SPITI VALLEY
তাবো থেকে কাজা, কাজা থেকে চন্দ্রতাল স্পিতির নৈস্বর্গিক দৃশ্যপটের সাক্ষী থাকতে গোটা ভারতবর্ষে এই যাত্রাপথের জুড়ি মেলা ভার। তাবো অবধি রাস্তায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে গাছপালা নজরে আসে। কিন্তু কাজা ঢুকলে সবুজের সংখ্যা আরও কমতে থাকে বা নেই বললেই চলে। তাবোতে একরাত্রি কাটানোর পর পরবর্তী গন্তব্য কাজা। ভারতের এই প্রত্যন্ত অঞ্চলের সবচেয়ে বড় শহর কাজা। যাওয়ার পথেই দেখে নিতে হবে ধানকর মনাস্ট্রি।
কাজা যাওয়ার আঁকাবাঁকা, এবড়োখেবড়ো রাস্তা যেন যাত্রাপথের অন্যতম অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই যাত্রাপথে দৃশ্যপটজুড়ে সোনালি পাহাড়। তাবো পেরনোর কিছুটা পরেই রাস্তার পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে স্পিতি নদী। চারপাশের দৃশ্য ছিল অপূর্ব। হিমালয়ের কোলে অবস্থিত স্পিতি এমনিই তার মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক দৃশ্য, বৈচিত্র্যময় উদ্ভিদ ও প্রাণিজগতের জন্য সুপরিচিত। তাবো থেকে ধানকর যাওয়ার পথে হলদে বাদামী ভূখণ্ডে কোথাও কোথাও গোলাপি ফুলে ঢাকা গাছের দেখা মেলে, যা স্পিতির প্রকৃতিকে আরও মোহময়ী করে তোলে। স্পিতি ভ্রমণে এ দৃশ্য একেবারেই মিস করা উচিত নয়। এই মায়াবী সফরের অনন্য সৌন্দর্য আপনার মনকে বিস্ময় ও মুগ্ধতায় ভরিয়ে তুলবে। এই সব দৃশ্যকে সাথে নিয়ে পৌঁছে যাবেন পাহাড়চূড়ায় অবস্থিত ধানকর মনাস্ট্রিতে।
ধানকর মনাস্ট্রি
বরফের চাদরে মোড়া হিমালয় পর্বতমালা এবং স্পিতি ও পিন নদীর আঁকাবাঁকা মিলনস্থলকে ওপর থেকে সেই হাজার হাজার বছর ধরে নজরে রাখছে ধানকর মনাস্ট্রি। পাথুরে পাহাড়ের মাথায় অবস্থিত এই মনাস্ট্রি স্পিতি ভ্রমণের অন্যতম সেরা আকর্ষণ। মনাস্ট্রি থেকে দেখা যায় ধানকর গ্রাম।
ধানকর গোম্পা ভারতের হিমাচল প্রদেশের লাহৌল-স্পিতি জেলার একটি ঐতিহাসিক বৌদ্ধ মঠ এবং একই সঙ্গে একটি ছোট গ্রাম। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩,৮৯৪ মিটার বা ১২,৭৭৪ ফুট উচ্চতায় স্পিতি উপত্যকায়, কাজা ও টাবোর মাঝামাঝি ধানকর গ্রামের একেবারে উপরে এই মনাস্ট্রি অবস্থিত। ‘ধাং’ শব্দের অর্থ খাড়া পাহাড় বা খাড়াই, আর ‘কার’ শব্দের অর্থ দুর্গ। তাই ‘ধানকার’ শব্দের অর্থ দাঁড়ায় ‘খাড়া পাহাড়ের ওপর নির্মিত দুর্গ’। স্পিতির কীই ও টাঙ্গ্যুদ মনাস্ট্রি এবং লাদাখের থিকসে, লিকীইর ও রাংদুম মনাস্ট্রির মতোই মধ্য তিব্বতের দুর্গ-শৈলী অনুসরণ করে নির্মিত হয়েছিল এই ধানকর মনাস্ট্রি।

মনাস্ট্রির ভেতরের অন্ধকার, সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয় উপরে, পুরো অন্ধকার। ওপরে আরাধনা করার ঘর রয়েছে। মনাস্ট্রিতে ব্যালকনির মতো জায়গা রয়েছে সেখান থেকে দুপাশের জনমানবহীন উচ্চভূমির মরুভূমি, আকাশছোঁয়া হিমালয় এবং নিচে ছড়িয়ে থাকা স্পিতি ও পিন নদী মিলনের সেই মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখা যায়। গোম্পার আশেপাশে উড়তে থাকা রঙিন প্রেয়ার্স ফ্ল্যাগ যেন জায়গার সৌন্দর্য্য আরও বাড়িয়ে দেয়।।
গোম্পার নিচেই রয়েছে ছোট্ট গ্রাম। সেখানেই অবস্থিত নতুন ধানকর মনাস্ট্রি, যেখানে বর্তমানে তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের গেলুগপা সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসীরা থাকেন।
পাথুরে পাহাড়ের মাথায় অবস্থিত এই মনাস্ট্রি স্পিতি ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ। ধানকার ঘুরে রাত্রিবাস কাজাতে। কাজা স্পিতির অন্যতম প্রশাসনিক শহর। পরের দিন দেখা হবে লাংজা ,কমিক, হিক্কিম, ছিছাম ব্রিজ আর কীই মনাস্ট্রি।
লাংজা
লাংজা গ্রাম মূলত দুটি কারণে বিশেষভাবে পরিচিত। প্রথমত, এখানে প্রচুর প্রাচীন সামুদ্রিক জীবাশ্ম পাওয়া যায় তাই “ভারতের ফসিল গ্রাম” নামে পরিচিত স্পিতির এই গ্রাম। দ্বিতীয়ত, গ্রামের ওপর থেকে সমগ্র উপত্যকার দিকে দৃষ্টি রেখে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল ও মনোরম লাংজা বুদ্ধ মূর্তি এই গ্রামের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। এই ছোট্ট গ্রামে মাত্র ১৩৬ জন মানুষের বসবাস।
লাংজা গ্রাম থেকে দৃশ্যমান সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ হল চাউ চাউ কাং নিল্ডা । প্রায় সারা বছরই বরফে আচ্ছাদিত এই মনোমুগ্ধকর শৃঙ্গটির উচ্চতা ৬,৩০০ মিটার (২০,৬৭০ ফুট)-এরও বেশি। মনে হয় যেন পাহাড়টি গ্রামের নীরব প্রহরী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে এই শৃঙ্গ।
কমিক, বিশ্বের সর্বোচ্চ মোটরেবল গ্রাম
স্থানীয় ভাষায় কমিক শব্দটির অর্থ, ‘তুষার মোরগের চোখ’। ‘কো’ শব্দের অর্থ তুষার মোরগ, ‘মিক’ শব্দের অর্থ চোখ। যানবাহনের মাধ্যমে পৌঁছানো যায় বিশ্বের সর্বোচ্চ গ্রামগুলির মধ্যে অন্যতম কমিক। কমিক গ্রামে প্রায় ৫০০ বছর প্রাচীন লুন্দুপ সেমো গোম্পা অবস্থিত। এখানে রয়েছে বিশ্বের সর্বোচ্চ রেস্টুরেন্ট।
হিক্কিম, বিশ্বের উচ্চতম পোস্ট অফিস
লাংজার মতো কমিক ও হিক্কিমও খুঁজলে প্রচুর জীবাশ্ম পাওয়া যায়। জানা যায়, কোটি কোটি বছর আগে স্পিতি উপত্যকা টেথিস সাগরের নিচে ছিল। সেই কারণেই আজও এখানে প্রাচীন সামুদ্রিক জীবের অসাধারণ ও বিরল জীবাশ্ম পাওয়া যায়, যা এই অঞ্চলের প্রাচীন ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪,৪৪০ মিটার (১৪,৫৬৭ ফুট) উচ্চতায় হিক্কিম গ্রামেই অবস্থিত বিশ্বের সর্বোচ্চ পোস্ট অফিস বা ডাকঘর। এই পোস্ট অফিস শুধু ডাক পরিষেবাই প্রদান করে এমনটা নয়, বরং প্রতিকূল ভৌগোলিক পরিস্থিতির মধ্যেও মানুষের অধ্যবসায়, সাহস এবং যোগাযোগ রক্ষার অদম্য প্রচেষ্টার প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত। এই পোস্ট অফিস থেকে চিঠি পাঠাতে পারেন আপনিও। প্রতি বছর অসংখ্য পর্যটক এখান থেকে তাঁদের বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশে পোস্টকার্ড পাঠান। সেই পোস্টকার্ডে হিক্কিম পোস্ট অফিসের বিশেষ স্ট্যাম্প মারা হয়। বিশ্বের অন্যতম দুর্গম অথচ মনোমুগ্ধকর অঞ্চলে অবস্থিত এই ডাকঘর ভ্রমণকারীদের এমন এক অভিজ্ঞতার স্বাদ দেয়, যা আজীবন স্মৃতিতে অমলিন হয়ে থাকে।
ছিছাম ব্রিজ- এশিয়ার সর্বোচ্চ সাসপেনশন ব্রিজ
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪,০৩৭ মিটার (১৩,৫৯৬ ফুট) উচ্চতায় অবস্থিত বিশ্বের অন্যতম দর্শনীয় সেতুগুলির একটি ছিছাম ব্রিজ। এটি এশিয়ার সর্বোচ্চ সাসপেনশন বা ঝুলন্ত সেতু, যা স্পিতি উপত্যকার চিচাম এবং কিব্বের দুটি প্রত্যন্ত গ্রামকে সংযুক্ত করেছে যাতে স্পিতির যোগাযোগ ব্যবস্থা হয়েছে আরও উন্নত । স্পিতি উপত্যকার প্রধান শহর কাজা থেকে ছিছাম ব্রিজের দূরত্ব প্রায় ২০ কীইলোমিটার।
২০১৭ সালে ছিছাম ব্রিজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। প্রায় ১৪ বছর ধরে এই সেতু নির্মাণ করা হয়। খরচ করা হয়েছে আনুমানিক ৪৮৫.৫০ লক্ষ টাকা। উদ্বোধনের পর থেকেই এটি পর্যটকদের কাছে অন্যতম আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে।

প্রায় ১১৪ মিটার দীর্ঘ এই সেতুটি সাম্বা লাম্বা নাল্লা নামে পরিচিত প্রায় ১,০০০ ফুট গভীর এক গিরিখাতের উপর নির্মিত। সেতুটি নির্মাণের আগে চিচাম ও কিব্বের গ্রামের বাসিন্দারা এই গভীর খাদ পার হতে অত্যন্ত ঝুঁকিইপূর্ণ দড়ির ট্রলি ব্যবহার করতেন। ফলে ছিছাম ব্রিজ নির্মিত হওয়ার পর স্থানীয় মানুষের যাতায়াত অনেক বেশি নিরাপদ ও সহজ হয়ে ওঠে।
কীই মনাস্ট্রি- স্পিতি উপত্যকার বৃহত্তম বৌদ্ধ মনাস্ট্রি
হিমাচল প্রদেশের লাহৌল ও স্পিতি জেলার স্পিতি উপত্যকায়, স্পিতি নদীর তীরবর্তী একটি পাহাড়ের চূড়ায় সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪,১৬৬ মিটার (১৩,৬৬৮ ফুট) উচ্চতায় অবস্থিত কীই গোম্পা। কাজা শহর থেকে কীই মনাস্ট্রির দূরত্ব প্রায় ১২ কিলোমিটার, আর সড়কপথে মানালি থেকে প্রায় ২১০ কিলোমিটার। পাহাড়ের ঢালে ধাপে ধাপে নির্মিত এই মনাস্ট্রিটি দূর থেকে একটি দুর্গের মতো দেখতে লাগে। এর স্থাপত্যে ১৪শ শতকের তিব্বতি বৌদ্ধ শিল্পকলার পাশাপাশি চীনা স্থাপত্যশৈলীরও প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।

কীই গোম্পা শুধু একটি ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, এটি দীর্ঘদিন ধরে লামাদের ধর্মীয় শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
এই মনাস্ট্রিটি উৎসর্গ করা হয়েছে লোচেন তুলকু-কে, যাঁকে মহান অনুবাদক লোতসাওয়া রিনচেন জাংপো-র ২৪তম পুনর্জন্ম বলে মনে করা হয়।
জনশ্রুতি অনুযায়ী, একাদশ শতকে বিখ্যাত বৌদ্ধ গুরু অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের শিষ্য দ্রোমতোন কীই গোম্পার প্রতিষ্ঠা করেন। তবে ইতিহাসবিদদের মতে, এই তথ্যটি সম্ভবত নিকটবর্তী রাংরিক গ্রামের একটি প্রাচীন কাদাম্পা মনাস্ট্রির সঙ্গে সম্পর্কিত, যা পরে ধ্বংস হয়ে যায়।Raise Your Concern About this Content
১৭শ শতকের মাঝামাঝি, পঞ্চম দলাই লামার শাসনকালে মঙ্গলদের আক্রমণে মনাস্ট্রি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরবর্তীকালে এই মনাস্ট্রি গেলুগপা সম্প্রদায়ের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পুনর্গঠিত হয়। ১৮২১ সালে, লাদাখ ও কুলুর যুদ্ধের সময় আবারও এই মনাস্ট্রিতে লুটপাট করা হয়। ১৮৪১ সালে, ডোগরা-তিব্বত যুদ্ধের সময় গুলাম খান ও রহিম খানের নেতৃত্বাধীন ডোগরা বাহিনী মনাস্ট্রিটির বড় ধরনের ক্ষতি করে। ১৮৪০-এর দশকে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মনাস্ট্রির অনেক অংশ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। পরে ১৯৭৫ সালের বিধ্বংসী ভূমিকম্পেও এটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
পরবর্তীকালে ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ ASI এবং রাজ্য সরকারের পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্ট (PWD)-এর উদ্যোগে মনাস্ট্রিটি সংস্কার করা হয়।
মনাস্ট্রির দেয়ালজুড়ে রয়েছে অসংখ্য প্রাচীন ভাস্কর্য, রঙিন দেওয়ালচিত্র (মুরাল) এবং ধর্মীয় চিত্রাঙ্কন। এছাড়াও এখানে সংরক্ষিত রয়েছে বহু প্রাচীন পুঁথি, ধর্মগ্রন্থ এবং বুদ্ধমূর্তি যা ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের অমূল্য সম্পদ।
চন্দ্রতাল-পরীরা স্নান করে যেখানে
‘এক বার মরনে সে পেহলে চন্দ্রতাল দেখনা চাহনা হু’ রনবীর সিং অভিনীত লুটেরা সিনেমার অন্যতম ডায়লগ যা এখনও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল।

হিমালয়ের বুকে চাঁদের মতো সুন্দর লেক। যদিও ভৌগোলিকভাবে চন্দ্রতাল লাহৌল এলাকার চন্দ্রা নদীর অববাহিকায় অবস্থিত। কুনজুম লা পাস লাহৌল ও স্পিতি উপত্যকার মধ্যে প্রাকৃতিক সীমানা তৈরি করেছে। পুরো এলাকাটি চন্দ্রতাল বন্যপ্রাণ অভয়ারণ্যের অন্তর্গত, যা নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণী ও উচ্চভূমির উদ্ভিদের নিরাপদ আবাসস্থল। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪,৩০০ মিটার (১৪,১০০ ফুট) উচ্চতায় অবস্থিত চন্দ্রতাল হ্রদটি সামুদ্রা টাপু মালভূমিতে অবস্থিত। হ্রদটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল এর অর্ধচন্দ্রের মতো আকৃতি। এই আকৃতির কারণেই এর নাম রাখা হয়েছে চন্দ্রতাল। স্থানীয় লোকেরা বিশ্বাস করেন এই লেকে পরীরা স্নান করতে আসেন। তাই এই লেকে স্নান করা ও কাপড় কাচা নিষিদ্ধ।
একবার স্পিতির সৌন্দর্য নিজের চোখে দেখলে, সেই স্মৃতি আজীবন হৃদয়ে অমলিন হয়ে থাকবে। তাই সুযোগ পেলে জীবনে অন্তত একবার স্পিতি ভ্যালি ঘুরে আসুন।
তথ্যসূত্র-
১. উইকিপিডিয়া
২. নিজস্ব অভিজ্ঞতা



