ফুটবল বিশ্বকাপের পাশাপাশি ২৫০ তম স্বাধীনতার উদযাপন করছে আমেরিকা। কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ১-০ গোল করেছে ফ্রান্স। সেই জয়ের সাক্ষী থেকেছে ফিলাডেলফিয়া স্টেডিয়াম। ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে এই ফিলাডেলফিয়া শহরের নাম। ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপের অন্যতম আয়োজক শহর ফিলাডেলফিয়া। একই সময়ে স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তিও উদযাপন করছে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে ফুটবলের উন্মাদনার পাশাপাশি ইতিহাসেরও কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে এই শহর। যে শহরের মাটিতে রচিত হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ভিত্তি, আজ সেই শহরই আবার নজর কেড়েছে গোটা বিশ্বের।
আমেরিকার স্বাধীনতার বীজ যেই শহরের মাটিতে দৃঢ়ভাবে শিকড় গেড়েছিল, সেই শহর ফিলাডেলফিয়া। যুক্তরাষ্ট্রের জন্মের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এই শহর। সালটা ১৭৭৬, ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার ঘোষণা করেছিল আমেরিকা। ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই স্বাধীনতার ঘোষণা গ্রহণ করেছিল ১৩টি ব্রিটিশ উপনিবেশের প্রতিনিধিরা। তারপরই গ্রেট ব্রিটেন থেকে মুক্ত হয়ে আত্মপ্রকাশ করে স্বাধীন যুক্তরাষ্ট্র। এই স্বাধীনতার ঘোষণা অনুমোদন করে ‘সেকেন্ড কন্টিনেন্টাল কংগ্রেস’। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের প্রধান খসড়া লিখেছিলেন থমাস জেফারসন।ফিলাডেলফিয়ার ইনডিপেনডেন্স হলেই গৃহীত হয়েছিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও মার্কিন সংবিধান।লিবার্টি বেল আজও আমেরিকার স্বাধীনতার অন্যতম প্রতীক।
জানেন কি?
১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই ফিলাডেলফিয়ার ইনডিপেনডেন্স হলে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র গৃহীত হয়। লিবার্টি বেল আজও আমেরিকার স্বাধীনতার প্রতীক।ইনডিপেনডেন্স হল ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের মর্যাদা পেয়েছে। ১৭৯০ থেকে ১৮০০ সাল পর্যন্ত ফিলাডেলফিয়া যুক্তরাষ্ট্রের অস্থায়ী রাজধানী ছিল।
কেন ফিলাডেলফিয়া হয়ে উঠল আমেরিকার স্বাধীনতার কেন্দ্র?
ভৌগোলিক অবস্থানই ফিলাডেলফিয়াকে বিপ্লবের কেন্দ্রস্থলে পরিণত করেছিল। নিউ ইংল্যান্ড থেকে দক্ষিণাঞ্চলের উপনিবেশগুলির ঠিক মাঝামাঝি অবস্থিত এই শহরে স্থল ও জলপথে পৌঁছানো ছিল খুবই সহজ। ডেলাওয়্যার নদী এবং স্কুকিল নদী এই শহরকে সমুদ্রপথে যুক্ত করেছিল অন্যান্য শহরের সঙ্গে।
১৭৭০- এর দশকে উত্তর আমেরিকার বৃহত্তম এবং সবচেয়ে উন্নত শহর হিসেবেও পরিচিতি লাভ করে এই শহর।
প্রশস্ত রাস্তা, ব্যস্ত বন্দর এবং শক্তিশালী অর্থনীতি দীর্ঘ সময় ধরে স্বাধীনতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার জন্য আদর্শ পরিবেশ গড়ে উঠেছিল এই শহরে।
শুধু ভৌগোলিক অবস্থানই নয়, ফিলাডেলফিয়া ছিল শিক্ষা, মুদ্রণ, সংবাদপত্র এবং রাজনৈতিক চিন্তাচর্চার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। ফলে স্বাধীনতা, নাগরিক অধিকার ও স্বশাসন নিয়ে জনমত গঠনে শহরটির ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ফিলাডেলফিয়া ও স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র
ইউরোপীয় শক্তিগুলির আগ্রহের কেন্দ্র বরাবরই ছিল আমেরিকা। যুক্তরাষ্ট্রে মোট ১৩টি উপনিবেশ গড়ে তোলে ব্রিটিশরা। এর আগে এই ভুখন্ডে বসবাস করতেন বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানুষ। ১৬০৭ সালে আমেরিকার ভার্জিনিয়ায় প্রথম বসতি স্থাপন করে ব্রিটিশরা। প্রথমে ব্রিটিশদের বিরোধিতা করেনি আমেরিকার মানুষ। পরবর্তীকালে স্ট্যাম্প অ্যাক্ট, টি অ্যাক্ট সহ একাধিক কর আরোপ করতে শুরু করে ব্রিটিশ সরকার। মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ১৭৭৪ সালে ব্রিটিশ সরকারের উপনিবেশ-সংক্রান্ত নীতির বিরুদ্ধে অসন্তোষ ও স্বাধীনতার দাবির জোয়ার যখন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন ফিলাডেলফিয়ার কার্পেন্টার্স হলে প্রথম কন্টিনেন্টাল কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। এই কংগ্রেসে প্রতিনিধি পাঠিয়েছিল ব্রিটিশ আমেরিকার মূল ১৩টি উপনিবেশের মধ্যে ১২টি। ১৭৭৫ থেকে ১৭৮১ সাল পর্যন্ত ফিলাডেলফিয়াতেই অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় কন্টিনেন্টাল কংগ্রেসের অধিবেশনও । সর্বসম্মতিক্রমে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র গ্রহণ করেন এই কংগ্রেসের ৫৬ জন প্রতিনিধি। এটি তৎকালীন পেনসিলভানিয়া স্টেট হাউসে গৃহীত হয় যা বর্তমানে ইনডিপেনডেন্স হল নামে পরিচিত। ঘোষণাপত্রটির মূল খসড়া লিখেছিলেন থমাস জেফারসন। সেই ঘোষণায় বলা হয়, মানুষ জন্মগতভাবে সমান। প্রত্যেক মানুষের স্বাধীনতা ও অধিকার রয়েছে। এই চিন্তাই পরবর্তীতে পুরো বিশ্বের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে প্রভাব ফেলেছে। স্বাধীনতা ও মুক্তির জন্য সংগ্রামরত বিশ্বের বহু জাতি ও জনগোষ্ঠী এই ঘোষণাপত্রকে অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে উল্লেখ করেছে। একই সঙ্গে প্রতি বছর ৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র গ্রহণের দিনটি উদযাপিত হয়।
ইনডিপেনডেন্স হলের পাশেই অবস্থিত ‘লিবার্টি বেল’ যা আজও আমেরিকার স্বাধীনতা, নাগরিক অধিকার এবং গণতন্ত্রের অন্যতম প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ পর্যটক এই ঐতিহাসিক নিদর্শন দেখতে ফিলাডেলফিয়ায় আসেন।
আমেরিকার স্বাধীনতার যুদ্ধ
১৭৭৫ সালে শুরু হয়েছিল আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ।একদিকে ছিল ব্রিটিশ বাহিনী। অন্যদিকে ছিল জর্জ ওয়াশিংটনের নেতৃত্বে সেনাবাহিনী। তবে শুধু তিনি একা নন, স্বাধীনতার আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন আরও অনেক নেতা। বেনজামিন ফ্রাঙ্কলিন ছিলেন কূটনীতিক ও চিন্তাবিদ। জন অ্যাডামস স্বাধীনতার পক্ষে জোরালো ভূমিকা পালন করেন। স্যামুয়েল অ্যাডামস জনগণকে আন্দোলনে উৎসাহ দেন।
আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সংঘর্ষ, ফোর্ট মিফলিন অবরোধ (২৬ সেপ্টেম্বর–১৬ নভেম্বর, ১৭৭৭) এবং জার্মানটাউনের যুদ্ধ (৪ অক্টোবর, ১৭৭৭) ফিলাডেলফিয়ার সীমানার মধ্যেই সংঘটিত হয়েছিল।

স্বাধীনতা যুদ্ধে ফ্রান্স উপনিবেশগুলিকে সামরিক ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করে। বিশেষ করে ইয়র্কটাউনের যুদ্ধে ফরাসি বাহিনীর সহায়তা ব্রিটিশদের পরাজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই স্বাধীনতার ঘোষণা গ্রহণের পর অনেকদিন পর্যন্ত যুদ্ধ চলেছিল। অবশেষে ১৭৮৩ সালে প্যারিস চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা স্বীকার করতে বাধ্য হয় ব্রিটেন। আলেকজান্ডার হ্যামিল্টন পরবর্তীতে নতুন রাষ্ট্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। Raise Your Concern About this Content
ফিলাডেলফিয়ার গুরুত্ব
১৭৭৬ থেকে ১৮০০ সালের মধ্যে মোট পাঁচবার যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে ফিলাডেলফিয়া। ঔপনিবেশিক যুগের শেষ সময় এবং স্বাধীনতার পরবর্তী প্রাথমিক সময়ের অধিকাংশ সময়ই দেশের রাজধানী ছিল এই শহর।
এই শহরের ইনডিপেনডেন্স হলে অনুষ্ঠিত হয় সাংবিধানিক সম্মেলন যেখানে ১৭৮৭ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর মার্কিন সংবিধান অনুমোদিত হয়। এটি আজও বিশ্বের দীর্ঘতম কার্যকর লিখিত জাতীয় সংবিধান হিসেবে স্বীকৃত।

ঐতিহাসিক গুরুত্বের স্বীকৃতি হিসেবে ইনডিপেনডেন্স হলকে ১৯৭৯ সালে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য (UNESCO World Heritage Site) হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়।
আজকের ফিলাডেলফিয়া শুধু ইতিহাসের শহর নয়; এটি শিক্ষা, সংস্কৃতি, গবেষণা, ক্রীড়া এবং পর্যটনের অন্যতম কেন্দ্র। স্বাধীনতার স্মৃতি ধারণ করেও শহরটি আধুনিক আমেরিকার অগ্রযাত্রার প্রতীক হয়ে রয়েছে।
উপসংহার
আমেরিকার স্বাধীনতা লাভের ইতিহাসে ফিলাডেলফিয়া আজও এক অনন্য অধ্যায়। এই শহরেই গৃহীত হয় স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র, রচিত হয় সংবিধান এবং গড়ে ওঠে একটি নতুন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভিত্তি।
তথ্যসূত্র-
১. National Park Service (Independence National Historical Park)
২. Library of Congress
৩. U.S. National Archives
৪. Encyclopaedia Britannica – Philadelphia
৫. UNESCO World Heritage Centre – Independence Hall
৬. উইকিপিডিয়া



