FIFA WORLD CUP 2026
জীবন যুদ্ধ থেকে ফুটবল মহাযুদ্ধ যিনি জীবনের প্রত্যেক জয়ের খেতাব বারবার অর্জন করেছেন নিজ দক্ষতায় তিনি লুকা মদ্রিদ। নাম তো শুনা হি হোগা।
১৯৮৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ক্রোয়েশিয়ার জাদারের শহরের উত্তরে ভেলেবিত পর্বতের দক্ষিণ ঢালে অবস্থিত মদ্রিচি নামের এক ছোট পাহাড়ি গ্রাম জন্মগ্রহণ করেন লুকা মদ্রিচ। এই গ্রাম জাটন ওব্রোভাচকির। সে সময় অঞ্চলটি ছিল তৎকালীন যুগোস্লাভিয়ার অন্তর্ভুক্ত সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র ক্রোয়েশিয়ার অংশ। সালটা ১৯৯১, লুকার বয়স মাত্র ৬ বছর। সেই বছরে স্বাধীনতার জন্য আগুন জ্বলছে ক্রোয়েশিয়ায়। যুদ্ধের আগুনে এক নিমেষে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় লুকার জীবন।

লুকা মদ্রিচ
ক্রোয়েশিয়ার ফুটবলের জাদুকর লুকা মদ্রিচ। স্টিপে মদ্রিচ ও রাদোইকা দোপুড় দম্পতির প্রথম সন্তান। তাঁর বাবা স্টিপের বাড়ি ছিল মোদ্রিচি গ্রামে, আর মা রাদোইকার জন্ম ওব্রোভাচের কাছাকাছি ক্রুশেভো গ্রামে। প্রথম জীবনে একটি নিটওয়্যার কারখানায় কাজ করতেন তাঁর বাবা-মা।
পিতামহের বাড়িতে শৈশব কেটেছিল লুকার।
যুদ্ধে দগ্ধ শৈশব, শরনার্থী শিবিরের যন্ত্রণা, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা বলে বলে গোল দিয়ে ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে জ্বলজ্বল করছে তাঁর নাম। আজ বিশ্বের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন লুকা। ক্রোয়েশিয়ার জাতীয় নায়কেরও খেতাব অর্জন করেছেন ব্যালন ডি’অর বিজয়ী।
লুকার কৃতীত্ব
রিয়েল মাদ্রিদের হয়ে খেলে জিনে আনেন ৬টি চ্যাম্পিয়ন লিগ, ৪টি লা লিগা-সহ অসংখ্য শিরোপা। ২০১৮ সালে বিশ্বকাপের ফাইনালে তুলে দেন নিজের দেশ ক্রোয়েশিয়াকে। লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর আধিপত্য ভেঙে জয় করেন ফুটবলের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সম্মান ব্যালন ডি’অরের খেতাব। ৪০ বছর বয়সেও ফুটবল মাঠে ঝড় তোলেন তিনি।
স্বজন হারানোর যন্ত্রণা
১৯৯১ সালের ক্রোয়েশিয়ার স্বাধীনতার যুদ্ধ ধ্বংস করে দিয়েছিল তাঁর শৈশব। খুব কাছ থেকে দেখেছেন যুদ্ধের ভয়াবহতা। দীর্ঘদিন উদ্বাস্তু জীবন কাটাতে হয়েছিল তাঁর পরিবারকে। স্বাধীনতার যুদ্ধের সময় সার্বিয়ান বিপ্লবীরা দখল করে নেয় তাঁদের গ্রাম। ৬ বছরের ছোট্ট লুকার সামনে গুলি করে হত্যা করা হয় তাঁর পিতামহকে। শৈশবের যাঁর সঙ্গে কাটিয়েছিলেন অনেকটা সময়। চোখের সামনে তাঁর মৃত্যু লুকার জীবনে গভীরভাবে প্রভাব ফেলে।স্বজন হারানোর তীব্র যন্ত্রণা শিশু বয়স থেকেই বয়ে নিয়ে চলেছেন।

শরনার্থী শিবিরের হাহাকার
ঘরবাড়ি হারিয়ে জাদারের শরনার্থী শিবিরে আশ্রয় নেয় তাঁর পরিবার। শরনার্থী শিবিরে তীব্র জলকষ্টে জীবন কাটাতে হত লুকার পরিবারকে। ক্রোয়েশিয়ান সেনাবাহিনীতে অ্যারোমেকানিক হিসেবে যোগ দেন তাঁর বাবা। ফুটফুটে শৈশবের বদলে যুদ্ধ বিপর্যস্ত শৈশবই ছিল লুকার সঙ্গী।

যন্ত্রণার মলম ফুটবল
মাত্র ৬ বছর বয়সে খুব কাছ থেকে যুদ্ধের বিভীষিকাকে দেখেছেন। প্রতিনিয়ত বোমা পড়ত জাদার শহরে। যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে মুক্তি পেতে ফুটবলকে আঁকড়ে ধরেন লুকা। যুদ্ধ বিপর্যস্ত ক্রোয়েশিয়ার ভূমিতে হয় তাঁর ফুটবল খেলার হাতেখড়ি। হোটেলের পার্কিং লটেই শরনার্থী শিবিরের আরও শিশুদের সঙ্গে ফুটবল খেলতেন। ১৯৯২ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ফুটবল একাডেমিতে ভর্তি করা হয় তাঁকে।
আর্থিকভাবে খুব একটা সচ্ছল না হলেও,তাঁর পড়াশোনা ও ফুটবল প্রশিক্ষণের কোনরকম ত্রুটি রাখেনি তাঁর পরিবার। আর্থিক সহায়তা করেছেন তাঁর কাকাও।
লুকার অনুপ্রেরণা
ছোটবেলায় ক্রোয়েশিয়ার কিংবদন্তি ফুটবলার জ্ভোনিমির বোবান এবং ইতালির তারকা ফ্রানচেস্কো তত্তির খেলা দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন লুকা মদ্রিচ। তাঁদের আদর্শ মেনেই একদিন বিশ্বের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার হয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন তিনি।Raise Your Concern About this Content
লুকার ফুটবল জীবন

পরিবারের সমর্থনে বিভিন্ন প্রতিনিধি প্রশিক্ষণ শিবিরে অংশগ্রহণ করেন লুকা। এনকে জাদার (NK Zadar) ক্লাবে অনুশীলন শুরু করেন। কোচ ছিলেন ডোমাগয় বাশিচ। ডৌমাগয় ও যুব একাডেমির প্রধান তোমিস্লাভ বাশিচের তত্ত্বাবধানে প্রশিক্ষণ শুরু হয় তাঁর।
সেইসময় মদ্রিচ ছিল বয়সে অনেক ছোট, শারীরিকভাবে অনেক রোগা এবং দুর্বল। তাই ডালমেশিয়া অঞ্চলের অন্যতম জনপ্রিয় ও শক্তিশালী ক্লাব হাজদুক স্প্লিট তাঁকে দলে নিতে চায়নি। পরে ইতালিতে অনুষ্ঠিত একটি যুব টুর্নামেন্টসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় নিজের প্রতিভার ঝলক দেখিয়ে তিনি সবার নজর কেড়ে নেন।
২০০১ সালের শেষ দিকে, লুকার বয়স মাত্র ১৬ বছর, তাঁর প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে দিনামো জাগরেবে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন তোমিস্লাভ বাশিচ। জাগরেবের যুব দলে কিছুটা সময় কাটানোর পর ২০০৩ সালে বসনিয়ান প্রিমিয়ার লিগের ক্লাবে পাঠানো হয় তাঁকে। মাত্র ১৮ বছর বয়সে বসনিয়ান প্রিমিয়ার লিগের ‘বর্ষসেরা খেলোয়াড়’ নির্বাচিত হন লুকা। ব্যস আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
উপসংহার
ফুটবল ইতিহাসে উজ্জ্বল ধ্রুবতারা লুকা। যুদ্ধের কাদামাটিতেই নিজের জীবনে সাফল্যের পদ্ম ফুটিয়েছেন ক্রোয়েশিয়ার এই সংগ্রামী ফুটবলার। যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই নিজের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন লুকা। শরণার্থী জীবন, স্বজন হারানোর বেদনা আর প্রতিনিয়ত মৃত্যুভয়ের মাঝেও তাঁর অদম্য ইচ্ছাশক্তি ,অধ্যাবসায় গোটা বিশ্বকে তাঁর হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে।




