Homeইত্যাদিভোগালী বিহু - আসামের ফসল এবং আগুনের উৎসব

ভোগালী বিহু – আসামের ফসল এবং আগুনের উৎসব

  • রোঙ্গালি বিহু বা বোহাগ বিহু: আসামি ভাষায় ‘বোহাগ’ শব্দের অর্থ হল ‘বৈশাখ’, অর্থাৎ যে বিহু বৈশাখ মাসে অনুষ্ঠিত হয়। পয়লা বৈশাখ থেকে শুরু হয়ে সাতদিন ব্যাপী এই বিহু নতুন বছরের সূচনাকে উদযাপন করে।
  • কোঙ্গালি বিহু বা কাতি বিহু: এই বিহু কার্ত্তিক মাসে অনুষ্ঠিত হয়। ‘কোঙ্গালি’ শব্দের অর্থ হল কাঙ্গাল বা দরিদ্র, এই বিহুর প্রতীক হল দারিদ্র্য। এই বিহু উদযাপনের মাধ্যমে ফসলের সুরক্ষা এবং সুষম কৃষিকাজের কামনা করা হয়।
  • ভোগালি বিহু বা মাঘ বিহু: এই বিহু মাঘ মাসে অনুষ্ঠিত হয়। ‘ভোগালি’ শব্দের অর্থ হল ভোগ। এই বিহুতে জনপদকে নানাবিধ ভোগ খাইয়ে বিহু উদযাপন করা হয়।

ভোগালি বিহু কি: ভোগালি বিহু বা মাঘ বিহু হল একপ্রকারের বিহু যা মাঘ মাসে (বাঙালি দিনলিপি বা আসামি দিনলিপি) বা জানুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত হয়। যেহেতু ফসল কাটার পরে এই বিহু অনুষ্ঠিত হয়, তাই এই বিহু কৃষি মরসুমের ভালো দিকগুলোকে উদযাপন করে। ভোগালি বিহুতে বিভিন্ন রকমের রন্ধিত পদ খাওয়ার মাধ্যমে উদযাপন করা হয়, এবং চাষবাসের ফসল উদযাপন করা হয়।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

ভোগালি বিহু একটি অনন্য উৎসব:

ভোগালি বিহু বা মাঘ বিহু হল আসামের ফসল কাটাইয়ের উৎসব। ভোগালি বিহুর অনন্য হওয়ার কারণ হল এটি কৃষি মরশুমের অন্তিমকাল উদযাপন করে প্রকৃতির এক অপরিহার্য উপাদানের মাধ্যমে – অগ্নি; এই উৎসবের একটি ধাপ হল মেজি বা ভেলাঘর, যা একটি অগ্নিকুণ্ড, যার প্রজ্বলনের মাধ্যমে দিন শুরু হয় এবং ভোগের আয়োজন করা হয়, যা সফল ফলনের প্রতি কৃতজ্ঞতার প্রতীক।

পটভূমি:

বিহু হল আসামি সংস্কৃতির এক প্রাচীন উৎসব যা প্রকৃত কৃষি মরশুমের বিভিন্ন সময়কে উদযাপন করে। ইংরেজি দিনলিপি অনুযায়ী ভোগালি বিহু জানুয়ারি মাসের মাঝখানে শুরু হয়, যা আসামি দিনলিপিতে মাঘ মাস নির্দেশ করে, তাই একে ‘মাঘ বিহু’ বলা হয়। এই সময়কালকে কৃষি মরশুমের শেষ বলে গণ্য করা হয় অর্থাৎ এই সময় ফসল কাটার জন্য উপযুক্ত হয়ে ওঠে। ‘ভোগালি’ শব্দের অর্থ ভোগ করা, এই উৎসবে ফলন হওয়া ফসল দিয়ে তৈরি বিভিন্ন রকমের পদ খেয়ে এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আনন্দ উপভোগ করা হয়।

ভোগালি বিহু উৎসবের ইতিহাস:

ভোগালি বিহু’ও একটি অতি প্রাচীন উৎসব, তাই এর ইতিহাস জানতে গেলে অনেক মন অভিমত লক্ষ করা যায়। কিছু জায়গায় কথিত আছে, খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০০-৩৩০০ নাগাদ দিমাসা কাছারি (Dimasa Kachari) নামক এক উপজাতি এই বিহু উৎসবের সূচনা করে। এই উপজাতি কৃষিকাজ ও পশুপালনকে প্রাধান্য দিত এবং এর প্রত্যেকটি পরিবর্তনকে দেবতার আশীর্বাদ হিসেবে উদযাপন করে।

আরেকটি মত অনুযায়ী, ভোগালি বিহুর সূচনাকাল স্পষ্ট নয়, এটি আসামি জাতির এক উৎসব। কিন্তু ১৩০০-১৯০০ খ্রিস্টাব্দ সময়কালে আসামে আহোম রাজবংশ শাসন করে। তাদের ইষ্টদেব ছিলেন অগ্নি। ভোগালি বিহুর দুটি আচার – মেজি এবং উরুকা, এই দুটি হল আহোমদের সংযোজন। এরাই বিহু উৎসবে অগ্নির সংযোজন ঘটিয়েছে।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

ভোগালি বিহুর আচার ও নিয়মাবলী:

ভোগালি বিহুর আচার এবং নিয়ম শুরু হয় পৌষ মাসের শেষদিন থেকে। উরুকা, পৌষ মাসের শেষদিনের রাতে গ্রামের যুবকদের দ্বারা নির্মিত ভেলাঘর বা মেজি (বাঁশ এবং শুকনো পাতা দ্বারা নির্মিত ঘর) এর ভেতরে আগুন জ্বালিয়ে গ্রামের মহিলারা ভেলাঘরের মধ্যে মহাভোগ রান্না করেন। পরের দিন সকালে সকলে স্নান করে সেই মেজিতে আগুন লাগিয়ে দেয়। ভোগালি বিহু আনন্দের উৎসব, তাই এখানে কিছু খেলা ও প্রতিযোগিতা তৈরি হয় যেমন – তেকেলি ভোঙ্গা (হাড়িভাঙা খেলা), ষাঁড়ের লড়াই ইত্যাদি। ভেলাঘর পুড়ে যাওয়ার পরে জ্বলে যাওয়া কাঠগুলো সকলে নিজেদের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে বাগানে ফেলে দেয়। এই পুড়ে যাওয়া কাঠকে আসামিরা অগ্নিদেবের প্রসাদ হিসেবে গ্রহণ করে।

ভোগালি বিহুর ভোজ – বিভিন্ন বিশেষ পদ:

খাবার হল ভোগালি বিহুর মহীরুহ, ভোগালি বিহুর ভোগে যেসব পদ ভোগ হিসেবে বানানো হয় সেগুলো প্রধানত সদ্য ফলন হওয়া চাল, তিল এবং অন্যান্য উপাদান যেমন চিনি, গুড়, নারকেল দ্বারা বানানো হয়। আসামি ও বাঙালি রন্ধনরীতির মধ্যে অনেক সাদৃশ্য রয়েছে, তার প্রমাণ আমরা এখানে পাই। ভোগের পদগুলির মধ্যে অন্যতম হল –

  • নারকেল লাড়ু – নারকেলের সাদা অংশ কুরে বা গুড়ো করে তার সঙ্গে চিনি বা গুড় মিশিয়ে আগুনে গরম করে এক আঠালো রকমের গথন দেওয়া হয় এবং তারপর গোল গোল আকারে বানিয়ে নেওয়া হয়।
  • তিলের লাড়ু – নারকেল লাড়ুর মতই এর রান্নার নিয়ম, কিন্তু এতে গুড় ব্যাবহার হয়না এবং নারকেলের পরিবর্তে তিল ব্যাবহার করা হয়।
  • সুঙ্গা পিঠা – সুঙ্গা বা চুঙাপুরা পিঠা হল একটি চোঙ আকৃতির পিঠা যা বিন্নি চাল, নারকেল ও দুধ দিয়ে বানানো হয়। এটি খেজুর গুড়ের সাথে খাওয়া হয়।
  • দই-চিড়ে-গুড় মাখা – টকদই, চিড়ে, চিনি ও খেজুর গুড় একসঙ্গে মেখে খাওয়া হয়।

এছাড়াও মাসর টেঙ্গা (ট্যাংরা মাছের ঝোল) ও খার (পেপে এবং ডাল দ্বারা তৈরি একটি ঝোল) এই পদগুলির মধ্যে অন্যতম।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

সাংস্কৃতিক তাৎপর্য:
ভোগালি বিহু আপনাতেই একটি অনন্য সাংস্কৃতিক উৎসব যা তাদের চাষাবাদ, অগ্নিদেবের প্রতি তাদের ভক্তি এবং তাঁদের মনের নির্মল প্রকাশকে তুলে ধরে। এই উৎসবের মাধ্যমে তাঁরা অগ্নিদেবের সাথে, ফসল ফলনের জন্য ভুমি বা পৃথিবীর প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধা প্রকাশ করে। যেখানে ভেলাঘর বা মেজি নির্মাণের সময়ে তাঁদের বন্ধুত্বপরায়ন আচরণ প্রকাশ পায়, সেইখানেই ভোগের রকমফেরের মাধ্যমে তাঁদের অনন্য রন্ধনপ্রণালির প্রমাণ পাওয়া যায়। ভোগালি বিহু, একাকী, আসামি সংস্কৃতির মাধুর্য তুলে ধরার পক্ষে যথার্থ।

ধার্মিক তাৎপর্য:
আসামে পালিত ভোগালি বিহু একটি ধার্মিক ও ভক্তিমুলক অনুষ্ঠান যার মাধ্যমে প্রকৃতির সকল উপাদানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো হয়।

  • মাঘ মাসের প্রথমদিন সকালে ভেলাঘর বা মেজি জ্বালানোর মাধ্যমে প্রকৃতির স্নিগ্ধতাকে তুলে ধরা হয়। জ্বলন্ত মেজিতে তিল, চাল, চিড়ে ছুড়ে দেওয়ার মাধ্যমে প্রকৃতির প্রতি আমাদের অর্পণকে তুলে ধরা হয়।
  • দিনলিপি অনুযায়ী, উরুকা বা পৌষ মাসের শেষদিন সন্ধেবেলা যখন এই উৎসব শুরু হয়, হিন্দুমতে সেদিন মকরসংক্রান্তি পালন করা হয়। এইসময় সূর্য মকরে প্রবেশ করে। এই আঙ্গিকে, ভোগালি বিহু ধার্মিক আঙ্গিকে খুব বেশি প্রধান হয়ে ওঠে।Raise Your Concern About this Content

উৎসব সংক্রান্ত আচারের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ:

এই উৎসবের আচারের মধ্যে অনেক বৈজ্ঞানিক আঙ্গিক লক্ষ্য করা যায়, তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হল –

  • মেজি বা ভেলাঘর: শীতের তীব্রতার সময় আগুন তাপ উৎপন্ন করে, যা জানুয়ারির ঠান্ডা আবহাওয়ায় মানুষকে উষ্ণ থাকতে সাহায্য করে। আগুনের ধোঁয়া প্রাকৃতিক জীবাণুনাশক হিসেবে কাজ করতে পারে, যা আশেপাশের পোকামাকড় এবং ক্ষতিকর জীবাণু কমিয়ে দেয়। শুকনো বাঁশ, খড় এবং পাতার ব্যবহার পরিবেশবান্ধব দহন নিশ্চিত করে এবং ছাইয়ের আকারে মাটিতে পুষ্টি ফিরিয়ে দেয়।
  • ঋতুগত সময়: ভোগালি বিহু জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে হয়, যখন সূর্য উত্তর দিকে (উত্তরায়ণ) যাত্রা শুরু করে। এই সময়টি নিম্নলিখিত বিষয়গুলির সাথে সম্পর্কিত: দিনের আলোর সময়ের ক্রমান্বয় বৃদ্ধি, কৃষিচক্রের পরিবর্তন, পরবর্তী ফসল মৌসুমের জন্য উন্নত জলবায়ু পরিস্থিতি।

বর্তমান সময়ে ভোগালি বিহু:

বর্তমান সময়কালে ভোগালি বিহু আরও বেশি প্রাধান্য পায়। তার এক কারণ হল, এই আধুনিকতার যুগে যেখানে মানুষ নিজের ইতিহাস সম্পর্কে অবগত নয়, পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকরনে ব্যস্ত, তাঁর নিজের সংস্কৃতি, নিজের ইতিহাসের প্রতি অবগত না হয়ে আচারে-ভাষায়-বস্ত্রে পাশ্চাত্যের অনুকরণে ব্যস্ত। সেই আঙ্গিকে ভোগালি বিহু স্বম্ভ্রমে, স্বচরিত্রে প্রকৃতির প্রতি নিবেদিতপ্রাণ হতে শেখায়, দেশের সংস্কৃতি ও বিজ্ঞানমুলক আচারকে আপন করতে শেখায়। ভোগালি বিহু প্রাছ্যের গরিমা, সংস্কৃতির গভীরতা এবং আত্মত্যাগ তুলে ধরে।

অসমীয়া খাবারের কিছু অনন্য রেস্তোয়া : নাম ঠিকানা , ম্যাপ লোকেশন খাবারের মেনু, সময় , যোগাযোগ নম্বর:

  • খরিকা রেস্টুরেন্ট: এই রেস্টুরেন্টে হাঁস, শুকর, স্কুইড এবং অক্টোপাস এর মাংস সুস্বাদু প্রক্রিয়ায় রান্না করে পরিবেশন করা হয়। এছাড়াও এখানে একটি আলাদা বিভাগ আছে যার নাম – কুক ইয়োর ওন ফুড।
  • মিসিং রেস্টুরেন্ট: এই রেস্টুরেন্টে আসামের মিসিং উপজাতিদের বিভিন্ন রন্ধনরীতি দ্বারা তৈরি পদ পরিবেশন করা হয়।
  • পেপা দ্য এথনিক কিচেন: এখানে অনেক মনোরম পরিবেশে নিরামিষ এবং আমিষ আসামি খাবার পরিবেশন করা হয়।

প্রত্যেকটি রেস্টুরেন্টের সমস্ত বিবরন তথ্যপঞ্জিতে দেওয়া রইলো।

তথ্যপঞ্জি:-

ভোগালি ও অন্যান্য বিহুর বিবরণ
ভোগালি বিহুর সময়কাল, আচার এবং খাদ্যপ্রনালি

রেস্টুরেন্টের বিবরন:

খরিকা রেস্টুরেন্ট :-
Address :1st Floor, Kamal C Plaza, 2, GS Rd, South Sarania, Chilarai Nagar, Guwahati, Assam 781007
Phone Number :  097069 99029
Opening Hours : 11 am–10:30 pm
মিসিং কিচেন রেস্টুরেন্ট :-
Address : 1st Floor House, No 24, Hengrabari Rd, near Public Health Chariali, GMC Ward Number 44, Ganeshguri, Guwahati, Assam 781036
Phone Number : 081340 32862
Opening Hours : 11 am–11 pm
পেপা দ্য এথনিক কিচেন :-
Address : Hotel Plaza Inn, PEPA The Ethnic Kitchen, attached to the PuHoR, near Nemcare Hospital, Bhangagarh, Guwahati, Assam 781032
Phone Number : 069003 55505
Opening Hours : 8 am–12 am

শান্তনু
শান্তনু
বিজ্ঞানমনস্ক ও গবেষণাভিত্তিক লেখায় প্রায়োগিক অভিজ্ঞতা নিয়ে শান্তনু, এক উদীয়মান সাহিত্যিক প্রতিভা, প্রাণিবিদ্যায় স্নাতক ও পরিবেশবিদ্যায় স্নাতকোত্তর। তার লেখা "অদ্ভুতুড়ে আলিনগর" বইটি পাঠকমহলে সমাদৃত হয়েছে, কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় প্রকাশ পেয়েছে।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

বাংলা ক্যালেন্ডার

- বিজ্ঞাপন -spot_img

Most Popular

Recent Comments