কলকাতা — নামটি উচ্চারণ করলেই মনে পড়ে যায় পুরোনো হলুদ ট্রাম, কলেজ স্ট্রিটের ধুলো জমা বইয়ের গন্ধ, ভীড় ঠাসা বাসে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর কণ্ঠে রবীন্দ্রসংগীত, সন্ধ্যায় রাস্তার ধারে ফুচকা খাওয়ার সময় চায়ের কাপ হাতে কোনো রাজনৈতিক আলোচনা, আর দিগন্তবিস্তৃত এক আকাশ যার নিচে প্রতিটি মানুষ জীবনের নিজস্ব নাটক অভিনয় করে চলে।
এই শহরটি যেন শুধুই একটি ভৌগোলিক অবস্থান নয় — বরং একটি ভাবনা, একটি আবেগ, এবং একটি চলমান কবিতা। এখানে প্রতিটি অলিগলি একেকটি ইতিহাসের পাতা, প্রতিটি চায়ের দোকান একেকটি জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র, আর প্রতিটি নাগরিক যেন একেকজন যাত্রালগ্ন গল্পের চরিত্র।
জীবনের রঙ এখানে ধূসর নয়, রঙিন — কখনো গাঢ় লাল প্রতিবাদের, কখনো শান্ত সাদা চিন্তার, আবার কখনো নীলাভ ভালোবাসার। আর সেই জন্যই এই শহর শুধু ইতিহাস নয়, এটি আত্মার এক স্থায়ী ঠিকানা।
বাংলার কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কলকাতাকে নিয়ে লিখেছিলেন তাঁর বিখ্যাত কবিতায়:
“এই শহর জানে আমার প্রথম সব কিছু
প্রথম প্রেম, প্রথম কবিতা,
প্রথম ছোঁয়া প্রথম দুঃখ…”
এই কটি পঙক্তির মধ্যেই যেন ধরা পড়ে কলকাতার নিজস্বতা। এই শহর জানে তার সন্তানদের সমস্ত প্রথম অভিজ্ঞতা। সে শুধু জন্ম দেয় না, প্রতিটি মানুষকে স্নেহ করে, প্রতিটি অনুভবকে লালন করে। এই শহর সাক্ষী থাকে প্রেমের, বেদনার, বিদ্রোহের আর শ্রদ্ধার।
কলকাতাকে অনেকেই ভালোবাসে তার সাহিত্যিক ঐতিহ্যের জন্য, আবার অনেকে ঘৃণাও করে তার ধূলিধুসর চেহারার জন্য। কিন্তু কেউ তাকে উপেক্ষা করতে পারে না। কারণ, এই শহরটি জীবন্ত — এখানে রাস্তাঘাটও যেন কথা বলে, দেয়ালের পোস্টারও যেন বর্ণনা করে জনতার ইচ্ছা, আর রাতের নিঃশব্দতাও যেন চিৎকার করে বলে যায় জীবনের গান।

এই শহরের সবচেয়ে বড় পরিচয় — সে কখনও কাউকে ভুলে যায় না। ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে সে রচনা করে চলেছে এমন সব গল্প, যা শুধু বইয়ে নয়, মানুষের মুখে মুখে বেঁচে থাকে।
এবং তাই, যখন ফরাসি লেখক Dominique Lapierre এই শহরকে “City of Joy” বলেন, তখন তা শুধুই একটি রূপক নয়, বরং একটি নিখাদ সত্য। কারণ দারিদ্র্য, কষ্ট, বৃষ্টিভেজা ভাঙাচোরা রাস্তাগুলোর মধ্যেও এই শহর হেসে ওঠে — হ্যাঁ, আনন্দে, হ্যাঁ, গর্বে।
এই প্রবন্ধে আমরা জানার চেষ্টা করব এই শহরের সেই হাসির পেছনের ইতিহাস, সেই আনন্দের উৎস, আর বুঝব — কেন কলকাতা শুধু একটি শহর নয়, একটি অনুভূতির নাম।
“City of Joy” নামের উৎস কোথায়?
“City of Joy” — এই উপাধিটি বিশ্বব্যাপী পরিচিত হয় ডমিনিক ল্যাপিয়ের (Dominique Lapierre) নামক একজন ফরাসি সাংবাদিক ও লেখকের লেখা ১৯৮৫ সালের উপন্যাসের মাধ্যমে। বইটির নামই ছিল “The City of Joy”, যেখানে তিনি কলকাতার একটি গরিব বস্তির মানুষের জীবনচিত্র তুলে ধরেন।
বইটিতে “আনন্দনগর” নামক কাল্পনিক একটি বস্তির কথা বলা হলেও বাস্তবে এটি কলকাতার Pilkhana অঞ্চলের অনুপ্রেরণায় রচিত। উপন্যাসের প্রতিটি লাইনে উঠে আসে — দারিদ্র্য শুধু একটি অর্থনৈতিক অবস্থা নয়, বরং এটি এক রকম আত্মিক পরীক্ষাও। আর এই পরীক্ষায় বারবার জয়ী হয়ে ওঠে এখানকার মানুষ। সে কারণেই লেখক এই শহরকে ডাকেন “আনন্দের শহর” — City of Joy।
- ১৯৯২ সালে এই উপন্যাস অবলম্বনে একটি চলচ্চিত্র তৈরি হয়, যেখানে পল ল্যাম্বার্টের ভূমিকায় অভিনয় করেন Patrick Swayze।
- বইটির অর্থলাভের একটি বড় অংশই ল্যাপিয়ের ব্যবহার করেন কলকাতার দরিদ্র শিশুদের জন্য।
কলকাতা নামের উৎপত্তি
“কলকাতা” নামের উৎপত্তি নিয়ে রয়েছে নানা মত এবং কিংবদন্তি। এর মধ্যে কয়েকটি জনপ্রিয় ব্যাখ্যা নিচে তুলে ধরা হলো:
১. কালীঘাট ও কালীমা কেন্দ্রিক নামকরণ:
সবচেয়ে প্রচলিত ধারণা হলো, “কলকাতা” নামটি এসেছে “কালীকেতু” বা “কলিকাতা” থেকে, যা দেবী কালীকে কেন্দ্র করে গঠিত। কালীঘাট মন্দির এই অঞ্চলের প্রাচীনতম ও অন্যতম পবিত্র স্থান। তাই ধারণা করা হয়, “কালী”-র নামানুসারেই এই অঞ্চলের নাম “কলকাতা” হয়।
২. কৃষিভিত্তিক নাম:
আবার এক দল ইতিহাসবিদ মনে করেন, “কলকাতা” এসেছে “কল” (চুন বা quicklime) ও “কাতা” (কাটা বা তৈরির জায়গা) থেকে। এই অঞ্চলে একসময় প্রচুর চুন তৈরির কাজ হতো।
৩. সাহেবি উচ্চারণ ও ইংরেজদের প্রভাব:
১৬৯০ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিনিধি জব চার্নক এই অঞ্চলে এসে তিনটি গ্রাম — সুতানুটি, গোবিন্দপুর, ও কলিকাতা — একত্রিত করে প্রতিষ্ঠা করেন কোম্পানির বাণিজ্যকেন্দ্র। এরপরে ব্রিটিশরা “Calcutta” নামে শহরটিকে চিহ্নিত করতে শুরু করে। ২০০১ সালে, স্থানীয় সংস্কৃতিকে সম্মান জানাতে নাম পরিবর্তন করে “কলকাতা” রাখা হয়।
■ কলকাতা: সাহিত্যের রাজধানী

কলকাতা বাংলা সাহিত্যের স্বর্ণযুগের জন্মস্থল। এই শহর শুধু সাহিত্য সৃষ্টি করেনি, বরং সাহিত্যকে প্রাণ দিয়েছে। নিচে এই শহরের সাথে জড়িত কয়েকজন মহান সাহিত্যিকের কথা উল্লেখ করা হলো:
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর:
- জন্ম কলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে।
- বিশ্বকবির অসংখ্য কবিতা, গান, উপন্যাস কলকাতা কেন্দ্রিক।
- চোখের বালি, ঘরে বাইরে, নৌকাডুবি প্রভৃতি রচনায় কলকাতার অভিজাত সমাজচিত্র ফুটে উঠেছে।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়:
- কলকাতার প্রশাসনিক চাকরির অভিজ্ঞতা থেকেই তাঁর উপন্যাসে উঠে এসেছে ব্রিটিশ রাজের নির্মমতা ও হিন্দু সমাজের অন্তর্দ্বন্দ্ব।
সত্যজিৎ রায়:

- ফেলুদা সিরিজে কলকাতা নিজেই একটি চরিত্র।
- পথের পাঁচালীর মতো চলচ্চিত্রে তিনি গ্রামবাংলার পাশাপাশি কলকাতার শহুরে জীবনও তুলে ধরেছেন।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ, জয় গোস্বামী সহ অসংখ্য আধুনিক কবি ও লেখক কলকাতার কফিহাউসে বসেই সৃষ্টি করেছেন সাহিত্যের নতুন দিগন্ত।
বিদেশি সাহিত্যে কলকাতা
কলকাতা শুধু ভারতীয় সাহিত্যে নয়, বহু বিদেশি সাহিত্যেও প্রভাব ফেলেছে। বিদেশি লেখকদের বই যেখানে কলকাতা উঠে এসেছে:
- Dominique Lapierre – The City of Joy
- Amitav Ghosh – The Shadow Lines, Sea of Poppies
- Amit Chaudhuri – Calcutta: Two Years in the City
- Rudyard Kipling – Various short stories set in colonial Calcutta
- George Orwell – Though not directly centered, British Raj প্রসঙ্গে বারবার Calcutta-এর কথা এসেছে।

কলকাতা কেন আলাদা?
১. সাংস্কৃতিক কেন্দ্রবিন্দু:
- দুর্গাপূজা, কবিতা পাঠ, নাট্যোৎসব, বইমেলা — এই শহরে সারা বছর চলে উৎসবের ঝলক।
২. রাজনৈতিক সচেতনতা:
- স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম পীঠস্থান।
- নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, বিদ্যাসাগরের মত নেতাদের চারণভূমি।
- ১৯৬০ ও ৭০’র দশকে নকশাল আন্দোলনের কেন্দ্র ছিল এই শহর।
৩. মধ্যবিত্তের শহর:
- কলকাতা হলো এমন একটি শহর যেখানে মানুষের স্বপ্ন থাকে, চায়ের কাপে ঝড় ওঠে, আবার রিকশাওয়ালা আর অধ্যাপক একই টেবিলে বসে আলোচনা করে।
৪. শিক্ষা ও বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্র:
- প্রেসিডেন্সি কলেজ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ স্ট্রিট — এ সব জায়গা ভারতবর্ষের চিন্তা-ভাবনার সূতিকাগার।

কলকাতা একটুকরো মাটি নয়, এটি এক টুকরো মন। এটি এমন একটি শহর, যেখানে প্রতিটি গলির বাঁক ইতিহাসের গল্প বলে। এখানে ট্রামের ঘণ্টাধ্বনি যেন অতীতের স্মৃতিচিহ্ন, আবার কলেজ স্ট্রিটের বইয়ের গন্ধ যেন জ্ঞানের অমৃতসুধা। এখানে প্রতিটি ঋতু শুধু আবহাওয়ার নয়, অনুভূতিরও পালাবদল ঘটায়।
এ শহরের প্রাণ হলো মানুষ — যাদের চোখে ক্লান্তি থাকলেও, হাসিতে আশ্চর্য এক উচ্ছ্বাস থাকে। সেই মানুষগুলোর কাছ থেকেই শহরটি পেয়েছে তার আসল নাম — “City of Joy”। এক ফরাসি লেখকের কলমে উঠে আসা এই নাম আজ শুধু একটি শিরোনাম নয়, এটি একটি মানসিক অবস্থান, একটি দর্শন। কলকাতা মানুষকে শেখায় কীভাবে কমে থেকেও বেশিতে বাঁচতে হয়, কীভাবে কান্নার মধ্যে থেকেও হাসতে হয়।
এ শহর কখনো কবিতার মত কোমল, আবার কখনো বিপ্লবের মত আগুনমুখো। এখানকার দুর্গাপূজা শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি বাঙালির সম্মিলিত কল্পনার উৎসব; এখানকার বইমেলা শুধু বই কেনাবেচা নয়, বরং একটি বুদ্ধিবৃত্তিক চেতনার সমারোহ; এখানকার চায়ের দোকান কেবল চা খাওয়ার জায়গা নয়, বরং চিন্তার বৈঠকখানা।
কবি জয় গোস্বামী এক কবিতায় লিখেছিলেন:
“এই শহর আমাকে ছুঁয়ে দেয় প্রতিদিন,
আমি বুঝি, আমি একটা কবিতার মধ্যে হাঁটছি।”
হ্যাঁ, এই শহর ঠিক সেরকমই — আপনি এখানে হাঁটলে কবিতার মধ্যে হাঁটেন, ইতিহাসের মধ্যে হাঁটেন, সাহিত্যের মধ্যে হাঁটেন। এই শহর আপনাকে শুধু আশ্রয় দেয় না, আপনাকে প্রতিদিন একটু একটু করে গড়ে তোলে, এক একটি গল্পে পরিণত করে। কলকাতার গল্প শেষ হয় না — কারণ এটি প্রতিদিন নিজেই নতুন করে লিখে ফেলে নিজস্ব ইতিহাস।
“City of Joy” — এই উপাধি এক বিস্ময়ের, এক সম্ভাবনার, আর এক অনন্ত জীবন্ত সত্তার নাম। কারণ এই শহরের হৃদয় এখনো স্পন্দিত হয় রবীন্দ্রসংগীতে, জীবনানন্দের ছন্দে, এবং লাখো মানুষের স্বপ্নে। কলকাতা শুধু একটা শহর নয় — এটি এক অনুভূতির নাম, এক জীবনদর্শনের নাম, এক বাঙালির আত্মার ঠিকানা।
তথ্যসূত্র:
- “রবীন্দ্র রচনাবলী” – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
- “কলিকাতা ও তার ইতিহাস” – নারায়ণ সাহা
- “স্মৃতির কলকাতা” – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
- “কলকাতা কথা” – গৌরীশঙ্কর ভট্টাচার্য
- “বঙ্গ সাহিত্যের ইতিহাস” – দীনেশচন্দ্র সেন
- “শহর কলকাতা” – অশোক মিত্র
- “কলকাতা ও সাহিত্য” – সাহিত্য একাডেমি প্রকাশনা
- “আধুনিক কলকাতার জনজীবন” – অরূপ কুমার দে
- “কফিহাউজের আড্ডা ও চিন্তাধারা” – সুবোধ সরকার
- কালবেলা – সমরেশ মজুমদার
- এক যে ছিল শহর – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
- মহানগর – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
- আনন্দবাজার পত্রিকা: কলকাতা বিশেষ সংখ্যা
- দেশ পত্রিকা: কলকাতা সংখ্যা
- চিত্রগ্রহণে : অদিতি সিংহ


