Homeপ্রকৃতি ও পরিবেশএকটি গাঁদা (গেন্দা) ফুলের জীবন গাঁথা

একটি গাঁদা (গেন্দা) ফুলের জীবন গাঁথা

বিষয়বস্তুর সারণী [hide]

দুখু মিয়াঁ সাহেব (কাজী নজরুল ইসলাম) এই গানে গেয়ে যেন বোঝাতে চেয়েছেন আমার প্রতি মেয়েদের ভালবাসার কথা। এভাবেই চলছে যুগের পর যুগ। আর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তোমরাও কেন জানি বাঁচিয়ে রেখে চলেছো আমার অস্তিত্ব। বহু বছর পর, শুধু বাংলার জগতে নয়, সুদূর মুম্বাইয়ের হিন্দি আধুনিক গানেও শোনা গেল একই রকম কথা। বাদশার গলায় বেজে উঠল “বড়লোকের বেটি লো লম্বা লম্বা চুল এমন মাথায় বেঁধে দেবো লাল গেন্দা ফুল”। চলো তাহলে আজকে জমজমাট গল্প হোক আমার এই জীবন গাঁথা নিয়ে। 

আচ্ছা! জানতে কি চাও আমার নাম আমার ঘর কোথায়? শুনবে তো? তাহলে বলি শোন তোমরা তো জানোই আমাকে গাঁদা নামে সবাই চেনে, কেউবা ডাকে গেঁদা বা গেন্দা বলে। কিন্তু তোমাদের মতো আমারও আরো নাম আছে।

গাঁদা ফুলের বৈজ্ঞানিক নাম হল ট্যাজিটিজ এরেকটা।(Tagetes erecta)। ট্রাজিটিক গনের গাছগুলো প্রধানত দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণ অংশে দেখা যায়। গাঁদা ফুল হলো বর্ষজীবী গাছ।এদের বর্ষজীবী বলা হয় কারণ এরা কেবল এক বছরের জন্য থাকে। এদের উচ্চতা ১থেকে ৫ ফুট।এরা মূলত রৌদ্রজ্জ্বল এলাকায় জন্মায়।বুঝলে তো আমার পরিচয় ?

 এবার বলি আমার বিশ্ব জুড়া প্রচার কি করে হলো। গেন্দা ফুল বা মেরিগোল্ড (Tagetes) নামটি এসেছে এট্রাস্কান জ্ঞানের দেবতা ‘টাগেস’ (Tages)–এর নাম থেকে। ধারণা করা হয়, ‘মেরিগোল্ড’ নামটি এসেছে মাদার মেরির নামানুসারে “Mary’s Gold” শব্দগুচ্ছ থেকে। গাঁদা ফুলের আদি নিবাস মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা বিশেষ করে মেক্সিকোঅঞ্চল। ১৬ শতকে স্প্যানিশ নাবিক ও অভিযাত্রীরা নতুন পৃথিবী আবিষ্কারের সময় গাঁদা ফুল ইউরোপে নিয়ে আসেন। ইউরোপে রং ও সহজ চাষের গুণে জনপ্রিয়তা বাড়ে। তারপর পর্তুগিজ বণিকরা গাঁদা ফুল ভারতে নিয়ে আসে। সম্ভবত গোয়া ও উপকূলবর্তী অঞ্চল দিয়ে। 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

আমার কিন্তু অনেক রকমভেদ রয়েছে ।বলছি শুন সে কথা।গাঁদা ফুল  প্রধানত দুই প্রজাতির হলেও রং আকার ব্যবহার অনুযায়ী আমার নানা রকম ভেদ আছে। 

আফ্রিকান গাঁদা ফুলের কথাই ধরো :  

  • ফুল আকারে বড় ও গোল 
  • রং হলুদ ও গাঢ় কমলা 
  • গাছের উচ্চতা বেশি 
  • পূজা মন্দিরসজ্জা ও মালা বানাতে বেশি ব্যবহৃত 

আবার যেমন রয়েছে ফরাসি গাঁদা :

  • এই ফুলের আকার ছোট 
  • হলুদ কমলা লালচে বাদামী মিশ্রিত রং 
  • গাছ খাটো ও ধোপালো 
  • বাগান সাজাতে ব্যবহৃত হয় 

ডাবল গাঁদা :

  • অনেক অনেক পাপড়ি 
  • ফুল ঘন ও সুন্দর 
  • পূজা সাজসজ্জা জনপ্রিয় 

ডাবল গাদা থাকবে সিঙ্গেল গাঁদা থাকবে না?  রয়েছে সিঙ্গেল গাঁদাও

  • সিঙ্গেল গাঁদার বৈশিষ্ট্য এক স্তরের পাপড়ি রয়েছে 
  • দেখতে সহজ ও হালকা 
  • বীজ উৎপাদনে উপযোগী 
  • দেশীয় /স্থানীয় গাঁদা
  • অঞ্চল ভেদে আলাদা নাম ও রূপ 
  • চাষ সহজ ও টেকসই 
  • গ্রামীন এলাকায় বেশি দেখা যায় .

জানো কি আমার উজ্জ্বল রঙের কারন কি? তাহলে বলে দেই গাঁদা ফুলে রয়েছে ক্যারোটিনয়েড। যার ফলে এই রঞ্জকই হলুদ কমলা গাড় সোনালী রং দেয়। এর মধ্যে লুটিন ও জিয়াজ্যান্থিন গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে গাছের যত রোদ পায়, ক্যারোটিনয়েড তৈরি হয় তত বেশি। মাটির গুণ ও সূর্যি মামার ভরপুর এল পেলে আমি নিজের রূপের সৌন্দর্য দেখাতে আরও উৎফুল হই। 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

বাংলা সংস্কৃতির সাথে রয়েছে আমার এক বিশেষ সম্পর্ক। পুজো বিবাহ অন্নপ্রাশন উপনয়ন,গৃহ প্রবেশ  যাই হোক না কেন মন্ডপ ও বাড়ি সাজাতে আমার জুড়ি মেলা ভার। আমার উজ্জ্বল রং কে অশুভ শক্তি নাশক ও শুভ শক্তির প্রতীক ধরা হয়। লোকাচার ও গ্রামীণ সংস্কৃতিতে গাঁদা ফুল শুভ শক্তির আহ্বায়ক বলে বিশ্বাস করা হয়। 

এছাড়া গানে গানে আমাকে পাবে তোমরা। কিভাবে এতো পরিচিতি জানতে ইচ্ছে হচ্ছে তো? হিংসে করোনা, আমার নাম নিয়ে বহু গান হয়েছে জানো?
যেমন ধরো,”বড়লোকের বেটি লো” এই গানটি সবারই জানা। গানটির প্রথম লিরিক্স ও সুর দিয়েছিলেন বাংলার এক লোকশিল্পী রতন কাহার। পরবর্তী সময়ে এই গান বিশেষভাবে প্রচার পায় পপ সিঙ্গার বাদশার হিন্দি রিমিক্সে। আজ  এই “বড়লোকের বেটি লো “গানটি বাঙালি অবাঙালি সবার মুখেই শোনা যায়। এখানে প্রেমের প্রতীক আমি।লোক কথা ও গানে গাঁদা ফুল মানে নীরব কিন্তু গভীর প্রেম। যে প্রেমে অপেক্ষা ও নিষ্ঠা রয়েছে তাই এই ফুলের সাজ মানে এক সম্পর্কের শক্ত উষ্ণ বিশ্বাসের প্রেমের প্রতীক। 

এছাড়াও চলচ্চিত্র জগতে স্থান রয়েছে আমার আধিপত্য।বিশেষ করে ভারতবর্ষের যতগুলো ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি রয়েছে প্রায় সবগুলোতেই এই আমাকে সাজসজ্জায় ব্যবহার করতে দেখা যায়। তাছাড়া হিন্দি সিনেমায় জায়গা করে নিয়েছে মেরিগোল দিয়ে সিনেমাও। শুধু কি তাই! গদর সিনেমার সেটে যে কতবার আমার ব্যবহার হয়েছে, ছবিটি দেখলে যা বারবার চোখে পড়ে। ‘শ্বশুরাল গেন্দা ফুল’ এই কথাটা প্রায়ই শোনা যায়। সেখানেও কিন্তু এই বিশেষ ফুলটির নাম এসেছে। Raise Your Concern About this Content

কৃতজ্ঞতা স্বীকার : Google

আমার জন্য অর্থনৈতিক সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে।খুলে গিয়েছে কর্মসংস্থান ও গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নতির পথ। ভারতের বিভিন্ন জায়গা তথা বিদেশেও অনুকূল পরিবেশে গাঁদা ফুলের চাষ করে বহু লোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে। তার ফলে বেড়েছে অর্থনৈতিক উন্নতি। এই ফুল চাষ করা খুব সহজ। তাই চাষিরা খুব অল্প খরচে এই ফুল চাষ করে ওটা বাণিজ্যিকরণ করে আর্থিকভাবে সচ্ছল হতে সমর্থ্য হচ্ছে। 

আয়ুর্বেদ ও লোকচিকিৎসায় প্রাচীন কাল থেকে আমাকে ব্যবহার হয়।কাটা ছেঁড়া, পোড়া, ক্ষত  সহ বিভিন্ন ত্বক জনিত সমস্যায় এই ফুলের গুন অপরিসীম। তাছাড়া আমার মধ্যে থাকা লুটিন  চোখের দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখে, চোখের ক্লান্তি কমায় তার কারনে এটি কে তো সাপ্লিমেন্ট হিসেবে ব্যবহার করা হয়। গাঁদা ফুলের নানা রকম ঔষধি গুন থাকার কারণে বিশ্বজুড়া আজ এই ফুলের জয়জয়কার। তৈরি হচ্ছে নানা রকম রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর ঔষধ কীটনাশক ওষুধ ও।এই ফুলকে তাই প্রাকৃতিক ওষুধের ভান্ডার বলা হয়। 

গাছের পাতা ফুল কুড়ি সবকিছুই উপযোগী হওয়ার আমি {গাঁদা ফুল}  জীবন থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রকৃতি ও মানুষের কাছে আশীর্বাদস্বরূপ। আমার জীবনগাঁথা তো শুনলে,এখন থেকে আমাকে ছিড়ে ফেলে দিতে একটু অন্তত আমার কথা ভেবে দেখো।তোমরা মানুষরা তো আমাকে ছাড়া পারবে না,তবে কেনো এতো কষ্ট দাও আমায়? 

  1. এনসাইক্লোপেডিয়া
  2. গাঁদা ফুল চাষ
  3. Types of Ganda Phool

সঙ্ঘমিত্রা ভট্টাচার্য
সঙ্ঘমিত্রা ভট্টাচার্যhttps://www.biswabanglahub.com
আমি সংঘমিত্রা ভট্টাচার্য। পেশায় একজন মিডিয়া কর্মী এবং গত ১৭ বছর ধরে বিভিন্ন স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। সাংবাদিকতার মাধ্যমে মানুষের গল্প, সমাজের বাস্তবতা এবং আমাদের সংস্কৃতিকে তুলে ধরাই আমার মূল লক্ষ্য। বিশেষ করে ভ্রমণকাহিনি, উত্তর–পূর্ব ভারতের সংস্কৃতি, ঐতিহ্যবাহী খাবার এবং মানুষের জীবনধারা নিয়ে লিখতে আমি ভীষণ আগ্রহী। একজন উত্তর–পূর্ব ভারতের নারী হিসেবে আমি আমার রাজ্য এবং দেশের বৈচিত্র্য, সৌন্দর্য ও সংস্কৃতিকে বৃহত্তর বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে চাই। আমার বিশ্বাস, গল্প ও লেখার মাধ্যমে আমরা আমাদের মাটির গন্ধ এবং মানুষের হৃদয়ের কথা সবার কাছে পৌঁছে দিতে পারি।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

বাংলা ক্যালেন্ডার

- বিজ্ঞাপন -spot_img

Most Popular

Recent Comments