Homeআধ্যাত্মিকনবকলেবর থেকে রথযাত্রা— জগন্নাথদেবের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ আচারেই দৈতাপতিরা অপরিহার্য 

নবকলেবর থেকে রথযাত্রা— জগন্নাথদেবের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ আচারেই দৈতাপতিরা অপরিহার্য 

দৈতাপতি কারা?

‘দৈতাপতি’ শব্দটির উৎস নিয়ে নানা মত থাকলেও অধিকাংশ গবেষকের মতে, এটি ‘দয়িতা’ বা ‘দয়িত’ শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ প্রিয়জন বা আত্মীয়। পুরাণ ও মন্দির-প্রথা অনুযায়ী, তাঁরা শবর রাজা বিশ্ববাসুর বংশধর। বিশ্বাস করা হয়, জগন্নাথদেবের আদিরূপ ‘নীলামাধব’-এর প্রথম পূজারি ছিলেন বিশ্ববাসু। সেই সূত্রেই দৈতাপতিরা নিজেদের দেবতার রক্তের সম্পর্কের আত্মীয় বলে মনে করেন। এই কারণেই দেবতার এমন সব আচার, যেখানে পারিবারিক স্নেহ, শোক, সেবা কিংবা স্পর্শের প্রয়োজন হয়, সেখানে দায়িত্ব পান একমাত্র তাঁরাই।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

কেন তাঁদের গুরুত্ব আলাদা?

জগন্নাথ মন্দিরে শতাধিক শ্রেণির সেবায়েত রয়েছেন। কিন্তু দৈতাপতিদের মর্যাদা একেবারেই স্বতন্ত্র। অন্য সেবায়েতরা যেখানে নির্দিষ্ট পূজা বা আচার সম্পন্ন করেন, সেখানে দৈতাপতিরা দেবতার ব্যক্তিগত পরিচর্যার দায়িত্বে থাকেন। দেবতার পোশাক বদলানো, শয্যায় শোয়ানো, বিশ্রাম, অসুস্থ অবস্থায় পরিচর্যা কিংবা রথে ওঠানো— এই সমস্ত কাজ তাঁদের হাতেই সম্পন্ন হয়। এই কারণেই তাঁদের অনেকেই ‘জগন্নাথের আত্মীয়’ বলে অভিহিত করেন।

নবকলেবরে দৈতাপতিদের ভূমিকা

নবকলেবর শ্রীজগন্নাথ সংস্কৃতির সবচেয়ে রহস্যময় ও গুরুত্বপূর্ণ আচারগুলির একটি। নির্দিষ্ট বছরে পুরনো দেহ ত্যাগ করে নতুন নিমকাঠের বিগ্রহে দেবতারা অধিষ্ঠিত হন। এই সমগ্র প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন দৈতাপতিরা। বনযাগ যাত্রায় পবিত্র নিমগাছ খোঁজা থেকে শুরু করে বিগ্রহ নির্মাণ, গোপন ‘ব্রহ্ম পদার্থ’ স্থানান্তর এবং পুরনো বিগ্রহের সমাধি— প্রতিটি ধাপেই তাঁদের ভূমিকা অপরিহার্য। সবচেয়ে গোপনীয় মুহূর্ত, অর্থাৎ ব্রহ্ম স্থানান্তরের সময় উপস্থিত থাকার অধিকারও কেবল তাঁদেরই থাকে। এই আচার এতটাই গোপন যে, আজও এর প্রকৃত রীতি সাধারণ মানুষের অজানা।

স্নানযাত্রার পর ‘অনবাসর’ পর্ব

স্নান পূর্ণিমার দিন ১০৮ কলসির জল দিয়ে মহাস্নানের পর বিশ্বাস করা হয়, জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রা অসুস্থ হয়ে পড়েন।এরপর প্রায় পনেরো দিনের ‘অনবাসর’ বা ‘অনসারা’ পর্বে দেবতারা জনদর্শনের বাইরে থাকেন। এই সময় মন্দিরের দরজা সাধারণ ভক্তদের জন্য বন্ধ থাকে। এই পুরো সময় দেবতাদের পরিচর্যা করেন দৈতাপতিরাই। তাঁরা আয়ুর্বেদিক ও ভেষজ ওষুধ, বিশেষ খাদ্য এবং বিশ্রামের মাধ্যমে দেবতাদের সুস্থ করে তোলার প্রতীকী আচার পালন করেন। দেবতার এই মানবিক রূপ ভারতীয় মন্দির সংস্কৃতিতে বিরল।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

‘দৈতা’ শব্দের প্রকৃত অর্থ

‘দৈতা’ শব্দটি সংস্কৃত ‘দয়িত’  শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ অত্যন্ত প্রিয়, আপনজন বা স্নেহভাজন। সেই থেকেই ‘দৈতাপতি’—অর্থাৎ যাঁরা প্রভুর সবচেয়ে প্রিয় সেবক। জগন্নাথদেবের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক ভৃত্য ও প্রভুর নয়, বরং আত্মীয়তার।

রথযাত্রায় তাঁদের ভূমিকা

রথযাত্রার দিন দেবতাদের গর্ভগৃহ থেকে বের করে ‘পাহান্ডি বিজে’-র মাধ্যমে রথে নিয়ে যাওয়ার গুরুদায়িত্ব দৈতাপতিদের।দেবমূর্তিগুলি অত্যন্ত ভারী। নির্দিষ্ট ছন্দ, মন্ত্রোচ্চারণ এবং বিশেষ কৌশলে তাঁদের বহন করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় সামান্য ভুলও বিপজ্জনক হতে পারে। তাই বহু বছরের অভিজ্ঞতা এবং কঠোর প্রশিক্ষণ ছাড়া এই দায়িত্ব পালন সম্ভব নয়।রথযাত্রা শেষে উল্টো রথেও একই দায়িত্ব পালন করেন তাঁরাই।

দেবতার সঙ্গে মানবিক সম্পর্ক

জগন্নাথ সংস্কৃতির সবচেয়ে অনন্য বৈশিষ্ট্য হল, এখানে দেবতাকে সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের পাশাপাশি পরিবারের সদস্য হিসেবেও দেখা হয়। দৈতাপতিরা দেবতার সঙ্গে সেই সম্পর্কই বহন করেন। দেবতার অসুস্থতা, বিশ্রাম, নতুন বস্ত্র, এমনকি নবকলেবরের সময় পুরনো বিগ্রহের জন্য শোকপালন— সবই মানুষের পারিবারিক জীবনের প্রতিচ্ছবি।এই মানবিক সম্পর্কই জগন্নাথ সংস্কৃতিকে অন্য অনেক ধর্মীয় পরম্পরা থেকে আলাদা করেছে।

দৈতাপতিদের উত্তরাধিকার

দৈতাপতি হওয়া যায় না; জন্মসূত্রেই এই অধিকার লাভ করতে হয়।বংশপরম্পরায় দায়িত্ব এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে চলে আসে। ছোটবেলা থেকেই পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের কাছ থেকে তাঁরা মন্দিরের নিয়ম, মন্ত্র, আচার ও দায়িত্ব শেখেন।এই উত্তরাধিকার কেবল পেশা নয়, এক গভীর আধ্যাত্মিক দায়বদ্ধতা।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

কঠোর নিয়ম ও শৃঙ্খলা

দৈতাপতিদের জীবনে ব্যক্তিগত শৃঙ্খলার গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।বিশেষ আচার পালনের আগে তাঁদের নিরামিষ আহার, ব্রত, শুচিতা, নির্দিষ্ট আচরণবিধি এবং বহু ধর্মীয় বিধিনিষেধ মেনে চলতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক জীবন থেকেও সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকতে হয়। নবকলেবরের সময় এই নিয়ম আরও কঠোর হয়ে ওঠে।

ইতিহাসের সঙ্গে যোগসূত্র

গঙ্গা রাজবংশের সময় থেকে দৈতাপতিদের উল্লেখ পাওয়া যায়। বিভিন্ন শিলালিপি, মাদলাপাঞ্জি এবং ওড়িশার ঐতিহাসিক দলিলে তাঁদের দায়িত্বের বিবরণ রয়েছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে রাজনৈতিক পরিবর্তন, আক্রমণ কিংবা শাসক বদল হলেও দৈতাপতিদের ভূমিকা অপরিবর্তিত থেকেছে। এই ধারাবাহিকতাই তাঁদের ঐতিহ্যের শক্তি।

দৈতাপতি বনাম অন্যান্য সেবায়েত

জগন্নাথ মন্দিরে পূজাপাণ্ডা, পুষ্পলক, সুয়ারা, মহাসুয়ারা, খুন্টিয়া-সহ বহু শ্রেণির সেবায়েত রয়েছেন।কিন্তু দৈতাপতিদের দায়িত্ব মূলত দেবতার ব্যক্তিগত সেবা এবং অন্তরঙ্গ আচারকেন্দ্রিক। অন্য কেউ যেখানে প্রবেশ করতে পারেন না, সেখানে প্রবেশাধিকার থাকে তাঁদের।এই বিশেষ অধিকারই তাঁদের মর্যাদাকে স্বতন্ত্র করেছে।

কেন তাঁদের ছাড়া রথযাত্রা অসম্পূর্ণ?

রথযাত্রার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত ‘পাহান্ডি’ থেকে শুরু করে রথে আরোহন, রথ থেকে অবতরণ— সবকিছুই দৈতাপতিদের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। তাঁরা না থাকলে রথযাত্রার প্রধান ধর্মীয় আচারই সম্পূর্ণ করা সম্ভব নয়। অর্থাৎ রথ, ভক্ত, উৎসব— সব থাকলেও দৈতাপতিদের অনুপস্থিতিতে রথযাত্রার মূল আধ্যাত্মিক অর্থ অপূর্ণ থেকে যাবে।

রথযাত্রার পরেও তাঁদের কাজ শেষ হয় না

অনেকে মনে করেন, দেবতাকে রথে তুলে দিলেই দৈতাপতিদের কাজ শেষ। বাস্তবে তা নয়। তাঁদের দায়িত্ব থাকে। তার মধ্যে আছে গুণ্ডিচা মন্দিরে অবস্থানকালে সেবা, বাহুড়া যাত্রা, সোনাবেশের আগে ও পরে নানা আচার, নীলাদ্রি বিজে পর্যন্ত বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান।Raise Your Concern About this Content

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

দৈতাপতিদের প্রশিক্ষণ ও জীবনযাপন

দৈতাপতিদের কোনও আনুষ্ঠানিক বিদ্যালয় নেই। তাঁদের শিক্ষা শুরু হয় পরিবার থেকেই। প্রবীণদের সঙ্গে মন্দিরে থেকে থেকে তাঁরা শিখে নেন আচার, মন্ত্র, দায়িত্ব এবং সময়জ্ঞান। শুধু ধর্মীয় জ্ঞান নয়, শারীরিক সক্ষমতাও প্রয়োজন। কারণ শত শত কিলোগ্রাম ওজনের বিগ্রহ বহন করা অত্যন্ত কঠিন কাজ।

আধুনিক সময়েও ঐতিহ্যের ধারক

আজ প্রযুক্তি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক কাঠামো অনেক বদলেছে। কিন্তু দৈতাপতিদের দায়িত্বে কোনও পরিবর্তন আসেনি। আধুনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি শতাব্দীপ্রাচীন আচার এখনও একই নিষ্ঠায় পালন করে চলেছেন তাঁরা। এই ধারাবাহিকতাই প্রমাণ করে, ঐতিহ্য কেবল ইতিহাস নয়— তা জীবন্ত সংস্কৃতি।

জগন্নাথ দর্শনের এক অনন্য দিক

ভারতের অধিকাংশ মন্দিরে দেবতাকে সর্বশক্তিমান রূপে দেখা হলেও পুরীর জগন্নাথ সংস্কৃতিতে ঈশ্বরকে মানুষের মতোই হাসতে, অসুস্থ হতে, বিশ্রাম নিতে এবং নতুন দেহ ধারণ করতে দেখা হয়। এই দর্শনের কেন্দ্রেই রয়েছেন দৈতাপতিরা। তাঁদের হাত ধরেই ঈশ্বর ও মানুষের দূরত্ব যেন অনেকটাই কমে আসে।

পরিশেষে বলা যায় ,শ্রী জগন্নাথের রথযাত্রা কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয় এটি বিশ্বাস, ঐতিহ্য, ইতিহাস এবং মানুষের সঙ্গে ঈশ্বরের আত্মীয়তার এক অনন্য প্রকাশ। সেই সম্পর্কের সবচেয়ে জীবন্ত প্রতীক দৈতাপতিরা।  দৈতাপতিরা শুধুমাত্র মন্দিরের সেবায়েত নন; তাঁরা জগন্নাথ সংস্কৃতির এক ঐতিহ্য। তাঁদের হাতেই রক্ষিত রয়েছে শতাব্দীপ্রাচীন এমন সব আচার, যা ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি ইতিহাস, সমাজ ও সংস্কৃতিরও মূল্যবান সম্পদ। রথযাত্রার রঙিন উৎসবের আড়ালে তাঁদের নিরলস সেবা, কঠোর শৃঙ্খলা এবং অগাধ ভক্তিই এই মহোৎসবকে পূর্ণতা দেয়। তাই জগন্নাথদেবের রথ যতটা ভক্তির প্রতীক, ততটাই দৈতাপতিদের উত্তরাধিকার, নিষ্ঠা এবং আত্মিক সম্পর্কেরও এক অনন্য দলিল।

তথ্যসূত্র :

১. দৈতাপতিদের নিয়ে তথ্য 
২. দৈতাপতিদের জগন্নাথদেবকে সেবা 
৩. রথের সঙ্গে দৈতাপতির সঙ্গে
৪. অন্যান্য তথ্য

সৃজিতা মল্লিক
সৃজিতা মল্লিক
ডিজিটাল মিডিয়ার নিউজ ডেস্কে কেটে গিয়েছে ৫ বছর। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণমাধ্যম নিয়ে পড়ার সময় থেকেই সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি হয় সৃজিতার। খবর ভালোবাসা তাই বাছবিচার ছাড়াই দেশ, দুনিয়া, রাজ্যের খবরের সঙ্গে সঙ্গে খেলা, বিনোদন দুনিয়ার ময়দানেও রয়েছে আনাগোনা। উৎসাহ বাজারের ওঠাপড়া, রাজনীতির বিষয়েও। খাদ্যরসিক। ছুটি পেলেই সপরিবার ভ্রমণে প্রাণের আরাম, মনের প্রশান্তি।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

বাংলা ক্যালেন্ডার

- বিজ্ঞাপন -spot_img

Most Popular

Recent Comments