Homeপ্রকৃতি ও পরিবেশজোড়া শালিক পাখিকে ঘিরে বাঙ্গালীর সংস্কার ও লোকবিশ্বাসের রহস্য

জোড়া শালিক পাখিকে ঘিরে বাঙ্গালীর সংস্কার ও লোকবিশ্বাসের রহস্য

বাঙালির লোকসংস্কৃতি এবং লোকবিশ্বাসে জোড়া শালিখ দেখা অত্যন্ত শুভ এক লক্ষণ। সকালবেলা বা ঘরের বাইরে বের হয়ে হুট করে একজোড়া শালিখ চোখে পড়লে কিছু সংখ্যক মানুষের এক অদ্ভূদ পরিবর্তণ চোখে পড়ে পরিবর্তন আসে। মন খারাপের মাঝে রাস্তায় চলতে চলতে হোক বা জানালা থেকে বাইরে তাকিয়ে একজোড়া শালিখ দেখামাত্র অবচেতন ভাবে অনেকের মুখে একটা হাসি ফুটে ওঠে, ঠিক যেন শীতকালের এক চিলতে রোদ্দুরের মতো। মনে মনে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে অনেকে ভাবেন, যাক, আজকের দিনটা দারুণ কাটবে। কিংবা ধরুন কোনও জরুরি কাজে বের হওয়ার সময় জোড়া শালিখ দেখে অজান্তেই অনেকের আত্মবিশ্বাস এক ধাক্কায় অনেকটাই বেড়ে যায়। শত আধুনিকতার মাঝেও আমাদের অবচেতন মন আমাদের ঐতিহ্য ও লোকবিশ্বাসের গল্পগুলোকে বিশ্বাস করতে ভালবাসে। জোড়া শালিখ দেখার পর মনের মধ্যে কেমন একটা ইতিবাচক মানসিকতা তৈরি করে নেয় অনেকে। কোনও পরীক্ষা, চাকরির ইন্টারভিউ বা ব্যবসার ক্ষেত্রে যাওয়ার সময় এমন ঘটনা ঘটলে অনেকেই ভেবে নেয় এই কাজে তাঁদের সফলতা আসবেই। বড়রাও মুহূর্তের জন্য শিশু হয়ে যান এবং মনে মনে। অনেকে মৃদুস্বরে ছোটবেলার সেই চেনা ছড়াটি আউড়ে ওঠেন- “জোড়া শালিখ দেখলে বাড়িতে কুটুম আসে”। এরাই আবার একটা বা বিজোড় শালিখ দেখতে পেলে মন খারাপ করে বসেন। সাধারণত যখনই কেউ জোড়া শালিখ দেখে, সে একা সেই আনন্দ উপভোগ করতে চায় না। কাউকে পাশে পেলে আনন্দ ভাগ করে বলেন, “ওই দেখ দেখ, জোড়া শালিখ! দিনটা আজ ভাল যাবে।” যেন এই শুভ ভাগ্যটা সে প্রিয়জনদের সাথেও ভাগ করে নিতে চায়। কিন্তু এই এত শত ভাবনার নেপথ্যে কী রয়েছে? শুধুই কি কুসংস্কার? আর এই কুসংস্কার থেকে মানুষ এখনও কেন বেরোতে পারছে না? এটি কি আদৌ মেনে চলা উচিত? এর সঙ্গে কি শুধুই নেতিবাচক ভাবনা জড়িত রয়েছে? নাকি ইতিবাচক কিছু ভাবনাও রয়েছে এই লোকবিশ্বাসের সঙ্গে? চলুন আজ এই লোকবিশ্বাসের সঙ্গে জড়িত খুঁটিনাটি বিষয়গুলো জানার চেষ্টা করবো।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

জোড়া শালিখ মানেই দুইটি শালিখ নয়:

লোকবিশ্বাসে উল্লেখ থাকা জোড়া শালিখকে অনেকেই মনে করেন দুটি শালিখ পাখির কথা বলা হয়েছে, কিন্তু বিষয়টা তা নয়। এখানে একটি মেয়ে শালিখ ও পুরুষ শালিখকে একসঙ্গে দেখলে দিন বা সময় ভাল কাটার কথা বলা হয়েছে। আর বিজোড় মানে সঙ্গী বিহীন এক পাখির কথা বলা হয়েছে। শালিখ একটি সামাজিক পাখি। এরা মূলত জোড়ায় জোড়ায় বা ঝাঁক বেঁধে চলতেই ভালবাসে বা পছন্দ করে। একটি শালিখ পাখিকে একা বসে থাকতে দেখার অর্থ, হয়তো সে তার সঙ্গীকে হারিয়েছে। কিংবা দল থেকে হারিয়ে কোনও বিপদে পড়েছে সে। এই জগতের মানুষের একটা ধারণা আছে যে, একাকীত্ব মানেই দুঃখ অনিবার্য আর সঙ্গে যদি সাহচর্য বা বন্ধু থাকে তাহলে জীবনে আনন্দ বিদ্যমান। সেই ধারণা থেকেই জোড়া শালিখ মিলন, সৌহার্দ্য এবং আনন্দের প্রতীক হয়ে ওঠে খুব সহজে। 

লোক গানের মধ্যে লোকবিশ্বাসের অন্তর্নিহিত অর্থ:

মনোজ ঠাকুরের লেখা এই জনপ্রিয় লোক সঙ্গীতের দিকে তাকালে প্রমাণিত হয়ে যায় যে, এটি নিছকই কোনও কুসংস্কার নয়। গানে হয়তো বলা হয়েছে, “সব মেয়েরাই বলে”। কিন্তু বাস্তবে মেয়ে হোক বা ছেলে সবাই একই ভাবে এই লোকবিশ্বাসকে মান্যতা দেন। বর্তমান সময়ে হয়তো অনেক মানুষ এই লোকবিশ্বাসকে কুসংস্কার বলে পাশ কাটিয়ে চলে যান বা যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু বহু মানুষ আছেন যাঁরা এই বিশ্বাসে বিশ্বাসী হয়ে জোড়া শালিখ দেখলে আজও প্রণাম করে তবেই সামনের রাস্তায় এগিয়ে যান। অথবা বিজোড় শালিখ পাখি দেখলে অন্যটিকে খোঁজার চেষ্টা করেন বা চোখ বন্ধ করে ভগবানের কাছে ভাল দিন কাটার প্রার্থনা করে তবেই এগোন। এবার আসি লোকবিশ্বাসকে ঘিরে মানুষের গভীর বিশ্বাসের কথায়।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

লোকসংস্কৃতি, প্রচলিত বিশ্বাস ও প্রেমের এক অপূর্ব মেলবন্ধন রয়েছে লোকবিশ্বাসের “জোড়া শালিখ দেখা ভাল সকালে বিকালে, বিজোড় হলে কপাল মন্দ, সব মেয়েরাই বলে” -এই গানে। আমাদের সমাজে শালিক পাখিকে নিয়ে যে লোকবিশ্বাস আছে, তা অত্যন্ত সহজভাষায় ও সুরে তুলে ধরা হয়েছে এখানে। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী গানের শুরুতেই বলা হয়েছে জোড়া শালিক দেখা ভাল, আর বিজোড় (অর্থাৎ একটা বা তিনটা) শালিক দেখলে কপাল মন্দ। এখানে ‘মেয়েরা বলে’ বলতে সাধারণত বোঝানো হয়েছে, এই বিশ্বাস মূলত আবহমান সময় ধরে বাংলার মহিলাদের মুখে মুখে প্রচারিত। এটি কেবল কুসংস্কারের কথা বলে না, তা রূপক হিসেবে ব্যবহার করে আমাদেরকে এক প্রেমের গল্পও বলে। গানের ভাষায় ও প্রচলিত কথায় দুই শালিক দেখলে নাকি “মনের মানুষ বাড়ি আসে”, আর এই ধারনা মিলনের প্রতীক। আগেই বলেছি জোড়া শালিখ বলতে আসলে এই লোকবিশ্বাসে দম্পতি শালিখ পাখিদের বোঝানো হয়েছে। আর এক দেখা অর্থাৎ সঙ্গীহীন কোনও শালিখ পাখিকে দেখা মানে আমাদের মনের মানুষ বা সঙ্গীর সঙ্গে বিবাদ বা ঝামেলা হতে পারে। এদিকে তিন শালিখ বলতে বোঝানো হয়েছে জোড়ের মাঝে তৃতীয় কারও আগমন। যা এক দম্পতি শালিখ পাখির মাঝে বিচ্ছেদ বা সমস্যার সষ্টি করে অর্থাৎ সম্পর্কের ছন্দপতন ঘটায়।

গানটির একটা অংশে এই বিবাদ এড়াতে গীতিকার লিখেছেন, বিজোড় বা একাকী থাকা যাবে না। লেখক নিজের জীবনকেও ‘জোড়া শালিকের’ সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন- “বেজোড় আমি দেখবো না, বেজোড় কভু হবো না…”। অর্থাৎ লোকবিশ্বাস কি উস্কে তিনি বলতে চেয়েছেন আমাদের মধ্যে একাকীত্বকে দূরে সরিয়ে একাত্মবোধকে জাগ্রত করতে হবে। একতা থাকলে যেকোনও যুদ্ধ জয় করা যায় তা আমরা ছোট থেকেই পড়ে আসছি। এই লোকবিশ্বাসের মধ্যে কোথাও সেই একতা বা জোট বেঁধে থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। গীতিকারও নিজের সঙ্গে আমাদেরকেও একতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে এই বিষয়টা তুলে ধরেছেন।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

আধুনিক যুগে এই বিশ্বাসের প্রাসঙ্গিকতা কতটুকু?

বর্তমান এই তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে এই অতিসাধারণ লোকবিশ্বাসগুলো কেন আমাদের অবচেতনে রাজত্ব করে? প্রকৃতির সাথে আত্মিক সংযোগ: এই ধরনের বিশ্বাস মানুষকে যান্ত্রিক জীবনের বাইরে চারপাশের জীববৈচিত্র্যের দিকে তাকাতে বাধ্য করে। কংক্রিটের জঙ্গল ও স্ক্রিন-নির্ভর সভ্যতায় বাঁচা মানুষটিও যখন অবচেতনে একটি শালিখ দেখতে পেলে আর একটির খোঁজ শুরু করে, তখন সে আসলে প্রকৃতির সাথে নিজের বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া সম্পর্ক নতুন করে গড়ে। কিন্তু বর্তমান যুগে দাঁড়িয়ে এই বিশ্বাসকে অন্ধভাবে আঁকড়ে ধরার কোনও যৌক্তিকতা নেই। আমরা যদি একটি শালিখ পাখিকে দেখে মন খারাপ করে বসে থাকি, তবে তা আমাদের নেতিবাচক মানসিকতাকেই প্রতিফলিত করে। জীবন থেকে নেতিবাচক বিষয়গুলো সরিয়ে আমাদের ইতিবাচক চিন্তার বৃদ্ধি ঘটাতে হবে।Raise Your Concern About this Content

উপসংহার:

আমাদের উচিত এই বিশ্বাসকে কোনও দৈববাণী হিসেবে না দেখা। তার থেকে এটাকে আমরা বাংলার লোকসংস্কৃতির এক মায়াময়, কাব্যিক ও নান্দনিক উপাদান হিসেবে গ্রহণ করতে পারি। বর্তমান যান্ত্রিক জীবনের ক্যানভাসে একজোড়া চঞ্চল শালিখ পাখি যদি আমাদের মনকে ক্ষণিকের তরে হলেও আনন্দ দিতে পারে, তবে সেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে উপভোগ করাই যায়। কিন্তু তা ঘিরে মনের মধ্য কুসংস্কার জড়ো করলে চলবে না। শুভ-অশভের কাল্পনিক বৃত্ত ভেঙে আমরা প্রকৃতির এই সুন্দর সৃষ্টিকে ভালবাসতে পারি। আসল বিষয় হল, কপাল বা ভাগ্য কোখনও কোনও পাখির সংখ্যা বা এমন কোনও ভাবনার ওপর নির্ভর করতে পারে না। তা নির্ভর করে আমাদের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, কাজ ও চেষ্টার ওপর। তবে এই লোকবিশ্বাসটিকে পুরোপুরি উড়িয়ে না দিয়ে এর ভেতরের রূপক অর্থটিকে আমরা গ্রহণ করতেই পারি। জোড়া শালিখ আমাদের শেখায় একাকীত্বের চেয়ে মেলবন্ধন সুন্দর। এটি আমাদের প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার এবং চারপাশের জীববৈচিত্র্যের দিকে নজর দেওয়ার একটা সুযোগ করে দেয়। খুব সহজে বলতে গেলে, এই লোকবিশ্বাসের মধ্যে যে ইতিবাচক দিগুলো রয়েছে তা আমরা গ্রহণ করতেই পারি শুধু অন্ধবিশ্বাসের অন্ধকার গহ্বর থেকে নিজেকে দূরে রাখতে হবে। আমাদের জীবনে এমনই অনেক বিষয় আছে যা থেকে আমরা ইতিবাচক বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দিয়ে নেতিবাচককে বিদায় জানাতে পারি। ঠিক যেমন আমরা পরমহংস দেব শ্রীরামকৃষ্ণ দেবের বিষয়ে জানি।

তথ্যসূত্র:

উইকিপিডিয়া
এই সময় -সংবাদ প্রতিবেদন
শালিক পাখির কথা
নিউজ ১৮ বাংলা -সংবাদ প্রতিবেদন
মনোজ ঠাকুরের লেখা গান
দৈনিক ইত্তেফাক
অন্যান্য প্রতিবেদন

রিয়া পুরকাইত
রিয়া পুরকাইত
নিজের ইচ্ছার প্রতি অফুরন্ত ভালবাসা। সেই ভালবাসার তাগিদে লেখালেখির দুনিয়ায় পা। সংবাদপত্র থেকে শুরু করে ডিজিটাল মিডিয়ায়‌ও চলছে কলম। গণজ্ঞাপন নিয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক উত্তীর্ণ। কবিতা লেখা, আবৃত্তি পাঠের পাশাপাশি ভাললাগে অবসর সময় খুঁজে সাহিত্যের জগতে ডুব দিতে। ভাল লাগে ভাল লাগার জন্য সময় বের করতে।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

বাংলা ক্যালেন্ডার

- বিজ্ঞাপন -spot_img

Most Popular

Recent Comments