FIFA WORLD CUP 2026
বিশ্বকাপ শুধু একটি ফুটবল প্রতিযোগিতা নয়, এটি কোটি কোটি মানুষের আবেগ, গৌরব এবং ইতিহাসের প্রতীক। আর সেই ইতিহাসের সবচেয়ে মূল্যবান প্রতীক হল বিশ্বকাপ ট্রফি। কিন্তু অবাক করার মতো বিষয়, বিশ্বের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত এই ট্রফি দু’দুবার চুরির শিকার হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সেটিকে লুকিয়ে রাখতে হয়েছিল, আবার একবার একটি সাধারণ কুকুরের কারণে ফিরে এসেছিল ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। আর একবার চুরি হওয়ার পর সেই ট্রফি আজও রহস্যের অন্ধকারেই হারিয়ে রয়েছে। এই ঘটনাগুলিই পরবর্তীকালে ফিফাকে ট্রফির নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বদলে ফেলতে বাধ্য করে। তাই বিশ্বকাপ ট্রফির ইতিহাস শুধুই বিজয়ের নয়, এটি রোমাঞ্চ, রহস্য, অপরাধ এবং ইতিহাসের এক অসাধারণ মিশ্রণ।
বিশ্বকাপ ট্রফির ইতিহাস: জুলে রিমে ট্রফি থেকে বর্তমান ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি
১৯৩০ সালে প্রথম ফুটবল বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার সময় বিজয়ীদের জন্য তৈরি করা হয় জুলে রিমে ট্রফি। ফরাসি ভাস্কর আবেল লাফ্লর এটি নির্মাণ করেন। ট্রফিটি ছিল সোনার প্রলেপ দেওয়া রুপোর তৈরি এবং এর উপরে গ্রিক বিজয়দেবী নাইকির মূর্তি ছিল। ১৯৭৪ সাল থেকে চালু হয় বর্তমান ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি । ইতালীয় শিল্পী সিলভিও গাজ্জানিগা এটি নকশা করেন। এটি ১৮ ক্যারেট সোনা দিয়ে তৈরি এবং ওজন প্রায় ৬.১৭৫ কেজি।

জুলে রিমে ট্রফির নামকরণের ইতিহাস
প্রথমদিকে ট্রফিটির নাম ছিল “Victory”। ১৯৪৬ সালে ফিফার তৎকালীন সভাপতি জুলে রিমে-এর সম্মানে ট্রফিটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় Jules Rimet Trophy। বিশ্বকাপ চালুর পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল জুলে রিমের। তাঁর প্রচেষ্টাতেই আন্তর্জাতিক ফুটবল বিশ্বকাপ বাস্তবে রূপ পায়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ট্রফি লুকিয়ে রাখার রোমাঞ্চকর ঘটনা
১৯৪২ সালে ইউরোপে যুদ্ধ চলাকালীন ইতালিতে রাখা ছিল ট্রফিটি। ফিফার সহ-সভাপতি অত্তোরিনো বারাসি আশঙ্কা করেছিলেন, নাৎসি বাহিনী ট্রফিটি বাজেয়াপ্ত করতে পারে। তাই তিনি ট্রফিটি একটি সাধারণ জুতোর বাক্সে লুকিয়ে নিজের বিছানার নিচে বহু বছর গোপনে রেখে দেন। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর আবার ট্রফিটি ফিফার কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এটি বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় ঘটনা।
১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ডে বিশ্বকাপ ট্রফি চুরির রহস্য
১৯৬৬ বিশ্বকাপের আগে লন্ডনের Westminster Central Hall-এ প্রদর্শনী চলাকালীন ট্রফিটি চুরি হয়ে যায়।চোরেরা নিরাপত্তা ভেঙে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই ট্রফি নিয়ে পালিয়ে যায়।ঘটনার পর গোটা ব্রিটেনে তোলপাড় শুরু হয়।স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড বিশাল তদন্ত শুরু করে। হাজার হাজার মানুষকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
কীভাবে ‘পিকলস’ নামে একটি কুকুর ট্রফি উদ্ধার করেছিল
চুরির এক সপ্তাহ পরে লন্ডনের দক্ষিণাংশে হাঁটতে বেরিয়েছিলেন ডেভিড করবেট। তাঁর পোষা কুকুর পিকলস একটি ঝোপের মধ্যে মোড়ানো কাগজের প্যাকেট খুঁজে পায়। খুলে দেখা যায় সেটিই হারিয়ে যাওয়া বিশ্বকাপ ট্রফি। এই ঘটনার পর পিকলস বিশ্বজুড়ে তারকা হয়ে ওঠে। সে পুরস্কার, টিভি শো এবং চলচ্চিত্রেও অংশ নেয়।
ট্রফি চুরির পর বিশ্বজুড়ে তোলপাড়
মূল্যবান ট্রফি প্রদর্শনের নিয়ম কঠোর করা হয়। নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সশস্ত্র পাহারা বাড়ানো হয়। ট্রফি পরিবহনের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা প্রোটোকল তৈরি করা হয়। সেইসঙ্গে ট্রফি হারানোর খবর বিশ্বজুড়ে প্রথম পাতার সংবাদে পরিণত হয়।ফিফা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। ইংল্যান্ড সরকারও তদন্তে নামে। ঘটনার পর থেকেই বিশ্বকাপ ট্রফির নিরাপত্তা নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে শুরু করে ফিফা।

১৯৭০ সালে ব্রাজিলের স্থায়ীভাবে জুলে রিমে ট্রফি জয়
Brazil national football team ১৯৭০ সালে তৃতীয়বার বিশ্বকাপ জিতে নিয়ম অনুযায়ী ট্রফিটি স্থায়ীভাবে নিজেদের দখলে নিয়ে যায়। তখনও কেউ ভাবেনি, কয়েক বছরের মধ্যেই সেটি আবার হারিয়ে যাবে।
১৯৮৩ সালে ব্রাজিল থেকে দ্বিতীয়বার চুরি
১৯৮৩ সালের ১৯ ডিসেম্বর ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের সদর দফতর থেকে ট্রফিটি আবার চুরি হয়ে যায়। চোরেরা কাচের বাক্স ভেঙে ট্রফিটি নিয়ে পালিয়ে যায়। তদন্তে কয়েকজন গ্রেফতার হলেও আসল ট্রফি আর কখনও উদ্ধার হয়নি।
কেন আজও উদ্ধার হয়নি জুলে রিমে ট্রফি
তদন্তকারীদের বিশ্বাস, চোরেরা ট্রফিটি গলিয়ে সোনা বিক্রি করে দিয়েছিল।যদিও এর পক্ষে চূড়ান্ত প্রমাণ কখনও পাওয়া যায়নি। ফলে আজও এটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় অমীমাংসিত রহস্য।
কেন বর্তমান ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি কোনো দেশ স্থায়ীভাবে পায় না
১৯৭৪ সাল থেকে নতুন নিয়ম চালু হয়। এখন কোনও দেশ তিনবার, চারবার বা দশবার বিশ্বকাপ জিতলেও আসল ট্রফি স্থায়ীভাবে পায় না। শুধু বিজয় উদ্যাপনের জন্য সীমিত সময় ট্রফিটি হাতে রাখার সুযোগ পায়। এরপর ট্রফি আবার ফিফার কাছে ফিরে যায়।Raise Your Concern About this Content
আসল ট্রফি ও প্রতিরূপ ট্রফির পার্থক্য
বিজয়ী দলকে স্থায়ীভাবে দেওয়া হয় FIFA World Cup Winners’ Trophy নামে একটি ব্রোঞ্জের প্রতিরূপ। আসল ট্রফিটি থাকে ফিফার সংগ্রহে। বিশ্বকাপ ফাইনাল, ট্রফি ট্যুর বা বিশেষ অনুষ্ঠানে কেবল আসল ট্রফি ব্যবহার করা হয়।
বিশ্বকাপ ট্রফির নিরাপত্তায় ফিফার কড়া ব্যবস্থা
বিশেষ নিরাপত্তা ভল্টে ট্রফি সংরক্ষণ করা হয়। পরিবহণের সময় থাকে সশস্ত্র নিরাপত্তা। বীমার পরিমাণ কয়েক কোটি ডলারেরও বেশি। নির্দিষ্ট ব্যক্তিরাই ট্রফি স্পর্শ করার অনুমতি পান। বিশেষ গ্লাভস ও নিরাপত্তা প্রোটোকল মেনে ট্রফি বহন করা হয়। ট্রফি ট্যুরেও বহুস্তরীয় নিরাপত্তা বলয় থাকে।

ট্রফি হারানোর ঘটনা ফুটবল বিশ্বকে কী শিক্ষা দিয়েছে?
বিশ্বকাপ ট্রফির ইতিহাস দেখিয়ে দেয় ঐতিহ্য সংরক্ষণ কতটা গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপত্তায় সামান্য গাফিলতিও ইতিহাস বদলে দিতে পারে। একটি প্রতীকী বস্তু কেবল ধাতুর তৈরি নয়—এটি কোটি মানুষের আবেগ ও স্মৃতির অংশ। অতীতের ভুল থেকেই আজকের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে;
পরিশেষে বলা যায়, বিশ্বকাপ ট্রফির ইতিহাস আসলে শুধু ফুটবলের ইতিহাস নয়, এটি মানবসভ্যতারও এক অনন্য দলিল। যুদ্ধের বিভীষিকা, আন্তর্জাতিক অপরাধ, বিশ্বজুড়ে আলোড়ন, এক সাধারণ কুকুরের অবিশ্বাস্য ভূমিকা এবং আজও অমীমাংসিত এক রহস্য—সব মিলিয়ে জুলে রিমে ট্রফির কাহিনি রীতিমতো সিনেমাকেও হার মানায়। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই শিক্ষা নিয়ে ফিফা বর্তমান বিশ্বকাপ ট্রফিকে বিশ্বের সবচেয়ে সুরক্ষিত ক্রীড়া ট্রফিগুলির অন্যতম করে তুলেছে। তবুও হারিয়ে যাওয়া জুলে রিমে ট্রফির রহস্য আজও ফুটবলপ্রেমীদের কৌতূহলের অন্যতম বড় বিষয় হয়ে রয়েছে।
তথ্যসূত্র:
১. বিশ্বকাপ ট্রফির ইতিহাস, জুলে রিমে ট্রফি, বর্তমান ফিফা ট্রফি
২. দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ট্রফি লুকিয়ে রাখার ঘটনা
৩. ১৯৬৬ সালের ট্রফি চুরি ও পিকলসের উদ্ধার অভিযান
৪. ১৯৮৩ সালের ব্রাজিলে ট্রফি চুরি



