কারখানার চিমনিতে ধোঁয়া উঠছে। কোথাও লেদ মেশিনের শব্দ, কোথাও লোহার সঙ্গে লোহার সংঘর্ষ, কোথাও আবার সারি সারি যন্ত্রপাতি। বছরের অন্য দিনগুলিতে এই শব্দই শিল্পাঞ্চলের পরিচয়। কিন্তু একটি দিন আসে, যখন সেই শব্দ কিছুটা থেমে যায়। যন্ত্রের গায়ে ওঠে গাঁদাফুলের মালা, পরিষ্কার করা হয় হাতুড়ি-রেঞ্চ-লেদ মেশিন, আর কর্মব্যস্ত কারখানার মেঝেতেই বসে পুজোর আসর। সেই দিন বিশ্বকর্মা পুজো।
বাংলার কাছে বিশ্বকর্মা পুজো নিছক একটি ধর্মীয় উৎসব নয়। এটি আসলে শ্রম, কারিগরি দক্ষতা এবং শিল্পজীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক সামাজিক উৎসব। কেন্দ্রীয় পর্যটন মন্ত্রকের ‘উৎসব’ পোর্টালেও বিশ্বকর্মাকে ঐশ্বরিক স্থপতি ও প্রকৌশলী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কারিগর, তাঁতি, শিল্পকর্মী থেকে ইঞ্জিনিয়ার— নানা পেশার মানুষ নিজেদের কাজের সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতির পুজো করেন এই দিনে।
যন্ত্র যখন দেবতা
বিশ্বকর্মা পুজোর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য সম্ভবত এখানেই— এই পুজোয় দেবতার সঙ্গে সমান গুরুত্ব পায় মানুষের কাজের উপকরণ। কারখানার মেশিন, গ্যারাজের গাড়ি, ছাপাখানার যন্ত্র, লোহার কারখানার সরঞ্জাম কিংবা কারিগরের হাতিয়ার— সবকিছুকেই সাজিয়ে-গুছিয়ে পুজো করা হয়।

বাংলার শিল্পাঞ্চলে এই উৎসবের আলাদা আবহ রয়েছে। কলকাতা, হাওড়া, হুগলি থেকে দুর্গাপুর, আসানসোল, হলদিয়া— শিল্প ও কারিগরি পেশার সঙ্গে যুক্ত নানা এলাকায় বিশ্বকর্মা পুজো বহুদিন ধরেই কর্মজীবনের ক্যালেন্ডারের গুরুত্বপূর্ণ দিন। পুরনো দিনের ছবিতে যেমন কারখানার শ্রমিকদের সমবেত পুজোর দৃশ্য দেখা যায়, তেমনই আজকের দিনে ছোট গ্যারাজ বা ওয়ার্কশপেও একই সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা রয়েছে। ২০১৬ সালের একটি প্রতিবেদনে পশ্চিমবঙ্গের কারখানা, গুদাম, অটোমোবাইলের দোকান থেকে বাস-অটো স্ট্যান্ড পর্যন্ত বিশ্বকর্মা পুজোর আয়োজনের উল্লেখ পাওয়া যায়।
এই উৎসবের সঙ্গে আবার জুড়ে যায় ঘুড়ি ওড়ানোর বাঙালি সংস্কৃতিও। ফলে বিশ্বকর্মা পুজো একদিকে যেমন শ্রম ও শিল্পের উৎসব, অন্যদিকে তেমনই শরৎ আসার আগমনী বার্তা।
যে বাংলায় শিল্প ছিল পরিচয়ের অংশ
বিশ্বকর্মা পুজোর সঙ্গে বাংলার সম্পর্ক বুঝতে গেলে ফিরে তাকাতে হয় বাংলার শিল্প-ইতিহাসের দিকে।
ঔপনিবেশিক সময় থেকেই বাংলায় শিল্প ও বাণিজ্যের নানা ক্ষেত্র গড়ে উঠেছিল। সরকারি শিল্প দফতরের শিল্প-ঐতিহ্যের নথিতে তুলো ও রেশম বস্ত্র, লবণ, জাহাজ নির্মাণ ও নীলচাষের মতো শিল্পের উল্লেখ রয়েছে। পরে রেলপথ ও পরিকাঠামোর প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে ইঞ্জিনিয়ারিং ও ভারী শিল্পের পরিকাঠামো। জেসপ, বার্ন স্ট্যান্ডার্ড, ব্রেথওয়েট, ব্রিটানিয়া ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ব্রিজ অ্যান্ড রুফের মতো সংস্থা সেই শিল্প-ঐতিহ্যের অংশ।
হাওড়ার শিল্পাঞ্চল একসময় ছিল এই শিল্পজগতের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। সরকারি নথি অনুযায়ী, বিংশ শতকের মাঝামাঝি হাওড়া একটি বড় ফাউন্ড্রি উৎপাদনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল এবং তার শিল্পসমৃদ্ধির কারণে অঞ্চলটি ‘এশিয়ার শেফিল্ড’ নামেও পরিচিতি পেয়েছিল।

অন্যদিকে বার্নপুরে ১৯১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ইন্ডিয়ান আয়রন অ্যান্ড স্টিল কোম্পানির কারখানা, যা পরবর্তীকালে স্টিল অথরিটি অফ ইন্ডিয়া লিমিটেডের অংশ হয়। দুর্গাপুরেও গড়ে ওঠে ইস্পাতকেন্দ্রিক শিল্পভিত্তি।
সেই বাংলায় শিল্প মানে শুধু কারখানা ছিল না। শিল্প মানে ছিল একটি গোটা জনপদ— শ্রমিকের পরিবার, বাজার, পরিবহণ, স্কুল, হাসপাতাল, আবাসন এবং একটি স্বতন্ত্র সামাজিক জীবন। বিশ্বকর্মা পুজো সেই জীবনেরই এক উৎসবমুখর প্রকাশ হয়ে উঠেছিল।
তারপর বদলে গেল শিল্পের ছবি
তবে বাংলার শিল্পগাথা শুধুই সাফল্যের গল্প নয়। স্বাধীনতার পর কয়েক দশকে রাজ্যের শিল্পক্ষেত্রে নানা সমস্যা তৈরি হয়। গবেষণায় বাংলার দীর্ঘমেয়াদি শিল্প-অবক্ষয়ের পেছনে অন্যান্য রাজ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা, কেন্দ্র-রাজ্য আর্থিক সম্পর্ক, শ্রম-সংক্রান্ত সংঘাত এবং বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশের ঘাটতির মতো একাধিক কারণের কথা উঠে এসেছে।
ফলে একসময় যে কারখানার সাইরেন শহরের দৈনন্দিন জীবনের অংশ ছিল, বহু জায়গায় সেই শব্দ ক্রমশ ক্ষীণ হয়েছে। একের পর এক পুরনো কারখানা বন্ধ হয়েছে বা উৎপাদন কমেছে। শিল্পের সঙ্গে জড়িত বহু পরিবারের জীবনেও এসেছে অনিশ্চয়তা।
আর শিল্পের সেই পরিবর্তনের সঙ্গে বদলেছে বিশ্বকর্মা পুজোর চরিত্রও। বড় কারখানার বিশাল আয়োজনের পাশাপাশি ছোট ও মাঝারি ওয়ার্কশপ, গ্যারাজ, পরিবহণ ব্যবসা এবং কারিগরি পেশার মানুষের উদ্যোগে উৎসবটি টিকে রয়েছে।
আজকের বাংলা—পুরনো গৌরব কি পুরোপুরি হারিয়ে গিয়েছে?
উত্তরটা সরল ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ নয়।
আজকের পশ্চিমবঙ্গ আর সেই পুরনো শিল্পবাংলা নয়। কিন্তু শিল্পের সম্ভাবনা একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। বরং তার চরিত্র বদলেছে। বড় ভারী শিল্পের পাশাপাশি ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, চামড়া, বস্ত্র, ইঞ্জিনিয়ারিং, তথ্যপ্রযুক্তি, লজিস্টিকস এবং পরিষেবাভিত্তিক শিল্পও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
২০২৬-২৭ সালের রাজ্য বাজেটের তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে নথিভুক্ত ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পের সংখ্যা প্রায় ৪৮.৮০ লক্ষে পৌঁছেছে। রাজ্য সরকারের দাবি, দেশের মোট উৎপাদনমুখী এমএসএমইগুলির ১৬.০২ শতাংশের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের সংযোগ রয়েছে।
রাজ্যের শিল্প পরিকাঠামোতেও নতুন উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। দুর্গাপুর-আসানসোল শিল্পাঞ্চল এখনও ইস্পাত ও ভারী শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। হলদিয়ায় রাসায়নিক ও পেট্রোকেমিক্যালভিত্তিক শিল্পের দীর্ঘদিনের উপস্থিতি রয়েছে।
এখন আবার নতুন শিল্পপার্ক, শিল্পকেন্দ্র এবং আধুনিক উৎপাদন পরিকাঠামোর দিকে জোর দেওয়া হচ্ছে। ২০২৬ সালে নদিয়ার ধুবুলিয়া ও পশ্চিম বর্ধমানের হীরাপুরে ‘প্লাগ অ্যান্ড প্লে’ শিল্পপার্ক তৈরির উদ্যোগের খবর সামনে এসেছে। পাশাপাশি প্রতিরক্ষা উৎপাদন ও জাহাজ নির্মাণের ক্ষেত্রেও পশ্চিমবঙ্গে নতুন বিনিয়োগ ও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
অর্থাৎ আজকের শিল্পবাংলার ছবি একেবারে শূন্য নয়। কিন্তু প্রশ্নটা অন্য জায়গায়— এই নতুন শিল্প কি সেই পুরনো শিল্প-পরিবেশের মতো বৃহৎ কর্মসংস্থান ও সামাজিক পরিকাঠামো তৈরি করতে পারছে?Raise Your Concern About this Content
অতীতের ‘সোনার যুগ’ বনাম আজ
অতীতের শিল্পবাংলার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল বড় শিল্পের ঘনত্ব এবং তার সঙ্গে তৈরি হওয়া শ্রমনির্ভর অর্থনীতি। হাওড়ার ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প, হুগলির জুট মিল, আসানসোল-দুর্গাপুরের ইস্পাত ও কয়লাভিত্তিক শিল্প, হলদিয়ার পেট্রোকেমিক্যাল— প্রতিটি ক্ষেত্রই নির্দিষ্ট অঞ্চলকে শিল্পনির্ভর জনপদে পরিণত করেছিল।
আজকের ছবিতে শিল্প অনেক বেশি বৈচিত্র্যময়। এমএসএমই-র বিস্তার হয়েছে, প্রযুক্তি ও পরিষেবা গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে, শিল্পপার্ক ও লজিস্টিকসের গুরুত্ব বেড়েছে। ফলে ‘কারখানা’ বলতে এখন শুধু বিশাল চিমনি আর হাজার হাজার শ্রমিকের উৎপাদনকেন্দ্র বোঝায় না।
তবু অতীতের সঙ্গে তুলনা করলে একটি ফারাক স্পষ্ট— পুরনো শিল্পবাংলার যে সাংস্কৃতিক পরিচয় ছিল, সেটি অনেকটাই তৈরি হয়েছিল শ্রমিক, কারখানা এবং শিল্পাঞ্চলকে ঘিরে। আজকের অর্থনীতিতে সেই জায়গা অনেক বেশি বিচ্ছিন্ন ও বহুমাত্রিক।

সেই কারণেই বিশ্বকর্মা পুজো আজও যেন একটি আয়না। পুজোর দিন মেশিনে মালা পরানোর মুহূর্তে শুধু দেবতার আরাধনা হয় না, ফিরে আসে বাংলার শিল্প-স্মৃতিও। মনে পড়ে হাওড়ার কারখানার শব্দ, দুর্গাপুরের ইস্পাতনগরী, বার্নপুরের শ্রমিকজীবন, হলদিয়ার শিল্পবন্দর— আর পাশাপাশি চোখে পড়ে নতুন শিল্পপার্ক, ক্ষুদ্র উদ্যোগ আর বদলে যাওয়া কর্মসংস্থানের মানচিত্র।
বিশ্বকর্মা আসলে তাই শুধু ‘যন্ত্রের দেবতা’ নন। বাংলার কাছে তিনি শ্রমের মর্যাদা, দক্ষতার সম্মান এবং উৎপাদনের প্রতীক। অতীতের শিল্পগৌরবকে শুধু স্মৃতিতে আটকে না রেখে যদি আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ, স্থায়ী বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত করা যায়, তবেই হয়তো বিশ্বকর্মা পুজোর সেই পুরনো অর্থ নতুন সময়েও ফিরে আসবে।
কারখানার মেশিন আবার গর্জে উঠবে— এই প্রত্যাশাই হয়তো বিশ্বকর্মা পুজোর সবচেয়ে বড় প্রার্থনা। পুজোর ধূপের গন্ধ মিলিয়ে যাওয়ার পরেও যেন বাংলার শিল্পভূমিতে কাজের শব্দটা থেকে যায়। কারণ একটি রাজ্যের শিল্প কেবল তার অর্থনীতিকে বদলায় না, বদলে দেয় তার মানুষের স্বপ্ন, শহরের চরিত্র এবং ভবিষ্যতের গল্পও।
তথ্যসূত্র
১. বিশ্বকর্মা পুজো বাংলার রীতিনীতি
২. বিশ্বকর্মা পুজো পালন
৩. বিশ্বকর্মা পুজোর তাৎপর্য
৪. পশ্চিমবঙ্গ ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে তথ্য



