অক্ষয় তৃতীয়া কি এবং কি তার মাহাত্ম্য? কেনো বাঙালির বারো মাসের তেরো পার্বনের মধ্যে এর গুরুত্ব অপরিসীম? জানতে পারলে চমকে যেতেই হবে। কারণ এই অতি শুভ দিনটি কেনো এতো মাঙ্গলিক, তা অনেকের কাছেই অজানা। তাই জেনে নেওয়া যাক দিনটির বিশেষত্ব।
অক্ষয় তৃতীয়া শব্দ-অর্থ যার ক্ষয় নেই। শুভ কর্ম বা অশুভ কর্ম যাই হোক না কেন, এই দিনে তা সংঘটিত হলে, তার প্রভাব অবিনশ্বর অক্ষয় ভাবে বিরাজ করে। বৈশাখ মাসের শুক্লপক্ষের তৃতীয়া তিথিতে এই শুভ দিনটি অনুষ্ঠিত হয় বলে এর নাম অক্ষয় তৃতীয়া। হিন্দু ধর্মে অক্ষয় তৃতীয়ার গুরুত্ব অপরিসীম। এই বিশেষ দিনে গঙ্গাস্নান, পূজা, দেব প্রতিষ্ঠা, বিবাহ, দান-ধ্যান সহ বিভিন্ন পারলৌকিক ক্রিয়াও অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। হিন্দু ধর্মের পাশাপাশি জৈন ধর্মেও এর গুরুত্ব অপরিসীম।
অক্ষয় তৃতীয়া শব্দটি এসেছে সংস্কৃত শব্দ অক্ষয় অর্থাৎ যার ক্ষয় নেই, অবিনশ্বর এবং ত্রিত্য অর্থাৎ তৃতীয় দিন। জেনে নেওয়া যাক এই অক্ষয় তৃতীয়ার পৌরাণিক ইতিবৃত্ত।
মহাভারত কথা
আমরা সবাই জানি যে মহাভারতে কৌরবদের কাছে পাশা খেলায় হেরে যাওয়ার জন্য পান্ডবদের বারো বছরের বনবাস ও এক বছরের অজ্ঞাতবাস ঘটেছিল। তাদের বনবাসে থাকার সময় দূর্বাসামুনী এই দিন রাতে পান্ডবদের আশ্রয় গ্রহণ করতে চান। কিন্তু সেসময় যথাযথ অন্ন সংস্থান না থাকায় মুনীবরের অভিশাপের ভয়ে দ্রৌপদী ভীত হন। এই পরিস্থিতিতে আশঙ্কিত হয়ে নিরুপায় দ্রৌপদী শ্রীকৃষ্ণের শরণাপন্ন হলে হাড়িতে, তলায় লেগে থাকা একটি মাত্র চালের দানা শ্রীকৃষ্ণ খেয়ে নেন। আর তাতেই পেট ভরে যায় দুর্বাসামুনী ও তাঁর শিষ্যদের। ফলত শ্রী কৃষ্ণের দ্বারা দুর্বাসার অভিশাপের হাত থেকে রক্ষা পান পাণ্ডবরা।
পরশুরাম জয়ন্তী/আখ্যা তীজ -কথিত আছে যে এই পবিত্র দিনেই বিষ্ণুর ষষ্ঠ অবতার পরশুরাম জন্মগ্রহণ করেছিলেন তাই দিনটিকে পরশুরাম জয়ন্তী হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে।
কথিত আছে যে মহা-ঋষি ব্যাসদেব এই দিনেই মহাভারত রচনা শুরু করেন। স্বয়ং ভগবান গণেশ দ্বারা লিখিত এই মহাকাব্য পঞ্চম বেদ নামে অভিহিত।
গঙ্গার মর্ত্যে আরোহন – কথিত আছে যে এই পবিত্র দিনে রাজা ভগিরথের প্রার্থনা পূরণের ফলস্বরূপ ভগবতী গঙ্গা এই পৃথিবীতে তাঁর যাত্রা শুরু করেন। শীতকালীন তুষারাবৃত দীর্ঘ ছয় মাস পর এই দিনেই কেদার বদ্রী গঙ্গোত্রী যমুনোত্রী এই চার-ধামের মন্দির দর্শনার্থীদের জন্য খোলা হয়ে থাকে। আবার রথযাত্রায় জগন্নাথ দেবের রথ নির্মাণ কার্যও শুরু হয়।
নতুন যুগের সূচনা – প্রবাদ আছে যে অক্ষয় তৃতীয়ার দিনে সত্য যুগ শেষ হয়ে ত্রেতা যুগের সূচনা হয়।
কুবের দেবতার তপস্যায় তুষ্ট হয়ে মহাদেব তাঁকে প্রচুর ঐশ্বর্য সমৃদ্ধি দান করেন। তাই মনে করা হয় এই দিনেই ভগবান কুবের, লক্ষী লাভ করেছিলেন।
শ্রীকৃষ্ণের বন্ধু সুদামা কৃষ্ণকে অন্ন-ভোগ নিবেদনের দ্বারা আশীর্বাদ প্রাপ্ত হন এই দিনে।
জৈন ধর্ম অনুযায়ী এই দিন তীর্থঙ্কর ঋষভনাথ উপবাস ভঙ্গ করেন আখের রস দ্বারা। এই দিন শ্রী রাম ঠাকুরের তিরোধান দিবসও উদযাপিত হয়।
শ্রীজগন্নাথের চন্দন যাত্রা এই দিনে নরেন্দ্র সরোবর এ চন্দন প্রলেপ দ্বারা শ্রী জগন্নাথের স্নানযাত্রা এবং নৌকা বিহার করানো হয়। যা চন্দন যাত্রা নামে উল্লেখিত।অক্ষয় তৃতীয়ার দিন প্রতি বছর পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে চন্দন যাত্রা উৎসব অনুষ্ঠিত হয় প্রায় ৪২ দিনের এই উৎসব চলাকালীন প্রথম ২১ দিন পঞ্চপান্ডব যা পাঁচটি শিবলিঙ্গ হিসাবে দেবতাদের প্রতিনিধি মূর্তি তাদের সুসজ্জিত করা হয়। এবং শোভাযাত্রা সিংহদ্বার থেকে নরেন্দ্র তীর্থ জলাধার পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়। শ্রী জগন্নাথ বলরাম এবং সুভদ্রাকে সাজানো রাজকীয় নৌকায় সন্ধ্যাবেলা জলাশয় ভাসানো হয়।
Reference : টাইমস অফ ইন্ডিয়া
নবদ্বীপ ধামে ও কলকাতা গৌড়ীয় মঠে তিন দিন ধরে চলে চন্দন যাত্রা। অক্ষয় তৃতীয়ার এই দিনে শ্রী নবদ্বীপ ধামের শ্রী কেশবজী গৌড়ীয় মঠের বৈষমরা উৎসব আয়োজন করেছিলেন। বলা হয় এই তিথিতে প্রতিষ্ঠিত যে কোন ব্রত অবিনশ্বর সেই কারণে ত্রিলা ভক্তি প্রজ্ঞান কেশব গোস্বামী মহারাজ শ্রীভক্তিবেদান্ত স্বামী মহারাজ ১৯৪১ সালে ত্রিলা গৌড়ীয় বেদান্ত সমিতি প্রতিষ্ঠার জন্য এই দিনটি বেছে নিয়েছিলেন। উৎসবের সকালে মঙ্গল আরতি এবং প্রাতঃ মন্ত্র পাঠ এবং কীর্তন অনুষ্ঠান দ্বারা সম্পাদিত হয়। মায়াপুরের বিভিন্ন মঠ এবং নবদ্বীপে স্ত্রী দেবানন্দ গৌড়ীয় মঠ শ্রীচৈতন্য সরস্বত মঠ মহাপ্রসাদের জন্য ৩০০ কিলো চাল ১৫০ কিলো দই ৫০ কিলো দই এবং বারোশো মিষ্টির আয়োজন করা হয়ে থাকে। বিগ্রহ তে চন্দনের প্রলেপ মাখিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় গঙ্গার ঘাটে। এরকম মণিপুর অঞ্চলের অণু মহাপ্রভুর মন্দিরে কদমতলা ঘাটে মাধব দাস বাবাজির আশ্রমে বড় আখড়া ও ছোট আখড়ায় মনি বাবা আশ্রমে চন্দন যাত্রা অনুষ্ঠিত হয়।
কলকাতা গৌড়ীয় মঠ বাগবাজারে একমাস ধরে নগর সংকীর্তন শোভাযাত্রা হয় শ্রীকৃষ্ণের চন্দন যাত্রা উদযাপন যা অক্ষয় তৃতীয়া থেকে শুরু হয়ে ২১ দিন ধরে চলে। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ চন্দনও ফুল দিয়ে সুন্দর ভাবে সজ্জিত ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে দর্শন লাভের জন্য মন্দির প্রাঙ্গণে সমবেত হন।

প্রদীপ কলা নারকেল মিষ্টি সুপারি দিয়ে পূজা এবং আখের রস দ্বারা উপোস ভঙ্গ করা হয়। ঠিকানা – ১৬/a , গিরীশ মঞ্চের বিপরীতে ,বাগবাজার। ফোন: (+৯১) ৮০১৭৬২৭০৫৪
এই দিন বিষ্ণু ও মহালক্ষ্মী পূজাও হয় বিষ্ণুর সহস্রনাম এবং বিষ্ণুর চালিশা পাঠ করা হয়।
দশমহাবিদ্যা – স্বয়ং শিব যখন তার তান্ডব নৃত্য দ্বারা ধ্বংস লীলায় মেতে ওঠেন তখন জানা যায় সেই অগ্নি থেকে দেবী ধুমাবতীর আবির্ভাব ঘটে এই দিনে।
বিষ্ণু পুরাণে আছে, পান্ডবদের মধ্যে প্রধান যুধিষ্ঠির যিনি ধর্ম সত্যের প্রতীক ছিলেন তাকে এই অক্ষয়-পাত্র দান করেছিলেন স্বয়ং সূর্যদেব – যখন তারা বনবাসে ছিলেন। এই অক্ষয়পাত্র তারই আশীর্বাদের প্রতীক রূপে বিবেচিত হয়।
ভারত-বর্ষের বিভিন্ন স্থানে গঙ্গার পবিত্র ঘাট, হরিদ্বার, বারানসিতে হাজার হাজার ভক্তগণ পবিত্র স্নানের জন্য আসেন। এটা মনে করা হয়ে থাকে যে এই দিন সোনা এবং রুপা কিনলে তা একটি শুভ ভাগ্যদায়-সূচক কারণ এই প্রতিটি প্রভাবই অক্ষয় রূপে বিস্তার লাভ করে।
উড়িষ্যায় ভগবান জগন্নাথের রথ যাত্রার জন্য নির্মিত রথ কার্য শুরু হয় এই দিনে। উত্তর প্রদেশে বৃন্দাবনে বাঁকে বিহারী মন্দিরে শ্রীকৃষ্ণের চরণ যুগল দর্শনের সুযোগ মেলে। মহারাষ্ট্রে মহিলারা হলদি এবং কুমকুম আদান-প্রদান করে বৈবাহিক আশীর্বাদ এবং একতা প্রার্থনা করেন ভগবতি গৌরীর কাছে। পশ্চিমবঙ্গেও লক্ষ্মী এবং গণেশ পুজো করা হয় এই দিনটি তে সোনা রুপা এবং এবং অন্যান্য মূল্যবান সম্পদ ক্রয় করা হয়ে থাকে সৌভাগ্যবৃদ্ধি জন্য।
ব্যবসায়িক দিক থেকে অক্ষয় তৃতীয়ার গুরুত্ব অপরিসীম এই দিন অনেক ব্যবসায়ীরাই তাদের নতুন হিসাব পত্র হালখাতা শুরু করেন, ভগবান গণেশের থেকে আশীর্বাদ চান এবং ভগবতী লক্ষ্মীর থেকে তার স্থায়িত্ব কামনা করেন। অক্ষয় তৃতীয়ায় প্রতিটি শুভ কর্মের প্রভাব যেমন অক্ষয় রূপে বিরাজ করে তেমনি অশুভ কর্মের প্রভাবও বিরাজ করে। তাই এই দিনে কোন কটু কথা,কোনরকম ঝগড়া,কারও ক্ষতি করা,অকারণ সম্পদ নষ্ট,ধার দেওয়া,গাছ কাটা নিষিদ্ধ।
এবছরের (ইং ২০২৫) নির্ঘন্ট:
আগামী ৩০শে এপ্রিল বাংলায় ১৬ই বৈশাখ অক্ষয় তৃতীয়ার শুভ তিথি পরেছে এই তিথি ২৯ শে এপ্রিল সন্ধ্যা ৮টা ২২ থেকে ৩০শে এপ্রিল ছটা ১০ পর্যন্ত থাকবে। সোনা কেনার শুভ সময় থাকবে৩০ শে এপ্রিল সকাল ৫:৪১ থেকে বেলা দুটো বারো পর্যন্ত।লক্ষ্যি নারায়ণ পূজায় হলুদ বস্ত্র,বিষ্ণুর সহস্র নাম ও চালিশা পাঠ শুভ মঙ্গলকারী প্রভাব নিয়ে আসে ভক্তদের জীবনে। তাই এই বৈশাখী তৃতীয়া কোনো সাধারণ তৃতীয়া নয় বরং অসাধারণ তাৎপর্য্যপূর্ণ অক্ষয় শুভ ফলধারী একটি মহাপবিত্র দিন।
তথ্যসূত্র :
একাধারে সাংবাদিকতা, মানবসম্পদ ও সৃজনশীল মিডিয়ায় সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা নিয়ে দীপান্বিতা আজ এক বহুমুখী লেখিকা। অনলাইন প্রকাশনা, ফিচার রচনা এবং স্ক্রিপ্ট উন্নয়নের ক্ষেত্রে তার অভিজ্ঞতা তাকে তীক্ষ্ণ সম্পাদকীয় দৃষ্টিভঙ্গি এবং গল্প বলার এক অনন্য দক্ষতা প্রদান করেছে। গণ সংযোগ ও মানবসম্পদ উন্নয়নে স্নাতকোত্তর দীপান্বিতা ডকুমেন্টারি স্ক্রিপ্টিং, ব্র্যান্ড স্টোরিটেলিং এবং গভীর গবেষণামূলক লেখায় এক উল্লেখনীয় অবদান রেখেছেন। প্রভাবশালী ব্লগ থেকে শুরু করে আকর্ষণীয় সামাজিক মাধ্যমের কনটেন্ট, বিভিন্ন শ্রেণীর পাঠকদের চাহিদা অনুযায়ী তার লেখনী শৈলী সবক্ষেত্রেই অনন্য। বিশ্ব বাংলায় তাঁর কাজ স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার প্রতি দৃঢ় প্রতিশ্রুতির এক প্রতিফলন।


