যদি কোনো বিষয় নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা চিন্তা করেও কোনো সমাধান পাচ্ছেন না , তাহলে এক কাপ বা এক ভাঁড় চা নিয়ে বসুন ,হয়তো মাথায় এসে যাবে কোন উপায় | তাই অনেক কাল ধরেই বিলিতি শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষিত বাঙ্গালীর চা এর ঠেকই হল আলাপ-আলোচনা, তর্ক থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গা| ক্যামোমিল, হিবিসকাস, উলং বা অন্য কোনো এক্সটিক ভ্যারাইটি নয়, শুধু এক কাপ লাল বা দুধ চা হলেই বাঙালি বাজি মাত করে দিতে পারতো, আর হয়তো এখনো পারে | তাই তো বাঙ্গালী পারে না এমন কি কিছু আছে ?
বাঙ্গালী যেমন চা এর জন্য হয় পাগল, একদা চা এর জন্য হয়েছিল ইতিহাস বদল:
শুনে হয়তো অবাক হচ্ছেন , এই চা নিয়ে বিপ্লব ঘটিয়েছিল বিদেশেও | মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-র বোস্টন শহরে ১৭৭৩-এর ডিসেম্বর-এ ঘটেছিলো এক অভূতপূর্ব ঘটনা, যা পরে যা পরে হয়ে উঠেছিল ‘দ্য আমেরিকান রেভোল্যুশন’ এর অন্যতম সূচনা | এই অঘটনের দিন ১৬-ই ডিসেম্বর এর রাত-এ প্রায় ১০০থেকে ১৫০ ‘সন্স অফ লিবার্টি’-র সদস্যরা মোহাক ইন্ডিয়ান্স দেড় ছদ্ধবেশে ব্রিটিশ দেড় এক চা-বাহি জাহাজ এ ওঠেন আর সেই জাহাজ থেকে চা ভর্তি ৩৪২ টা কাঠের বড়ো-বড়ো বাক্স বোস্টন বন্দরে ফেলে দেয়| সেই সময়ের মূল্যে প্রায় ১০,০০০ ব্রিটিশ পাউন্ড-এর চা নষ্ট করা হয়েছিল |

প্রেক্ষাপট : ব্রিটিশ কর সমস্যা এবং চা আইন, যা হয়ে ওঠে বিদ্রোহের স্ফুলিঙ্গ :
সেই সময় দীর্ঘকালের ব্রিটিশ সরকারের প্রতি যমতে থাকা ক্ষোভ, অন্যায় এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আর অন্যায্যো কর এর বোঝা মানুষকে অত্যন্ত ক্ষিপ্ত করে তোলে; আর তার-ই পরিণতিতে হয়েছিল এই চা বিদ্রোহ | ব্রিটিশ এর বিরুদ্ধে ফরাসি ও তাদের মিত্র বিভিন্ন আদিবাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংঘটিত ‘ফ্রেঞ্চ অ্যান্ড ইন্ডিয়ান ওয়ার’-এ ব্রিটেন জিতে গেলেও ওই যুদ্ধ তাদের আর্থিক ভাবে দুর্বল করে দিয়েছিল| তাই আমেরিকান উপনিবেশ এর মানুষ দের বিভিন্ন রকমের কর দিতে বাধ্য করা হয়| আমদানি করা চিনি, গুড়ের রস, কাঁচ, লিড, রং, কাগজ, চা ও অন্যান্য দ্রব্যতে, খবরের কাগজ, আইনি নথি, ও অন্যান্য ছাপানো নথি ও সামগ্রীতেও কর চাপানো হয় | দিনের পর দিন বাড়তে থাকা কর-এর বোঝা মানুষকে কে ব্রিটিশদের প্রতি ক্ষিপ্ত করে তুলতে থাকে, এর পর একদিন তা চূড়ান্ত হিংসার্তক প্রতিবাদে পরিণত হয়| প্রতিবাদ করা মানুষদের দিকে ব্রিটিশ সৈন্যরা গুলি করে ও তাতে পাঁচ জন প্রতিবাদী আমেরিকান উপনিবেশী প্রাণ হারায় |
অতিরিক্ত কর এর বোঝাতে মানুষ পিষ্ট হলেও প্রাণ-হানি আগে হয়নি, কিন্তু ‘বোস্টন গণহত্যা’ কাণ্ড সেই সুরক্ষার কবচকবচকে ব্যর্থ করে দেয়, সেই কাণ্ডের পরে ব্রিটিশ এর প্রতি আন্দোলন আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে | সাধারণ মানুষের রোষে ব্রিটিশরা পিছু হটতে বাধ্য হয়, পরে ব্রিটেন অন্যান্য কর প্রত্যাহার করলেও, চা এর ওপর কর বজায় রাখে| আমেরিকান উপনিবেশীদের উপর ব্রিটেন এর আধিপত্তর চাপ বজায় রাখার জন্য এটি মূলত করা হয় |

১৭৭৩ সালে ‘টি অ্যাক্ট’ পাস করানো হয় যার ফলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আমেরিকান উপনিবেশীদের সরাসরি চা বেচতে পারতো | তাতে চা এর পণ্য মূল্য কমলেও চায়ের ওপর কর বজায় থাকার জন্য, ক্রেতাদের কোনো সুবিধে হয়নি | বরং এটা তাদের কাছে ব্রিটিশ দেড় কর অধিকার স্বীকার করিয়ে নেওয়ার একটি প্রচেষ্টার কৌশল মনে হয়েছে আর প্রতিবাদ আরও দিকে-দিকে ছড়িয়েছে |
আমেরিকান উপনিবেশীরা চায়ের চালানগুলো জাহাজ থেকে নামাতে দিতে অস্বীকার করতে শুরু করে| তখন গভর্নর থমাস হাচিনসন অনড় ছিলেন যে চা জাহাজ থেকে নামানো হবে এবং তার ওপর নির্ধারিত কর পরিশোধ করা হবে। এরপর ১৬-ই ডিসেম্বর ১৭৭৩ এর রাত-এ প্রায় ১০০থেকে ১৫০ ‘সন্স অফ লিবার্টি’-র সদস্যরা মোহাক আদিবাসীদের আদলে ছদ্মবেশ ধারণ করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির তিনটে চা-বাহী জাহাজজাহাজে ওঠেন আর সেই জাহাজ থেকে চা ভর্তি ৩৪২ টা কাঠের বড়ো-বড়ো বাক্স বোস্টন বন্দরে ফেলে দেয়| বোস্টন এর চা বিদ্রোহের এই ঘটনাটি ‘বোস্টন টি পার্টি’ নামে ইতিহাস-এ চিহ্নিত|Raise Your Concern About this Content
চা বিপ্লব ও বাঙালি :
বাঙালি জাতির সব বিষয় আর সব ঘটনার সাথে যোগাযোগ আছে, ইটা শুধু কথার-কথা নয়, বরং অনেকটাই সত্য| অন্তত সাত-সাগর পার বোস্টন এর চা বিপ্লব এর সাথে বাঙালির প্রত্যক্ষ না হলেও পরোক্ষ সম্পর্ক আছে |

সেই সময়ই ভারতে পলাশীর যুদ্ধের পর বাংলা থেকে প্রাপ্ত বিপুল রাজস্ব ও সম্পদ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আর্থিক শক্তি বৃদ্ধি করে, যা তাদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ, বাংলার সম্পদ লুণ্ঠন করে শক্তিশালী হয়ে ওঠা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিই পরবর্তীকালে সেই চা-বাণিজ্যের মাধ্যমে আমেরিকার উপনিবেশগুলোতে নিজেদের অর্থনৈতিক আধিপত্য বিস্তার করে। আর সেই আধিপত্যের বিরুদ্ধেই সংঘটিত হয় ইতিহাসখ্যাত ‘বোস্টন টি পার্টি’। এই অর্থে ঘটনাটির সঙ্গে বাংলার একটি পরোক্ষ ঐতিহাসিক সংযোগ খুঁজে পাওয়া যায়। এখানে বলে রাখা ভালো, কোম্পানির অর্থনৈতিক শক্তির একটি বড় অংশ এসেছিল বাংলা থেকে। কিন্তু বোস্টন টি পার্টি-তে ফেলে দেওয়া চা বাংলায় উৎপাদিত ছিল না।
চা বলতেই বাঙালির আবেগ চলকে ওঠে, ঘেমে নাজেহাল অবস্থাতেও এক কাপ চা হলে সব ক্লান্তি নিমিষে মিলিয়ে যায়, চিন্তা-ভাবনা খোলে, বন্ধুত্ব হয়, মাঝে মাঝে আবার আন্টি-ডিপ্রেসেন্ট এর কাজও করে | ইট’স এ লেজিটিমেট সোশ্যাল ড্রিংক | চা নিয়ে এমন দুর্ভাগ্য-জনক এবং অমানবিক ঘটনা চা এর আমেজটা কিছুটা হলেও শিথিল করে – কারণ বাঙালি সমব্যথী জাতি|
কোনো এক বিকেলের আড্ডায়, চা এর কাপ-এ চুমুক দিতে গিয়ে যদি মনে পরে এই বোস্টন টি পার্টির কথা, শোনাবেন গল্পটা|
তথ্যসূত্র :
১. বোস্টন টি পার্টি
২. বোস্টন টি পার্টির ইতিহাস
৩. বোস্টন টি পার্টির পটভূমি
৪. বোস্টন টি পার্টি
৫. চা আইন
৬. বোস্টন গণহত্যা
৭. উপনিবেশগুলোর ওপর পার্লামেন্টের কর আরোপ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং আমেরিকান বিপ্লব, ১৭৬৩–১৭৭৫
৮. সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধ
৯. থমাস হাচিনসন



