Homeইত্যাদিযেখানে খুঁটি পড়ে, সেখানেই শুরু হয় মায়ের আগমনী — জানুন খুঁটি পুজোর...

যেখানে খুঁটি পড়ে, সেখানেই শুরু হয় মায়ের আগমনী — জানুন খুঁটি পুজোর অজানা গল্প!

চলুন একটু খুঁজে দেখি খুঁটি পুজোর উৎপত্তি, তাৎপর্য, আধুনিক রূপ এবং বাঙালির মনে এর বসবাস কিভাবে হল।

খুঁটি পুজো কী?

খুঁটি পুজো হল বাঙালীর সর্ব বৃহৎ উৎসব শারদীয়া দুর্গাপূজার মহাযজ্ঞ শুরুর প্রথম ধাপ। মূলত পুজোর প্যান্ডেল বা স্থায়ী পুজো মণ্ডপ দুর্গাপূজা উপলক্ষে বিশেষভাবে তৈরির কাজ শুরু করার আগে একটি লম্বা শাল কাঠের অথবা বাঁশের খুঁটি বিভিন্ন স্বকীয় আচারের সাথে পূজাস্থানে পুঁতে এই মাঙ্গলিক আচার পালন করা হয়।

এই পুজো কবে হয়?

দুর্গাপুজোর এই প্রথম ধাপ সাধারণত রথযাত্রার পর প্রথম রবিবার বা যেদিন কাঠামো তৈরির কাজ শুরু হয় তার আগেই এই সুসম্পন্ন হয়। পূজার মাত্র ৯০ থেকে ১০০ দিন আগেই অনুষ্ঠিত হওয়ার কারণে খুঁটি পুজো আপামর বাঙালীর মনে ‘পুজো আসছে’ এই ইঙ্গিত বয়ে আনে।

খুঁটি পুজোর ইতিহাস ও সামাজিক পটভূমি

বারোয়ারি দুর্গাপুজোর প্রচলন ব্রিটিশ আমলে শুরু হলেও খুঁটি পুজোর ধারণাটি এসেছে গ্রামীণ সমাজের “স্থানের অধিকার” বোঝাতে। বিশেষজ্ঞ মনে আগে কোনও জমিতে কিছু করতে গেলে সেই জমিকে পবিত্র করে তোলা হতো — সেই রেওয়াজ ও বিশ্বাস থেকেই এসেছে খুঁটি পুজো। প্রাচীনকালে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের বনেদি বাড়িগুলোর দুর্গাপুজোর ইতিহাস ঘাঁটলে প্রতিমা তৈরির কাঠামোর পূজা বা ‘কাঠামো পুজো’ করার চল দেখা যায়। সময়ের সাথে সাথে বারোয়ারি বা সর্বজনীন পূজা জনপ্রিয়তা পেলে মণ্ডপ নির্মাণ কর্ম একটি বড় সামাজিক কাজ হয়ে দাঁড়ায়। এই সুবিশাল কর্মযজ্ঞের শুভ সূচনা করতেই পরবর্তী কালে খুঁটি পুজোর প্রচলন শুরু হয় বলে অনেকে মতপ্রকাশ করেছেন।

খুঁটি পুজোর ধূপকাঠির ধোঁয়া ভেসে যাচ্ছে সকালের আলোয়—শুরু হল পুজোর প্রথম প্রার্থনা।
ফটো: বাসু কর

খুঁটি পুজোর আচার-আচরণ : খুঁটি পূজা কিভাবে করতে হয়

  • প্রথমে প্রথমে বাঁশ বা কাঠের খুঁটিটি নিয়ম মেনে শঙ্খ ও উলুধনির সাথে ঢাক কাঁসর বাজিয়ে নির্দিষ্ট পুকুর বা নদীতে চান করানো হয়
  • এরপর স্নান শেষে খুঁটিটি নিয়ম মেনে শঙ্খ ও উলুধনির সাথে ঢাক কাঁসর বাজিয়ে যাত্রা করে নির্দিষ্ট স্থান নিয়ে আসা হয়
  • পুজোর স্থানে খুঁটিটি পুঁতে তার গায়ে গাঁদা ফুলের মালা পরানো হয়
  • সেইখানে ফুল, চন্দন, সিঁদুর, ধূপ-ধুনো, ধান-দূর্বা, ও নারকেল ইত্যাদি ফল প্রসাদ দিয়ে পুজোর সামগ্রী দিয়ে অল্প আকারে পূজাচর্চা করে দেবী মাকে নিমন্ত্রণ জানানো হয়
  • পুরোহিত মন্ত্র পড়েন, দেবী দুর্গাকে বাপের বাড়ী আসার জন্যে নিমন্ত্রণ করেন
  • অনেকে পূজোর পর খিচুড়ি ভোগ বা নাড়ু-মুড়ি বিতরণও করেন

খুঁটি পুজোর মন্ত্র:

যেহেতু খুঁটি পুজো মূলত পুজো প্যান্ডেল বা মণ্ডপ তৈরির আনুষ্ঠানিক শুভ সূচনা হিসেবে পালন করা হয়, তাই শাস্ত্রীয়ভাবে এই পুজোর সময় মূলত ভূমি দেবতা বা ধরিত্রী মা, শ্রী বিশ্বকর্মা এবং দেবাদীদেব ভগবান শিবের আরাধনা পুজো করা হয়। 
খুঁটি পুজোর জন্যে শাস্ত্রমতে কোন সুনির্দিষ্ট মন্ত্র নেই, তবে পুজোর সময় সাধারণত নিচের মন্ত্রগুলো উচ্চারিত হয়:
১) মঙ্গলাচরণ ও সংকল্প: সর্ব প্রথমে মণ্ডপ ও প্যান্ডেল নির্মাণের স্থান পবিত্র করা হয় এবং দেবী পুজোর কাজটি যাতে নির্বিঘ্নে সুসম্পন্ন হয় সেই সংকল্পে ভূমি পূজার মন্ত্র পাঠ করা হয়।
২) শিবমন্ত্র উচ্চারণ: অনেকে খুঁটি পুজোকে মহাদেবের আরাধনা বলে মনে করেন। তাই এরপর “ওঁ নমঃ শিবায়” ধ্বনি সহ শিবমন্ত্র ও শিব স্তোত্র পাঠ করা হয়।
৩) মাঙ্গলিক মন্ত্র: সনাতন ধর্মমতে যেকোনো শুভ কাজের শুরুতে শ্রী গণেশ ও শ্রী শ্রী দুর্গা মা কে স্মরণ করা হয়ে থাকে। তাই এর পর “ওঁ সর্বমঙ্গলা মাঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থ সাধিকে। শরণ্যে ত্র্যম্বকে গৌরী নারায়ণী নমোস্তুতে।।” মন্ত্র সহিত শ্রী গণেশ ও শ্রী শ্রী দুর্গা স্তোত্র পাঠ করা হয়।
৪) বীজ মন্ত্র: সর্বশেষে পুজোর প্রধান খুঁটি টি সুনির্দিষ্ঠ স্থানে স্থাপন করার সময় শ্রীগুরু ও ইষ্টদেবতার আশীর্বাদ প্রার্থণা করা হয়। তাই নিজনিজ শ্রীগুরুর বীজ মন্ত্র (মৌনভাবে) ও তারপর ইষ্টদেবতার বীজ মন্ত্র জপ করা হয়। মতান্তরে অনেকে বীজ মন্ত্র মৌনভাবে উচ্চারণ করে থাকেন। 

আধুনিক রূপ ও সমাজে গুরুত্ব

আজ খুঁটি পুজো হয়ে উঠেছে মিডিয়া কাভারেজের বিষয়। বড় বড় ক্লাবগুলোর খুঁটি পুজোতে থাকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, গানের সন্ধ্যা, খাবারের স্টল। এই দিনটিই প্যান্ডেল কর্মীদের, থিম ডিজাইনারদের কাজে নেমে পড়ার দিন — অর্থাৎ প্রস্তুতির ঢাকে প্রথম কাঠি পড়া।

কেন এখনো এই রীতি টিকে আছে?

বাঙালির মননে দুর্গাপুজো শুধু উৎসব নয়, আবেগ। খুঁটি পুজো সেই আবেগের সূচনা। এটা শুধুই একটি খুঁটি নয়, বরং প্রতিবছরের মতো আবার সবাই মিলে একত্রিত হওয়ার, “শুরু” বলার প্রতীক। এই ঐতিহ্যই বছরের পর বছর ধরে টিকিয়ে রেখেছে খুঁটি পুজোর সংস্কৃতি।

“নিউ টাউনের সিএ ব্লকের বাসিন্দারা আনন্দে একসঙ্গে খুঁটি পুজোর শুভ মুহূর্ত উদযাপন করছেন।”

উদ্দেশ্য

খুঁটি পুজোর মূল উদ্দেশ্য হল পুজো সফলভাবে শেষ করার জন্য দেব-দেবীদের আশীর্বাদ কামনা করা। এটি এক প্রার্থনা—যাতে দুর্গাপুজো শান্তিপূর্ণ ও সৌভাগ্যময়ভাবে অনুষ্ঠিত হয়।

আলতা রাঙা হাতের ছোঁয়ায় খুঁটির গায়ে পড়ল সিঁদুর—বাঙালির পুজো আবেগ শুরু এখান থেকেই।
ফটো: বাসু কর

তাৎপর্য

খুঁটি পুজো হল দুর্গাপুজোর আনুষ্ঠানিক সূচনা। প্যান্ডেল তৈরির শুরুর দিনটিকেই চিহ্নিত করে এই পুজো। এটি যেন সেই চুপিচুপি শুরু হওয়া আগমনী সুর—যেখানে এখনও মণ্ডপ তৈরি হয়নি, কিন্তু মনের ভেতরে দেবী আসছেন বলে বাজতে শুরু করেছে ঢাক।

রীতিনীতি

এই দিনে একটি খুঁটি (সাধারণত কাঠ বা বাঁশের) স্থাপন করা হয় এবং তার চারপাশে সাময়িকভাবে সাজানো হয় পুজোর স্থান। সিঁদুর, ধূপ, ফুল, নারকেল, ফল, ধান-দূর্বা দিয়ে পূজা সম্পন্ন হয়। পুরোহিত মন্ত্রোচ্চারণ করে দেবীকে নিমন্ত্রণ করেন।

সময়কাল

খুঁটি পুজো সাধারণত দুর্গাপুজোর দু’তিন মাস আগে হয়। অনেক পুজো কমিটি রথযাত্রার পরের প্রথম রবিবার দিনটি বেছে নেন। তবে ক্লাবভেদে ভিন্ন হতে পারে নির্দিষ্ট দিন।

“সিলভার ওক এস্টেটের বাসিন্দাদের উপস্থিতিতে পুরোহিতের মাধ্যমে খুঁটি পুজোর শুভ সম্পাদন।”

স্থান

যে স্থানে প্যান্ডেল নির্মাণ হবে, সেই স্থানেই খুঁটি পুজো সম্পন্ন হয়। এই পুজোর মাধ্যমেই সেই স্থানকে পবিত্র করে মণ্ডপ নির্মাণ শুরু করা হয়।

গুরুত্ব

খুঁটি পুজো শুধুই এক খুঁটির পূজা নয়—এটি হল বাঙালির মিলনমেলা, প্রাথমিক আবেগ, শুভ সূচনা। দুর্গাপুজোর elaborate প্যান্ডেল নির্মাণের আগেই এই অনুষ্ঠান মানে উৎসবের শুরু। এর মাধ্যমে একটা সামাজিক সংযোগ তৈরি হয় যা কলকাতা সহ গোটা বাংলায় সংস্কৃতির একটি অপরিহার্য অংশ।

পাড়ার রাস্তায় এক খুঁটি গাঁথতেই থেমে গেল গাড়ির গতি—পুজো আসছে, এ বার্তাই তো ছড়িয়ে দিল এই ছোট্ট আয়োজন।
ফটো: বাসু কর

উপসংহার:

খুঁটি পুজো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কোনও বড় উৎসব শুরু হয় ছোট্ট একটা খুঁটি ঠেলে। সেটাই বিশ্বাস, সেটাই আবেগ। এখান থেকেই গড়ে ওঠে মণ্ডপ, ঢাকের তালে জমে ওঠে বিসর্জনের কান্না। কিন্তু সব কিছুর আগে থাকে এই পবিত্র সূচনা।

তথ্যসূত্র

উজ্জয়িনী হালদার
উজ্জয়িনী হালদার
ইলেকট্রনিকসের শিক্ষার্থী উজ্জয়িনী এক প্রগতিশীল কন্টেন্ট বিশেষজ্ঞ হিসেবে প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং গল্প বলার চাতুর্যের একটি অনন্য সমন্বয় গড়ে তুলেছেন। পড়াশুনোর পাশাপাশি স্বাধীন লেখিকা উজ্জয়িনী ডেটা ভিত্তিক অন্তর্দৃষ্টির মাধ্যমে আকর্ষণীয় ডিজিটাল গল্প তৈরি করেন। জটিল ধারণাগুলোকে সহজে বোঝানোর জন্য চিত্তাকর্ষক কন্টেন্ট তৈরিতে পারদর্শী উজ্জয়িনীর লেখনীতে বিশ্লেষণাত্মক চিন্তা ও সৃজনশীলতা সমন্বয় পাওয়া যায়। সাধারণ পাঠকদের জন্য কঠিন প্রযুক্তিগত বিষয় অনুবাদ করা কিংবা একাধিক প্রকল্প পরিচালনা, সকল কাজেই তিনি কৌতূহলী ও সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে সঠিকভাবে কাজ করে চলেছেন।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

বাংলা ক্যালেন্ডার

- বিজ্ঞাপন -spot_img

Most Popular

Recent Comments