দাশরথায় বিদ্মহে সীতাবল্লভায় ধীমহি তন্ন রামঃ প্রচোদয়াৎ
আজ থেকে প্রায় সাত হাজার বছর আগে পুণ্যভূমি ভারতবর্ষের অযোধ্যা রাজ্যে মহারাজ দশরথের ঘরে মহারানী কৌশল্যা’র কোল আলোকিত করে জন্ম গ্রহণ ছিলেন এক নক্ষত্র শ্রী রঘুনাথ চন্দ্র, সারা ভূ-ভারতবর্ষ আমরা তাঁকে শ্রীরামচন্দ্র নামেই জানি। শাস্ত্রানুসারে উঁনি ছিলেন অযোধ্যার মহারাজ, মিথীলা রাজ জনকের কন্যা শ্রীমতি জানকী দেবী’র পতি, পবন পুত্র হনুমানের ইষ্ট ও দশানান রাবনের দমনকারী। শ্রীমতি জানকী দেবীকে আমরা মাতা সীতা রূপেই জানি। পুরাণ অনুসারে শ্রী রামচন্দ্র মহাবতার শ্রীবিষ্ণুর সপ্তম অবতার রূপে ধরাধামে অবতীর্ণ হয়েছিলেন রাজা দশরথের প্রথম সন্তান হয়ে।
হাজার বছর পেরিয়েও আজ ভারতবর্ষ তথা দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় তিনি প্রতি ভক্ত মনে পূজিত। শ্রীরামচন্দ্র যেন বিগ্রহে প্রতিষ্ঠিত কেবল পূজিত মূর্তি নন, ন্যায় পরায়ণ, সত্য প্রতিষ্ঠাতা, প্রজা বৎসল এক আদর্শ মর্যাদা পুরুষোত্তম। শ্রীরাম তাই আজও এশিয়াবাসীর এক মহাপ্ৰিয় চরিত্র – যার প্রতিচ্ছবি জয় শ্রীরাম ধ্বনির মাধ্যমে জন-সাধারণের মধ্যের আবেগ উচ্ছাসে প্রতিফলিত হয়। রামনবমী, দীপাবলি তে উচ্ছাসিত মানুষের উদযাপন সেই সত্যই যেন প্রকাশিত করে।

জন্মবৃত্যান্ত -তিথি নক্ষত্র ও স্থান
খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীতে চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষে নবমী তিথিতে পুনর্বসু নক্ষত্রে মাতা কৌশল্যার গর্ভে জন্ম নিলেন শ্রীরাম। ইক্ষাকু বংশের রাজা দশরথ এর জ্যেষ্ঠ পুত্র শ্রী রাম পৃথিবীর পাপ ও রাক্ষস কুলের বিনাশ করে ধর্ম রাজ্য স্থাপন করার জন্য জন্মগ্রহণ করেন। দেবতাদের প্রার্থনায় স্বয়ংবিষ্ণু রাম রূপে ধরে এসেছিলেন। কুলগুরু বশিষ্ঠ মুনী যখন নামকরণের দায়িত্ব ভার নিলেন তখন রাম লক্ষণ ভরত ও শত্রুঘ্ন এই চার পুত্রের নামকরণের পর পিতা দশরথ বশিষ্ঠ মুনীর কাছে এর অর্থ জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, রাম শব্দ ক্ষুদ্র হলেও ব্যাপ্তি অসীম। রামের রা শব্দটি এসেছে নমো নারায়ণায় নমঃ মন্ত্র থেকে । রা বাদ দিলে নমো নায়নায় অর্থাৎ রূপ রসাদী বিষয় কে নমস্কার করা হয় যার অর্থ সম্পূর্ণ বিপরীত হয়ে যায়। তেমন ম শব্দ ওঁ নম শিবায় থেকে আসে যার থেকে ম বাদ দিলে ন শিবায় -মানে অকল্যাণকর বোঝায়। সুতরাং নমো নারায়ণায় নমোঃ ও ওঁ নমঃ শিবায় এই দুই মন্ত্র রাম নামের প্রাণ স্বরূপ। তাই রাম নাম জপে জীব মুক্তি লাভ করে।
রামচন্দ্র কে নিয়ে ভারতের সংকৃতি গড়ে উঠেছে। তাঁর চরিত্র শৌর্য বীর্য ক্ষমা পিতৃভক্তি ভাতৃপ্রেম প্রজানুরাগ ধর্মপালনে সদা ব্রতী থাকার কারণে তিনি আজও আমাদের এতো প্রিয়।
ভারতবর্ষ নেপাল শ্রীলংকা থাইল্যান্ড কম্বোডিয়া ইন্দোনেশিয়া সহ গোটা দক্ষিন পূর্ব এশিয়ায় শ্রীরামের জনপ্রিয়তা লক্ষ্য করা যায়। শুধু তাই নয়- চৈনিক সিংহলী তিব্বতী খোটানি ব্রম্ভদেশ জাপানি ফিলিপিন লাওসের মঙ্গোলিয়া ও সাইবেরিয়া ভাষাতেও রামায়ণ প্রসঙ্গ আছে। তার কারণ রাম ও রামায়ণ কাহিনী এখানে সংস্কৃতির সাথে ওতো প্রোত ভাবে জড়িত।

শ্রীলংকায় মাতা সীতাকে যখন রাবন অপহরণ করে নিয়ে যায়, তখন তাঁকে উদ্ধার করতে শ্রীরাম হনূমান কুলের সাহায্যে সমুদ্রের ওপর একটি সেতু নির্মাণ করা হয়।ভারতের তামিলনাড়ুর রামেশ্বরম থেকে শ্রীলংকার মান্নার দ্বীপ পর্যন্ত সমুদ্রের ওপর চুনাপাথরের সেতুই সেই রামসেতু। শ্রীলংকায় বহু স্থান রামায়ণের বহু ঘটনার সাক্ষি। তীরুকেতেশ্বরম – এর লোককথা অনুযায়ী রামচন্দ্র এখানে শিবলিঙ্গ স্থাপন করেছিলেন। রাবন হত্যার পর রামেশ্বরমেও শিব মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যা আজও পূজিত হয়।সীতা এলিয়া ও রামফলসে মনে করা হয় মাতা সীতা বন্দিনী ছিলেন। বর্তমানে সেখানেসীতা আম্মান মন্দির প্রতিষ্ঠিত। এখানে রামের চরণ চিহ্ন আছে বলে বিশ্বাস করা হয়। নীল-ওয়ারী স্থানে শ্রীরাম তীর মেরে জল বের করেছিলেন বলে জানা যায়।গায়ত্রী পিডুম এ রাবন পুত্রমেঘনাদ শিবের আরাধনা করে অতিপ্রাকৃত ক্ষমতার অধিকারী হয়েছিলেন বলে জানা যায়।
থাইল্যান্ড এ রামায়নের স্থানীয় নাম রামকিয়েন যা জাতীয় মহাকাব্য হিসাবে পরিচিত। থাই রাজারা নিজেদের বিষ্ণুর অবতার শ্রীরামের বংশধর বলে মনে করেন তাই তাদের নামের সাথে রাম যুক্ত করা হয়। আয়ুধ্যা বলে থাইল্যান্ড এ একটি প্রাচীন শহর যা ভারোতের অযোধ্যার নাম এ নামাঙ্কিত। বৌদ্ধ প্রধান দেশ হলেও শ্রীরামের পূজা গভীর শ্রদ্ধার সাথে এখানে পালন করা হয়। Raise Your Concern About this Content

ইন্দোনেশিয়ায় তাদের সংস্কৃতির মূল অঙ্গ বলে পরিচিত রামায়ণ। যা ওয়ায়াং অরেঙ নাম পরিচিত। ইন্দোনেশিয়ার বিখ্যাত প্রামবানান হিন্দু মন্দিরে রামায়ণ উৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এটি মূলত মুসলিম প্রধান দেশ হলেও রাম ও রামায়ণ সমান ভাবে জনপ্রিয়। সুতরাং ধর্মীয় সীমানা ছাড়িয়ে রামায়ণ এখানেও একাত্মতার প্রতীক হয়ে ওঠে।
কম্বোডিয়ায় রামায়ণ রিয়ামকার নামে পরিচিত। যেখানে আঙ্কোরভাটের মতো সুপ্রসিদ্ধ এশিয়ার সব থেকে বড় হিন্দু মন্দির প্রতিষ্ঠিত আছে ।
শ্রীরামচন্দ্রের ধর্ম ছিল প্রজা পালন – যা আজকের সময়ে পৃথিবীর সব শাসকদের কাছে মূল্যবান শিক্ষা। তিনি সর্বস্ব ত্যাগ করে সর্বস্বার্থ বিসর্জন দিয়ে তা পালন করেছেন। মানব রূপে তিনি মর্ত্যে লীলা করেছেন মাত্র ঊনসত্তর বছর। কিন্তু এই সময় টুকুর মধ্যেই তিনি দেখিয়ে দিয়ে গেছেন কিভাবে এক রাজা কে সত্যনিষ্ঠ হতে হয়, ন্যায় ও ধর্ম রক্ষার কেনো প্রয়োজন, অধর্ম কে কিভাবে নাশ করতে জানতে হয়, প্রজার মঙ্গলের জন্য এক রাজা কে কতটা নিঃস্বার্থ পরায়ণ হতে হয় এবং সর্বোপরি কিভাবে রাজ্যে সুশাসন ফিরিয়ে আনা যায়। বর্তমান সময়ে শ্রীরাম চরিত্র ও তার আদর্শ ভবিষ্যতের পাথেয় । হাজার হাজার বছর পরেও তাই শ্রীরামচন্দ্র এখনো এতো জনপ্রিয়।
ওঁ রামায় রামচন্দ্রায় রামভদ্রায় বেধসে
রঘুনাথায় নাথায় সীতায়া পতয়ে নমঃ।
তথ্যসূত্র :
১) শ্রীরামচন্দ্রের অনুধ্যান -স্বামী স্বৎপ্রেমানন্দ
২) সন্ধ্যা বন্দনা – বৈকুণ্ঠনাথ সান্যাল
৩) রামায়ণ কথা -স্বামী তথাগতানন্দ
৪) শ্রীরামচন্দ্র কৃপালু
৫) বৈদিক সনাতন হিন্দুত্ব




