মোবাইলে কয়েকটি ট্যাপ। তারপর স্ক্রিনে ভেসে ওঠে— “Your order is on the way.” কয়েক মিনিট পরই দরজায় বাজে বেল। আমরা খাবার, ওষুধ, মুদি সামগ্রী বা প্রয়োজনীয় জিনিস হাতে পাই। কাজ শেষ। কিন্তু এই কয়েক মিনিটের সুবিধার আড়ালে যে মানুষটি রোদ, বৃষ্টি, যানজট, দুর্ঘটনার ঝুঁকি আর সময়ের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করেন, তাঁর জীবনের গল্প খুব কমই আলোচনায় আসে।
ভারতে গত কয়েক বছরে অনলাইন ডেলিভারি পরিষেবা মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে। শহর থেকে মফস্বল— সর্বত্র বেড়েছে অ্যাপ-নির্ভর ডেলিভারি পরিষেবা। এই পরিষেবার মূল ভরসা হাজার হাজার ডেলিভারি কর্মী। তাঁরা শুধু খাবার নয়, সময়, প্রতিশ্রুতি এবং একটি বিশাল ডিজিটাল অর্থনীতিকে প্রতিদিন সচল রাখছেন। অথচ তাঁদের অধিকাংশের জীবন অনিশ্চয়তা, চাপ এবং অদৃশ্য শ্রমের এক কঠিন বাস্তবতায় ঘেরা।
অ্যাপের পিছনের মানুষ: ডেলিভারি কর্মীর বাস্তব জীবন
অ্যাপে একটি বিন্দু নড়তে থাকে। সেই বিন্দুর পিছনে থাকেন একজন মানুষ। তাঁরও পরিবার আছে, অসুস্থতা আছে, অর্থকষ্ট আছে, ভবিষ্যতের স্বপ্ন আছে। অনেকেই ভোর থেকে রাত পর্যন্ত ১০ থেকে ১৪ ঘণ্টা কাজ করেন। কেউ কলেজের পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন, কেউ পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী, কেউ আবার চাকরি না পেয়ে এই পেশায় এসেছেন। গ্রাহকের কাছে তাঁরা শুধু একজন ডেলিভারি পার্টনার, কিন্তু বাস্তবে তাঁরা সমাজেরই এক গুরুত্বপূর্ণ কর্মজীবী শ্রেণি।

‘অনলাইন ডেলিভারি’ অর্থনীতির অদৃশ্য শ্রমিক
অনলাইন বাণিজ্যের দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে ডেলিভারি কর্মীদের গুরুত্বও বেড়েছে। কিন্তু এই অর্থনীতির সবচেয়ে দৃশ্যমান মানুষগুলিই অনেক সময় সবচেয়ে অদৃশ্য। অধিকাংশ সংস্থা তাঁদের স্থায়ী কর্মী নয়, বরং ‘গিগ ওয়ার্কার‘ হিসেবে চিহ্নিত করে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই চাকরির নিরাপত্তা, পেনশন, বেতনসহ ছুটি বা সামাজিক সুরক্ষার সুবিধা সীমিত।
বেতন, ইনসেনটিভ ও বাস্তব আয়
বাইরে থেকে অনেকের ধারণা, ডেলিভারি কর্মীরা প্রতিটি অর্ডারে ভালো আয় করেন। বাস্তব চিত্র অবশ্য অনেক জটিল। তাঁদের আয় নির্ভর করে—প্রতিদিন কতগুলি অর্ডার সম্পূর্ণ হল, কোন সময়ে কাজ করছেন, কত দূরে ডেলিভারি দিতে হচ্ছে, ইনসেনটিভের শর্ত পূরণ হয়েছে কি না, গ্রাহকের টিপস পাওয়া গেল কি না আর এর সঙ্গে যুক্ত হয় পেট্রোল, মোবাইল রিচার্জ, বাইকের রক্ষণাবেক্ষণ, সার্ভিসিং ও অন্যান্য ব্যক্তিগত খরচ। ফলে হাতে থাকা প্রকৃত আয় অনেকটাই কমে যায়।
বৃষ্টির দিন, উৎসবের রাত: ঝুঁকি নিয়েই কাজ
যখন প্রবল বৃষ্টি হয়, আমরা অনেকেই বাইরে বেরোতে চাই না। ঠিক সেই সময়েই সবচেয়ে বেশি অর্ডার আসে। দুর্গাপুজো, দীপাবলি, ঈদ, বড়দিন কিংবা নতুন বছর— উৎসবের সময়ই ডেলিভারি কর্মীদের ব্যস্ততা সবচেয়ে বেশি। পিচ্ছল রাস্তা, জল জমা, যানজট, দুর্ঘটনার ঝুঁকি— সবকিছুর মধ্যেই সময়মতো পৌঁছানোর চেষ্টা চালিয়ে যেতে হয়। অনেকেই বলেন, অসুস্থ শরীর নিয়েও কাজ করতে হয়েছে শুধুমাত্র আয় কমে যাওয়ার ভয়ে।
রেটিংয়ের চাপ: এক স্টারের মূল্য কত?
একটি মাত্র খারাপ রেটিং কখনও কখনও একজন কর্মীর আয়ে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। রেটিং কমে গেলে ভবিষ্যতে কম অর্ডার আসতে পারে, ইনসেনটিভ হাতছাড়া হতে পারে, কর্মদক্ষতার সূচক খারাপ হতে পারে। অনেক সময় দেরির কারণ থাকে প্রবল যানজট, রেস্তোরাঁয় খাবার তৈরি হতে দেরি, ভুল ঠিকানা অথবা আবহাওয়া। কিন্তু অভিযোগের দায় প্রায়ই ডেলিভারি কর্মীর উপরেই এসে পড়ে। ফলে গ্রাহকের হাসিমুখের পিছনে অনেক সময় লুকিয়ে থাকে এক অদৃশ্য মানসিক চাপ।

অ্যালগরিদমের নিয়ন্ত্রণে কর্মজীবন
কখন কাজ পাবেন, কত দূরের অর্ডার আসবে, কত টাকা মিলবে— এর অনেকটাই নির্ধারণ করে একটি সফটওয়্যার। ডেলিভারি কর্মীরা বলেন, অনেক সময় তাঁরা বুঝতেই পারেন না কেন হঠাৎ অর্ডার কমে গেল অথবা কেন আয় আগের তুলনায় কমে গেল। সিদ্ধান্তের বড় অংশই অ্যালগরিদমের মাধ্যমে নেওয়া হয়, যার ব্যাখ্যা কর্মীদের কাছে সবসময় স্পষ্ট থাকে না।
শারীরিক ও মানসিক চাপ
ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাইক চালানো, ভারী ব্যাগ বহন, গরমে কাজ, বৃষ্টিতে ভিজে থাকা— এসবের ফলে কোমর, ঘাড়, হাঁটু ও পিঠের নানা সমস্যা দেখা দেয়। এর পাশাপাশি রয়েছে মানসিক চাপ। তারমধ্যে আছে বেশ আছে – নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ডেলিভারি শেষ করার তাড়া, গ্রাহকের আচরণ, কম রেটিংয়ের ভয়, আয় অনিশ্চিত হওয়ার উদ্বেগ এই চাপ অনেক সময় দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ক্লান্তির কারণ হয়ে ওঠে।
গ্রাহকের আচরণ
অনেক সময় ভুল ঠিকানা, রেস্তোরাঁর বিলম্ব বা আবহাওয়ার কারণে দেরি হলেও দায় বর্তায় ডেলিভারি কর্মীর উপর। ফলে রেটিং কমে যাওয়ার আশঙ্কা তাঁদের আয়ের উপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
পরিবারের দায়িত্ব ও স্বপ্ন
অসংখ্য ডেলিভারি কর্মীর পরিবারের পুরো দায়িত্ব তাঁদের কাঁধে। কারও সন্তান স্কুলে পড়ে, কেউ বাবা-মায়ের চিকিৎসার খরচ চালান, কেউ আবার নিজের পড়াশোনার খরচ জোগান। অনেকেই এই কাজকে চূড়ান্ত পেশা হিসেবে দেখেন না। কারও স্বপ্ন সরকারি চাকরি, কারও ছোট ব্যবসা, কেউ আবার উচ্চশিক্ষা সম্পূর্ণ করতে চান।
শিক্ষিত যুবকদের নতুন কর্মক্ষেত্র
বর্তমানে বহু স্নাতক, স্নাতকোত্তর কিংবা প্রযুক্তি শিক্ষায় শিক্ষিত তরুণ-তরুণীও এই পেশায় যুক্ত।
বেকারত্ব, দ্রুত আয়ের প্রয়োজন এবং কাজের তুলনামূলক স্বাধীনতার কারণে অনেকেই ডেলিভারি পরিষেবাকে অস্থায়ী কর্মসংস্থান হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। এটি একদিকে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে, অন্যদিকে উচ্চশিক্ষিত যুবকদের কর্মসংস্থানের সংকটের ছবিও সামনে এনেছে।
নারী ডেলিভারি কর্মীদের আলাদা লড়াই
সংখ্যায় এখনও কম হলেও নারী ডেলিভারি কর্মীদের উপস্থিতি ধীরে ধীরে বাড়ছে।
তাঁদের সামনে অতিরিক্ত কিছু চ্যালেঞ্জ থাকে— গভীর রাতে কাজের নিরাপত্তা, শৌচাগারের অভাব, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, পরিবার ও কাজের ভারসাম্য। এসব বাধা সত্ত্বেও অনেক নারী এই পেশায় নিজের জায়গা তৈরি করছেন।Raise Your Concern About this Content

কোভিডের সময় থেকে আজ পর্যন্ত পরিবর্তন
কোভিড-১৯ অতিমারির সময় ডেলিভারি কর্মীরাই ছিলেন অত্যাবশ্যক পরিষেবার অন্যতম মুখ।সেই সময় মানুষ ঘরে থাকলেও তাঁরা প্রতিদিন বাইরে বেরিয়ে ওষুধ, খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দিয়েছেন। অতিমারির পরে অর্ডারের সংখ্যা বেড়েছে, প্রযুক্তির ব্যবহার আরও উন্নত হয়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে বেড়েছে প্রতিযোগিতা, কর্মীর সংখ্যা এবং আয়ের অনিশ্চয়তাও।
ভবিষ্যৎ: ডেলিভারি কর্মীদের জায়গা কোথায়?
ভারতে গিগ অর্থনীতি দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। আগামী কয়েক বছরে ডেলিভারি কর্মীর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। কিন্তু শুধু কাজের সুযোগ বাড়লেই হবে না। প্রয়োজনের মধ্যে আছে ন্যায্য পারিশ্রমিক, দুর্ঘটনা হলে স্বাস্থ্যবিমা, সামাজিক সুরক্ষা, অভিযোগ নিষ্পত্তির নিরপেক্ষ ব্যবস্থা, কর্মীদের জন্য মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ। ডিজিটাল অর্থনীতির ভবিষ্যৎ যতই উজ্জ্বল হোক, সেই ভবিষ্যতের ভিত তৈরি করছেন যাঁরা, তাঁদের জীবনও সমানভাবে নিরাপদ ও সম্মানজনক হওয়া জরুরি। শেষ পর্যন্ত মনে রাখতে হবে, কোনও অ্যাপের স্ক্রিনে দেখা একটি ‘অর্ডার পৌঁছে গিয়েছে’ বার্তার পিছনে রয়েছে একজন মানুষের পরিশ্রম, সময় এবং সংগ্রাম। শহরের ব্যস্ত জীবনে যাঁরা আমাদের সুবিধা পৌঁছে দেন, তাঁদের গল্পও শোনা প্রয়োজন। কারণ প্রযুক্তির যুগেও প্রতিটি ডেলিভারির পিছনে রয়েছে একজন মানুষ।
পরিশেষে বলা যায়, ডেলিভারি কর্মীদের আমরা প্রায় প্রতিদিনই দেখি, অথচ তাঁদের জীবনকে খুব কমই দেখি। আমাদের সুবিধা, সময় বাঁচানো আর প্রযুক্তিনির্ভর জীবনের প্রতিটি ধাপে তাঁদের অবদান জড়িয়ে আছে। একটি খাবার, একটি ওষুধ কিংবা একটি ছোট প্যাকেট সময়মতো পৌঁছে দেওয়ার জন্য তাঁরা প্রতিদিন অসংখ্য অদৃশ্য লড়াই লড়েন।
তাই তাঁদের শুধু ‘ডেলিভারি বয়’ বা ‘রাইডার’ হিসেবে নয়, দেশের নতুন অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রমশক্তি হিসেবে দেখার সময় এসেছে। কারণ, দরজায় কড়া নাড়ার আগে তাঁদেরও একটি দীর্ঘ পথ পেরোতে হয়— যে পথের নাম পরিশ্রম, অনিশ্চয়তা, দায়িত্ব এবং অদম্য লড়াই।
তথ্যসূত্র
১. নীতি আয়োগ — ভারতের দ্রুত বর্ধনশীল গিগ ও প্ল্যাটফর্ম অর্থনীতি (২০২২)
২. ভারতের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম সংস্থাগুলির শ্রম পরিস্থিতি সংক্রান্ত বার্ষিক মূল্যায়ন
৩. অ্যাপের মাধ্যমে কর্মীদের নিয়ন্ত্রণ, অ্যালগরিদমের কারণে কাজের চাপ
৪. ডেলিভারি কর্মীদের আয় কাঠামো



