Homeইত্যাদিজামাই আদরের দিন না কি লোকঐতিহ্যের উৎসব? জামাই ষষ্ঠীর অজানা ইতিহাস

জামাই আদরের দিন না কি লোকঐতিহ্যের উৎসব? জামাই ষষ্ঠীর অজানা ইতিহাস

জামাই ষষ্ঠীর ইতিহাস ও উৎপত্তি

জামাই ষষ্ঠীর শিকড় প্রাচীন বাংলার লোকধর্ম ও কৃষিনির্ভর সমাজে। মূলত সন্তানদের মঙ্গল কামনায় পালিত ষষ্ঠী ব্রত থেকেই এই উৎসবের উৎপত্তি। ষষ্ঠী দেবীকে সন্তানরক্ষা ও বংশবৃদ্ধির অধিষ্ঠাত্রী দেবী হিসেবে মানা হয়। প্রাচীনকালে মেয়ের সুখী দাম্পত্য জীবন ও সন্তানের কল্যাণ কামনায় শ্বশুরবাড়ির তরফে জামাইকে সম্মান জানানো হতো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই রীতিই আলাদা সামাজিক উৎসবে পরিণত হয়।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলার যৌথ পরিবারব্যবস্থা এবং আত্মীয়তার সম্পর্ককে দৃঢ় করার প্রথার মধ্যে জামাই ষষ্ঠী বিশেষ গুরুত্ব পায়। ধীরে ধীরে এটি বাঙালির অন্যতম জনপ্রিয় পারিবারিক উৎসবে পরিণত হয়।

কোথা থেকে এল ‘জামাই ষষ্ঠী’ নাম?

জামাইষষ্ঠী মূলত লোকায়ত প্রথা। ষষ্ঠীদেবীর পার্বণ থেকেই এই প্রথার উদ্ভব। জামাতা বা  ‘জামাই’ এবং ‘ষষ্ঠী’—এই দুই শব্দের সংমিশ্রণেই নাম ‘জামাই ষষ্ঠী’। ষষ্ঠী তিথিতে জামাইকে নিমন্ত্রণ করে আপ্যায়ন করার রীতি থেকেই এই নামের প্রচলন। তবে উৎসবটির মূল ধর্মীয় পরিচয় ছিল ‘ষষ্ঠী ব্রত’। পরে সামাজিক গুরুত্ব বাড়তে থাকায় ‘জামাই ষষ্ঠী’ নামটিই বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

জামাই ষষ্ঠীর আরেক নাম ‘অরণ্যষষ্ঠী’ কেন?

বাঙালির ১২ মাসের ১৩ পার্বণের অন্যতম হল জামাই ষষ্ঠী। এই বিশেষ তিথিটি মূলত শাশুড়ি মা ও জামাইয়ের মধ্যে পালনীয় একটি বিশেষ তিথি। পঞ্জিকায় জামাই ষষ্ঠী অরণ্য ষষ্ঠী নামেও পরিচিত। অনেক জায়গায় জামাই ষষ্ঠীকে ‘অরণ্যষষ্ঠী’ বলা হয়। এর কারণ ষষ্ঠী দেবীর সঙ্গে বৃক্ষ, বনভূমি ও প্রকৃতির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। প্রাচীনকালে গ্রামবাংলার মহিলারা বট, অশ্বত্থ বা অন্যান্য বৃক্ষতলায় গিয়ে ষষ্ঠী ব্রত পালন করতেন। সন্তান ও পরিবারের মঙ্গল কামনায় বনদেবীরূপে ষষ্ঠীর আরাধনা করা হতো। সেই থেকেই ‘অরণ্যষষ্ঠী’ নামের প্রচলন। 

ষষ্ঠী দেবী ও এই উৎসবের ধর্মীয় তাৎপর্য

হিন্দু লোকবিশ্বাসে ষষ্ঠী দেবী হলেন সন্তানদের রক্ষাকর্ত্রী। তাঁর বাহন কালো বিড়াল। বাংলার মঙ্গলকাব্য, ব্রতকথা ও লোককাহিনিতে ষষ্ঠী দেবীর উল্লেখ পাওয়া যায়। বিশ্বাস করা হয়, সন্তানদের দীর্ঘায়ু, সুস্বাস্থ্য এবং পারিবারিক সুখ-সমৃদ্ধির জন্য তাঁর পূজা করা হয়। জামাই ষষ্ঠীর দিন মায়েরা দেবীর কাছে কন্যার সংসার ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কল্যাণ কামনা করেন। সেই কারণে জামাইকে সম্মান জানানোও এই ধর্মীয় বিশ্বাসেরই একটি সামাজিক প্রকাশ।

বাংলার সমাজে জামাই ষষ্ঠীর ঐতিহ্য

বাংলা সমাজে জামাই শুধু একজন পরিবারের সদস্য নন, তিনি কন্যার সুখ-দুঃখের সঙ্গী। তাই তাঁকে সম্মান জানানো মানে মেয়ের সংসারকে সম্মান জানানো। বহু পরিবারে জামাইকে নতুন পোশাক, ফল, মিষ্টি ও উপহার দেওয়ার রীতি রয়েছে। একসময় এই উৎসব আত্মীয়তার বন্ধন দৃঢ় করার অন্যতম মাধ্যম ছিল। দূরে বিয়ে হওয়া মেয়েরা এই উপলক্ষে বাপের বাড়িতে আসতেন। ফলে উৎসবটি পারিবারিক পুনর্মিলনেরও একটি উপলক্ষ হয়ে উঠত।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

কেন পালিত হয় জামাই ষষ্ঠী? উৎসবের মূল উদ্দেশ্য

জামাইষষ্ঠী মূলত লোকায়ত প্রথা। ষষ্ঠীদেবীর পার্বণ থেকেই এই প্রথার উদ্ভব। জামাই ষষ্ঠীর মূল উদ্দেশ্য শুধু আপ্যায়ন নয়। এর মধ্যে রয়েছে— কন্যার সুখী দাম্পত্য জীবনের প্রার্থনা। জামাইয়ের দীর্ঘায়ু ও সুস্বাস্থ্যের কামনা। দুই পরিবারের সম্পর্ককে আরও মজবুত করা। পারিবারিক বন্ধন ও সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখা। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মঙ্গল কামনা। 

গ্রামবাংলা বনাম শহুরে জামাই ষষ্ঠী

গ্রামবাংলায় এখনও অনেক জায়গায় ষষ্ঠী দেবীর পূজা, ব্রতকথা পাঠ এবং লোকাচার মেনে উৎসব পালিত হয়। গাছের ডাল, পাতা, ফল ও ঐতিহ্যবাহী উপকরণ ব্যবহার করে পূজার আয়োজন দেখা যায়। অন্যদিকে শহুরে জীবনে ধর্মীয় আচার অপেক্ষা সামাজিক ও পারিবারিক অংশটাই বেশি গুরুত্ব পায়। এখন অনেক পরিবারে রেস্তোরাঁয় খাওয়াদাওয়া, অনলাইন উপহার পাঠানো কিংবা ছোট পারিবারিক জমায়েতের মাধ্যমে জামাই ষষ্ঠী উদযাপন করা হয়।

জামাই ষষ্ঠীর বিশেষ আচার ও রীতি-নীতি

শাস্ত্র মতে এই পুজোয় কাঁঠালপাতার ওপর ৫, ৭ বা ৯ রকমের ফল কেটে সাজিয়ে রাখা হয়। জ্যৈষ্ঠ মাসে আম, লিচু, কাঁঠালের রমরমা। তাই এই মরশুমি ফলগুলিও থাকে পাতে। সঙ্গে থাকে ১০৮ আঁটি দূর্বা। এই দিনে ষষ্ঠী পুজোর জন্য শ্বাশুড়িরা ভোরবেলা স্নান সেরে ঘটে জল ভরে নেন। তারপর ঘটের ওপর আম পাতা রাখেন। সঙ্গে থাকে তালপাতার পাখা। একটি সুতো হলুদে চুবিয়ে তাতে ফুল ও বেলপাতা দিয়ে গিট বেঁধে ডোর তৈরি করা হয়। একে ষষ্ঠীর ডোর বলা হয়ে থাকে।

এই দিনে সাধারণত শাশুড়ি জামাইয়ের কপালে চন্দনের ফোঁটা দেন। মঙ্গলসূত্র বা হলুদ সুতো বেঁধে দীর্ঘায়ু কামনা করেন। এরপর ফল, মিষ্টি ও নানা উপকরণ দিয়ে আশীর্বাদ করা হয়।

খাবারের তালিকায় থাকে ইলিশ বা বড় মাছ, চিংড়ি, পোলাও, মাংস, বিভিন্ন ভাজা। সেইসঙ্গে আম, লিচু, কাঁঠাল- সহ মৌসুমি ফল। এছাড়াও থাকে পায়েস ও মিষ্টান্ন। শাশুড়ি মায়ের হাতেও নতুন শাড়ি তুলে দেন জামাই বাবাজি। জামাইয়ের সঙ্গে মেয়ে ও নাতি-নাতনিকেও নতুন জামাকাপড় দেওয়া ও ভুরিভোজ করানো হয় এ দিন।বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতির এক অনন্য প্রদর্শনীও বলা চলে এই দিনটিকে।

জামাই ষষ্ঠী ও বাংলার অর্থনীতি

জামাই ষষ্ঠী এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ মৌসুমি বাজারও তৈরি করেছে। এই সময় মাছের বাজারে চাহিদা ও দাম বাড়ে। মিষ্টির দোকানে বিক্রি বৃদ্ধি পায়। পোশাক ও উপহারের ব্যবসায় বিশেষ ছাড় ও অফার দেখা যায়। ফল বিক্রেতাদের ব্যবসা বাড়ে। রেস্তোরাঁগুলিতে বিশেষ ‘জামাই ষষ্ঠী মেনু’ চালু হয়। অর্থাৎ একটি পারিবারিক উৎসব স্থানীয় অর্থনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে।Raise Your Concern About this Content

সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে বদলে যাওয়া জামাই ষষ্ঠী

একসময় জামাই ষষ্ঠীর স্মৃতি সীমাবদ্ধ থাকত পারিবারিক অ্যালবামে। এখন ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের যুগে উৎসবের রূপ অনেকটাই বদলে গেছে। জামাইকে নিয়ে মজার মিম, ছবি, ভিডিও, রিল—সবই এখন উৎসবের অংশ। অনেক পরিবার দূরে থাকলেও ভিডিও কলে শুভেচ্ছা বিনিময় করে। ফলে ঐতিহ্য ও প্রযুক্তির এক নতুন মেলবন্ধন তৈরি হয়েছে।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

আধুনিক পরিবারে জামাই ষষ্ঠীর নতুন ব্যাখ্যা

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উৎসবটির ব্যাখ্যাও বদলাচ্ছে। অনেকেই মনে করেন, শুধু জামাই নয়, পরিবারের সব সদস্যের প্রতি সমান সম্মান প্রদর্শনের সংস্কৃতি গড়ে তোলা উচিত।

তাই কোথাও কোথাও এখন ‘মেয়ে-জামাই’ কিংবা সমগ্র পরিবারের মিলনোৎসব হিসেবেও দিনটি পালিত হচ্ছে। উৎসবের মূল বার্তা হয়ে উঠছে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

বর্তমান প্রজন্মের কাছে জামাই ষষ্ঠীর প্রাসঙ্গিকতা

ব্যস্ত নগরজীবন ও ছোট পরিবারের যুগেও জামাই ষষ্ঠী তার গুরুত্ব হারায়নি। কারণ উৎসবটি আসলে সম্পর্ক উদযাপনের দিন। পরিবারের সদস্যদের একত্রিত হওয়ার, হাসি-আড্ডায় মেতে ওঠার এবং আত্মীয়তার বন্ধনকে নতুন করে ঝালিয়ে নেওয়ার সুযোগ দেয় এই দিন। আধুনিকতার ছোঁয়ায় রীতিনীতি বদলালেও উৎসবের মূল সুর একই রয়ে গেছে—পরিবার, সম্পর্ক এবং শুভকামনা।

পরিশেষে বলা যায়, বাঙালির নানা পার্বণের মধ্যে একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ উৎসব জামাইষষ্ঠী। এটি, বাঙালির ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতিক লৌকিক আচার। জামাই ষষ্ঠী শুধু মাছ-মাংস আর ভুরিভোজের উৎসব নয় এটি বাংলার সামাজিক ইতিহাস, লোকবিশ্বাস, পারিবারিক সংস্কৃতি ও আবেগের এক জীবন্ত দলিল।  

 অরণ্যষষ্ঠীর ধর্মীয় আচার থেকে শুরু করে আজকের সোশ্যাল মিডিয়া যুগ—সব পরিবর্তনের মধ্যেও এই উৎসব বাঙালির পারিবারিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে রয়েছে।

তথ্যসূত্র

১. ষষ্ঠী দেবীর পরিচয়, উৎপত্তি ও ধর্মীয় গুরুত্ব
২. জামাই ষষ্ঠীর উৎপত্তি, সামাজিক প্রেক্ষাপট ও প্রচলিত কাহিনি
৩. অরণ্যষষ্ঠীর তাৎপর্য ।  কেন অরণ্যষষ্ঠী বলা হয়, তার ধর্মীয় ও লোকাচারগত ব্যাখ্যা
৪. বাংলায় পালিত ১২টি ষষ্ঠী ব্রত
৫. ষষ্ঠী দেবী সম্পর্কিত ঐতিহাসিক ও লোকবিশ্বাসভিত্তিক তথ্য
৬. বাংলা লোকসংস্কৃতি বিষয়ক বিভিন্ন গবেষণা গ্রন্থ, ব্রতকথা সংকলন এবং পশ্চিমবঙ্গের আঞ্চলিক লোকঐতিহ্য সম্পর্কিত প্রকাশনা।

সৃজিতা মল্লিক
সৃজিতা মল্লিক
ডিজিটাল মিডিয়ার নিউজ ডেস্কে কেটে গিয়েছে ৫ বছর। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণমাধ্যম নিয়ে পড়ার সময় থেকেই সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি হয় সৃজিতার। খবর ভালোবাসা তাই বাছবিচার ছাড়াই দেশ, দুনিয়া, রাজ্যের খবরের সঙ্গে সঙ্গে খেলা, বিনোদন দুনিয়ার ময়দানেও রয়েছে আনাগোনা। উৎসাহ বাজারের ওঠাপড়া, রাজনীতির বিষয়েও। খাদ্যরসিক। ছুটি পেলেই সপরিবার ভ্রমণে প্রাণের আরাম, মনের প্রশান্তি।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

বাংলা ক্যালেন্ডার

- বিজ্ঞাপন -spot_img

Most Popular

Recent Comments