ভারতীয় উপমহাদেশের সঙ্গীত ঐতিহ্যে ঢাকের স্থান স্বতন্ত্র। বিশেষ করে বাঙালি সমাজে এ বাদ্যযন্ত্র উৎসব-পার্বণ, পূজা-অর্চনা, সামাজিক আচার এবং লোকউৎসবের অপরিহার্য অনুষঙ্গ। ঢাকের আওয়াজ শুধু ছন্দ সৃষ্টি করে না, এটি এক ধরনের সমষ্টিগত আনন্দ, উল্লাস এবং সামাজিক সংহতিরও প্রতীক। প্রাচীনকাল থেকে যুদ্ধক্ষেত্র, রাজকীয় অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে ধর্মীয় পূজা সব ক্ষেত্রেই ঢাক তার শক্তিশালী বোল ও ছন্দ দিয়ে পরিবেশকে প্রাণবন্ত করেছে।

ঢাকের উৎস ও ইতিহাস
গবেষকরা মনে করেন, ঢাকের শিকড় আদিম সমাজে নিহিত। মানুষ যখন হিংস্র জন্তুকে তাড়াতে বা শত্রুর আগমন ঘোষণা করতে চাইত, তখনই ডঙ্কা, দুন্দুভির মতো বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করা হতো। ঢাক সেই ধারারই উত্তরসূরি বলা যেতে পারে।
‘ডঙ্কা’ থেকে ‘ঢাক’!
প্রাচীন গ্রন্থে ঢাকের উল্লেখ “ডঙ্কা” নামেই পাওয়া যায়। ধ্বনি-নির্ভর নামকরণের সূত্র ধরে “ডং ডং” শব্দ থেকে ডঙ্কা, সেখান থেকে ঢক্কা এবং পরিশেষে ঢাক নামের উদ্ভব ঘটে। নাট্যশাস্ত্র ও প্রাচীন পালি-প্রাকৃত সাহিত্যে এর প্রমাণ মেলে।
প্রত্ননিদর্শনের সাক্ষ্য

পাহাড়পুর মহাবিহার, ময়নামতীর ধ্বংসাবশেষ এবং সোমপুর মহাবিহারের ফলকচিত্রে ঢাকসদৃশ বাদ্যযন্ত্র দেখা যায়। যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাদের সমবেত করতে ও বিজয়ের ঘোষণা দিতে ঢাক অপরিহার্য ছিল।
গঠন ও প্রস্তুত প্রণালি
ঢাক সাধারণত কাঠের খোল, খাসির বা গরুর চামড়া, বাঁশ বা লোহার চাক, চামড়ার দড়ি ও পিতলের কড়া দিয়ে তৈরি হয়।
- কাঠ: কড়ই, মান্দার, তবে আম কাঠ সর্বোত্তম ধরা হয়।
- চামড়া: এক প্রান্তে মোটা গরুর/মহিষের চামড়া, অপর প্রান্তে ছাগলের পাতলা চামড়া ব্যবহৃত হয়।
- টিউনিং ব্যবস্থা: চামড়ার দড়ি ও কড়া টেনে সুর ঠিক করা হয়।
এই ঐতিহ্যবাহী প্রণালি আজও প্রায় অপরিবর্তিত আছে, যা ঢাকের স্বকীয় শব্দ ও অনুরণন তৈরি করে।
ঢাকের প্রকারভেদ
- ঢাক: সাধারণ আকারের, পূজা ও উৎসবে ব্যবহৃত।
- জয়ঢাক: ঢাকের অতি বৃহৎ সংস্করণ; অনেক সময় লোহার পাত দিয়ে তৈরি।
- বীরঢাক/বীরকালী: যুদ্ধোন্মুখ আবহ তৈরির জন্য বাজানো হতো; বর্তমানে পূজা বা আচারেও ব্যবহার হয়।
ঢাকের বাদনশৈলী
ঢাকি সাধারণত ঢাককে বাঁ কাঁধে ঝুলিয়ে বাজান।

- ডান হাতে মোটা কাঠি, বাঁ হাতে চিকন কাঠি ব্যবহার করে এক অনন্য ছন্দ সৃষ্টি হয়।
- ঢাকের বোল যেমন ঢেমকুড়া কুড় কুড়, চড়াম চড়াম, বা টেট্টে না টেং, তা লোকমুখে ছড়ার মতো প্রচলিত।
- দেবীর বোধন, আরতি, বিসর্জন—প্রত্যেক পর্বে আলাদা তাল ও ছন্দ বজায় রাখার নিয়ম ছিল।
বাংলা সংস্কৃতি ও ঢাক
ঢাক শুধু সঙ্গীত নয়, বরং বাংলার আধ্যাত্মিক ও সামাজিক জীবনের প্রতীক।
- দুর্গোৎসব: ঢাক ছাড়া পূজা অচল। দেবীর আগমনী থেকে বিসর্জন পর্যন্ত ঢাক অপরিহার্য।
- বলির প্রথা: পশুবলি বা সতীদাহের সময় করুণ আর্তচিৎকার আড়াল করতে ঢাক বাজানো হতো।
- সামাজিক প্রচার: রাজআদেশ প্রচারের জন্য ঢাক বাজানো হতো। “ডক্কা মারা” বা “ঢাক পেটানো” প্রবাদ তাই প্রচলিত।
- লোকউৎসব: নববর্ষের মঙ্গল শোভাযাত্রা, চৈত্রের গাজন, বিয়ে বা শোভাযাত্রা—সবখানেই ঢাক আবশ্যক।
বৃন্দাবন দাসের চৈতন্যভাগত: জয়ঢাক, বীরঢাকের উল্লেখ। হরিদেবের রায়মঙ্গল: রণসজ্জার বর্ণনায় ঢাক-ঢোল। মহাভারত: কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সূচনায় ডঙ্কার ধ্বনি। শিশুপাঠ্য: “আগডুম বাগডুম ঘোড়াডুম সাজে/ঢাক মৃদং ঝাঁঝর বাজে।” প্রবাদ: যেমন—“নিজের ঢাক নিজে পেটানো”, “ঢাক ঢাক গুড়গুড়”, “ধর্মের ঢাক বাতাসে বাজে।”

লোকবিশ্বাস ও ঢাক
গাজনের ঢাক বাজলে শিমুল তুলোর ফল পাকে। চৈত্রের ঢাকে কাঠি পড়লে বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকে। ঝড়-তুফান থামাতে ঢাক বাজানোর বিশ্বাস প্রচলিত।
ঢাকের হাট
বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জে প্রায় ৫০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী “ঢাকের হাট” বসে। দুর্গাপূজার আগে ঢাকিরা এখানে ভিড় জমান এবং বায়না ঠিক করেন। এ আয়োজনকে ঘিরে গ্রামীণ লোকসংস্কৃতির এক বিশাল মিলনমেলা হয়।
ঢাক বিশ্বজনীন!
ধ্রুপদি যন্ত্রসংগীতের সঙ্গে ঢাক মিলিয়ে বাজানোর চেষ্টা হচ্ছে। নারী ঢাকিদের দলও গড়ে উঠছে, যা ঐতিহ্যের নতুন দিগন্ত। প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছে, যাতে ঢাক শিল্পচর্চা আরও সমৃদ্ধ হয়। তবে আধুনিক সাউন্ড সিস্টেম ও পাশ্চাত্য বাদ্যযন্ত্র ঢাকের গুরুত্ব কমিয়ে দিয়েছে। তরুণ প্রজন্মের অনীহাও একটি কারণ। তবু আত্মপরিচয় রক্ষায় এবং স্বদেশি সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে ঢাকের পুনর্জাগরণ জরুরি।
তথ্যসূত্র:
- বাংলার লোকবাদ্য – আশুতোষ ভট্টাচার্য
- লোকসংগীত ও লোকবাদ্য – সুকুমার সেন
- বাংলার লোকসংস্কৃতি – দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
- লোকসংস্কৃতির কথা – আশুতোষ ভট্টাচার্য
- বাংলার লোকজ বাদ্যযন্ত্র – প্রতাপচন্দ্র মজুমদার
- লোকসংগীত – সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়
- লোকসাহিত্য সমীক্ষা – দীনেশচন্দ্র সেন
- বাংলার লোকসংগীত – আশুতোষ ভট্টাচার্য
- লোকসংস্কৃতি ও সমাজ – অজিতকুমার ঘোষ
- লোকসংস্কৃতি ও লোকসাহিত্য – সুকুমার সেন



