Homeপার্বণীবিশ্বকর্মা পুজো মানেই আকাশে ঘুড়ি! জানেন কি কীভাবে এল এই বাঙালি রীতি?

বিশ্বকর্মা পুজো মানেই আকাশে ঘুড়ি! জানেন কি কীভাবে এল এই বাঙালি রীতি?

শরতের আকাশে ঘুড়ি অবশ্য নতুন কোনও দৃশ্য নয়। কিন্তু বাংলায় এমন একটি দিন আছে, যেদিন ঘুড়ির সঙ্গে উৎসবের সম্পর্কটা যেন আরও গাঢ় হয়ে ওঠে—বিশ্বকর্মা পুজো

একদিকে কারখানা, ওয়ার্কশপ, গ্যারাজ কিংবা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার পুজো। যন্ত্রপাতি পরিষ্কার করে ফুল-মালা দিয়ে সাজানো হচ্ছে। অন্যদিকে বাড়ির ছাদে কিংবা পাড়ার মাঠে চলছে ঘুড়ি ওড়ানোর প্রস্তুতি। কোথাও লাটাইয়ে সুতো জড়ানো হচ্ছে, কোথাও ঘুড়ির লেজ ঠিক করা হচ্ছে, আবার কোথাও পছন্দের ঘুড়ি নিয়ে শুরু হয়েছে বন্ধুবান্ধবের তর্ক। কিন্তু প্রশ্নটা থেকেই যায়—বিশ্বকর্মা পুজোর সঙ্গে ঘুড়ির সম্পর্কটা তৈরি হল কী ভাবে?

কিন্তু পুজোর সঙ্গে ঘুড়ির সম্পর্ক কোথায়?

প্রথমেই একটা কথা পরিষ্কার করে নেওয়া দরকার। বিশ্বকর্মা পুজোর ধর্মীয় আচারের মধ্যে ঘুড়ি ওড়ানোর কোনও আবশ্যিক বিধান নেই। অর্থাৎ, বিশ্বকর্মার পুজো করতেই হবে, আর তার পর ঘুড়ি ওড়াতেই হবে—এমন কোনও ধর্মীয় নিয়ম নেই।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

তাহলে এই যোগসূত্র এল কোথা থেকে?

এর উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের যেতে হয় লোকাচার, ঋতু, কর্মসংস্কৃতি এবং বাংলার শহুরে জীবনের ইতিহাসের দিকে।

বিশ্বকর্মা পুজো মূলত শ্রমজীবী ও কারিগরদের সঙ্গে গভীর ভাবে যুক্ত। কারখানা, ছাপাখানা, লোহার ওয়ার্কশপ, গ্যারাজ, রেল-কারখানা, নির্মাণক্ষেত্র—যেখানে যন্ত্রপাতি মানুষের কাজের অন্যতম হাতিয়ার, সেখানেই বিশ্বকর্মার আরাধনা বিশেষ গুরুত্ব পায়।

একটা সময় বাংলার শিল্পাঞ্চলে এই পুজো ছিল কার্যত কর্মীদের নিজস্ব উৎসব। সারা বছর যন্ত্রের শব্দ, কাজের চাপ আর সময়ের তাড়ায় ব্যস্ত থাকার পর এই দিনটিতে কর্মস্থলেই তৈরি হত অন্য রকম পরিবেশ। যন্ত্রপাতি পরিষ্কার করা হত, পুজো হত, কোথাও ভোগ বা খাওয়াদাওয়া, কোথাও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। কাজের জায়গাটাই হয়ে উঠত উৎসবের জায়গা। আর সেই উৎসবেরই একটা স্বাভাবিক সম্প্রসারণ ছিল আনন্দ আর অবসর। সেখানেই ঘুড়ির প্রবেশ।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

শরতের বাতাস আর নীল আকাশ

ঘুড়ি ওড়ানোর জন্য আবহাওয়ারও একটা বড় ভূমিকা রয়েছে।  বর্ষা পেরিয়ে শরতের শুরু। আকাশ ধীরে ধীরে পরিষ্কার হচ্ছে। মেঘের ফাঁকে নীল রং আরও উজ্জ্বল। বাতাসে বর্ষার অতিরিক্ত আর্দ্রতা অনেকটাই কমে এসেছে। এই সময় খোলা আকাশে ঘুড়ি ওড়ানোর আনন্দই আলাদা। ফলে বিশ্বকর্মা পুজোর সময়টা অনেক জায়গাতেই ঘুড়ি ওড়ানোর জন্য অনুকূল হয়ে ওঠে।

তার সঙ্গে রয়েছে ছুটির আমেজ। স্কুল-কলেজ বা কাজের ব্যস্ততার বাইরে কয়েক ঘণ্টা নিজের মতো করে কাটানোর সুযোগ। তাই পুজোর দিন বাড়ির ছাদে উঠে ঘুড়ি ওড়ানো ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে উৎসবের অন্যতম বিনোদন।

অর্থাৎ, ঘুড়ির সঙ্গে বিশ্বকর্মা পুজোর সম্পর্কটা কোনও একদিনে তৈরি হয়নি। বরং ঋতুর আবহাওয়া, শিল্পাঞ্চলের উৎসব, অবসর এবং বাঙালির খেলাধুলার সংস্কৃতি—সব মিলিয়েই এই রীতিকে জনপ্রিয় করেছে।

কারখানার সাইরেন থেকে ছাদের লাটাই

বিশ্বকর্মা পুজোর সঙ্গে বাংলার শিল্পাঞ্চলের সম্পর্কের কথা উঠলে হাওড়া, হুগলি, উত্তর কলকাতা, উত্তর ২৪ পরগনা-সহ বিভিন্ন এলাকার পুরনো কারখানা-সংস্কৃতির কথা মনে পড়ে।

এক সময় কারখানার পুজো মানেই ছিল শ্রমিকদের মধ্যে আলাদা উৎসাহ। কারখানা সাজানো হচ্ছে, যন্ত্রপাতিতে ফুল দেওয়া হচ্ছে, কোথাও তৈরি হচ্ছে প্যান্ডেল। পুজোকে ঘিরে কর্মীদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে উৎসবের আবহ। পুজো শেষ হলে শুরু হত অন্য পর্ব—খাওয়াদাওয়া, আড্ডা, আনন্দ।

এই আবহে অনেক জায়গায় ঘুড়ি হয়ে উঠেছিল দিনের অন্যতম আকর্ষণ। কারখানার আশপাশের বাড়ি কিংবা শ্রমিক কোয়ার্টারের ছাদে শুরু হত ঘুড়ি ওড়ানো। ধীরে ধীরে সেই অভ্যাস ছড়িয়ে পড়ে বৃহত্তর শহুরে সমাজে।

বিশ্বকর্মা পুজো তাই অনেকের কাছে শুধু যন্ত্রের পুজো নয়। এটা ছিল কাজের ফাঁকে একটু আনন্দ করার দিনও।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

‘প্যাঁচ’ থেকে ‘ভোকাট্টা’

ঘুড়ি ওড়ানোর আনন্দ শুধু আকাশে ঘুড়ি তুলে দেওয়ার মধ্যে আটকে নেই। আসল উত্তেজনা শুরু হয় যখন দু’টি ঘুড়ির মুখোমুখি দেখা। তারপর শুরু হয় ‘প্যাঁচ’।

এক পক্ষ সুতো ছাড়ছে, অন্য পক্ষ টান দিচ্ছে। কারও চোখ ঘুড়িতে, কারও চোখ সুতোয়। আশপাশের ছাদ থেকেও তখন দর্শক জুটে যায়। কয়েক সেকেন্ডের সেই লড়াই কখন যে ছোট্ট প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়, বোঝাই যায় না।

আর তারপর— ‘ভোকাট্টা!’

জিতে যায় একটি ঘুড়ি। অন্যটি স্বাধীন হয়ে যায় হাওয়ার কাছে।

কাটা ঘুড়ির পিছনে ছুটতে থাকা বাচ্চাদের দলও তখন উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাস্তার মোড়ে, গলির ভিতর, মাঠের ধারে—যেদিকেই কাটা ঘুড়ি ভেসে যায়, সেদিকেই শুরু হয় ছোটাছুটি।

সেই দৌড়ে ঘুড়িটা কে পেল, সেটা অনেক সময় বড় কথা নয়। আসল আনন্দ ছিল দৌড়তে পারায়, চিৎকার করতে পারায়, বন্ধুদের সঙ্গে হইচই করতে পারায়।

লাটাইয়ে  লুকিয়ে আছে এক টুকরো শৈশব

আজকের প্রজন্মের অনেক শিশুর কাছে ঘুড়ি হয়তো শুধুই একটি খেলনা। কিন্তু একটু পুরনো প্রজন্মের কাছে লাটাইয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক গল্প।

কারও প্রথম ঘুড়ি ওড়ানোর স্মৃতি বাবার হাত ধরে। কারও লাটাই ধরতে শেখার গল্প দাদুর কাছে। কেউ আবার পাড়ার বড় দাদার কাছ থেকে শিখেছে কী ভাবে সুতো ছাড়তে হয়। ঘুড়ি কিনতে যাওয়াটাও ছিল এক ধরনের উৎসব।

দোকানে সারি সারি রঙিন ঘুড়ি। কোনওটা একরঙা, কোনওটায় নকশা, কোনওটা ছোট, কোনওটা বড়। পছন্দ করতে করতেই কেটে যেত অনেকটা সময়। সঙ্গে সুতো, লাটাই—সব মিলিয়ে উৎসবের প্রস্তুতি যেন শুরু হয়ে যেত কয়েক দিন আগে থেকেই।

এখন অবশ্য সেই ছবি অনেকটাই বদলেছে। স্মার্টফোন, গেম, সোশ্যাল মিডিয়া আর বদলে যাওয়া শহুরে জীবন ছাদের আড্ডাকে অনেকটাই সরিয়ে দিয়েছে। অনেক বহুতলে ঘুড়ি ওড়ানোর জায়গাও নেই। কোথাও আবার নিরাপত্তার কারণে ছাদে ওঠার সুযোগ সীমিত।

তবু বিশ্বকর্মা পুজো এলেই বাংলার অনেক জায়গায় আকাশের দিকে তাকালে দেখা যায়—কোথাও একটি ঘুড়ি, কোথাও কয়েকটি, আবার কোথাও যেন রীতিমতো রঙের মেলা।

শুধু উৎসব নয়, বদলে গিয়েছে বাংলার ছবিও

বিশ্বকর্মা পুজোর ঘুড়ি তাই শুধু বিনোদনের গল্প নয়। এর মধ্যে লুকিয়ে আছে বাংলার সামাজিক পরিবর্তনের ছবিও। এক সময় যেখানে কারখানা ছিল শহরের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, সেখানে আজ অনেক পুরনো কারখানা বন্ধ বা তার চরিত্র বদলে গিয়েছে। যে শ্রমিকপাড়াগুলিতে এক সময় পুজোর সঙ্গে ঘুড়ির উৎসব জুড়ে থাকত, সেখানেও বদল এসেছে।Raise Your Concern About this Content

কিন্তু সংস্কৃতি সহজে হারিয়ে যায় না। এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে কিছু আনন্দ নিজের পথ খুঁজে নেয়। বিশ্বকর্মা পুজোর ঘুড়িও তেমনই।

কারখানার ছাদ থেকে আবাসনের ছাদে, শ্রমিকপাড়া থেকে শহরতলির বাড়িতে—ঘুড়ি তার জায়গা বদলেছে, কিন্তু উৎসবের সঙ্গে তার সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন হয়নি।

আকাশের দিকে চেয়ে তাকানোর একটা দিন

বিশ্বকর্মা পুজোর সবচেয়ে সুন্দর দিক হয়তো এটাই—এই দিনটা মানুষকে কিছুক্ষণের জন্য হলেও আকাশের দিকে তাকাতে শেখায়।

সারা বছর চোখ আটকে থাকে মোবাইলের স্ক্রিনে, কম্পিউটারের পর্দায়, রাস্তার যানজটে কিংবা কাজের ব্যস্ততায়। অথচ একটা ঘুড়ি উড়ছে দেখার জন্য মানুষকে মাথা তুলতেই হয়।সুতোটা থাকে হাতে, কিন্তু চোখ থাকে আকাশে।

হয়তো সেই কারণেই বিশ্বকর্মা পুজোর ঘুড়ি এতটা নস্টালজিক। এটি শুধু একটি উৎসবের অংশ নয়, বরং শহুরে জীবনের সেই সহজ আনন্দের স্মৃতি, যেখানে কয়েক ঘণ্টার জন্য কোনও বড় আয়োজনের প্রয়োজন হত না। একটা ঘুড়ি, একটা লাটাই, একটু বাতাস আর কয়েকজন বন্ধু—ব্যস, উৎসব তৈরি।

পরিশেষে বলা যায়, বছর বদলায়। ছাদ বদলায়। কারখানার চেহারা বদলায়। ঘুড়ির নকশাও বদলায়। বদলে যায় মানুষের ব্যস্ততা। কিন্তু শরতের নীল আকাশে যখন কোনও রঙিন ঘুড়ি হাওয়ার সঙ্গে দুলতে দুলতে ওপরে ওঠে, তখন কোথাও না কোথাও আবার শোনা যায়— ‘ভোকাট্টা!’ হয়তো আজ সেই আওয়াজ আগের মতো ঘন ঘন শোনা যায় না। কাটা ঘুড়ির পিছনে ছোটার জন্য গলিতে আগের মতো বাচ্চাদের দলও নেই। তবু বিশ্বকর্মা পুজোর আকাশে ঘুড়ি উঠলেই ফিরে আসে এক টুকরো পুরনো বাংলা।

যে বাংলায় কারখানার সাইরেনের পাশেই উৎসবের ঢাক বাজত, পুজোর পর ছাদে উঠত লাটাই, আর আকাশের দিকে তাকিয়ে কয়েক মুহূর্তের জন্য সবাই ভুলে যেত ব্যস্ততা। তাই বিশ্বকর্মা পুজোর ঘুড়ি হয়তো কোনও ধর্মীয় নিয়মের গল্প নয়। এটি আসলে বাংলার লোকজ সংস্কৃতি, শ্রমজীবনের উৎসব আর হারিয়ে যেতে বসা ছাদ-সংস্কৃতির এক রঙিন স্মৃতি।

আর সেই স্মৃতির সুতোটা এখনও কোথাও না কোথাও কারও হাতে ধরা থাকে। হাওয়ায় ঘুড়ি উড়তে থাকে। লাটাই ঘুরতে থাকে। আর বাংলার আকাশে ভেসে থাকে সেই চিরপরিচিত ডাক—‘ভোকাট্টা!’

তথ্যসূত্র

১. বিশ্বকর্মা পূজোর সঙ্গে ঘড়ির যোগসূত্র
২. ঘুড়ির লড়াই 
৩. বিশ্বকর্মা পুজোয় ঘুড়ি কেন ওড়ানো হয়
৪. কলকাতার আকাশে ঘুড়ি

- বিজ্ঞাপন -
সৃজিতা মল্লিক
সৃজিতা মল্লিক
ডিজিটাল মিডিয়ার নিউজ ডেস্কে কেটে গিয়েছে ৫ বছর। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণমাধ্যম নিয়ে পড়ার সময় থেকেই সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি হয় সৃজিতার। খবর ভালোবাসা তাই বাছবিচার ছাড়াই দেশ, দুনিয়া, রাজ্যের খবরের সঙ্গে সঙ্গে খেলা, বিনোদন দুনিয়ার ময়দানেও রয়েছে আনাগোনা। উৎসাহ বাজারের ওঠাপড়া, রাজনীতির বিষয়েও। খাদ্যরসিক। ছুটি পেলেই সপরিবার ভ্রমণে প্রাণের আরাম, মনের প্রশান্তি।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

বাংলা ক্যালেন্ডার

- বিজ্ঞাপন -spot_img

Most Popular

Recent Comments