FIFA WORLD CUP 2026
বিশ্বকাপের মঞ্চ উত্তর আমেরিকায়,
কিন্তু আবেগের রাজধানী বাংলা
২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ অনেক দিক থেকেই ইতিহাস গড়তে চলেছে। এই প্রথম মাঠ কাঁপাতে নামছে ৪৮টি দেশ। আয়োজক হিসেবেও কোনো একক দেশ নয়, থাকছে মেক্সিকো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর কানাডা—তিনটি দেশ মিলে। ১৬টি শহরের ১৬টি চোখ ধাঁধানো স্টেডিয়ামে মাসজুড়ে চলবে ফুটবলের এই মহাযজ্ঞ। পরিসংখ্যান বলছে, ডিজিটাল পর্দা আর টিভির সামনে মিলিয়ে এবার নাকি প্রায় ৫০০ কোটিরও বেশি মানুষ চোখ রাখবেন এই টুর্নামেন্টে। সোজা কথায়, দুনিয়ার প্রতি দুজন মানুষের মধ্যে একজন মেতে উঠবেন ফুটবল জ্বরে।
তবে বিশ্বকাপের আসল জাদুটা কিন্তু শুধু ওই গুটিকয়েক আয়োজক দেশের স্টেডিয়ামেই আটকে থাকে না। গ্যালারির গণ্ডি পেরিয়ে তা হয়ে ওঠে এক বৈশ্বিক উৎসব। আর সেই বিশ্বজনীন আবেগের যদি কোনো রাজধানী খোঁজা হয়, তবে চোখ বন্ধ করে বলে দেওয়া যায়—সেটা হলো আমাদের এই বাংলা।
বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে ভারত নেই, বাংলা থেকে কোনো ফুটবলারও সেখানে খেলবেন না। তবুও কলকাতা থেকে কোচবিহার, শিলিগুড়ি থেকে সুন্দরবন বা ওপার বাংলার আনাচে-কানাচে—বিশ্বকাপ এলে বাঙালি যেভাবে মেতে ওঠে, তা পৃথিবীর আর কোথাও দেখা মেলা ভার। কেন এই উন্মাদনা? এর পেছনে রয়েছে দেড়শো বছরের এক চেনা ইতিহাস।
বুটের নিচে ব্রিটিশ বধ: বাংলার ফুটবলের আদি কথা
বাঙালির ফুটবলপ্রেম কিন্তু আজকের নয়, এর শিকড় দেড়শ বছরের পুরোনো। উনিশ শতকের শেষের দিকে ব্রিটিশ সাহেবদের হাত ধরেই কলকাতায় ফুটবলের পা রাখা। তবে খেলাটা বেশিদিন শুধু সাহেবদের ব্যারাকে বা বাবুদের ড্রয়িংরুমে আটকে থাকেনি। খুব দ্রুতই তা হয়ে ওঠে আমজনতার প্রাণের খেলা।
এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ ১৯১১ সালের সেই ঐতিহাসিক আইএফএ শিল্ড জয়। মোহনবাগানের খালি পায়ের এগারোটা ছেলে যখন বুট পরা গোরাদের হারিয়ে দিল, সেটা শুধু মাঠের জয় ছিল না; ওটা ছিল পরাধীন ভারতের বুকে ব্রিটিশ রাজের গালে একটা সপাটে চড়। ইতিহাসবিদরা বলেন, ওই একটা ম্যাচের জয় বাঙালির মজ্জায় আত্মবিশ্বাস ঢুকিয়ে দিয়েছিল।

পরবর্তীতে ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানের চিরন্তন লড়াই, কলকাতা ময়দানের ধুলো ওড়ানো দুপুর, আর পাড়ার রকে বসে ফুটবল নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ—সব মিলিয়ে ফুটবল বাঙালির ডিএনএ-তে ঢুকে গেছে। তাই চার বছর পর পর যখন বিশ্বমঞ্চে ফুটবল ফেরে, তখন বাঙালির রক্তে দোলা লাগাটাই তো স্বাভাবিক।
ভারত নেই তো কী? আমাদের যে ‘ব্রাজিল–আর্জেন্টিনা’ আছে!
বাস্তবতা হলো, ভারত কোনোদিন বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলেনি। ১৯৫০ সালে একবার সুযোগ এলেও নানা টানাপোড়েনে যাওয়া হয়ে ওঠেনি। তারপর কেটে গেছে দীর্ঘ ৭৫ বছর, বিশ্বমঞ্চে দেশের জার্সি আজও অধরা। কিন্তু তাতে বাঙালির কী বা এসে যায়?
সমাজবিজ্ঞানীরা একে ‘সোশ্যাল আইডেন্টিটি’ বা সামাজিক পরিচয় দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারেন, কিন্তু বাঙালির কাছে এটা স্রেফ খাঁটি ভালোবাসা। এখানে একটা ফুটবল দল সমর্থন করা মানে সেটা পারিবারিক ঐতিহ্যের অংশ। বাবা যদি ব্রাজিলের অন্ধ ভক্ত হন, তবে ছেলে-মেয়েরা অবধারিতভাবে সেই হলুদ জার্সির প্রেমে পড়বে। আবার কোনো পরিবারে হয়তো যুগের পর যুগ ধরে ম্যারাডোনা-মেসির আকাশী-সাদার রাজত্ব। নিজেদের দেশের দল না থাকলেও, অন্য একটা দেশের জন্য গলা ফাটিয়ে পাড়া মাথায় করা—এমন অদ্ভুত ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসা বোধহয় শুধু বাঙালির পক্ষেই সম্ভব।
আর্জেন্টিনা বনাম ব্রাজিল: বাংলার নিজস্ব যুদ্ধ
বাংলায় বিশ্বকাপ মানেই তো চিরকালীন সেই মহাসংগ্রাম—আর্জেন্টিনা বনাম ব্রাজিল।
আজকের এই উন্মাদনার বীজ বোনা হয়েছিল গত শতাব্দীর ৭০ আর ৮০-র দশকে। পেলের সেই নান্দনিক ফুটবল কিংবা ১৯৮৬-তে দিয়েগো ম্যারাডোনার সেই ঈশ্বরপ্রদত্ত পায়ের জাদু—বাঙালির মনে এমনভাবে দাগ কেটেছিল যে, তা আজও অমলিন।
বিশ্বকাপ এলেই বাংলার চেনা রূপটা বদলে যায়। বহুতল বাড়ির ছাদ থেকে শুরু করে গলির মোড়ের ল্যাম্পপোস্ট—সবুজ-হলুদ আর আকাশী-সাদা পতাকায় ছেয়ে যায়। কেউ বানান বিশ ফুট উঁচু কাটআউট, কেউ আবার নিজের আস্ত বাড়িটাই রঙ করে ফেলেন প্রিয় দলের পতাকার রঙে। একে পণ্ডিতরা ‘সীমান্তহীন ফ্যান কালচার’ বলতেই পারেন, কিন্তু আসল কথা হলো, এই সাতসমুদ্দুর তেরো নদী পারের দেশগুলোর সঙ্গে বাঙালির কোনো ভৌগোলিক টান নেই, আছে আত্মিক টান।
ফুটবল যখন মেগা ইকোনমি: চায়ের দোকান থেকে খিদিরপুরের বাজার
বিশ্বকাপ শুধু মনের খোরাক জোগায় না, এই এক মাস বাংলার বাজার-হাটেও দারুণ জোয়ার আসে।
খেলা শুরুর আগে থেকেই কলকাতার খিদিরপুর, মেটিয়াবুরুজ, বড়বাজার কিংবা শিলিগুড়ির মার্কেটগুলোয় তিল ধারণের জায়গা থাকে না। প্রিয় তারকার জার্সি, প্রিয় দলের পতাকা, ব্যানার কেনার ধুম পড়ে যায়। ইলেকট্রনিক্স দোকানে ভিড় বাড়ে নতুন স্মার্ট টিভি বা প্রজেক্টর কেনার। কত শত মানুষ এই একটা মাসকে কেন্দ্র করে দুটো বাড়তি পয়সার মুখ দেখেন!
পাড়া-মহল্লার ক্লাবগুলো বড় পর্দা খাটিয়ে খেলা দেখানোর ব্যবস্থা করে। মুড়ি-তেলেভাজা আর চায়ের কাপে তুফান ওঠে মধ্যরাতের ম্যাচগুলো নিয়ে। ফুটবলকে কেন্দ্র করে এই যে একটা স্থানীয় অর্থনীতি চাঙ্গা হয়ে ওঠে, এটাও বিশ্বকাপের একটা বড় অবদান।

টেকনোলজির ছোঁয়া: রকের আড্ডা এখন রিলসের দুনিয়ায়
১৯৯০ বা ২০০২ সালের বিশ্বকাপ দেখার যে নস্টালজিয়া ছিল, ২০২৬-এ এসে তার খোলনলচে অনেকটাই বদলে গেছে।
একসময় পাড়ার একটা মাত্র রঙিন টিভির সামনে গোটা মহল্লা ভেঙে পড়ত। আর এখন সবার হাতে হাতে মোবাইল স্ক্রিন। ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, ইউটিউব আর সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে খেলা দেখার ধরণ বদলে গেছে। বাংলার নতুন প্রজন্ম এখন শুধু রাত জেগে খেলা দেখে ক্ষান্ত হয় না; তারা ম্যাচের পর ম্যাচ বিশ্লেষণ করে, ট্রোল বানায়, ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামে রিলস পোস্ট করে আর অনলাইন কমেন্ট বক্সে তর্কের ঝড় তোলে। বিশ্বকাপ এখন আর শুধু একমুখী বিনোদন নয়, বাঙালি এখন নিজেই সেই কন্টেন্টের বড় নির্মাতা।
ধর্ম–বর্ণ ভুলে একাসনে: মাঠ যখন মেলবন্ধনের মঞ্চ
খেলার একটা অদ্ভুত ক্ষমতা আছে, তা মানুষকে এক লহমায় কাছে টেনে আনে। বিশ্বকাপের সময় বাংলায় এই দৃশ্যটা সবচেয়ে সুন্দরভাবে ফুটে ওঠে।
পাড়ার চায়ের দোকানে হয়তো একই বেঞ্চে বসে খেলা দেখছেন একজন দিনমজুর, একজন স্কুলশিক্ষক, একজন কলেজপড়ুয়া আর একজন বড় ব্যবসায়ী। গোল হতেই সবাই একসঙ্গে লাফিয়ে উঠছেন, জড়িয়ে ধরছেন একে অপরকে। সেখানে কোনো জাত নেই, ধর্ম নেই, ধনী-দরিদ্রের দেওয়াল নেই। এই যে একটা সামাজিক মেলবন্ধন, এটাই বিশ্বকাপকে শুধু একটা টুর্নামেন্ট থেকে বদলে এক মহোৎসবে রূপ দেয়।Raise Your Concern About this Content
নতুন স্বপ্নের উড়ান
বিশ্বকাপ আমাদের ঘরের ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের বুকেও স্বপ্নের বীজ বুনে দেয়। খেয়াল করলে দেখা যাবে, বিশ্বকাপ চলাকালীন বা তার ঠিক পর পরই স্থানীয় ফুটবল একাডেমিগুলোয় বাচ্চাদের ভর্তির লাইন পড়ে যায়।

টিভি পর্দায় মেসি, এমবাপ্পে বা জুড বেলিংহামদের পায়ের জাদু দেখে গলি-মহল্লার খুদে ফুটবলাররাও বিকেলে মাঠে নেমে ট্রাই-ব্রেকারের প্র্যাকটিস শুরু করে। তারা বোঝে, মেধা আর কঠোর পরিশ্রম থাকলে দুনিয়া জয় করা অসম্ভব নয়। এভাবে বিশ্বকাপ তরুণ প্রজন্মের কাছে এক বড় অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়ায়।
উপসংহার: বিশ্বকাপের আসল ঠিকানা
২০২৬ বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফিটা হয়তো শেষ পর্যন্ত উত্তর আমেরিকার কোনো একটা জমকালো স্টেডিয়ামেই উঠবে। বিজয়ী দলের নাম লেখা হবে ইতিহাসের পাতায়।
কিন্তু বিশ্বকাপের যে আসল আনন্দ, তার যে টানটান উত্তেজনা আর আবেগ—তা ছড়িয়ে থাকবে এই বাংলার কোটি কোটি মানুষের মনে। কারণ, আমাদের এখানে বিশ্বকাপ মানে শুধু ৯০ মিনিটের একটা ম্যাচ নয়। এটা হলো রাত জাগার স্মৃতি, পাড়ার রকের অমলিন আড্ডা, চায়ের কাপে তুফান তোলা বিতর্ক, ছাদ থেকে ঝুলে থাকা প্রিয় দলের পতাকা আর প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা এক পৈত্রিক আবেগ।
তাই খাতা-কলমে ২০২৬ বিশ্বকাপের মাঠ হয়তো মেক্সিকো বা আমেরিকায়, কিন্তু তার প্রাণভোমরাটি স্পন্দিত হবে বাঙালির ঘরে ঘরেই। ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে বাংলার নাম নেই তো কী, বাংলার হৃদয়ে বিশ্বকাপ চিরকাল ছিল, আছে আর থাকবে।
তথ্যসূত্র
- FIFA World Cup 2026™ Official Information and Tournament Overview
- Why India Is Not at the World Cup – Novy Kapadia
- A Social History of Indian Football: Striving to Score – Boria Majumdar and Kausik Bandyopadhyay
- An Integrative Theory of Intergroup Conflict – Henri Tajfel and John C. Turner
- BBC SPORTS




