স্বাধীনতা প্রাপ্তি প্রাণ বায়ুর শ্বাস গ্রহণের মতো। পরাধীনতার গ্লানি যে সয়েছে, স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ সে একমাত্র বুঝতে পারে। প্রত্যেকে,ব্যবহারিক জীবনে এই গ্লানিমুক্ত প্রশ্বাসটুকু নিতে পারে, যদি তার পায়ের-তলায় দাঁড়াবার শক্ত মাটি থাকে, মাথার ওপরে থাকে এক আকাশ ভরা মুক্ত নীল নির্মলতা। বেঁচে থাকার জন্য যখন এই অপরিহার্য সত্য সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য ,তবে অন্যের ছড়ি ঘোড়ানো সে সহ্য করবে কেন?
আজকের স্বাধীনতার যে সুসময় আমরা আছি তার রক্ত বারুদ মৃত্যুতে ভরা অতীত ও মুক্তি একদিনে আসেনি। আমরা সবাই জানি যে এর পেছনের সংগ্রাম যন্ত্রনার কথা। সেখানে ভারত-বর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনে মাস্টারদা সূর্যসেন, বিনয় বাদল দিনেশ, ক্ষুদিরাম এমন আরো অনেক বীর বঙ্গের সন্তানগণ উচ্চতর আদর্শ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু এই সংগ্রামে বাংলার নারী, যে আজ থেকে প্রায় একশো দেড়শ বছর আগে যখন চার দেওয়ালের মধ্যে থাকা শিক্ষাবিহীন,বাল্যবিবাহিতা বা অবগুন্ঠনবতী ছিল, সে তবে তার চিত্ত এতো দৃঢ়তার সাথে প্রকাশ করল কি করে? আশ্চর্যের বিষয়!
স্মৃতির ছেঁড়া পাতা থেকে :-
“গোল্ডি সেটা নিয়ে ছিঁড়ে দলা পাকিয়ে ছেঁড়া কাগজের টুকরিতে ফেলে দিল। অমনি যেন বারুদে আগুন পড়লো। আহত ক্ষিপ্র বাঘের মতো লাফিয়ে উঠে ননীবালা এক চড় বসিয়ে দিলেন গোল্ডির মুখে। দ্বিতীয় চড় মারবার আগেই অন্য সি আই ডি কর্মচারীরা তাঁর উদ্যত হাত চেপে ধরে রাখলো।…. কি অসীম শক্তি ফেটে বেরিয়ে আসছে তখন ননীবালা দেবীর ভেতর থেকে। ‘ছিঁড়ে ফেলবে তো আমায় দরখাস্ত লিখতে বলেছিলে কোনো ? আমাদের দেশের মানুষের কোনো মানসন্মান থাকতে নেই’ ?”

গোল্ডি ছিল তৎকালীন ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো অফিসার(প্রেসিডেন্সি জেল)। এই দেবী তখন সেই জেলেই বন্দী কারণ বিপ্লবী রামচন্দ্র মজুমদারের স্ত্রী সেজে গিয়েছিলেন লুকোনো পিস্তলের খবর আনতে। আর তা প্রকাশ্যে আসতেই জেলবন্দী হতে হয় তাকে। তৎকালীন সমাজের এক বিধবা মহিলা মাথায় সিঁদুর দিয়ে গিয়েছিলেন,সামাজিক রীতি নীতি কে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে শুধু লক্ষ্য পূরণের জন্য। চমক এখানেই। এরকম আরো এক বিপ্লবী সাহসিনী,যার নাম দুকড়িবালা দেবী। কোলের শিশুকে ফেলে রেখে এই গ্রাম্য গৃহবধূর গ্রেপ্তার হতে হয়েছিল পিস্তল লুকোবার জন্য,স্বাধীনতা আনয়নে যারা তৎপর তাদের আশ্রয়দাত্রী হিসাবে। এক গ্রামের গৃহবধূ প্রয়োজন মনে করেনি,সমাজ কি বলবে? কোলের শিশুটির কি হবে ?

প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার এমন এক নারী মুক্তি যোদ্ধা যিনি ধরা পড়বার আগেই আত্মঘাতী হয়েছিলেন পটাসিয়াম সায়ানাইড দ্বারা। পিতা-মাতার শখের রানী (ডাকনাম),মাস্টারদা সূর্য্য সেন এর চট্টগ্রামে অস্ত্রাগার লুন্ঠনে সহযোগিতা করেছিলেন বলে পুলিশের নজরে আসেন। পড়াশোনায় অত্যন্ত কৃতী ছাত্রী নিজেকে ভালোবাসার আগে দেশ কে ভালোবেসে ফেলেছিলেন বলে স্বেচ্ছায় মৃত্যু বরণ করেন।
সরোজিনী নাইডু ওরফে সরোজিনী চট্টোপাধ্যায় বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন এ নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, হয়ে উঠলেন জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম মহিলা সভাপতি এবং প্রথম রাজ্যপাল (উত্তরপ্রদেশ),কারাদণ্ড থামাতে পারেনি তাঁর অদমনীয় মানসিক শক্তিকে।
কনকলতা বড়ুয়া ১৯৪২ সালে ব্রিটিশ পতাকার পরিবর্তে জাতীয় পতাকা উত্তোলোনের জন্য পুলিশের গুলিতে মৃত্যু বরণ করেন। অত্যাচারী ব্রিটিশ গভর্নর স্টিভেন্সকে সামনে দাঁড়িয়ে তার বুক লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন। মাতঙ্গিনী হাজরা ১৯৪২ সালে অগাস্ট আন্দোলনে মেদিনীপুরে জাতীয় পতাকা হাতে পুলিশের গুলিতে শহীদ হয়েছিলেন। বীনা দাস, নেতাজির সাথে যার পরিচয় ছিল,তিনিও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে বাংলার গভর্নর স্ট্যানলি জ্যাকসন কে গুলিতে বিদ্ধ করেন বলে নয় বছর কারাগারে সাজা প্রাপ্ত হলেন। কামিনী রায় সরলা দেবী শান্তি ঘোষ, সুনীতি চৌধুরী আরো কত নারীশক্তি এই বিপ্লবের আদর্শে পরাক্রান্তা ছিলেন।
যে জাতির ইতিহাস এতো শক্ত বুননে তৈরী তাকে প্রশ্ন করবে কে ? কার সাহস থাকবে বলার, এই ক্লীবতা এই মেরুদন্ডহীন সমাজ আমার নয় ? প্রজন্ম যেন স্থবির না হয় –
কাব্যিক ভাষায় –
অহঃ স্বাধীনতা!
অজ্ঞ তোমায় সুলভ ভাবিয়া
জ্ঞানহীন অহমিকার বাক্য চিবাইয়া
স্বাধীন ভূমিতে নিদ্রা যাইতে
অবোধের যে কি সুখ !
স্বদেশপ্রেমীক তোমরা তাহা বুঝিবে কেমনে অবুঝ ?
এই যে এত কষ্টলব্ধ স্বাধীনতা,এর মূল্যায়ন বোঝা দরকার। নারীশক্তির তাই জাগৃতি। বার বার মনে প্রশ্ন উঠে আসে কিসের এই প্রত্যয়? কোথা থেকে আসে এতো সাহস? কেনো সুখ কেন্দ্রিক চলমান স্রোতে গা ভাসিয়ে না চলার এতো আকাঙ্খা? কেন এত বিপদ,এত প্রতিকূলতা জেনেও তাকে বরণ করার প্রবৃত্তি? এতো শক্ত মেরুদণ্ডের ইতিবৃত্য কি? শুধুই আবেগ? নাকি অন্যকিছু? কি মনস্তত্ব কাজ করে এর পেছনে ?
- যখন লক্ষ্য স্থির ও একক
- যখন আবেগ এবং ন্যায় / হৃদয় আর মস্তিষ্ক এক কথা বলে
- যখন পরবর্তী কি হতে পারে তা না ভেবে শুধু বর্তমানে স্থায়ী থাকা যায়
হতে পারে এমন অনেক কারণ। সে সময় আর এ সময় নারীদের অবস্থানগত দিক থেকে যে হাজার সময়ের ব্যবধান ঘটে গেছে। আজ যে নারী স্বাধীনতা,নারী সম্মান,সামাজিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক তাঁর সম্মান লাভ, তার ভিত্তি ভূমির অতীত আসলে অনেক গভীর সে কথা অনস্বীকার্য। এই অতীত লব্ধ অভিজ্ঞতায় বলীয়ান নারীশক্তি যেন তেজোদীপ্ত উজ্জ্বল বহ্নি। ক্রমে এক আগুনের ছোঁয়া থেকে হাজার হাজার মোমবাতি জ্বলে ওঠে। তাঁর শক্তিতে তার সন্তান তার পরিবেশ হয়ে ওঠে বলশালী। নির্ভিক হৃদয়বান তেজস্বী জাতকে উন্নত হয় দেশ । ক্রমে জাতি হয়ে ওঠে মাতৃ-ভক্ত শক্তির প্রতীক। মা এবং মাতৃভূমি হয়ে ওঠে নন্দন কানন-সে কথা ইতিহাস প্রমান সাপেক্ষ্য।
তথ্যসূত্র ➖




