আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স – এখন সমস্যা সমাধান ও উদ্বেগ দুইয়ের কারণ। এর প্রভাবে বিশেষত বর্তমানে তথ্য প্রযুক্তি বিভাগ (সফটওয়্যার টেকনোলজি) এর ম্যান-পাওয়ার কি হারে হ্রাস করা হচ্ছে তা সবাই অবগত। এক্ষেত্রে বিকল্প জীবিকার সন্ধান হিসাবে কৃষি, পর্যটন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবাগুলো রয়েছে যাদের চাহিদা বরাবর ছিল আছে ও থাকবে। এগ্রটুরিজম সেক্টর আগামী সময়ের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আর্থ সামাজিক ভূমিকা গ্রহণ করতে চলেছে।
কৃষি-পর্যটন (এগ্রোট্যুরিজম) কি ও কেন ?
কৃষি ও পর্যটন যখন একই সাথে একই জায়গায় সম্মিলিত ভাবে গড়ে ওঠে স্বাভাবিক ভাবে তাকেই কৃষি পর্যটন বলা হয়ে থাকে। কিন্তু এক্ষেত্রে কোনোরকম কীটনাশক প্রয়োগ ছাড়া, বিজ্ঞানের সহায়তায় আধুনিকীকরণ দ্বারা যখন সেই একই জমিতে অনেক বেশি বিভিন্ন প্রকারের অর্গানিক ফুড বা জৈব সবজি ফল দানা শস্য উৎপাদন করে একই সাথে পর্যটন ব্যাবসাও গড়ে তোলা যায় তবে তাকে বলা যায় কৃষি-পর্যটন কেন্দ্র বা এগরোটুরিস্ট স্পট – । বর্তমান যুগে খাবার গ্রহণের ব্যাপারে মানুষের সচেতনতা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তার প্রমান জিম এবং হেলথি ড্রিঙ্কস কোম্পানি গুলোর রমরমা বাজার। একই সাথে বাজার চলতি সবজি ফলের প্রতি ভয় ও অনীহা থেকে অর্গানিক তথা জৈব খাদ্যের প্রতি মানুষের আস্থা বিশ্বাস বৃদ্ধি হচ্ছে কারণ সাধারণ মানুষ এখন নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে অনেক বেশি সচেতন। তাই কৃষি ভিত্তিক সম্পূর্ণ জৈব সার দ্বারা তৈরী ক্ষেতের সবজি ও ফল এখনসোনার মতোই দামি সম্পদ। সম্পদের সাথে তার পরিচিতি ও বিকাশ ঘটানো অপরিহার্য্য। এ ক্ষেত্রে পর্যটন শিল্প যখন যুক্ত হয় তখন তাকে বলা যায় হাতির দাঁতে বাঁধানো সোনা। ছুটিতে ঘুরতে আসা পর্যটক গ্রামীণ থাকা খাওয়ার পরিষেবাও পায়। ক্ষেতের সতেজ সবজি ফল পুকুরের মাছ পোল্ট্রির মুরগি ডিম্ সরাসরি লাঞ্চ ও ডিনার থালি সমৃদ্ধ করে। সাথে আছে থাকার ব্যাবস্থাও।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কৃষি-পর্যটন -বিশ্বের বাজারে এই চাহিদা এখন উর্ধমুখী। মার্কেট ডাটা ফোরকাস্ট এর তথ্য অনুযায়ী ২০২৫-২০৩০ সালের মধ্যে ২৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাজার, ১২% হারে বেড়ে উঠে প্রায় ৫৬৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে আশা করা যায়।
ফিলিপিন, আমেরিকা, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, ইতালির সাথে ভারতবর্ষ ও এগ্রটুরিজম এ প্রথমসারিতে – বলাবাহুল্য কৃষি ভিত্তিক অর্থনীতি ও একই সাথে পর্যটন বিশ্বব্যাপী আরো জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। খামারে থাকা (ফার্ম স্টে), মধু , ফল সবজি ক্ষেত থেকে সরাসরি সংগ্রহ, স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে পরিচয় সব মিলিয়ে বিশ্বব্যাপী পর্যটকদের মধ্যে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে এই এগ্রো টুরিজম।
ভারতবর্ষ কৃষিভিত্তিক দেশ। তাই আর্থসামাজিক সাফল্যের সাথে সাথে ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশে মহারাষ্ট্র, পাঞ্জাব, কেরালা, উত্তরাখন্ড, কর্ণাটক, তামিলনাড়ু, গোয়া কৃষি-পর্যটন- এগ্রো ট্যুরিজম ক্রমশ বিকশিত হয়ে উঠছে। ভারতে কৃষির অবদান জিডিপিতে প্রায় ১৮.২% (২০২৩-২৪)
পশ্চিমবঙ্গে কৃষি-পর্যটন:
পশ্চিমবঙ্গে কৃষি-পর্যটনের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ এই কৃষি পর্যটনে পশ্চিমবঙ্গ দ্রুত এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কান্ডারি হয়ে উঠছে। এই বঙ্গের মাটি আবহাওয়া বৃষ্টি নদী সবই অনুকূল হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি নিশ্চিত ভাবে জনপ্রিয় করে তুলছে আধুনিক কৃষি বাজারকে।
জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির কারণ –
জৈব খাদ্য (অর্গানিক ফুড) এর চাহিদা বৃদ্ধি
কারণ রাসায়নিক ফরমালিনের ব্যবহারে ক্যান্সার, মধুমেহ, হৃদ রোগ আরো অন্যান্য উপসর্গ ডেকে আনে। জৈব খাদ্য (অর্গানিক ফুড) হলো হরমোনবিহীন অথবা বিনা কীটনাশকে কৃত্তিম সারে তৈরী সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক স্বাদ বিশিষ্ট ও পুষ্টি গুন্ সমৃদ্ধ। এতে পরিবেশ মাটি বা জলের কোনো ক্ষতি হতে পারেনা।
কিভাবে এগ্রোটুরিজম শুরু করা যায় ?
কৃষি পর্যটন মূলত জমি নির্ভর যেখানে পুকুর, গবাদি পশু, পর্যটকদের জন্য থাকার ব্যবস্থা করা যায়। তবে কন্ট্রাক্চুওয়াল ফার্মিং বিকল্প করা যেতে পারে। ফার্ম বা খামার প্রতিষ্টার পর দরকার সোশ্যাল মিডিয়া প্রচার। এরপর থাকে বিভিন্ন খাতে ইনকাম বা আয়ের সুযোগ । গ্রাম্য পরিবেশের সাথে আধুনিক পরিষেবা, অফ সিজন এ জেলি, সস, আচার তৈরী করে তা অনলাইন অফলাইন বিক্রয়, রুমস্টে, প্রবেশ টিকিট, সামাজিক ও বিবাহ অনুষ্ঠান হিসাবে ভাড়া দেওয়া, ক্যাটারিং এমনকি পরবর্তীতে স্থায়ী ফার্ম প্রতিষ্ঠার পর স্পা, পার্লার, আয়ুর্বেদ চিকিৎসা এমন অনেক কিছু উন্মুক্ত করা যেতে পারে।

- এগ্রোটুরিজম উল্লেখযোগ্য কিছু সামাজিক দায়িত্ব বহন করে। যেহেতু এটি কৃষি ভিত্তিক তাই বেশ অনেক জায়গা জুড়ে এর অবস্থিতি হলে সবথেকে বেশি লাভবান হতে পারে সেই গ্রাম। ব্যাবসার শ্রম ও কারিগর এখানে মূলত এলাকাবাসী। উন্নত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরী অনেক বেশি পরিমান অথচ নির্ভেজাল এই সবজির বাজার মূল্য বেশি থাকায় কৃষক এখানে তার শ্রমের প্রকৃত মূল্য পেয়ে থাকে। কৃষি চাষের পাশাপাশি মাছ হাঁস মুরগি ছাগল প্রতিপালনে গ্রামের মহিলারাও যুক্ত থাকে। এভাবে একটি স্থানের আর্থ সামাজিক মূল্য অনেকগুন বেড়ে যায়।
- লার্নিং উইথ নেচার -বর্তমানে শিক্ষা ব্যাবস্থার মধ্যে একটি নতুন অপরিহার্য্য শর্ত যুক্ত হয়েছে – আর তা হলো প্রকৃতির সাথে শেখা। পর্যটন শিল্পে যখন গ্রামীণ পরিষেবায় প্রকৃতির থেকে স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরা বীজ বপন থেকে একটি গাছের বেড়ে ওঠা ,ফলফুল আসা প্রত্যখ্য করতে পারে তখন জীবনের প্রতি এক নতুন মূল্যবোধের দৃষ্টি তৈরী হয় যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মূল্যবান সম্পদ।
- শহুরে জীবনে হাজারো ব্যাস্ততার মাঝে নির্মল পরিবেশে দুদিনের ফার্ম স্টেইং বাকি দিন গুলোতে এক্সট্রা অক্সিজেন দিতে পারে। গ্রামীণ সংস্কৃতির সাথে পরিচয় ঘটার পাশাপাশি চাষির কষ্টলব্ধ ফসল ফলানোর প্রক্রিয়া এক অন্যরকম মূল্যায়ণ এনে দিতে পারে।
- যেহেতু জৈব সার ও কীটনাশকবিহীন খাবার তা ফল সবজি ডিম্ মাছ বা মাংস হোক – তাতে জমি বা পরিবেশের কোনোরকম ক্ষতি হতে পারেনা। কৃষিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক কি পরিমান পরিবেশ দূষণের জন্য তা বলাবাহুল্য। সুতরাং পরিবেশগত দিক ও এখানে সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারী অনুদান
ভারত ও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিভিন্ন সরকারি অনুদান ও প্রকল্প – কৃষক বন্ধু, পিএম কিষান, বাংলা শস্য বিমা, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, কিষান ক্রেডিট কার্ড এইরকম সরকারি অনুদান এক্ষেত্রে সাহায্য করে থাকে।
পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে একটি এগ্রো-ট্যুরিজমের আলোচনা, ঠিকানা, ফোন নম্বর
সৃজনী এগ্রো ফাউন্ডেশন :-
মেদিনীপুরে লাল পাথুরে মাটির দেশে ২০২৪ সালে অধ্যাপক ডক্টর প্রশান্ত কুমার দাস শুরু করেন সৃজনী এগ্রোফার্ম যা আজ কয়েকশ গ্রামবাসীর রোজগারের পথ। এই ইন্টিগ্রেটেড ফার্ম ৪০ বিঘা জমির ওপর এক রিসোর্ট প্রজেক্ট ও বলা যায়। কারণ এখানে কৃষি শিক্ষার সাথে কৃষি পর্যটনও অঙ্গাঙ্গী ভাবে যুক্ত। শুরুতে অন্নুনত জায়গা, রুক্ষ মাটি ছিল সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ। তাই পরিবেশ অনুকূল বিভিন্ন প্রকার মশলা, মেডিসিনাল প্লান্ট, বিভিন্ন ফল-সবজি অর্থাৎহর্টি কালচার দিয়ে ফাউন্ডেশনের শুভারম্ভ হয় । ক্রমশ আম, কুল, মুসম্বি, পেয়ারা, পেঁপে, ড্রাগন ফল এর চাষ এর মাধ্যমে ব্যাপক হারে বিস্তার লাভ করে। উদাহরণ স্বরূপ ৫বিঘা কুল চাষে ৪০০০০ টাকা এবং কেজি প্রতি ৭০-৮০ টাকা পাওয়া যায়। মেদিনীপুর অঞ্চলে ফলের চাষ কম হওয়ায় মূল্য স্বভাবতই বেশি পাওয়া যায়। জমিতে আম গাছ রোপনের পর তার ফলন সময় তিন বছর ধরে নিলে সেখানেইন্টিগ্রেটেড ক্রপিং এর মাধ্যমে পেঁপে-গাছ লাগিয়ে তিন-ছয় মাসের মধ্যে গাছ প্রতি ২৫-৩০কেজি পেঁপে পাওয়া যায়। যার পাইকারি বাজার দাম ৪৫-৫০ টাকা। তেমনি ওল এর ইন্টারক্রপিং লেবু চাষ। এইভাবে ইন্টিগ্রেটেড ফার্মিং দ্বারা বিভিন্ন সবজি দিয়ে একই জমিকে সর্বাধিক ব্যবহার করে মুনাফা করা যায়। এছাড়া টুরিস্টদেড় জন্য এখানে বাগানের টাটকা সবজি ভুড়িভোজে অন্তর্ভুক্ত করা হয় । তাছাড়াও নার্সারী ম্যানেজমেন্ট এর ক্ষেত্রে ভিসিটরদের জন্য অর্গানিক গাছ তৈরী থাকে যারা বাড়িতে নিয়ে যেতে চান। কারণ অর্গানিক ফার্মিং এ ফল ও সবজির স্বাদ, চেহারা ও রং বাজার চলতি সবজির থেকে ভিন্ন হয়। Raise Your Concern About this Content

বাঙালির বিশেষ বিশেষ দিন গুলোতে যেমন বসন্ত উৎসব, পয়লা বৈশাখ, দোল, পুজোর মতো সামাজিক অনুষ্ঠানে পর্যটকরা এখানে সদলবলে অথবা পরিবারের সাথে অংশগ্রহণ করে থাকে। প্রকৃতির সান্নিধ্য, গ্রাম্য সংস্কৃতি, মাড হাউস এর মতো হারিয়ে যাওয়া শিল্প, চালের রুটি, ব্যাম্বো চিকেন, পান্তা, ট্রাইবাল ফুড, সরুচাকলি, ব্ল্যাক রাইস সব মিলিয়ে টুরিস্ট এখানে শহুরে ব্যাস্ত জীবন ভুলে এক লাইফ টাইম এক্সপেরিয়েন্স এর স্বাদ নিয়ে যেতে পারে। সমৃদ্ধ কৃষি সুখী জীবন এদের মূল বক্তব্য যা আধুনিক কৃষি ও জৈবিক কৃষিকে বাস্তবায়িত করে জীবন ও জীবিকার মাধ্যমে কয়েক গুন্ বেশি উন্নত জীবন লাভ করা সম্ভব।
সৃজনী আগ্রো ফাউন্ডেশন এ কোনো ইচ্ছুক ব্যাক্তির জমি বা প্রশিক্ষয়ন বা ম্যান পাওয়ার না থাকলেও কন্টাক্ট ফার্মিং সুবিধা দান করে। এছাড়াও ১৫দিন – এক মাস এখানে থেকে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে এই ফার্মিং এ সিদ্ধান্ত নেবার পর সৃজনী গাইড লাইন হিসাবে কাজ করে থাকে। সাথে আছে ইন্টার্নশীপ, ক্যাম্পিং, স্টেইং, ডেস্টিনেশন ওয়েডিং ইত্যাদি।
ঠিকানা : সৃজনী এগ্রো ফাউন্ডেশন
দেলুয়া, মেদিনীপুর সদর, পশ্চিমবঙ্গ
ফোন – ৯১২৬৫৮৩৬৭০
তথ্য সূত্র :
১) পশ্চিমবঙ্গে এগ্রোটোরিসম
২) ইন্টিগ্রেটেড ফার্মিং
৩) এগ্রিকালচার ডায়েরি
৪) পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যৎ এগ্রটুরিজম
৫) এইসময়
৬) উত্তরণ কৃষি


