একটা সময় ছিল, কেরিয়ার বলতে চোখের সামনে ভেসে উঠত কয়েকটি চেনা ছবি—ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, সরকারি চাকরি কিংবা কর্পোরেটের মোটা মাইনের পদ। আজ সেই তালিকায় নিঃশব্দে জায়গা করে নিয়েছে আরও একটি পেশা—কনটেন্ট ক্রিয়েটর বা সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার। সকালে ঘুম থেকে উঠে ক্যামেরা অন করা, দিনের কোনও ঘটনা নিয়ে ভিডিয়ো বানানো, নিজের দক্ষতা বা মতামত তুলে ধরা, তারপর সেই কনটেন্টের দর্শকসংখ্যা বাড়ার অপেক্ষা—অনেক তরুণ-তরুণীর কাছে এটাই এখন ভবিষ্যতের কেরিয়ার পরিকল্পনা। প্রশ্নটা তাই উঠছে, চাকরি কি আর শুধু অফিস, নির্দিষ্ট সময় আর মাসের শেষে বেতনের নাম? নাকি মোবাইলের ক্যামেরার সামনেও তৈরি হতে পারে নতুন পেশার দুনিয়া?
পরিসংখ্যান বলছে, এই পরিবর্তন নিছক কল্পনা নয়। ২০২৪ সালের YouTube India–SmithGeiger Report অনুযায়ী, ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সি ভারতীয় জেন জি-র প্রায় ৮৩ শতাংশ নিজেদের ‘ক্রিয়েটর’ বলে মনে করেন। অর্থাৎ তাঁরা শুধু ডিজিটাল কনটেন্টের দর্শক নন, নিজেরাও কোনও না কোনও ভাবে সেই দুনিয়ায় কনটেন্ট তৈরি করছেন। আরও তাৎপর্যপূর্ণ, প্রায় ৭৫ শতাংশ তরুণ ক্রিয়েটর কনটেন্ট তৈরিকে ভবিষ্যতের কেরিয়ার হিসেবে দেখছেন। অর্থাৎ ‘শখ’ আর ‘পেশা’র মাঝের সীমারেখাটা ক্রমশ ঝাপসা হচ্ছে।
শুধু মুম্বই-দিল্লি নয়, গল্পটা এখন ছোট শহরেরও
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় দিক সম্ভবত এখানেই। কনটেন্ট ক্রিয়েটর হওয়ার জন্য আর মুম্বই, দিল্লি কিংবা বেঙ্গালুরুর মতো বড় শহরে থাকা বাধ্যতামূলক নয়। ইন্দোর, জয়পুর, নাগপুর, পাটনা কিংবা দেশের বিভিন্ন ছোট শহরের তরুণরা নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি, খাবার, স্থানীয় জীবনযাপন, ভ্রমণ, শিক্ষা কিংবা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নিয়ে ভিডিয়ো বানিয়ে দর্শক তৈরি করছেন। স্মার্টফোন আর সহজলভ্য ইন্টারনেট সেই সুযোগটাকে আরও বড় করেছে। একসময় নিজের এলাকার গল্প হয়তো আটকে থাকত পাড়ার মধ্যে। এখন সেই গল্প কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছে যেতে পারে দেশের অন্য প্রান্তে, এমনকী বিদেশেও। ফলে ডিজিটাল দুনিয়া শুধু নতুন পেশা তৈরি করছে না, ভৌগোলিক বৈষম্যের সংজ্ঞাটাও বদলে দিচ্ছে।

ইউটিউব শুধু বিনোদন নয়, আয়ের মঞ্চও
কনটেন্ট ক্রিয়েশনের এই উত্থানের কেন্দ্রে রয়েছে ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, শর্ট ভিডিয়ো প্ল্যাটফর্মসহ একাধিক মাধ্যম। বিশেষ করে ইউটিউব এখনও তরুণ ক্রিয়েটরদের কাছে অন্যতম বড় মঞ্চ।প্রতিভা, জ্ঞান কিংবা নিজের ভাবনা প্রকাশের পাশাপাশি এখন কনটেন্ট থেকে তৈরি হচ্ছে বিজ্ঞাপন, ব্র্যান্ড সহযোগিতা, স্পনসরশিপ এবং অন্যান্য আয়ের সুযোগ। একটি সফল চ্যানেল বা অ্যাকাউন্ট অনেকের কাছে কার্যত ছোট ব্যবসার মতো কাজ করছে। ভারতের ক্ষেত্রেও সেই পরিবর্তন স্পষ্ট। রিপোর্ট অনুযায়ী, ৫৫ শতাংশ ক্রিয়েটর মনে করেন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তাঁদের আর্থিক স্বাধীনতা অর্জনে সাহায্য করেছে। অর্থাৎ, তরুণ প্রজন্মের কাছে প্রশ্নটা আর শুধু ‘কী নিয়ে ভিডিয়ো বানাব?’ নয়। বরং, ‘এই কাজটাকেই কি পেশা হিসেবে নেওয়া যায়?’
‘ভাইরাল’ হওয়া আর পেশা তৈরি—এক জিনিস নয়
তবে এখানেই রয়েছে সবচেয়ে বড় ভুল বোঝাবুঝি। সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভিডিয়ো ভাইরাল হয়ে যাওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি কেরিয়ার তৈরি করা—দুটো এক বিষয় নয়। আজ যে ভিডিয়োতে লাখ লাখ ভিউ, কাল সেই একই অ্যাকাউন্ট হয়তো দর্শকের নজরেই নেই।কনটেন্ট ক্রিয়েশনের ক্ষেত্রে তাই শুধু জনপ্রিয়তা নয়, প্রয়োজন নিয়মিত কাজ, মৌলিক ভাবনা, দর্শকের আস্থা, বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান এবং পরিবর্তনশীল প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা।আর রয়েছে অ্যালগরিদমের চাপ। কোন ভিডিয়ো বেশি মানুষ দেখবে, কোনটি হঠাৎ হারিয়ে যাবে—তার অনেকটাই নির্ভর করে এমন একটি ব্যবস্থার উপর, যা ক্রিয়েটরের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেই।ফলে বাইরে থেকে যতটা স্বাধীন পেশা মনে হয়, বাস্তবে তার চাপও কম নয়।
‘সকাল থেকে রাত, ইন্টারনেট অন মানেই কাজ অন’

আন্তর্জাতিক একটি সমীক্ষায় ৫৭ শতাংশ জেন জি জানিয়েছেন, সুযোগ পেলে তাঁরা ইনফ্লুয়েন্সার হতে চান। কিন্তু পেশা হিসেবে এই কাজের কঠিন দিকটিও সামনে এসেছে।মার্কিন ক্রিয়েটর হান্না উইলিয়ামসের অভিজ্ঞতা সেই বাস্তবতারই উদাহরণ। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কনটেন্ট তৈরির কাজ সপ্তাহে পাঁচ দিন বা নির্দিষ্ট অফিস-সময় মেনে চলে না। ঘুম থেকে ওঠা থেকে ঘুমোতে যাওয়া পর্যন্ত ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত থাকাটাই যেন কাজের অংশ। অর্থাৎ, যে স্বাধীনতাকে এই পেশার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ মনে হয়, সেটিই কখনও কখনও হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে বড় চাপ।অফিসে কাজের সময় শেষ হয়। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় কাজের সময় শেষ হওয়ার কোনও নির্দিষ্ট ঘড়ি নেই।
মহিলাদের অংশগ্রহণও বাড়ছে
ডিজিটাল কনটেন্টের দুনিয়ায় মেয়েদের অংশগ্রহণও দ্রুত বাড়ছে। গত দু’বছরে ইউটিউবে মহিলা ক্রিয়েটরের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে বলে রিপোর্টে উঠে এসেছে। আর বিষয়ও বদলেছে। শুধু ফ্যাশন বা বিউটি নয়—শিক্ষা, রান্না, ভ্রমণ, বই, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, সংবাদ বিশ্লেষণ থেকে শুরু করে উদ্যোক্তা হওয়ার গল্প—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই মহিলারা নিজেদের জায়গা তৈরি করছেন।ফলে ইনফ্লুয়েন্সার অর্থ শুধু বিনোদন নয়; এটি হয়ে উঠছে নিজের জ্ঞান, দক্ষতা এবং পরিচয়কে তুলে ধরার একটি মাধ্যম।
স্কুল-কলেজেও ঢুকছে ‘ক্রিয়েটর’ হওয়ার প্রস্তুতি
কনটেন্ট ক্রিয়েশনের এই সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকারও। কেন্দ্রীয় বাজেটে অ্যানিমেশন, ভিজ্যুয়াল এফেক্টস, গেমিং এবং কমিক্স—অর্থাৎ AVGC ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মুম্বইয়ের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজিসের সহযোগিতায় ১৫ হাজার মাধ্যমিক স্কুল এবং ৫০০ কলেজে কনটেন্ট ক্রিয়েটর ল্যাব তৈরির ঘোষণা করা হয়েছে। এই খাতে প্রতিভা তৈরির জন্য বাজেটে ২৫০ কোটি টাকা বরাদ্দের কথাও জানানো হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এই শিল্পে প্রায় ২০ লক্ষ পেশাদারের প্রয়োজন হতে পারে বলেও অনুমান করা হচ্ছে।অর্থাৎ, কনটেন্ট তৈরি আর শুধু মোবাইল হাতে ব্যক্তিগত উদ্যোগের জায়গায় আটকে নেই। ধীরে ধীরে এটি শিক্ষা, দক্ষতা এবং শিল্পের পরিকাঠামোর সঙ্গেও যুক্ত হচ্ছে।
শিক্ষাবিদরা কী বলছেন?

এই প্রসঙ্গে শিক্ষাবিদ পবিত্র সরকার জানান, ‘ কেরিয়ারের এই পরিবর্তনকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। কারণ নতুন প্রজন্ম যে পৃথিবীতে বড় হচ্ছে, সেখানে ডিজিটাল দক্ষতা, যোগাযোগ ক্ষমতা, সৃজনশীলতা এবং ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডিংও কর্মদক্ষতার অংশ হয়ে উঠছে।’ তবে তিনি আরো জানান, ‘ইনফ্লুয়েন্সার হব’ আর ‘কেরিয়ার তৈরি করব’—দুটিকে এক করে দেখা ঠিক নয়। ভাইরাল হওয়ার নেশা যাতে শিক্ষার বিকল্প না হয়ে ওঠে, সেদিকেও নজর দিতে হবে।Raise Your Concern About this Content
চাকরি বদলাচ্ছে, নাকি চাকরির সংজ্ঞাই বদলাচ্ছে?
আসলে পরিবর্তনটা শুধু ইনফ্লুয়েন্সার পেশার উত্থানে নয়। বদলে যাচ্ছে কাজ সম্পর্কে তরুণ প্রজন্মের ধারণাও। আগের প্রজন্মের কাছে চাকরির অর্থ ছিল স্থায়িত্ব। নতুন প্রজন্মের কাছে তার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে স্বাধীনতা, নিজের মতো কাজ করার সুযোগ, সৃজনশীলতা এবং নিজের পরিচয় তৈরি করার আকাঙ্ক্ষা।তাই হয়তো ভবিষ্যতের কর্মজগতে ‘চাকরি’ এবং ‘নিজের কাজ’-এর মধ্যেকার সীমারেখা আরও ক্ষীণ হবে। কেউ অফিসে বসে কাজ করবেন, কেউ বাড়ি থেকে, কেউ ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে, আবার কেউ একসঙ্গে একাধিক পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকবেন।
তবে শেষ পর্যন্ত সাফল্যের মাপকাঠি শুধু কত ফলোয়ার, কত লাইক কিংবা কত ভিউ—সেটা হবে না। যে কনটেন্ট মানুষের আস্থা অর্জন করবে, নতুন কিছু শেখাবে, বিনোদন দেবে কিংবা কোনও সমস্যার সমাধান করবে, তারই দীর্ঘমেয়াদি মূল্য থাকবে। আজকের জেন জি তাই হয়তো চাকরির সংজ্ঞা মুছে দিচ্ছে না, বরং সেটাকে আরও বড় করে লিখছে। অফিসের ডেস্ক থেকে মোবাইলের ক্যামেরা—কর্মজগতের মানচিত্র বদলাচ্ছে। আর সেই নতুন মানচিত্রে ‘কনটেন্ট ক্রিয়েটর’ হয়তো আর বিকল্প পেশা নয়, আগামী দিনের মূলধারার কেরিয়ারেরই একটি নাম।
তথ্যসূত্র :
১. ইনফ্লুয়েন্সার পেশা
২. জেন জি-দের মধ্যে ইনফ্লুয়েন্সার প্রবণতা
৩. কেন্দ্রীয় বাজেটে কনটেন্ট ক্রিয়েশন



