১৯৬০-এর দশকের কলকাতা ছিল সাংস্কৃতিকভাবে অগ্রগামী কিন্তু সামাজিক ও নাগরিক পরিকাঠামোর দিক থেকে ভীষণ চাপে থাকা এক শহর। সাহিত্যে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার, চলচ্চিত্রে সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, ঋত্বিক ঘটক; সংগীতে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, সব মিলিয়ে শহর তখন ভারতীয় রেনেসাঁর এক উজ্জ্বল কেন্দ্র। কিন্তু এই উজ্জ্বলতার আড়ালে ছিল ঘনবসতি, ক্রমবর্ধমান যানজট ও পরিবহণ সমস্যা।
তৎকালীন সময়ে শহরের যানবাহনের প্রধান ভরসা ছিল ট্রাম, বাস ও ট্যাক্সি। কিন্তু জনসংখ্যা বেড়ে চলায় ট্রাম হয়ে উঠছিল ধীরগতি ও অপ্রতুল, বাস-ট্যাক্সির ভিড় সামলাতে পারছিল না মহানগর। অফিসযাত্রীদের দৈনন্দিন দুঃসহ অভিজ্ঞতা শহরকে হাঁপিয়ে তুলেছিল। ফলে বিশেষজ্ঞ মহলে ধীরে ধীরে পাতালরেলের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।

পরিকল্পনার জন্ম (১৯৬৯)
১৯৬৯ সালে ভারত সরকার ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার যৌথভাবে কলকাতায় মেট্রো রেল নির্মাণের সম্ভাবনা নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করে। এ প্রকল্পে সহযোগিতা করে সোভিয়েত ইউনিয়ন (তখন মস্কোর মেট্রো ছিল বিশ্বখ্যাত) ও পূর্ব জার্মানি (বার্লিন পাতালরেল নির্মাণে দক্ষ)।
প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী দমদম থেকে টালিগঞ্জ পর্যন্ত ১৬.৪৫ কিমি দীর্ঘ নর্থ-সাউথ করিডর নির্মাণের কথা বলা হয়। প্রকল্পের দায়িত্বে ছিল Metropolitan Transport Project (Railways), যা রেল মন্ত্রকের অধীনে একটি বিশেষ সংস্থা।
ভিত্তিপ্রস্তর (১৯৭২)
১৯৭২ সালে কলকাতার মেট্রো প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী কলকাতায় এসে এই প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এটি ছিল ভারতবর্ষের পরিবহণ ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নে নানা প্রতিবন্ধকতা আসে—
- জমি অধিগ্রহণের সমস্যা
- অর্থের অভাব
- প্রযুক্তিগত জটিলতা
- শহরের ঘনবসতি ও সরু রাস্তায় কাজ করার অসুবিধা
ফলত, কাজ এগোতে সময় লাগে অনেক। প্রায় এক দশক টালবাহানার পর অবশেষে প্রকল্প দৃশ্যমান রূপ নিতে শুরু করে।

ঐতিহাসিক সূচনা (১৯৮৪)
২৪ অক্টোবর ১৯৮৪। ভারতবর্ষের ইতিহাসে এই দিনটি এক বিশেষ মাইলফলক। সেদিন কলকাতার বুকে ছুটল প্রথম পাতালরেল।
- রুট : ভবানীপুর (বর্তমানে নেতাজি ভবন) → এসপ্ল্যানেড
- দূরত্ব : ৩.৪ কিমি
- প্রথম ভাড়া : ৫০ পয়সা থেকে ১ টাকা
এই ছোট্ট পথযাত্রা হলেও তা ভারতীয় রেল পরিবহণ ব্যবস্থার জন্য ছিল এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় জায়গা করে নিয়েছিল “মাটির তলা থেকে ছুটছে ট্রেন”—এই খবর। ফোন, টেলিভিশন, সোশ্যাল মিডিয়া তখনো এত প্রচলিত হয়নি, তবু শহরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়েছিল অভূতপূর্ব উন্মাদনা। Raise Your Concern About this Content
মানুষ বিস্ময়ে দেখেছিল—

- ধুলো নেই,
- যানজট নেই,
- হর্ন বা শব্দ নেই,
- কয়েক মিনিটে গন্তব্যে পৌঁছনো যায়।
কলকাতা যেন এক ঝটকায় ভবিষ্যতের শহরে রূপ নিল।
প্রথম দিকে কলকাতা মেট্রোতে ছিল সাধারণ নন-এসি কোচ, কাগজের টিকিট ও হাতে ছেঁড়া টোকেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যুক্ত হয়েছে—
- এসি কোচ
- স্মার্ট কার্ড ও টোকেন ব্যবস্থা
- চলন্ত সিঁড়ি (এস্কেলেটর)
- লিফট ও প্রতিবন্ধী যাত্রীদের সুবিধা
- সিসিটিভি নজরদারি
- ডিজিটাল ঘোষণা ও সিগন্যাল সিস্টেম
এখন কলকাতা মেট্রো কেবল যানবাহন নয়, এটি এক প্রযুক্তিগত প্রতীক।

হুগলি নদীর তলায় মেট্রো : এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ
কলকাতার মেট্রোর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অগ্রগতি ঘটে ২০২৩ সালে, যখন হাওড়া ময়দান–এসপ্ল্যানেড করিডর চালু হয়। এটি দেশের প্রথম জলতল মেট্রো।
- টানেল বসানো হয় হুগলি নদীর তলায়।
- প্রতিটি টানেলের ব্যাস প্রায় ৫.৫ মিটার।
- সর্বোচ্চ গভীরতা মাটি থেকে প্রায় ৩০ মিটার নিচে।
এই প্রকল্প শুধু কলকাতার নয়, গোটা ভারতের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার নিদর্শন। অনেকেই মজা করে প্রশ্ন করেছিলেন—“জানালা দিয়ে মাছ দেখা যাবে?” যদিও মাছ দেখা যায় না, কিন্তু দেখা যায় ভারতের উন্নয়নের এক নতুন অধ্যায়।
সাম্প্রতিক সম্প্রসারণ
২১ শতকের দ্বিতীয় দশক থেকে কলকাতা মেট্রো দ্রুত সম্প্রসারণের পথে—
- শিয়ালদহ–এসপ্ল্যানেড রুট
- নোয়াপাড়া–জয় হিন্দ (কলকাতা বিমানবন্দর) রুট
- হেমন্ত মুখোপাধ্যায়–বেলেঘাটা রুট
প্রায় ১৪ কিমি নতুন রেলপথ যুক্ত হয়ে মেট্রো আরও বিস্তৃতভাবে শহরের পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণ অংশকে যুক্ত করেছে।
কলকাতার মেট্রো কেবল যানবাহন নয়; এটি শহরের সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে।
- প্রতিদিন লাখো মানুষ—অফিসযাত্রী, ছাত্রছাত্রী, রোগী, ব্যবসায়ী—মেট্রোর উপর নির্ভরশীল।
- অসংখ্য সাহিত্যকর্ম, কবিতা, চলচ্চিত্রে পাতালরেল এসেছে প্রতীক হয়ে।
- কলকাতার আধুনিকতার পরিচয় এখন অনেকটাই মেট্রো নির্ভর।
যেভাবে লন্ডনের আন্ডারগ্রাউন্ড বা নিউ ইয়র্কের সাবওয়ে শহরের পরিচয়ের অঙ্গ, ঠিক তেমনভাবেই কলকাতার মেট্রো আজ বাঙালির এক গর্ব।

- লন্ডন আন্ডারগ্রাউন্ড (১৮৬৩) → বিশ্বের প্রথম পাতালরেল।
- মস্কো মেট্রো (১৯৩৫) → শিল্পকলা ও স্থাপত্যের জন্য বিখ্যাত।
- টোকিও মেট্রো → সময়ানুবর্তিতার জন্য প্রসিদ্ধ।
- কলকাতা মেট্রো (১৯৮৪) → ভারতের প্রথম পাতালরেল, নদীর তলা দিয়ে চলার নজির স্থাপন করেছে।
অর্থাৎ কলকাতা মেট্রো দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ পাতালরেল ব্যবস্থা।
১৯৬৯ সালে যে স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, ১৯৮৪ সালে তার সূচনা, আর আজ ২০২৫-এ এসে কলকাতার মেট্রো শহরের জীবনরেখা। প্রতিদিন লাখো মানুষের যাতায়াত, অফিস-স্কুল-কলেজের রুটিন, আনন্দ ও দুঃখের গল্প মিশে আছে এর প্রতিটি কামরায়।
মেট্রো আজ আর শুধু যানবাহন নয়; এটি এক চলমান ইতিহাস।
এক শহরের আধুনিকতা, প্রযুক্তি ও আশার প্রতীক।



