back to top
19 C
Kolkata
Tuesday, 13 January, 2026

Buy now

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img

বাঙালির উৎসব-সংস্কৃতির অনন্য বাদ্যযন্ত্র

দুর্গা পূজার প্যান্ডেলে ঢাকিরা ঢাক বাজাচ্ছে || কৃতজ্ঞতা স্বীকার এডুইনডেক্স এরনিজস্ব ওয়েবসাইট ||

ঢাকের উৎস ও ইতিহাস

গবেষকরা মনে করেন, ঢাকের শিকড় আদিম সমাজে নিহিত। মানুষ যখন হিংস্র জন্তুকে তাড়াতে বা শত্রুর আগমন ঘোষণা করতে চাইত, তখনই ডঙ্কা, দুন্দুভির মতো বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করা হতো। ঢাক সেই ধারারই উত্তরসূরি বলা যেতে পারে।

‘ডঙ্কা’ থেকে ‘ঢাক’!

প্রাচীন গ্রন্থে ঢাকের উল্লেখ “ডঙ্কা” নামেই পাওয়া যায়। ধ্বনি-নির্ভর নামকরণের সূত্র ধরে “ডং ডং” শব্দ থেকে ডঙ্কা, সেখান থেকে ঢক্কা এবং পরিশেষে ঢাক নামের উদ্ভব ঘটে। নাট্যশাস্ত্র ও প্রাচীন পালি-প্রাকৃত সাহিত্যে এর প্রমাণ মেলে।

প্রত্ননিদর্শনের সাক্ষ্য

বাঙ্গালী ঢাকী || কৃতজ্ঞতা স্বীকার ডি সোর্স এর নিজস্ব ওয়েবসাইট ||

পাহাড়পুর মহাবিহার, ময়নামতীর ধ্বংসাবশেষ এবং সোমপুর মহাবিহারের ফলকচিত্রে ঢাকসদৃশ বাদ্যযন্ত্র দেখা যায়। যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাদের সমবেত করতে ও বিজয়ের ঘোষণা দিতে ঢাক অপরিহার্য ছিল।

গঠন ও প্রস্তুত প্রণালি

ঢাক সাধারণত কাঠের খোল, খাসির বা গরুর চামড়া, বাঁশ বা লোহার চাক, চামড়ার দড়ি ও পিতলের কড়া দিয়ে তৈরি হয়।

  • কাঠ: কড়ই, মান্দার, তবে আম কাঠ সর্বোত্তম ধরা হয়।
  • চামড়া: এক প্রান্তে মোটা গরুর/মহিষের চামড়া, অপর প্রান্তে ছাগলের পাতলা চামড়া ব্যবহৃত হয়।
  • টিউনিং ব্যবস্থা: চামড়ার দড়ি ও কড়া টেনে সুর ঠিক করা হয়।
    এই ঐতিহ্যবাহী প্রণালি আজও প্রায় অপরিবর্তিত আছে, যা ঢাকের স্বকীয় শব্দ ও অনুরণন তৈরি করে।

ঢাকের প্রকারভেদ

  • ঢাক: সাধারণ আকারের, পূজা ও উৎসবে ব্যবহৃত।
  • জয়ঢাক: ঢাকের অতি বৃহৎ সংস্করণ; অনেক সময় লোহার পাত দিয়ে তৈরি।
  • বীরঢাক/বীরকালী: যুদ্ধোন্মুখ আবহ তৈরির জন্য বাজানো হতো; বর্তমানে পূজা বা আচারেও ব্যবহার হয়।

ঢাকের বাদনশৈলী

ঢাকি সাধারণত ঢাককে বাঁ কাঁধে ঝুলিয়ে বাজান।

ঢাকি বিটস ইমারসন || কৃতজ্ঞতা স্বীকার লাইফ ইস ভ্যাকেশন এর নিজস্ব ওয়েবসাইট
  • ডান হাতে মোটা কাঠি, বাঁ হাতে চিকন কাঠি ব্যবহার করে এক অনন্য ছন্দ সৃষ্টি হয়।
  • ঢাকের বোল যেমন ঢেমকুড়া কুড় কুড়, চড়াম চড়াম, বা টেট্টে না টেং, তা লোকমুখে ছড়ার মতো প্রচলিত।
  • দেবীর বোধন, আরতি, বিসর্জন—প্রত্যেক পর্বে আলাদা তাল ও ছন্দ বজায় রাখার নিয়ম ছিল।

বাংলা সংস্কৃতি ও ঢাক

ঢাক শুধু সঙ্গীত নয়, বরং বাংলার আধ্যাত্মিক ও সামাজিক জীবনের প্রতীক।

  • দুর্গোৎসব: ঢাক ছাড়া পূজা অচল। দেবীর আগমনী থেকে বিসর্জন পর্যন্ত ঢাক অপরিহার্য।
  • বলির প্রথা: পশুবলি বা সতীদাহের সময় করুণ আর্তচিৎকার আড়াল করতে ঢাক বাজানো হতো।
  • সামাজিক প্রচার: রাজআদেশ প্রচারের জন্য ঢাক বাজানো হতো। “ডক্কা মারা” বা “ঢাক পেটানো” প্রবাদ তাই প্রচলিত।
  • লোকউৎসব: নববর্ষের মঙ্গল শোভাযাত্রা, চৈত্রের গাজন, বিয়ে বা শোভাযাত্রা—সবখানেই ঢাক আবশ্যক।

বৃন্দাবন দাসের চৈতন্যভাগত: জয়ঢাক, বীরঢাকের উল্লেখ। হরিদেবের রায়মঙ্গল: রণসজ্জার বর্ণনায় ঢাক-ঢোল। মহাভারত: কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সূচনায় ডঙ্কার ধ্বনি। শিশুপাঠ্য: “আগডুম বাগডুম ঘোড়াডুম সাজে/ঢাক মৃদং ঝাঁঝর বাজে।” প্রবাদ: যেমন—“নিজের ঢাক নিজে পেটানো”, “ঢাক ঢাক গুড়গুড়”, “ধর্মের ঢাক বাতাসে বাজে।”

ঢাকি আরতি || কৃতজ্ঞতা স্বীকার লাইফ ইস ভ্যাকেশন এর নিজস্ব ওয়েবসাইট ||

লোকবিশ্বাস ও ঢাক

গাজনের ঢাক বাজলে শিমুল তুলোর ফল পাকে। চৈত্রের ঢাকে কাঠি পড়লে বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকে। ঝড়-তুফান থামাতে ঢাক বাজানোর বিশ্বাস প্রচলিত।

ঢাকের হাট

বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জে প্রায় ৫০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী “ঢাকের হাট” বসে। দুর্গাপূজার আগে ঢাকিরা এখানে ভিড় জমান এবং বায়না ঠিক করেন। এ আয়োজনকে ঘিরে গ্রামীণ লোকসংস্কৃতির এক বিশাল মিলনমেলা হয়।

ঢাক বিশ্বজনীন!

ধ্রুপদি যন্ত্রসংগীতের সঙ্গে ঢাক মিলিয়ে বাজানোর চেষ্টা হচ্ছে। নারী ঢাকিদের দলও গড়ে উঠছে, যা ঐতিহ্যের নতুন দিগন্ত। প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছে, যাতে ঢাক শিল্পচর্চা আরও সমৃদ্ধ হয়। তবে আধুনিক সাউন্ড সিস্টেম ও পাশ্চাত্য বাদ্যযন্ত্র ঢাকের গুরুত্ব কমিয়ে দিয়েছে। তরুণ প্রজন্মের অনীহাও একটি কারণ। তবু আত্মপরিচয় রক্ষায় এবং স্বদেশি সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে ঢাকের পুনর্জাগরণ জরুরি।

তথ্যসূত্র:

অদিতি সিংহ
অদিতি সিংহ
সম্পাদনা, সাংবাদিকতা, এবং সৃজনশীল লেখায় প্রায়োগিক অভিজ্ঞতা নিয়ে অদিতি এক উদীয়মান সাহিত্যিক কণ্ঠ। বাংলা সাহিত্যের প্রতি অগাধ ভালোবাসা এবং সুগভীর প্রতিভার অধিকারী এক তরুণ লেখিকা। বাংলা সাহিত্যে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করে, নিয়মিত বিভিন্ন পত্রিকা, ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল এবং সংকলনে তার লেখা প্রকাশ হয়েছে। তার লেখা একক বই এবং সম্পাদিত সংকলন কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় প্রকাশ পেয়েছে, তার “মৃত্যু মিছিল” বইটি পাঠকমহলে বেশ জনপ্রিয়। তার সৃষ্টিশীলতার প্রসার ঘটেছে আকাশবাণী এবং ফ্রেন্ডস এফএম-এ, যেখানে তার লেখা সম্প্রচারিত হয়েছে। অদিতির মতে, "বইয়ের থেকে পরম বন্ধু আর কেউ হয় না," এবং এই বিশ্বাস তাকে সাহিত্য জগতে প্রতিনিয়ত এগিয়ে নিয়ে চলেছে। বর্তমানে তিনি “বিশ্ব বাংলা হাব” -এ লেখক পদে কর্মরত।

প্রাসঙ্গিক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here
Captcha verification failed!
CAPTCHA user score failed. Please contact us!

সাথে থাকুন

110FansLike
105FollowersFollow
190SubscribersSubscribe
- বাংলা ক্যালেন্ডার -
- বিজ্ঞাপন -spot_img

সাম্প্রতিক