Homeপ্রকৃতি ও পরিবেশঅবহেলিত সৌন্দর্যের নিঃশব্দ গল্প :

অবহেলিত সৌন্দর্যের নিঃশব্দ গল্প :

ঘেটো ফুল কি?

ঘেটো ফুল বলতে সাধারণত এমন সব বুনো,অবহেলিত ও নিজে থেকে জন্ম নেওয়া ফুলকে বোঝায় যেগুলো মানুষের যত্ন ছাড়াই প্রকৃতির কোলে বড় হয়ে ওঠে। এই গাছগুলো কোন নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক নাম না হলেও অনেকগুলোর বৈজ্ঞানিক নাম রয়েছে। এটি একটি লোকজ বা আঞ্চলিক নাম, যা গ্রাম বাংলা ও সিলেট অঞ্চলে বেশি ব্যবহৃত হয়। ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন রাজ্য যেমন আসাম ত্রিপুরায় ঘেটো ফুল দেখা যায়। বিশেষ করে ফাল্গুন মাস থেকে এই ফুলগুলো ফুটতে শুরু করে। খালি জায়গা রাস্তার পাশ ঝোপজার বা পতিত জমিতে অথবা কোন নদীর ধারে বা বনাঞ্চলে এই  ফুলগুলো দেখা যায়। ঘেটু ফুলকে অনেকে ভাট ফুল হিসাবে চিনে থাকে। যেহেতু ফাল্গুন মাসে বিভিন্ন চর্ম রোগের উপদ্রব দেখা যায় তাই গ্রাম বাংলায় লোকেরা সেই রোগ থেকে নিরাময়ের জন্য ঘেঁটু ফুল দিয়ে ঘেটু ঠাকুরের পূজা অর্চনা করে থাকেন। আচ্ছা সে গল্পে পড়ে যাচ্ছি। আগে পরিচয় করিনি ঘৃত ফুল নিয়ে। আজ আমরা যে ঘেটু ফুলের গল্প বলছি তার নাম ভন্টাকি বা ভাট চৈতঘাড়া ফুল।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

আচ্ছা আগেই বলিনেই ভাট ফুলের আদি নিবাস ভারত বর্ষ, বাংলাদেশ ও মায়ানমার অঞ্চলে। আর্য যুগ থেকে এই ফুল অবহেলায় বড় হলেও পূজায় ব্যবহৃত হয়। এটি একটি গুল্ম জাতীয় বহু বর্ষজীবী সপুষ্পক উদ্ভিদ যার বৈজ্ঞানিক নাম  “Clerodendrum viscosum.”

ভাটগাছের প্রধান কান্ড সোজাভাবে দন্ডায়মান। সাধারণত দুই থেকে ৪ মিটার লম্বা হয়। পাতাগুলো দেখতে কিছুটা পান পাতার আকৃতি খুব খসখসে। ডালের শীর্ষ দেশের পুষ্প দন্ডের ফুল ফোটে। সাদা আর বেগুনির রং এর মিশ্রিত এই ফুলের গন্ধ খুবই মিষ্টি। ফুল ফুটার পর মৌমাছিরা ঘাট ফুলের মধু সংগ্রহ করতে আসে। 

অবহেলিত এই ফুলের উল্লেখ পাওয়া যায় কবি জীবনানন্দ দাশের একটি কবিতায়ও। সেখানে তিনি লিখেছেন 

“ভাঁট আঁশ শ্যাওড়ার বন

বাতাসে কি কথা কয় বুঝি নাকো, বুঝি নাকো চিল কেন কাঁদে;

পৃথিবীর কোনো পথে দেখি নাই আমি, হায়, এমন বিজন। “

বোঝাই যাচ্ছে বাংলাদেশ তথা ভারতের বাঙালি লোকের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এই ফুল। সেই  আর্য সময় থেকে এই ফুল  গ্রাম বাংলার খুব পরিচিত একটা অংশ। 

ফুলটি শুধু যে সৌন্দর্যের জন্য সবার কাছে প্রিয় তা কিন্তু নয়। এর ঔষধি গুনও রয়েছে। এতে প্রচুর পরিমাণে ফ্ল্যাভোনয়েড থাকে।ফ্ল্যাভোনয়েড ক্যান্সার দমনে সহায়ক। এছাড়া কৃমি চুলকানি কোলেস্টেরল ব্লাড সুগার সহ বিভিন্ন রোগের এক প্রাকৃতিক ঔষুধী।

ব্যবহার :

ভাটগাছ ঔষধি গুনসম্পন্ন উদ্ভিদ হওয়ায় এর পাতার রস শিশুর জ্বর দূর করে বলে গ্রাম বাংলার এটি খুব প্রচলিত। 

ঘেঁটুপূজা / সিলেটি দের ঘাট বাধা :

পশ্চিমবঙ্গের ২৪ পরগনা হাওড়া বাঁকুড়া জেলায় বাঙালি হিন্দু সমাজে সেতু পূজা হয়ে থাকে। প্রচলিত  আছে ঘেঁটু বা ঘন্টা কর্ণ হলেন শিবের এক অনুচর। বাংলার জনসমাজে কল্পিত ঘৃণার্হ নামের দেবতা হলেন চর্ম রোগের দেবতা। তিনি আবার শিবের অনুচর এবং তীব্র হরি বিদ্বেষী। মঙ্গল দেবতা বিষ্ণুর বিপরীতে এই দেবতার অবস্থান অনেকটা কার্তিকী অমাবস্যার অনুষ্ঠিত অলক্ষী পূজার মত। বসন্তকালে খোস পাঁচড়া বারবার অন্তত দেখা যায় আর সেজন্য এই কাল্পনিক অশুভ দেবতাকে মেরে  বিদায় জানানো হয়। পূজার অন্যতম উপকরণ ঘেঁটু ফুল বা ভাঁট ফুল থেকে দেবতার এরূপ নাম হয়েছে বলে যুগ যুগ ধরে মেনে আসছে। এই দেবতা বিষ্ণুবিদ্বেষ হেতু বিষ্ণুর নাম যেন তার কানে না যায় সেজন্য দোকানের পাশে সর্বদা ঘন্টা ঝুলিয়ে রাখেন তাই এর আরেক নাম “ঘন্টা কর্ণ “

আচ্ছা এবার বলি এই পূজন নিয়ম। প্রতিবছর ফাগুন মাসের সংক্রান্তিতে এই পুজো অনুষ্ঠিত হয়। এই পুজোর জন্য আলাদা করে কোন পুরোহিত প্রয়োজন হয় না। গৃহস্থ মহিলারা এ পূজা করতে পারে। ঘেটো পূজা পশ্চিমবাংলার বিভিন্ন জায়গায় প্রচলিত হলেও উত্তর পূর্বাঞ্চলে খুব একটা ঘেটু বুঝার প্রচলন নেই।উত্তর পূর্বাঞ্চলের ঘেটু ফুল একই দিনে অন্যভাবে ব্যবহৃত হয়। এবং পূজার বিধিও আলাদা। 

ঘেঁটু পূজা :

আগেই বলেছি ফাগুন মাসের সংক্রান্তি তিথিতে এই ঘেট পূজা অনুষ্ঠিত হয়। পূজার জন্য লাগে মুড়ি ভাজার পুরনো ঝোল কালি মাখা মাটির খোলা, তেল হলুদে ব্যবহার্য ছোট বস্ত্র খন্ড তিনটি করি ছোট ছোট তিনটি গোবর দিয়ে পাকালো পিণ্ড ঘেটুফুল সিঁদুর ধান ও দুর্বা ঘাস। 

প্রথমে ব্রতিনীরা এল চুলে বসে হাতে মাটির খোলা নি কোন জায়গায় বসিয়ে দেন। তার উপরে তিনটি গোবরের পিণ্ড লাগিয়ে সেগুলো কড়ি, সিঁদুর,ঘেটু ফুল দিয়ে  সাজানো হয় । খোলার উপর কাপড়ের টুকরোটি বিছিয়ে দেওয়া হয় বাড়ির সামনে উঠোনে বা একটু দূরে এই রাস্তার তিন মাথায় চার মাথার ধারে ভিড়ের মাঝে এটি সম্পূর্ণ হয়। সে সময় ঘেটু ফুলকে নিয়ে বিভিন্ন ছড়া বলা হয়। পূজার শেষে অল্প বয়সী ছেলেরা মোটা বাঁশের লাঠি দিয়ে খোলাটা ভেঙ্গে দিয়ে হরি বিদ্দেশি ঘেটো দেবতাকে অপমান করে। তারপর দৌড়ে পুকুরের জলে হাত পা ধুয়ে আসে যাতে কোন চর্মরোগ না হয়। এরপর মহিলারা ওই হলুদ ও তেল মাখানো পুজোতে ব্যবহৃত বাচ্চাদের চোখে বুলিয়ে দেয় ও খোলার ঝুলকাল কাজলের মতন পরিয়ে দেয় যেন। এরপর দেওয়া হয় ঘেটু ঢাকুর কে বিদায়। হরিনাম সংকীর্তন এর মাধ্যমে এই হেতু ঠাকুরকে বিদায় জানানো হয়। সন্ধ্যা বেলা ছোট ছেলেরা রঙিন কাগজ ও কঞ্চি দিয়ে ছোট্ট ডুলি বানিয়ে কুড়িয়ে পাওয়া ঘেটুফুল ও প্রদীপ দিয়ে ঘেটু ঠাকুরকে সাজিয়ে কাঁধে করে বাড়ি বাড়ি ঘুরে এবং ঘেটুর গান গেয়ে চাল পয়সা ভিক্ষা করে।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

এ তো গেল পশ্চিমবঙ্গের কথা। এবার আসি পূর্ববঙ্গ তথা উত্তর-পূর্ব ভারতের বাঙালি প্রধান এলাকাগুলিতে। যেহেতু ঘেটুফুল সিলেটের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত তাই ধরিয়ে নিতে পারেন উত্তর-পূর্ব ভারতের সিলেটি প্রধান বাঙালি যেখানে রয়েছে সেখানে ঘেটুফুল আজও পূজিত হয়। চৈত্র সংক্রান্তির দিন  গৃহস্থের বাড়ি ও গেইটে ঘেটু ফুলকে গোবরের দলার উপর দিয়ে অপ- শক্তিকে বাড়ি আসা থেকে রক্ষা করা হয়.।এছাড়াও দেবাদিদেব মহাদেব বনে জঙ্গলের কুড়িয়ে পাওয়া ফুল দিয়ে পূজিত হন বলে দেবাদিদেব মহাদেব কেও এই ফুল অর্পণ করা হয়। Raise Your Concern About this Content

এ তো গেল এক ঘেঁটু ফুলের গল্প। যে ফুল অবহেলিত যার সৌরভ চারিদিকে ছড়ালেও আজ ও সে বনে জঙ্গলে অবহেলায় জীবন কাটায়। আপনারা নিশ্চয়ই এ ঘেটুফুল দেখে থাকবেন যারা দেখেননি একবার তার গল্প গাথা পড়ে আর পরিচয় জেনে তাকে আপন করে ঘরের শোভা বাড়াতেও কাজে লাগাতে পারবেন। প্রকৃতির এই সৃষ্টি যেন বুঝিয়ে দেয়  সবাই অবহেলিত মানেই তার কোন দোষ যে থাকবে তা কিন্তু নয় সে অনেক সময় পরিস্থিতির শিকার কখনো বা পরিচিতির অভাবের কারণে সে অবহেলিত। 

যেহেতু চৈত্র মাস তাই এই ঘেঁটোফুলের নাম না নিলে বসন্ত যেন অপূর্ণই থেকে যাবে। যে ফুল প্রকৃতিকে সুন্দর করে তুলেছে মানুষের মনে তার গন্ধে আনন্দ ভরে দিয়েছে সে যেন সবার কাছে পরিচিত হয় যে উদ্দেশ্যেই আমার এই লেখা। গ্রাম বাংলার অনেক পরিচিত ফুল ফল রয়েছে যা সবাই জানেন না বা চেনেন না। আমাদের এই “বিশ্ববাংলা হাব ” এর মূল চেষ্টাই হল সেইসব অচেনা জিনিস যা বাংলা ও বাঙালির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত তাদের পরিচয় পরিয়ে দেওয়া। লেখাটি ভালো লাগলে নিশ্চয়ই জানাবেন। 

তথ্য সূএ:

উইকিপিডিয়া

সঙ্ঘমিত্রা ভট্টাচার্য
সঙ্ঘমিত্রা ভট্টাচার্যhttps://www.biswabanglahub.com
আমি সংঘমিত্রা ভট্টাচার্য। পেশায় একজন মিডিয়া কর্মী এবং গত ১৭ বছর ধরে বিভিন্ন স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। সাংবাদিকতার মাধ্যমে মানুষের গল্প, সমাজের বাস্তবতা এবং আমাদের সংস্কৃতিকে তুলে ধরাই আমার মূল লক্ষ্য। বিশেষ করে ভ্রমণকাহিনি, উত্তর–পূর্ব ভারতের সংস্কৃতি, ঐতিহ্যবাহী খাবার এবং মানুষের জীবনধারা নিয়ে লিখতে আমি ভীষণ আগ্রহী। একজন উত্তর–পূর্ব ভারতের নারী হিসেবে আমি আমার রাজ্য এবং দেশের বৈচিত্র্য, সৌন্দর্য ও সংস্কৃতিকে বৃহত্তর বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে চাই। আমার বিশ্বাস, গল্প ও লেখার মাধ্যমে আমরা আমাদের মাটির গন্ধ এবং মানুষের হৃদয়ের কথা সবার কাছে পৌঁছে দিতে পারি।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

বাংলা ক্যালেন্ডার

- বিজ্ঞাপন -spot_img

Most Popular

Recent Comments