পাহাড়কে দেখলে এক পলকে যতটা স্থির মনে হয় বাস্তব তা উল্টো। ভিতরে প্রতিনিয়ত চলে ভাঙাগড়া। সেই পাহাড়ের উপর যখন মানুষের তৈরি রাস্তা, বহুতল হোটেল, পার্কিং লট, পর্যটনকেন্দ্র এবং ক্রমবর্ধমান জনসমাগমের চাপ যুক্ত হয়, তখন প্রকৃতির স্বাভাবিক পরিবর্তন অনেক ক্ষেত্রেই বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। তার উদাহরণ উত্তরাখণ্ড। ২০১৩ সালের কেদারনাথ বিপর্যয় থেকে জোশীমঠের ভূমিধস ও জমি বসে যাওয়া, আবার ২০২৫ সালের ধারালির ভয়াবহ ফ্ল্যাশ ফ্লাড—একটির পর একটি ঘটনা মনে করিয়ে দিয়েছে, হিমালয়ে বিপর্যয়ের কারণকে শুধু প্রকৃতিকে দোষারোপ করলে চলবে না। একাধিক বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানে অতিবৃষ্টির সঙ্গে মোরেন বা হিমবাহজাত আলগা পাথর-মাটির বিশাল প্রবাহের সম্ভাবনার কথা উঠে আসে। ধরালী, হর্ষিল, কিশ্তওয়াড় এবং কাঠুয়া— এই চার জায়গা অল্প সময়ের ব্যবধানে পর পর মেঘভাঙা বৃষ্টি এবং তার জেরে হড়পা বান নেমে আসে। আর এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে উত্তরাখণ্ড এবং জম্মু-কাশ্মীর। প্রশ্ন হল—পাহাড় কতটা পর্যটন বহন করতে পারে, কোথায় করতে পারে এবং কোন ধরনের পর্যটন করতে পারে? বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নিয়ে কি কি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে?
উত্তরাখণ্ড: দেবভূমি থেকে ‘ওভার-ট্যুরিজম’
উত্তরাখণ্ডের সঙ্গে পর্যটনকে আলাদা করা প্রায় অসম্ভব। ধর্মীয় পর্যটনের সঙ্গে শুরু করে গত কয়েক দশকে দ্রুত বেড়েছে অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজম, উইকএন্ড ট্যুরিজম, হোমস্টে, ট্রেকিং এবং পাহাড়ি রিসর্টের সংস্কৃতি।
এতে যেমন কর্মসংস্থান হয়েছে, ব্যবসা বেড়েছে সেই সঙ্গে পরিবহণ থেকে হোটেলের মালিককেরাও হয়েছেন উপকৃত । তাই পর্যটনকে উত্তরাখণ্ডের অর্থনীতি থেকে মুছে দেওয়া কখনই বাস্তবসম্মত যুক্তি নেই।
সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধিকেই পর্যটননীতির একমাত্র সাফল্য হিসেবে দেখা হয়। আর তাতেই ঘটে বিপদ । মা । মানুষ ভুলতে শুরু করে হিমালয় কোনও সমতলের মহানগর নয়। একই জায়গায় সীমাহীন গাড়ি, মানুষ, হোটেল, জল ব্যবহার এবং বর্জ্যের চাপ সে নিতে পারে না। উত্তরাখণ্ড নিয়ে বিভিন্ন গবেষণাতেও অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন, অপরিকল্পিত অবকাঠামো এবং বিপুল পর্যটকসমাগমকে পরিবেশগত স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

পাহাড়ের ভূগোলকে অস্বীকার
হিমালয় পৃথিবীর তুলনামূলক নবীন পর্বতমালাগুলির একটি। খাড়া ঢাল, আলগা শিলা, গভীর নদীখাত, ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল এবং বর্ষার তীব্র বৃষ্টিপাত হওয়ায় এখানে নির্মাণের নিয়ম সমতলের মতো হতে পারে না। নদীর প্রাকৃতিক বন্যাপ্রবাহ অঞ্চলে বাড়ি ওঠে, ঢাল কেটে বহুতল নির্মাণ হয় কিংবা রাস্তা চওড়া করার জন্য পাহাড়ের বড় অংশ কেটে ফেলা হয়।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে হিমাচল প্রদেশের পরিবেশগত পরিস্থিতি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টও উদ্বেগ প্রকাশ করে। তাদের পর্যবেক্ষণ, সেই দিন আর বেশি দূরে নেই, যে দিন দেশের মানচিত্র থেকে মুছে যাবে হিমালয় অঞ্চলের এই রাজ্য। আদালতের আরও পর্যবেক্ষণ, হিমাচলে দুর্যোগের জন্য শুধু প্রকৃতিকে দোষ দেওয়া ঠিক নয়। এই দুর্যোগের জন্য দায়ী মানুষ।
হিমালয় অঞ্চলের রাজ্যগুলিতে কেন এই ধরনের বিপর্যয় ঘটছে বার বার?
বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু এবং পশ্চিমি ঝঞ্ঝার জোড়া ধাক্কাতেই পাহাড়ি রাজ্যে এমন লাগাতার বৃষ্টি। পাহাড়ে অবশ্য প্রাকৃতিক বিপর্যয় নতুন নয়। আচমকা বন্যায় এক রাতে ভেসে গিয়েছে আস্ত জনপদ— এমন ঘটনা বহু বার ঘটেছে। কিন্তু গত কয়েক বছরে ঘন ঘন মেঘভাঙা বৃষ্টি, হড়পা বানের যে ঘটনা ঘটছে, তার নমুনা আগে বিশেষ দেখা যায়নি। বিশেষত গত দশ বছরে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের নিরিখে সংবাদ শিরোনামে উঠে আসা যেন নিয়ম করে ফেলেছে উত্তরাখণ্ড এবং পার্শ্ববর্তী হিমাচল প্রদেশ। এর মধ্যে ভয়ঙ্করতম অবশ্যই ২০১৩ সালের কেদারনাথের হড়পা বানের ঘটনা।
ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে , জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সর্বাপেক্ষা ক্ষতিগ্রস্ত হতে চলেছে ভারতের হিমালয়-লাগোয়া অঞ্চল এবং উপকূলবর্তী এলাকা। সেই পরিণতিই ক্রমে স্পষ্ট হচ্ছে। তার জলজ্যান্ত নমুনা দেখা যাচ্ছে উত্তরাখণ্ড, হিমাচলে ঘন ঘন হড়পা বান, ধস, মেঘভাঙা বৃষ্টির মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঘটনায়। তবে বিশেষজ্ঞদের অনেকেরই মত, হিমালয় অঞ্চলের রাজ্যগুলিতে ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য জলবায়ু পরিবর্তন যতখানি দায়ী, তার থেকেও বেশি দায়ী মানুষের কাজকর্ম। অনিয়ন্ত্রিত ভাবে এবং কোনও আইন না মেনে পাহাড়ের কোলে যথেচ্ছ ভাবে নির্মাণকাজ। এ ছাড়াও দেখা যাচ্ছে, পর্যটনের উন্নয়নের স্বার্থে ভূপ্রাকৃতিক গত ভাবে স্পর্শকাতর এলাকায় নানা ভাবে নির্মাণকাজ হচ্ছে। যার জেরে পাহাড়ের মাটি আলগা হয়ে যাচ্ছে। ফলে ঘন ঘন ধস নেমে আসছে। নদীর ঠিক ধার ঘেঁষেই গড়ে উঠেছে হোটেল, রাস্তা। চওড়া দেওয়াল তুলে পাহাড়ি নদীর স্বাভাবিক স্রোতকে ব্যাহত করে তাকে সঙ্কীর্ণতর করে দেওয়া হচ্ছে। ফলে অতিবৃষ্টিতে জল যখন বাড়ছে, তখন মানুষ-নির্ধারিত গণ্ডি ছাপিয়ে জল ভাসিয়ে দিচ্ছে আশপাশের এলাকা।
বর্তমানে পাহাড়ের জন্য কী কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?
ধস নামার আগেই সতর্কতা
উত্তরাখণ্ড থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশে Landslide Early Warning System (LEWS) তৈরি করা হয়েছে।Geological Survey of India বা GSI বৃষ্টিজনিত পাহাড়ধসের পূর্বাভাসের মডেল তৈরি করেছে। দার্জিলিং ও কালিম্পংয়ে এই ব্যবস্থার পরীক্ষামূলক পর্যায় করা হয়েছে। সেইসঙ্গে উত্তরাখণ্ডের রুদ্রপ্রয়াগেও এই মডেল পরীক্ষা করার কাজ ও চলছে।
Landslide Early Warning System হল পাহাড়ে বিপর্যয় মোকাবিলার পদ্ধতি। এই পদ্ধতির মাধ্যমে পাহাড়ে ধস নামলে প্রথমে ধীরে ধীরে ‘ধসের পরে উদ্ধার’ কাজ করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে ‘ধসের আগে সতর্কতা’ খবর সহজে মিলছে।
দার্জিলিং–কালিম্পংয়ে নিয়মিত ধসের পূর্বাভাস
পশ্চিমবঙ্গের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলির একটি হল দার্জিলিং ও কালিম্পংকে নিয়মিত ধসের পূর্বাভাসকে আওতায় আনা। কলকাতায় National Landslide Forecasting Centre-এর মাধ্যমে পাহাড়ে ধসের পূর্বাভাস আগে থেকেই আসছে সামনে। বৃষ্টির পরিমাণ, ভূপ্রকৃতি এবং অতীতের ধসের তথ্যের মতো বিভিন্ন বিষয় বিশ্লেষণ করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার পূর্বাভাস দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। এর ফলে প্রশাসনের হাতে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আগে প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

কোন পাহাড় কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, তার বৈজ্ঞানিক মানচিত্র তৈরি
উত্তরাখণ্ডের অভিজ্ঞতার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা—সব পাহাড় বা পাহাড়ের সব ঢাল সমান নিরাপদ নয়।তাই জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া দেশজুড়ে ধস প্রবণ এলাকায় ভৌগোলিক দিক নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করছে। বিভিন্ন অঞ্চলের ভূমির গঠন, ঢালের স্থায়িত্ব এবং ধসের সম্ভাবনা নিয়ে বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
বৃষ্টির তথ্যের সঙ্গে পাহাড়ধসের পূর্বাভাস মিলিয়ে দেখা
পাহাড়ধসের অন্যতম বড় চিন্তার কারণ হল অতিবৃষ্টি। তাই শুধু পাহাড়ের গঠন জানলেই হবে না, কতটা বৃষ্টি হলে কোন এলাকায় ধসের ঝুঁকি বাড়ে, সেটিও বোঝার চেষ্টা চলছে। জিএসআই-এর rainfall-induced landslide early warning model-এ বৃষ্টিপাতের তথ্যকে পাহাড়ের ভূপ্রকৃতি ও ধসের সম্ভাবনার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। দার্জিলিং ও কালিম্পং এই ব্যবস্থার পরীক্ষার আওতায় রয়েছে।
পাহাড়ের মাটির দিকে নজর
শুধু বৃষ্টির দিকে নজর নয় পাহাড়ের মাটি বা ঢালের অতি সূক্ষ্ম পরিবর্তন নজরে রাখাও এখন বিপর্যয় মোকাবিলা দফতরের অংশ হয়ে উঠছে। জিএসআই দেশে real-time ground deformation monitoring-এর জন্য DGPS station-ও ব্যবহার করছে। এর মূল উদ্দেশ্য হল ভূ-পৃষ্ঠের পরিবর্তন সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক তথ্য পাওয়া। Raise Your Concern About this Content
‘স্মার্ট ট্যুরিজম’ নীতি

ভবিষ্যতের পাহাড়ি পর্যটনে সংখ্যা নয়, ব্যবস্থাপনাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একদিনে একটি এলাকায় ৫০ হাজার মানুষ পাঠানোর বদলে ডিজিটাল পারমিটের মাধ্যমে পর্যটকের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। একটিমাত্র জনপ্রিয় জায়গায় সবাইকে কেন্দ্রীভূত না করে কাছাকাছি ছোট গন্তব্যে পর্যটন ছড়িয়ে দেওয়া যায়।
আগাম অনলাইন বুকিং, নির্দিষ্ট পার্কিং হাব, পাহাড়ের নীচ থেকে বৈদ্যুতিক শাটল, ট্রেকিং পারমিট, প্লাস্টিক নিয়ন্ত্রণ, ‘ক্যারি ইন-ক্যারি আউট’ বর্জ্যনীতি এবং স্থানীয় হোমস্টে নেটওয়ার্ক—সব মিলিয়ে তৈরি হতে পারে স্মার্ট পর্যটন। সেই সঙ্গে পর্যটনের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় শুধু পর্যটক কী চান, সেই প্রশ্ন করলে চলবে না। জানতে হবে—পাহাড় কতটা নিতে পারবে।
পরিশেষে বলা যায়,উত্তরাখণ্ড আমাদের সেই কথাটিই বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে। প্রকৃতি উন্নয়নের বিরোধী নয়। প্রকৃতি শুধু তার নিজের নিয়মে চলে। সেই নিয়ম অস্বীকার করে তৈরি উন্নয়ন যত আধুনিকই দেখতে হোক, তার ভিত দুর্বল। আর সম্ভবত উত্তরাখণ্ডের সবচেয়ে বড় শিক্ষা এখানেই—পাহাড়কে জয় করে পর্যটন গড়া যায় না, পাহাড়ের সঙ্গে সহাবস্থান করেই পর্যটনের ভবিষ্যৎ গড়তে হয়।
তথ্যসূত্র
১. জলবায়ু-সংবেদনশীল পর্যটন অঙ্গরাজ্য
২. উত্তরাখণ্ডের বিপর্যয়: শুধুই প্রাকৃতিক, নাকি মানুষের তৈরি ঝুঁকি?
৩. যাত্রাপথই কি বিপদের উৎস?
৪. উত্তরাখণ্ড: দেবভূমি থেকে ‘ওভার-ট্যুরিজম’-এর ল্যাবরেটরি
৫. উত্তরাখণ্ড থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমানে ব্যবস্থাপনা
৬. জলবায়ু-সহনশীল পাহাড়ি সড়কের জন্য ভূমিধস প্রশমনে উন্নত পদক্ষেপ গ্রহণ করছে MoRTH



