Homeপার্বণীবিদ্যার দেবীর পুজোতেই উন্মাদনা তুঙ্গে এই গ্রামে

বিদ্যার দেবীর পুজোতেই উন্মাদনা তুঙ্গে এই গ্রামে

এই পুজো ঘিরে মামুদপুরের মানুষের আবেগ গভীর। বহু পরিবারে দুর্গাপুজোর চেয়েও সরস্বতী পুজোর গুরুত্ব বেশি। কারণ, এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বিদ্যা, সংস্কৃতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বপ্ন। কৃষিনির্ভর ও প্রাকৃতিক প্রতিকূলতায় লড়াই করা এই এলাকার মানুষ বিদ্যার দেবীর আরাধনাকেই জীবনের অগ্রগতির প্রতীক হিসেবে দেখেন। তাই সরস্বতী পুজো এখানে শুধু উৎসব নয়, আশার আর প্রার্থনারও নাম।

দুর্গাপুজোর আদলে সরস্বতী আরাধনা

মামুদপুরের সরস্বতী পুজোর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল এর আয়োজনের ধরন। এই পুজোকে দেখলে সহজেই মনে হয়, এটি যেন দুর্গাপুজোরই আরেক রূপ। পাড়া-পাড়া, ক্লাব-ক্লাব মিলিয়ে একাধিক পুজো অনুষ্ঠিত হয়, এবং প্রতিটি পুজোর মধ্যেই থাকে নিজস্ব পরিকল্পনা, থিম ও নান্দনিক ভাবনা।

প্রায় প্রতিটি ক্লাব সারা বছর ধরে অপেক্ষা করে এই একটি পুজোর জন্য। সদস্যরা বৈঠক করেন, থিম ঠিক করেন, বাজেট নির্ধারণ করেন, শিল্পী নির্বাচন করেন সবটাই হয় অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে। অনেক ক্ষেত্রেই বাজেট লক্ষাধিক টাকা ছাড়িয়ে যায়, যা কোনও ছোট গ্রামাঞ্চলের পুজোর ক্ষেত্রে সত্যিই ব্যতিক্রমী। প্রতিমা নির্মাণ থেকে মণ্ডপসজ্জা, আলোকসজ্জা থেকে নিরাপত্তা সব কিছুতেই থাকে পেশাদারিত্বের ছাপ।

এই পুজোর আরেকটি বিশেষ দিক হল, এলাকার সাধারণ মানুষদের সরাসরি অংশগ্রহণ। শুধু ক্লাব কর্তৃপক্ষ নয়, গ্রামের প্রবীণ থেকে শিশু সকলেই কোনও না কোনও ভাবে যুক্ত থাকেন এই আয়োজনের সঙ্গে। কেউ বাঁশ জোগাড় করেন, কেউ খাবারের ব্যবস্থা দেখেন, কেউ আবার অতিথি আপ্যায়নের দায়িত্ব নেন। ফলে সরস্বতী পুজো হয়ে ওঠে একটি সম্মিলিত সামাজিক কর্মকাণ্ড।

লক্ষাধিক টাকার বাজেট, থিমের বাহার

মামুদপুরের সরস্বতী পুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য তার থিম-নির্ভর আয়োজন। একাধিক ক্লাব সংগঠন প্রতিবছর লক্ষাধিক টাকার বাজেটে অভিনব থিমের মাধ্যমে বাগদেবীর আরাধনা করেন। শিল্পীরা নিখুঁত কারুকার্যে ফুটিয়ে তোলেন ভাবনা, ইতিহাস ও সংস্কৃতির নানা দিক। ফলে এই পুজো শুধু পূজার্চনা নয়, এক ধরনের প্রদর্শনীও বটে।

শহর-গ্রামের সেতুবন্ধন

এই থিমের মাধ্যমে একদিকে যেমন কলকাতার হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যকে স্মরণ করা হয়েছে, তেমনই অন্যদিকে শহর ও গ্রামের মধ্যে এক সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন গড়ে উঠেছে। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের শিশুদের কাছে এই আয়োজন হয়ে উঠেছে এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা যাদের অনেকেই ট্রাম বা হাত রিক্সা দেখেছে শুধু বই বা ছবিতে।

কলকাতার বড়ো বড়ো পূজোগুলোকে সম্পূর্ণ রূপে টেক্কা দেয় এই গ্রামের সরস্বতী পুজো। প্রায় ৫ দিন মত এখানে পুজোয় মেতে ওঠে মানুষ। হলুদ  শাড়ি-পাঞ্জাবি, আনন্দ-উল্লাস, নতুন নতুন খেলা, গান, মেলা… কত কিছুই না দেখা যায়। আর সব থেকে বেশি দৃষ্টি আকর্ষণ করে, ঠাকুর ভাসান। যেমন তেমন করে এই গ্রামে ঠাকুরের বিসর্জন হয় না। গ্রামের পর গ্রাম, দেশ বিদেশে থেকে মানুষের ঢল নামে নদীর ঘাটে ঘটে। সকলে সকাল থেকে অপেক্ষা করে সন্ধ্যে নামার। তারপর শুরু হয়, আকাশ জুড়ে রঙের খেলা, কলকাতা থেকে আনা আতশবাজির প্রদর্শনী। শুধুমাত্র বিসর্জনের দিন খুলে দেওয়া হয় বাংলাদেশ বর্ডার। দুই প্রান্তের মানুষ ওই একটা মাত্র দিনে এক হয়, আলাপচারিতা বাড়ায় বিনা বাঁধায়। জিনিস আদান-প্রদান করে। 

গ্রন্থপঞ্জি

১. লোকসংস্কৃতি পরিচয় — আশুতোষ ভট্টাচার্য
২. বাংলার লোকসংস্কৃতি — দুলাল চৌধুরী
৩. ভারতীয় লোকসংস্কৃতি — অশোক মিত্র
৪. লোকধর্ম ও লোকসংস্কৃতি — নির্মল সেন
৫. বাংলার ব্রত ও লোকাচার — যোগেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য
৬. লোকায়ত ভারত — দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
৭. লোকসংস্কৃতির স্বরূপ ও ধারা — সুব্রত মুখোপাধ্যায়
৮. বাংলার লৌকিক দেবদেবী — তারাপদ সাঁতরা
৯. গ্রামবাংলার লোকউৎসব — সুকুমার সেন
১০. লোকসংস্কৃতি ও সমাজচেতনা — গোপাল হালদার
১১. ভারতীয় সংস্কৃতির রূপরেখা — নীহাররঞ্জন রায়
১২. লোকসংস্কৃতি ও লোকসাহিত্য — যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য
১৩. বাংলার পূজা-পার্বণ ও লোকায়ত ধারা — অনিলকুমার নিয়োগী
১৪. লোকসংস্কৃতির নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি — কে. কে. চট্টোপাধ্যায়
১৫. লোকধারা ও গ্রামীণ সংস্কৃতি — পীযূষকান্তি বড়ুয়া

সরস্বতী পুজো

বিদায় ২০২৫ : স্বাগতম ২০২৬ সময়ের দরজায় দাঁড়িয়ে আমরা
অদিতি
অদিতি
অদিতি — সাংবাদিকতা ও সৃজনশীল লেখায় প্রায়োগিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এক উদীয়মান সাহিত্যিক কণ্ঠ, যাঁর লেখা পত্রিকা, আন্তর্জাতিক জার্নাল ও সংকলনে প্রকাশিত। লেখিকা বাংলা সাহিত্যের প্রতি অগাধ ভালোবাসা আর সৃষ্টিশীল প্রতিভার ধারক।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

বাংলা ক্যালেন্ডার

- বিজ্ঞাপন -spot_img

Most Popular

Recent Comments