুজো মানে শাড়ি-পাঞ্জাবী। দেশ হোক বা বিদেশ পুজোর সময় নিজেদের বাঙালি পোশাক ছাড়া অন্যকিছুতে যেন মানানসই লাগে না। সারা বছর ক্যাসুয়ালের ভিড়ে এই আনন্দের দিনে বাঙালি বেশভূষাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে থাকে। দশমীর সিঁদুরখেলা মহিলাদের লাল পাড় সাদা শাড়ি, কপালে গাঢ় সিঁদুর ছাড়া যেন ভাবাই যায় না। পুরুষদের পরনে ধুতি-পাঞ্জাবী থাকা বাধ্যতামূলক। এটাই তো বাঙালিদের ঐতিহ্য, আড়ম্বর, এটাই তো বাঙালির সংস্কৃতি।
বিদেশেও বেশ কিছু বিখ্যাত পুজো হয়। যেখানে প্রবাসের মাটিতে শোনা যায় ঢাকের আওয়াজ, পাওয়া যায় ধূপের গন্ধ।
ক্যালিফোর্নিয়ায় মাউন্টেন হাউসের দুর্গোৎসব

প্রতিবারের ন্যায় এবছরেও মা দুর্গাকে বরণ করতে প্রস্তুত মাউন্টেন হাউস। ক্যালিফোর্নিয়ার মাটিতে ফুটে উঠবে এক টুকরো বাংলা। পূর্বার আয়োজনে ক্যালিফোর্নিয়ার মাউন্টেন হাউস সেন্ট্রাল পার্কে বসছে চলতি বছরের দুর্গাপুজোর আসর। ৩ দিন ধরে চলবে উদযাপন। এই বছরের বিশেষ আকর্ষণ পূর্বার দুর্গাপুজো উদযাপনের ৫ বছরের পূর্তি। তাই যেন সাজসাজ রব। সাথে থাকছে নানারকম খাবারের আয়োজন। শিশুদের জন্যে বসে আঁকো প্রতিযোগিতা তো থাকছেই, অবাঙালী ভারতীয়দের অনুরোধে সাথে থাকছে বিশাল ডিস্কো ডান্ডিয়ার আয়োজন। বাংলার ঐতিহ্যকে ধরে রাখা, সংস্কৃতিকে বিদেশের মাটিতে ছড়িয়ে দেওয়ার এই অভিযান পূর্বার মাধ্যমে সফল হচ্ছে বছর বছর ধরেই।
বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশন অব ভিক্টোরিয়ার দশভূজার আরাধনা
বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশন অব ভিক্টোরিয়া হল অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়ায় বসবাসকারী ভারতীয় বাঙালিদের একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন। পৃথিবীর এক প্রান্তে, সুদূর অস্ট্রেলিয়ায় থেকেও BAV বাংলার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও শিকড়কে সযত্নে ধরে রাখার কাজ করে চলেছে।
তাদের উদ্যোগে চলতি বছরেও দুর্গাপুজোর আয়োজন করা হয়েছে।

আটলান্টিক সিটির শারদোৎসব
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভারত ও বাংলাদেশের বাঙালিরা একসাথেই দুর্গাপুজোয় অংশগ্রহণ করেন। প্রবাসী বাঙালিদের উদ্যোগে গত বছর শ্রীশ্রী গীতা সংঘ মন্দিরেই পুজো অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
দক্ষিণ পোমনার বৈকুণ্ঠ হিন্দু জৈন মন্দিরে প্রথমবারের মতো দুর্গাপুজোর আয়োজন করে নিউজার্সির আটলান্টিক কাউন্টির প্রবাসী বাঙালিরা। পরবর্তীকালে ২০১০ সাল থেকে আটলান্টিক সিটির ১০৯, গীতা সংঘ মন্দিরেই দুর্গাপুজোর আসর বসে।
পুজো, আরতি, সংগীত ও নৃত্য পরিবেশনা সহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রোগ্রাম,সিঁদুর খেলা, প্রসাদ বিতরণের মতো একাধিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। Raise Your Concern About this Content
মেলবোর্নের দুর্গাপুজো
মেলবোর্নে দুর্গাপুজোর আরম্ভ হয় ১৯৮৯ সালে। গতবছরও মেলবোর্নে ১১টি বারোয়ারি পুজো ও ১০টি পারিবারিক পুজো হয়েছিল। বারোয়ারি পুজোর মধ্যে ৩টি পুজো বাংলাদেশের। পারিবারিক পুজোগুলো তিথি অনুযায়ী হয় কিন্তু বারোয়ারি পুজোগুলো হয় উইকেন্ডে কারণ উইকডেতে ছুটি পাওয়া একটু চাপের। কলকাতা থেকে শোলা ও ফাইবারগ্লাসের প্রতিমা নিয়ে আসা হয়। প্রতিমা বিসর্জন করা হয় দর্পণ বিসর্জনের মাধ্যমে। ভোগে খিচুড়ি,লাবড়া, চাটনি, মিষ্টি খাওয়ানো হয়।
শেফিল্ডের দুর্গোৎসব

ইংল্যান্ডে দুর্গাপুজো উজ্জাপিত হয় ধুমধাম করে, আয়োজিত করা হয় রীতি-রেওয়াজ মেনেই। শেফিল্ডের দুর্গোৎসব এগুলির মধ্যে সবথেকে বেশি উল্লেখযোগ্য। ধুনুচিনাচ, সন্ধিপুজো, আরতি, পুজোর সাজ সবকিছুতে বাঙালির ছোঁয়া। সাথে থাকে বিশাল খাদ্যোৎসব।
হেলসিংবর্গের দশভূজার আরাধনা
সুইডেনের হেলসিংবর্গ শহরে দুর্গাপুজোর আয়োজন খুব জাঁকজমকভাবে পালন করা হয়। বাঙালিরা এমনিও খুব উৎসবমুখী। চণ্ডীপাঠ থেকে কুমারী পুজো সবকিছু নিষ্ঠা ভরে পালন করা হয়। সুইডেনে লিঙ্গবৈষম্য নেই বললেই চলে সেই বিদেশের মাটিতে কুমারী পুজোর মাহাত্ম্য অন্যরকম সুন্দর।
উপসংহার
প্রবাসীদের দুর্গাপুজো আসলে বিদেশের মাটিতে বাংলাকে নতুন করে খুঁজে পাওয়ার গল্প। এটি শুধু প্রতিমা, পুজো, ভোগ বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের বা বিভিন্ন মানুষের মিলন অনুষ্ঠান নয়, এর মধ্যে মিশে থাকে দেশছাড়ার স্মৃতি, নিজের শহরের জন্য টান, পরিবার ও বন্ধুত্ব, নতুন প্রজন্মকে বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করানো এবং নিজের সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার এক আন্তরিক দায়িত্ববোধ।
দেশ থেকে বহু ক্রোশ দূরে থাকলেও দুর্গাপুজো বাঙালিকে মনে করিয়ে দেয় বাংলার এতিহ্য, সংস্কৃতি, অনুভূতিকে সঙ্গে করে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাঙলিরা দুর্গাপুজো করে বিশ্বের নানা প্রান্তে প্রতিষ্ঠা করে তাঁর জন্মভূমি বাংলাকে।



