Homeইত্যাদিটুসু উৎসব আজও সম্বৃদ্ধ করে চলেছে বাংলার লোকসংস্কৃতির ধারাকে 

টুসু উৎসব আজও সম্বৃদ্ধ করে চলেছে বাংলার লোকসংস্কৃতির ধারাকে 

টুসু পার্বণ 

পৌষ মাস জুড়ে রাঢ় বাংলার গ্রামজীবনে টুসু পার্বণ এক বিশেষ আবেগের নাম। বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, বর্ধমান, হুগলি জেলার গ্রামাঞ্চল থেকে শুরু করে ঝাড়খণ্ডের সিংভূম অঞ্চল পর্যন্ত টুসু দেবীর আরাধনা প্রচলিত। অগ্রহায়ণের শেষ দিন থেকে পৌষ সংক্রান্তি পর্যন্ত এই মন্ত্রহীন, পুরোহিতবিহীন পূজা মূলত নারীকেন্দ্রিক। গ্রামবাংলার একান্নবর্তী পরিবারের অবিবাহিত মেয়েরা কিংবা কয়েকটি পরিবারের মেয়েরা দলবদ্ধ হয়ে সন্ধ্যায় সন্ধ্যায় টুসু আরাধনায় অংশ নেয়। এই উৎসব কৃষিজীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। নতুন ধান ওঠার আনন্দ, শীতের রৌদ্র, মাঠের ফসল সব মিলিয়ে টুসু পার্বণ যেন রাঢ় বাংলার কৃষিসভ্যতার এক জীবন্ত দলিল।

টুসু নামের উৎপত্তি 

টুসু নামের উৎপত্তি নিয়ে বহু মত প্রচলিত। সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ধানের তুষ থেকেই ‘টুসু’ শব্দের উৎপত্তি। শীতকালে গ্রামের মানুষ ধানের তুষ জ্বালিয়ে আঁচ পোহায় এই দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা থেকেই লোকদেবীর নামকরণ। পশ্চিমবঙ্গের পৌষালি উৎসব ‘তুষতুষালি ব্রতকথা’ এই মতের সমর্থন করে। লোকগবেষক বঙ্কিমচন্দ্র মাহাতো তুষ-উৎপত্তির তত্ত্বকে গ্রহণ করেছেন। অন্যদিকে দীনেন্দ্রনাথ সরকার টুসু শব্দের উৎস খুঁজেছেন তিষ্যা বা পুষ্যা নক্ষত্রে, আবার কেউ কেউ ঊষা দেবীর নামের সঙ্গেও এর যোগসূত্র দেখিয়েছেন। আরও এক মত অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের প্রজননদেবতা ‘টেষুব’ শব্দের সঙ্গে টুসুর সাদৃশ্য রয়েছে। এই মতভেদই প্রমাণ করে যে টুসু কোনও একক ধর্মীয় কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ নন তিনি বহু সংস্কৃতির সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা এক লোকদেবী।

টুসু দেবীর আরাধনা

টুসু মূলত দ্রাবিড়-অস্ট্রিক ভাষাগোষ্ঠীর কোল, মুন্ডা, সাঁওতাল, ওরাওঁ, ভূমিজ, বাউরি, বাগদি, কুর্মি, মাহাতো প্রভৃতি আদিবাসী ও অনগ্রসর সম্প্রদায়ের উপাস্য দেবী। এই সমাজগুলির কাছে টুসু কেবল দেবী নন, তিনি জীবনের সুখ-দুঃখের সঙ্গিনী। টুসু গানের মাধ্যমে প্রেম, বিরহ, অভাব, শোষণ, স্বপ্ন সবই প্রকাশ পায়। তাই টুসু গান কোনও লিখিত সাহিত্য নয়; এটি শ্রুতিনির্ভর, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মুখে মুখে বহমান এক জীবন্ত সাহিত্যধারা।

মন্ত্রহীন লোকবিশ্বাসের রূপ

টুসু পূজার আচার অত্যন্ত সরল। কুমোরদের তৈরি পোড়া মাটির খোলায় ধানের তুষ ভরে, তার উপর গাঁদাফুল সাজিয়ে তৈরি হয় ‘টুসুখোলা’। সন্ধ্যায় আলো, চাল, দূর্বাঘাস, সর্ষে, বাসক, আকন্দ ইত্যাদি নিবেদন করে পিঁড়ির উপর বসানো হয় টুসুকে। কোনও মন্ত্র নেই, নেই ব্রাহ্মণ্য আচার শুধু গানই পূজার প্রধান মাধ্যম। ভোগ হিসেবে চিড়ে, গুড়, বাতাসা, মুড়ি, ছোলা দেওয়া হয়। এই আরাধনায় কচিকাঁচা থেকে বৃদ্ধা সবাই অংশ নেয়, যা লোকসংস্কৃতির সাম্যবাদী চরিত্রকে স্পষ্ট করে।Raise Your Concern About this Content

 চাউড়ি, বাউড়ি ও আলোর উৎসব

পৌষের শেষ চার দিন টুসু পার্বণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। প্রথম দিন ‘চাউড়ি’ এ দিন চালগুড়ি তৈরি হয় এবং উঠোন গোবর-মাটি দিয়ে নিকোনো করা হয়। দ্বিতীয় দিন ‘বাউড়ি’ নানা আকারের পিঠে বানানো হয়, রাত জেগে গান চলে, গ্রাম আলোয় সেজে ওঠে। এই দিনগুলি কেবল ধর্মীয় নয়, সামাজিক মিলনক্ষেত্রও বটে।

 লোকসাহিত্যের নাট্যরূপ

পৌষ সংক্রান্তির ভোরে টুসুদেবীকে চতুর্দোলায় বসিয়ে নদী, পুকুর বা দিঘিতে বিসর্জন দেওয়া হয়। এই সময় বিভিন্ন দলের মধ্যে টুসু গানের তরজা চলে। এক দলের গান আরেক দলের গানকে ব্যঙ্গ করে, প্রশ্ন তোলে, সমাজবাস্তবতার ছবি আঁকে। এই গানের লড়াই লোকসাহিত্যের এক নাট্যরূপ, যেখানে রসিকতা ও তীক্ষ্ণ সামাজিক বোধ একসঙ্গে ধরা পড়ে।

ইতিহাসের সাক্ষী লোকগান

টুসু গান যে কেবল ধর্মীয় বা বিনোদনের মাধ্যম নয়, তার প্রমাণ মেলে ইতিহাসে। ১৯৫৩ সালে জওহরলাল নেহেরুর নেতৃত্বে রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন গঠিত হলে মানভূম অঞ্চলে বাংলা ভাষার দাবিতে জনমত গঠনে টুসু গান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। লোকসংগীত হয়ে ওঠে রাজনৈতিক প্রতিবাদের ভাষা যা টুসু সংস্কৃতির ঐতিহাসিক গুরুত্বকে অনস্বীকার্য করে।

আধুনিকতার চাপে টুসু সংস্কৃতির সংকট

আজ পশ্চিমি সংস্কৃতি ও প্রযুক্তির দাপটে বাঁকুড়া–পুরুলিয়ার টুসু উৎসব তার আগের জৌলুস হারাচ্ছে। তবু মকর সংক্রান্তির সকালে সর্ষে ক্ষেতের ওপার থেকে ভেসে আসা টুসু গানের সুর মনে করিয়ে দেয় রাঢ়বঙ্গ এখনও তার শিকড় ভুলে যায়নি। লোকসংস্কৃতি হয়তো রূপ বদলায়, কিন্তু তার আত্মা মরে না।

গ্রন্থপুঞ্জ

বাংলার লোকসংস্কৃতি — আশুতোষ ভট্টাচার্য
লোকসংস্কৃতি ও লোকসাহিত্য — দীনেন্দ্রনাথ সরকার
ভারতীয় লোকধর্ম — নির্মলকুমার বসু
বাঙালির ব্রতকথা — আশুতোষ ভট্টাচার্য
পশ্চিমবঙ্গের লোকদেবতা ও লোকবিশ্বাস — নিমাইচন্দ্র মণ্ডল
রাঢ় বাংলার লোকসংস্কৃতি — কালীপদ মিত্র
লোকসংগীত ও সমাজচেতনা — সুকুমার সেন
বাংলার ব্রত ও উৎসব — উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য
আদিবাসী সংস্কৃতি ও সমাজ — সতীশচন্দ্র রায়
ভারতীয় লোকসাহিত্যের ইতিহাস — অমলেন্দু মিত্র
মানভূমের লোকসংস্কৃতি — অনিলকুমার মাহাতো
লোকধর্ম ও সমাজসংস্কার — নির্মলেন্দু দাশ
বাংলার গ্রামজীবন ও লোকবিশ্বাস — যোগেশচন্দ্র বাগল
আদিম সমাজ ও লোকসংস্কৃতি — নীহাররঞ্জন রায়
ঝাড়খণ্ড ও রাঢ় অঞ্চলের লোকউৎসব — শশাঙ্কশেখর দে

অদিতি
অদিতি
অদিতি — সাংবাদিকতা ও সৃজনশীল লেখায় প্রায়োগিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এক উদীয়মান সাহিত্যিক কণ্ঠ, যাঁর লেখা পত্রিকা, আন্তর্জাতিক জার্নাল ও সংকলনে প্রকাশিত। লেখিকা বাংলা সাহিত্যের প্রতি অগাধ ভালোবাসা আর সৃষ্টিশীল প্রতিভার ধারক।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

বাংলা ক্যালেন্ডার

- বিজ্ঞাপন -spot_img

Most Popular

Recent Comments