ভারতীয় নবজাগরণের ইতিহাসে এমন কিছু নাম রয়েছে, যাঁরা কেবল তাঁদের সময়কে প্রভাবিত করেননি, সময়ের সীমা অতিক্রম করে হয়ে উঠেছেন চিরন্তন প্রেরণা। স্বামী বিবেকানন্দ সেই বিরল মহাপুরুষদের অন্যতম। মাত্র ঊনচল্লিশ বছরের জীবনে তিনি ভারতীয় আধ্যাত্মিকতা, মানবতাবাদ ও আত্মবিশ্বাসের যে দীপ্ত বার্তা বিশ্বদরবারে পৌঁছে দিয়েছিলেন, তার প্রভাব আজও অমলিন। অথচ তাঁর এই উজ্জ্বল জীবনের সমাপ্তি ঘিরে রয়ে গেছে গভীর রহস্য, বিস্ময় ও আধ্যাত্মিক কৌতূহল।
১৯০২ সালের ৪ জুলাই বেলুড় মঠে তাঁর মহাপ্রয়াণ শুধু এক ব্যক্তির মৃত্যু ছিল না; ছিল একটি যুগের নীরব অবসান। চিকিৎসাবিদ্যার ভাষায় তাঁর মৃত্যু ব্যাখ্যা করা গেলেও, শিষ্য ও অনুরাগীদের বিশ্বাসে তা ছিল এক উচ্চতর আত্মিক উত্তরণ মহাসমাধি। স্বামী বিবেকানন্দ নিজেই কি আগাম বুঝে গিয়েছিলেন তাঁর অন্তিম সময়? শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের ভবিষ্যদ্বাণী কি এই মহাপ্রয়াণের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে মিলে যায়? ভগিনী নিবেদিতার স্বপ্ন, স্বামীজির পূর্বোক্ত বাক্য, শেষ দিনের ঘটনাবলি সব মিলিয়ে তাঁর দেহত্যাগ আজও ইতিহাস ও আধ্যাত্মিকতার সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা এক অনির্ণেয় প্রশ্ন।
স্বামীজির নিজের উপলব্ধি
“আমার শরীর আত্মাকে আর ধারণ করতে পারছে না” স্বামী বিবেকানন্দের জীবনচরিত ঘাঁটলে দেখা যায়, তিনি নিজেই তাঁর স্বল্পায়ু সম্পর্কে সচেতন ছিলেন। স্বামী অভেদানন্দ তাঁর গ্রন্থ “Swami Vivekananda: A Biography”-তে উল্লেখ করেছেন, স্বামীজি তাঁকে স্পষ্ট করে বলেছিলেন, “আমি আর বড়জোর পাঁচ বছর বাঁচব।” তাঁর বিশ্বাস ছিল, তাঁর আত্মা ক্রমশ এতটাই বিস্তৃত হয়ে উঠেছে যে, এই জড় শরীর তাকে আর ধারণ করতে পারছে না। যোগ ও বেদান্ত দর্শনের ভাষায়, এটি এক উচ্চতর চৈতন্য স্তরে পৌঁছনোর ইঙ্গিত।
শ্রীরামকৃষ্ণের ভবিষ্যদ্বাণী
স্বামী বিবেকানন্দের মৃত্যুকে ঘিরে যে রহস্য আরও ঘনীভূত হয়, তার অন্যতম কারণ শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের একটি বহুল উদ্ধৃত উক্তি। “শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত”-এ পাওয়া যায় সেই প্রসঙ্গ, যেখানে ঠাকুর বলেছিলেন, “নরেন যেদিন বুঝবে তার কাজ শেষ, সেদিন সে নিজেই চলে যাবে।” এই বাক্যটি যেন স্বামীজির জীবনের অন্তিম অধ্যায়ের এক ভবিষ্যদ্বাণীতে পরিণত হয়। শিষ্যদের বিশ্বাস, স্বামীজি বুঝেছিলেন ভারত ও বিশ্বের কাছে তাঁর বার্তা পৌঁছে গেছে, এবার তাঁর দেহত্যাগের সময়।
শেষ ভোজন ও নীরব বিদায়
ভগিনী নিবেদিতা তাঁর স্মৃতিকথা “The Master as I Saw Him”-এ স্বামীজির শেষ দিনগুলির একাধিক অন্তরঙ্গ বর্ণনা দিয়েছেন। মৃত্যুর মাত্র দু’দিন আগে, ২ জুলাই, স্বামী বিবেকানন্দ নিজ হাতে তাঁকে অত্যন্ত স্নেহভরে খাইয়েছিলেন। তখন বিষয়টি সাধারণ বলেই মনে হয়েছিল। কিন্তু পরে নিবেদিতা উপলব্ধি করেন এ ছিল গুরুর শেষ আশীর্বাদ, শেষ বিদায়।
সময়ের আশ্চর্য মিল
৪ জুলাই রাতের এক ঘটনা স্বামী বিবেকানন্দের প্রয়াণকে ঘিরে থাকা রহস্যকে আরও গভীর করে তোলে। ভগিনী নিবেদিতা সেদিন স্বপ্নে দেখেন শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব আবার দেহত্যাগ করছেন। আশ্চর্যজনকভাবে, ঠিক রাত ৯টা ১০ মিনিটে যখন স্বামীজির মহাপ্রয়াণ ঘটে, সেই একই সময়ে নিবেদিতা এই স্বপ্নটি দেখেন। নিবেদিতা নিজেই লিখেছেন, এই সমাপতন তাঁর জীবনের অন্যতম গভীর আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা।
ঝড়ের আগের নীরবতা
স্বামী বিবেকানন্দের শেষ দিনটি ছিল বিস্ময়করভাবে স্বাভাবিক। ভোরে উঠে দীর্ঘক্ষণ ধ্যান, তারপর ছাত্রদের ব্যাকরণ ও দর্শনের পাঠ। গঙ্গার ঘাটে গিয়ে মাঝিদের নৌকা থেকে টাটকা ইলিশ মাছ কিনে আনা এই ঘটনাটি “Life of Swami Vivekananda” গ্রন্থেও উল্লেখ রয়েছে। দুপুরে সকলের সঙ্গে আনন্দ করে ইলিশের নানা পদে আহার করেন তিনি। কিন্তু বিকেলে হঠাৎ করেই মঠের একটি নির্দিষ্ট স্থান দেখিয়ে বলেন, “আমার দেহ গেলে ওখানেই সৎকার করিস।” আজ সেই স্থানেই দাঁড়িয়ে আছে স্বামী বিবেকানন্দের স্মৃতিমন্দির যেন তাঁর কথার অমোঘ বাস্তবায়ন।
চিকিৎসাবিদ্যার ব্যাখ্যা
স্বামী বিবেকানন্দ একাধিকবার বলেছিলেন, তিনি ৪০ বছর বয়স অতিক্রম করবেন না। বাস্তবে তাঁর প্রয়াণকালে বয়স হয়েছিল ঠিক ৩৯ বছর ৫ মাস ২৫ দিন। এই নিখুঁত সময়গত মিল তাঁর জীবনকে ঘিরে থাকা রহস্যকে আরও দৃঢ় করে।
Raise Your Concern About this Contentচিকিৎসকদের মতে, স্বামী বিবেকানন্দের মৃত্যুর কারণ ছিল মস্তিষ্কের রক্তনালী ফেটে যাওয়া। অতিরিক্ত কাজ, অনিদ্রা ও দীর্ঘদিনের শারীরিক অসুস্থতা এই অবস্থার জন্য দায়ী বলে ধরা হয়। কিন্তু তাঁর অনুগামী ও যোগসাধকদের বিশ্বাস ছিল ভিন্ন। তাঁদের মতে, স্বামীজি মহাসমাধি লাভ করেছিলেন। যোগশাস্ত্র অনুসারে, পরম সিদ্ধ পুরুষেরা ইচ্ছামৃত্যুর মাধ্যমে দেহত্যাগ করেন এবং সে সময় ব্রহ্মরন্ধ্র ভেদ হয় এই বিশ্বাস বহু প্রাচীন যোগগ্রন্থে পাওয়া যায়।
“আমি চল্লিশ ছুঁবো না”
সংক্ষিপ্ত আয়ু, অসীম প্রভাব
মাত্র ৩৯ বছরের জীবনে স্বামী বিবেকানন্দ বিশ্বকে দিয়ে গিয়েছেন এক অনন্য দার্শনিক উত্তরাধিকার। রাজযোগ, কর্মযোগ, জ্ঞানোযোগ ও ভক্তিযোগ এই চার পথকে তিনি আধুনিক ভাষায় বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছিলেন। ১৮৯৩ সালের শিকাগো ধর্মসভায় তাঁর ভাষণ ভারতকে বিশ্ব মানচিত্রে নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করে।
গ্রন্থপুঞ্জ
১. স্বামী বিবেকানন্দ: একটি জীবনী — স্বামী অভেদানন্দ
২. আমি যেমন দেখেছি গুরুদেবকে — ভগিনী নিবেদিতা
৩. স্বামী বিবেকানন্দের জীবন ও বাণী — ইস্টার্ন ও ওয়েস্টার্ন ডিসাইপলস (সংকলিত)
৪. শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত — মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত (শ্রী ‘ম’)
৫. স্বামী বিবেকানন্দ: এক ঐতিহাসিক মূল্যায়ন — রোমাঁ রোলাঁ
৬. স্বামী বিবেকানন্দ: জীবনচরিত — স্বামী গম্ভীরানন্দ
৭. বিবেকানন্দ: দেশ ও যুগ — শংকরীপ্রসাদ বসু
৮. স্বামী বিবেকানন্দ ও আধুনিক ভারত — রাধাকৃষ্ণান ভট্টাচার্য
৯. রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ ভাবধারা — স্বামী লোকেশ্বরানন্দ
১০. রাজযোগ — স্বামী বিবেকানন্দ
১১. কর্মযোগ — স্বামী বিবেকানন্দ
১২. জ্ঞানোযোগ — স্বামী বিবেকানন্দ
১৩. ভক্তিযোগ — স্বামী বিবেকানন্দ
১৪. Letters of Swami Vivekananda — স্বামী বিবেকানন্দ
১৫. The Life of Swami Vivekananda — তাঁর অনুগামী ও সন্ন্যাসীবৃন্দ



