Homeইত্যাদিকাশী প্রবাসী বাঙালি সন্ন্যাসীদের জীবন ও তাঁদের প্রভাব

কাশী প্রবাসী বাঙালি সন্ন্যাসীদের জীবন ও তাঁদের প্রভাব

কাশী/বারাণসী শহরের দৃশ্য
চিত্রঃ গঙ্গাবক্ষ থেকে কাশী/বারাণসী শহরের দৃশ্য।। Photo by Rachel Claire on Pexels.com

আমাদের এই বাংলায় জানা অজানা এমন অনেক সাধু সন্তরা আছেন যাদের দিব্য লীলার সাধন ভূমি কাশী। বাংলার প্রতি ধূলিকণা পবিত্র,এই ভূমি সোনার ফসল উৎপাদনকারী  তাই তো এই দিব্য সাধকগণ তাদের দিব্য লীলায় চরিতার্থ করেছেন বাংলা সহ সম্পূর্ণ ভূ-ভারত কেও। যুগ যুগ ধরে চলে আসা এই পুজা যজ্ঞে নিরন্তর অগ্নিতে আহুতি প্রদানকারী আপামর সাধকগণের মধ্যে বাংলার সাধু সন্তগণ কাশীবাসী  সন্ন্যাসী রূপে  আজও তাদের দিব্য লীলা চরিতার্থ করে চলেছেন। এমনই কিছু কাশীবাসী বাংলার ভগবৎ প্রেমী গৌরবময় সাধকদের  সম্পর্কে যা জানা যায়: –

স্বামী অচলানন্দজীর কথা –স্বামী বিবেকানন্দের শিষ্য এই মহান সন্ন্যাসী জীবনের শেষ লগ্নে এই কাশি ধামেই মুক্তি লাভ করেন (১৯৪৭)। তিনি  শ্রী রামকৃষ্ণ দেবের ষোড়শ পার্ষদের মধ্যে অন্যতম স্বামী নিরঞ্জনানন্দের ঘনিষ্ট সান্নিধ্যে ছিলেন। তাঁর পূর্বাশ্রমের নাম ছিল কেদারনাথ মৌলিক তাই স্বামী বিবেকানন্দ তাঁকে কেদারবাবা বলে ডাকতেন। 

স্বামী ভাস্বরানন্দ ছিলেন সদানন্দময় সাত্বিক সন্ন্যাসী। সরলতার প্রতিমুর্তি এই স্বামীজী “শোনানে নেতাজি” প্রবন্ধের লেখক। প্রথম জীবনে সিঙ্গাপুরে থাকা কালীন নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর সাথে তার পরিচয় হয়,তিনি তখন আজাদ হিন্দ ফৌজ এর কর্ণধার। তাঁর এই প্রবন্ধে নেতাজির সম্পর্কে  অনেক অবিস্মরনীয় ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার কথা আমরা জানতে পারি।জীবনের শেষ লগ্নে এই পবিত্র কাশীধামেই তিনি সদ্গতি লাভ করেন (ইংরিজী সন ১৯৭৮)।

স্বামী অপূর্বানন্দ – কাশি অদ্বৈত আশ্রমের অধক্ষ্য এই স্বামীজী ছিলেন স্বয়ং শ্রী শ্রী মা সারদা দেবীর শিষ্য  এবং বহু স্মৃতিকথাপূর্ণ বিবিধ গ্রন্থের লেখক। তাঁর পূর্বাশ্রম ছিল পূর্ব বঙ্গের নোয়াখালী জেলায় ,১৯৯০ সালের ১১ই অক্টোবর তিনি কাশী তে তাঁর স্থুল শরীর ত্যাগ করেন। 

স্বামী স্বপ্রকাশানন্দ,জানা যায় তাঁর পূর্ব নাম ছিল সুরেন। জীবনের অধিকাংশ সময় ইনি তপস্যা ও শাস্ত্র চর্চা নিয়ে নিমগ্ন থাকতেন।প্রশ্ন ওঠে ধর্ম জীবনে রুচি বা আস্বাদ কি করে পাওয়া যায়? তিনি বলেন সেটা নির্ভর করে অনুভূতির ওপর আর অনুভূতি আসে ব্যাকুলতা ও ভাব ভক্তি থেকে ,বিবেক ও বৈরাগ্য দ্বারা।  ১৯৮৩ সালে তিনি কাশিতেই পরলোক গমন করেন।

স্বামী পরমেশানন্দ ছিলেন স্বয়ং শ্রী মা সারদার শিষ্য এবং কাশিতে সন্ন্যাস জীবন যাপন করে ১৯৮৬ সালে ধরাধাম ত্যাগ করেন। সাধন সম্পর্কে তিনি বলতেন অভ্যাস ছেড়ে দিলে আর পাওয়া যায়না।

স্বামী সত্যস্বরূপানন্দ ছিলেন সিলেটের অধিবাসী কিন্তু সাধন জীবনে তিনি কাশিতে এসে তাঁর সাধনায় লিপ্ত হন এবং এখানেই দেহত্যাগ করেন (ইংরিজী সন ১৯৮৭)।

কাশী অধুনা প্রয়াগরাজে দশেশ্বমেধ ঘাটের সন্ধ্যা আরতির দৃশ্য
চিত্রঃ কাশী অধুনা প্রয়াগরাজে দশেশ্বমেধ ঘাটের সন্ধ্যা আরতির দৃশ্য। Photo by: Charak

এরকম অনেক সাধু সন্ন্যাসীর নাম জানা যায় যাদের সাধনার মূল ভিত্তিভূমি ছিল এই কাশীধাম, যার বর্তমান নাম প্রয়াগরাজ। স্বামী চিৎপ্রকাশানন্দ, স্বামী রঘুবরানন্দ, স্বামী ধর্মেশানন্দ, স্বামী ধীরেশানন্দ ইত্যাদিরা হলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম। 

কাশী শব্দের অর্থ মুক্তি,যাতে সব প্রকাশিত হয় তাই কাশী। জানা যায় এতো সাধু সন্ন্যাসীর সাধনা দিব্য চিৎ তরঙ্গ সূক্ষ্য ভাবে জগতের কল্যানে মগ্ন। কাশীতে সর্ব মোট আশিটি ঘাট আছে। যেমন অসি ঘাট,জরাসন্ধ্র ঘাট বা মীর (মীর রুস্তম আলী) ঘাট ,মহানির্বান ঘাট,শিবালয় ঘাট,মণিকর্ণিকা ঘাট ,হনূমান ঘাট (সঙ্কটমোচন মন্দির),কর্ণাটক ঘাট ,দশাশ্বমেধ ঘাট ,পান্ডে ঘাট অহল্যাবাঈ ঘাট,শীতলা ঘাট,নারদ ঘাট ইত্যাদি। অসি ঘাটে দেবী দুর্গার শুম্ভ নিশুম্ভ বধের খড়্গ পড়ে। গঙ্গা ও অসি নদীর এই মিলন এক মহাতীর্থ,যা উল্লেখ আছে মৎস্য পুরান, অগ্নি পুরান,কুর্ম পুরান, পদ্ম পুরান ও কাশীখন্ডে। এই ঘাটেই ১৬-১৭ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে গোস্বামী তুলসী দাস বিখ্যাত “রাম চরিত মানস” রচনা করেন।সংক্রান্তি,চন্দ্র গ্রহণ,সূর্য গ্রহণ,গঙ্গা দশোহরা ,মৌনী অমাবস্যা, একাদশীতে এর স্নান মাহাত্য রয়েছে। এই এক একটি ঘাটে ব্রহ্ম ঋষি,তপস্বী মহর্ষি এবং উচ্চ কোটির সাধকগণ তাদের আধ্যাত্মিক তরঙ্গ দ্বারা উচ্চ মার্গে গমন এবং পরম জ্ঞান প্রাপ্ত করেন।

দুজন বাঙালি সাধুর মজার কথোপকথন দ্বারা কাশীতে প্রবাসী বাঙালি সাধুর কাশীবাসী হওয়ার ইচ্ছা পূরণের কারণটি জানা যায়। কাশির অদ্বৈত আশ্রমের তারাপ্রসন্ন মহারাজকে যখন স্বামী চেতনানন্দ জিজ্ঞেস করেন,শাস্ত্র বলে বাসনা ক্ষয় ছাড়া তত্ত্ব জ্ঞান হয়না আর তা না হলে শেষ জন্ম সম্ভব নয়। আবার শাস্ত্র বলছে কাশীতে মরলে মুক্তি। তাহলে কি শাস্ত্র পড়া নিরর্থক ?বেদান্ত শাস্ত্র গঙ্গার জলে ফেলে বিসর্জন দিয়ে কাশীবাসী হওয়াই ঠিক। আমি আপনার কাছে সত্যি জানতে চাই। উত্তরে তিনি শান্ত ভাবে বলেন “তুমিও ঠিক আমিও ঠিক – অর্থাৎ জ্ঞান ছাড়া মুক্তি হয়না,আবার কাশীতে মরলে মুক্তি হয়“। স্বামী চেতনানন্দ জিজ্ঞেস করেন -”দু-জন্যে ঠিক কি করে হবে?” তিনি একটু হেসে বললেন -”বাবা বিশ্বনাথ শেষ কালে জ্ঞানটি দিয়ে দেন“।।

তথ্যসূত্র : 

  1. প্রাচীন সাধুদের কথা (প্রথম খন্ড): স্বামী চেতনানন্দ 
  2. প্রাচীন সাধুদের কথা (দ্বিতীয় খন্ড): স্বামী চেতনানন্দ
  3. স্বামী ভাস্করানন্দ
  4. কামারপুকুর রামকৃষ্ণমিশন
  5. বাংলা উইকিপিডিয়া
  6. রামকৃষ্ণমিশন জীবনী সঙ্কলন
  7. বেদান্ত সোসাইটি, সেন্ট লুইস
  8. রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দ সেন্টার, নিউ ইয়র্ক
দীপান্বিতা চক্রবর্তী
দীপান্বিতা চক্রবর্তী
একাধারে সাংবাদিকতা, মানবসম্পদ ও সৃজনশীল মিডিয়ায় সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা নিয়ে দীপান্বিতা আজ এক বহুমুখী লেখিকা। অনলাইন প্রকাশনা, ফিচার রচনা এবং স্ক্রিপ্ট উন্নয়নের ক্ষেত্রে তার অভিজ্ঞতা তাকে তীক্ষ্ণ সম্পাদকীয় দৃষ্টিভঙ্গি এবং গল্প বলার এক অনন্য দক্ষতা প্রদান করেছে। গণ সংযোগ ও মানবসম্পদ উন্নয়নে স্নাতকোত্তর দীপান্বিতা ডকুমেন্টারি স্ক্রিপ্টিং, ব্র্যান্ড স্টোরিটেলিং এবং গভীর গবেষণামূলক লেখায় এক উল্লেখনীয় অবদান রেখেছেন। প্রভাবশালী ব্লগ থেকে শুরু করে আকর্ষণীয় সামাজিক মাধ্যমের কনটেন্ট, বিভিন্ন শ্রেণীর পাঠকদের চাহিদা অনুযায়ী তার লেখনী শৈলী সবক্ষেত্রেই অনন্য। বিশ্ব বাংলায় তাঁর কাজ স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার প্রতি দৃঢ় প্রতিশ্রুতির এক প্রতিফলন।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

বাংলা ক্যালেন্ডার

- বিজ্ঞাপন -spot_img

Most Popular

Recent Comments