দার্জিলিং -এর কার্শিয়ং-এর সবুজ পাহাড়ের কোলে অবস্থিত এক ঐতিহাসিক বাড়ি আজও বহন করে চলেছে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক গৌরবময় অধ্যায়। এই বাড়ির প্রতিটি ইট, প্রতিটি কোণ যেন সাক্ষী নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর সংগ্রামী জীবন, তাঁর অদম্য দেশপ্রেম এবং স্বাধীনতার স্বপ্নের। ব্রিটিশ শাসনের সময় গৃহবন্দি অবস্থায় নেতাজি এই বাড়িতেই কাটিয়েছিলেন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মাস। এখান থেকেই তিনি লিখেছিলেন বহু ঐতিহাসিক চিঠি, রাজনৈতিক বার্তা এবং হরিপুরা কংগ্রেসের ঐতিহাসিক সভাপতির ভাষণের খসড়া। শুধু নেতাজিই নন, তাঁর দাদা স্বাধীনতা সংগ্রামী শরৎচন্দ্র বসুর স্মৃতিও জড়িয়ে রয়েছে এই বাড়ির সঙ্গে। বর্তমানে জাদুঘরে রূপান্তরিত এই ঐতিহ্যবাহী ভবনটি নেতাজির ব্যবহৃত নানা সামগ্রী, দুর্লভ আলোকচিত্র এবং ঐতিহাসিক দলিল সংরক্ষণ করে নতুন প্রজন্মের কাছে স্বাধীনতা আন্দোলনের এক মূল্যবান ইতিহাস তুলে ধরছে।
১৯৩৬ সালে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু কার্শিয়ং-এর গিদ্দা পাহাড়ে এই বাড়িতেই ব্রিটিশ সরকারের বন্দি হিসেবে অন্তরীণ অবস্থায় ছিলেন। টানা ৭ মাস এই বাড়িতে তাঁকে আটক করে রাখে ব্রিটিশ সরকার।
ইতিহাস
১৯২২ সালে শরৎচন্দ্র বসু তৎকালীন অসমের ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট অব পুলিশ পিটার রাউলি লাসেলস ওয়ার্ড-এর কাছ থেকে এই বাড়িটি ক্রয় করেন।
১৯৩৩ থেকে ১৯৩৫ সাল পর্যন্ত শরৎচন্দ্র বসু ব্রিটিশ সরকারের নির্দেশে এই বাড়িতে অন্তরীণ অবস্থায় ছিলেন। পরে ১৯৩৬ সালে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকেও টানা ৭ মাস এই বাড়িতে গৃহবন্দি করে রাখা হয়।
গৃহবন্দি অবস্থায় এখান থেকেই তিনি চৌকিদারদের মাধ্যমে গোপনে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কাছে নানা নির্দেশ পাঠাতেন। ১৯৩৭ সালের অক্টোবর মাসে তিনি আবার কয়েক দিনের জন্য এই বাড়িতে আসেন।
এই বাড়ি থেকেই নেতাজি তাঁর স্ত্রী এমিলি শেঙ্কেল, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে পত্র মাধ্যমে যোগাযোগ করেছিলেন। এছাড়াও এখানেই বসে তিনি হরিপুরা কংগ্রেসে সভাপতির ভাষণের খসড়া রচনা করেন। এখান থেকেই তিনি মহাত্মা গান্ধী ও জওহরলাল নেহরুর উদ্দেশে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ চিঠিও লিখেছিলেন।নেতাজির ব্যবহৃত বহু ব্যক্তিগত সামগ্রী আজও এই বাড়িতে সযত্নে সংরক্ষিত রয়েছে।
১৯৯৬ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উচ্চশিক্ষা দপ্তর বাড়িটি অধিগ্রহণের উদ্যোগ গ্রহণ করে। পরবর্তীতে রাজ্য সরকার বাড়িটি অধিগ্রহণ করে সংস্কার করে এবং এর দায়িত্ব নেতাজি ইনস্টিটিউট ফর এশিয়ান স্টাডিজ-এর হাতে তুলে দেওয়া হয়।
২০০৫ সালে কলকাতা মিউজিয়ামের উদ্যোগে বাড়িটিকে জাদুঘরে রূপান্তরিত করা হয়। নেতাজির লেখা সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ চিঠি আজও এখানে অত্যন্ত যত্ন সহকারে সংরক্ষিত রয়েছে এবং হিমালয় অঞ্চলের ভাষা, সমাজ ও সংস্কৃতি বিষয়ক গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়।
২০১৭ সালে বাড়িটির মেরামত ও পুনরুদ্ধারের জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকার ১০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করে। বর্তমানে এই ঐতিহাসিক বাড়িটি পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত।
হরিপুরা কংগ্রেস ও বোস বাড়ির গুরুত্ব
১৯৩৮ সালে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রচিত হয় গুজরাটের হরিপুরায় অনুষ্ঠিত ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশনে, যা ‘হরিপুরা অধিবেশন’ নামে পরিচিত। গুজরাটের হরিপুরায় অনুষ্ঠিত এই অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন। সভাপতির ভাষণে তিনি স্পষ্টভাবে জানান যে, বিভিন্ন প্রদেশে কংগ্রেসের গঠিত মন্ত্রিসভাগুলির মধ্যে বিপুল বৈপ্লবিক সম্ভাবনা রয়েছে এবং সেই সম্ভাবনাকে দেশের কল্যাণে কাজে লাগানো উচিত। আর কার্শিিয়ং-এর বোস বাড়িতে বসেই হরিপুরা কংগ্রেসের সভাপতি ভাষণের খসড়া লিখেছিলেন সুভাষচন্দ্র বোস।
শরৎচন্দ্র বোসের লাগানো ক্যামেলিয়া গাছ
বাড়িটির বাইরের অংশে রয়েছে এক মনোরম ও শান্ত বাগান, যেখানে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর একটি ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে। চারপাশজুড়ে রয়েছে নানা প্রজাতির গাছপালা ও সবুজের সমারোহ। এছাড়াও এখানে রয়েছে একটি ঐতিহাসিক ক্যামেলিয়া গাছ, যা ১৯৩৪ সালে নেতাজির দাদা শরৎচন্দ্র বসু নিজ হাতে রোপণ করেছিলেন। আজও সেই গাছটি এই ঐতিহ্যবাহী বাড়ির ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এই বাড়িতেই নেতাজি তাঁর ভাইপোদের সঙ্গে লুকোচুরি খেলতেন, দোলনায় দোল খেতেন এবং পরিবারের সঙ্গে আনন্দঘন সময় কাটাতেন।

বোস হাউস ও দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম মহান নেতা দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসও এই ঐতিহাসিক বাড়িতে কিছু সপ্তাহ অবস্থান করেছিলেন। পরবর্তীকালে ১৯২৫ সালের ১৬ জুন দার্জিলিংয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। ফলে এই বাড়িটি শুধু নেতাজি ও শরৎচন্দ্র বসুর স্মৃতিবিজড়িত নয়, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের উপস্থিতির কারণেও ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
বোস বাড়ি ও পদ্মবাহাদুর ছেত্রী
১৯৭৩ সালে বসু পরিবারের সদস্য শিশির বসু ও কৃষ্ণা বসুর কাছ থেকে প্রতিদিন মাত্র ২ টাকা মজুরিতে এই বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পান পদ্মবাহাদুর ছেত্রী। এরপর থেকেই তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে এই ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িত বাড়ির দেখভাল করে আসছেন।
বাড়িতে কী কী সংগ্রহ করে রাখা হয়েছে?
কাঠ ও কাঁচের তৈরি ঐতিহ্যবাহী দরজা পেরিয়ে জাদুঘরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়বে নস্টালজিয়া ভরা পুরনো দিনের পরিবেশ। বাড়িটি চারটি প্রশস্ত ঘর এবং একটি বড় খোলা বারান্দা রয়েছে । একসময় এই বারান্দাটিই বসার ঘর ও খাবার ঘর হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
প্রতিটি ঘরের দেওয়ালজুড়ে সযত্নে সাজানো রয়েছে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জীবনের নানা পর্যায়ের বিরল আলোকচিত্র। ছবিগুলির মাধ্যমে ধাপে ধাপে ফুটে উঠেছে তাঁর শৈশব, শিক্ষাজীবন, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর ভূমিকা, দেশি-বিদেশি নেতাদের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ, আজাদ হিন্দ ফৌজের নেতৃত্ব, স্ত্রী এমিলি শেঙ্কেলের সঙ্গে কাটানো মুহূর্ত এবং তাঁর জীবনের শেষ যাত্রার স্মৃতিচিহ্ন।
জাদুঘরের একটি কক্ষ এবং খোলা বারান্দার একটি অংশে সংরক্ষণ করা হয়েছে কার্শিয়াংয়ের গিদ্দা পাহাড়ের এই বাড়িতে অবস্থানকালে নেতাজির ব্যবহৃত আসবাবপত্র। তাঁর ব্যবহৃত খাট, টেবিল, চেয়ারসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক সামগ্রীর পাশাপাশি আজাদ হিন্দ ফৌজের পোশাক, জুতো এবং আরও অনেক ব্যক্তিগত ব্যবহার্য বস্তু অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে সংরক্ষণ করা হয়েছে।

এমিলি শেঙ্কেলকে লেখা সুভাষের চিঠি
গিদ্দাপাহাড়ের এই বাড়ির একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় দিক হল এমিলি শেঙ্কেলের সঙ্গে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর যোগাযোগ। ১৯৩৬ সালে গিদ্দাপাহাড়ে থাকাকালীন সুভাষচন্দ্র বসু যে ২৬টি চিঠি লিখেছিলেন, তার মধ্যে ১১টি ছিল এমিলি শেঙ্কেলকে উদ্দেশ্য করে। একই সময়ে নেতাজি এমিলির কাছ থেকেও ১০টি চিঠি পেয়েছিলেন। সুভাষচন্দ্র বসু ও এমিলি শেঙ্কলের এই পত্রালাপ তাঁদের গভীর ব্যক্তিগত সম্পর্কের এক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য বহন করে।Raise Your Concern About this Content

কার্শিয়ং-এর বোস হাউসে কীভাবে যাবেন?
কার্শিয়ং-এর রেলওয়ে স্টেশনের খুব কাছেই অবস্থিত এই ঐতিহাসিক বাড়িতে খুব সহজেই পৌঁছানো যায়। আপনি যদি কার্শিয়ং-এ যান, তাহলে একটি গাড়ি ভাড়া করে সরাসরি এই জাদুঘরটি ঘুরে দেখতে পারেন।
এছাড়া, কার্শিয়ং-এর বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখতে গোটা দিনের জন্য সাইটসিয়িং ট্যুর বুক করলেও এই জাদুঘরটি সাধারণত সেই ভ্রমণসূচির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত থাকে। অধিকাংশ স্থানীয় ট্যুর অপারেটর তাঁদের দিনব্যাপী ভ্রমণ পরিকল্পনায় এই ঐতিহাসিক স্থানটি রাখেন।
নিকটতম রেলস্টেশন: নিউ জলপাইগুড়ি
নিউ জলপাইগুড়ি থেকে শেয়ার গাড়ি, বাস বা ভাড়া গাড়ি করে পৌঁছে যাবেন কার্শিয়ং। সময় লাগবে ২ থেকে ২.৫ ঘণ্টা। শেয়ার গাড়িতে খরচ পড়বে জনপ্রতি ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। নিউ জলপাইগুড়ি থেকে কার্শিয়ং যাওয়ার জন্য গাড়ি ভাড়া ৩৫০০-৪০০০টাকা। সরকারি বাসের সুবিধাও রয়েছে। তবে সেক্ষেত্রে আপনাকে অটো বা গাড়ি করে নিউ জলপাইগুড়ি থেকে শিলিগুড়ি বাসস্ট্যান্ড যেতে হবে।
নিকটতম বিমানবন্দর: বাগডোগরা বিমানবন্দর
বাগডোগরা থেকে গাড়ি করে কার্শিয়ং যাওয়া যায়। খরচ পড়বে ৪০০০ থেকে ৪৫০০ টাকা।
কোথায় থাকবেন?
থাকার জন্য কার্শিয়ং-এর বোস হাউসের খুব কাছেই রয়েছে অতিথি গৃহ হোমস্টেকে বেছে নিতে পারেন। রুমভাড়া ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা। তাছাড়াও কার্শিয়ং স্টেশনের কাছাকাছি বেশ কিছু হোটেল রয়েছে। রুমভাড়া ৮০০-২০০০, সেক্ষেত্রে সেখান থেকে নেতাজি মিউজিয়াম যেতে গেলে আপনাকে গাড়ি ভাড়া করতে হবে। ভ্রমণের আগে সর্বশেষ তথ্য যাচাই করে নেওয়া ভালো।
কন্ট্যাক্ট নম্বর- অতিথি গৃহ হোমস্টে (9851072749)
উপসংহার
এই বাড়ি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের গৌরবময় ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল প্রতীক। এই জাদুঘর শুধু নেতাজির স্মৃতিকে জীবন্ত করে রাখেনি, বরং তাঁর অদম্য সাহস, দেশপ্রেম এবং আত্মত্যাগের চেতনাকেও আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
তথ্যসূত্র
১. বাংলা: নেতাজির কার্সিয়াংয়ের বাড়ি—যেখানে তিনি বেশ কিছু ঐতিহাসিক চিঠি লিখেছিলেন—তা জাদুঘরে রূপান্তরিত হলো।
২. কার্সিয়ংয়ে পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে নেতাজির পৈতৃক বাড়ি।
৩. নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু মিউজিয়াম, কার্সিয়ং
৪. হরিপুরা কংগ্রেস অধিবেশন (১৯৩৮) – আধুনিক ভারতের ইতিহাসের নোট



