back to top
24 C
Kolkata
Tuesday, 13 January, 2026

Buy now

spot_imgspot_imgspot_imgspot_img

বড়দিন মানে কলকাতার পার্ক স্ট্রীট: উৎসব ও ইতিহাস

কলকাতায় বড়দিন মানেই পার্ক স্ট্রিট। সেই আমল থেকেই এখানে বাস করতেন বেশিরভাগ বনেদী ইংরেজী পরিবার। আজও ডিসেম্বর এলেই এই রাস্তা পরিণত হয় শহরের সবচেয়ে আলোঝলমলে ও প্রাণবন্ত এলাকায়। ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, ঔপনিবেশিক  সাহেবদের কাছে কলকাতা ছিল খাস তালুক, জাকঁজমকে ও জনপ্রিয়তায় শহরের স্থান ছিল লন্ডনের মতই। কলকাতার জন্মলগ্ন থেকেই ইউরোপীয় সংস্কৃতির প্রভাব শহরের সঙ্গে মিশে যায়। ১৬৮৬ সালে জব চার্নক সুতানুটিতে আশ্রয় নেন। জঙ্গলঘেরা সেই জনপদেই প্রথমবার কলকাতায় বড়দিন পালিত হয় বলে ঐতিহাসিকদের একাংশ মনে করেন। সুতানুটি যেখানে শহরের জন্মভূমি, পার্ক স্ট্রিট সেখানে আধুনিক উৎসবচেতনার প্রতীক।

পার্ক স্ট্রিটের পুরনো নাম ছিল ‘Burial Ground Road’। ধীরে ধীরে এটি সাহেবদের বসবাস, চার্চ ও সামাজিক জীবনের কেন্দ্রে পরিণত হয় এবং বড়দিন হয়ে ওঠে সেই জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। আজকাল থিমড লাইটিং শুরু হয় সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে জওহরলাল নেহরু রোড পর্যন্ত, যা সম্প্রসারিত হয়ে মল্লিক বাজার ক্রসিং ও ক্যাথেড্রাল রোড ধরে সেন্ট পলস ক্যাথেড্রাল পর্যন্ত পৌঁছেছে।

ঔপনিবেশিক যুগে উৎসবের শুরু

ব্রিটিশ আমলে পার্ক স্ট্রিট ছিল বনেদী ইউরোপীয় সমাজের প্রধান সামাজিক কেন্দ্র। বড়দিন তখন ছিল চার্চের প্রার্থনা, ক্লাবের নাচ-গান ও পারিবারিক ভোজের দিন। তবে ১৭৭০-এর দশকে এই এলাকা ছিল স্যার এলিজা ইম্পে-র ডিয়ার পার্ক, পরে কবরস্থান। পঙ্কজ দত্তের “Colonial Calcutta: Landscape and Memory” গ্রন্থে পার্ক স্ট্রিটের এই বিবর্তনের উল্লেখ আছে।

১৯৪০-এর দশক থেকে এলাকাটি উৎসব ও সামাজিক জীবনের কেন্দ্রে পরিণত হয়। সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখায় জানা যায়, পার্ক স্ট্রিট শহরের আনন্দযাপনের ঠিকানা হয়ে ওঠে এই সময় থেকেই। আর ষাট-সত্তরের দশকে তা পরিণত হয়ে ওঠে কলকাতার নাইটলাইফের প্রাণকেন্দ্রে।

নাইটলাইফ-প্রেমীদের বিশেষ বড়দিন

একসময় পার্ক স্ট্রিট ছিল কলকাতার নাইটলাইফের প্রাণ কেন্দ্র। বড়দিনের রাতে রেস্তোরাঁ, বার ও ক্লাবগুলোতে বিশেষ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হতো। লাইভ ব্যান্ড, নাচ আর বিশেষ খাবারের মাধ্যমে বড়দিনের রাত হয়ে উঠত বছরের সবচেয়ে স্মরণীয় সময়গুলোর একটি। এই সংস্কৃতি পার্ক স্ট্রিটকে দেয় এক আলাদা পরিচিতি ।

ফ্লুরি’স-এ কেক আর গান

ফ্লুরি’স, ট্রিনকাস, মকাম্বো কিংবা পিটার ক্যাট এই নামগুলো পার্ক স্ট্রিটের বড়দিনের ইতিহাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। বড়দিন উপলক্ষে বিশেষ কেক, প্লামপুডিং, রোস্ট ও ইউরোপীয় খাবারের আয়োজন হতো অনেক বছর থেকেই। এর সঙ্গে অনেক জায়গায় লাইভ মিউজিক বড়দিনের উৎসবকে আরও উষ্ণ করে তুলত।

সেন্ট পলসের মধ্যরাতের প্রার্থনা

সেন্ট পলস ক্যাথেড্রাল’ই হল বড়দিনে কলকাতা পার্ক স্ট্রিট এলাকার আধ্যাত্মিক কেন্দ্র। মধ্যরাতের প্রার্থনায় অংশ নিতে ভিড় করেন বহু মানুষ। ক্যারোল গান, মোমবাতির আলো আর প্রার্থনার পরিবেশ বড়দিনের প্রকৃত বার্তা শান্তি, ভালোবাসা ও মানবিকতার কথা মনে করিয়ে দেয়।

নব্বইয়ে শুরু ঝলমলে লাইটিং

তবে পার্ক স্ট্রিটে পরিকল্পিত আলোকসজ্জা শুরু হয় ১৯৯০-এর দশক থেকে। বিভিন্ন থিমে সাজানো আলো, রঙিন আর্চ আর ঝাড়বাতির মতো নকশা ধীরে ধীরে মানুষের আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। আজ এই লাইটিং কলকাতার বড়দিনের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত দৃশ্য।

ধর্মনিরপেক্ষ উৎসবের মিলনমেলা

পার্ক স্ট্রিটের বড়দিন আজ কেবল খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। হিন্দু, মুসলিম, শিখসহ সব ধর্মের মানুষ এখানে একসঙ্গে উৎসব উদযাপন করেন। এটি কলকাতার সহাবস্থান ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

কেক ট্রেইলের মূল কেন্দ্র

পার্ক স্ট্রিট কলকাতার কেক-সংস্কৃতির কেন্দ্র। চিত্রা বন্দ্যোপাধ্যায়ের “কলকাতার খাদ্যসংস্কৃতি” গ্রন্থে উল্লেখ আছে, ঔপনিবেশিক আমলেই কেক ও পুডিং শহরে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ১৯২৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ফ্লুরি’স এই কেক ট্রেইলের প্রধান নাম। প্রণবকুমার দত্তের “কলকাতার ক্যাফে কালচার” গ্রন্থে এর বিশেষ উল্লেখ আছে। এখন মোকাম্বো ও আধুনিক অক্সফোর্ড বুকস্টোর ক্যাফে এই ঐতিহ্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

ডিসেম্বরজুড়ে চলে উৎসব আমেজ

পার্ক স্ট্রিটের বড়দিন এখন গোটা ডিসেম্বর জুড়ে বিস্তৃত। সন্ধ্যা নামলেই আলো, আড্ডা আর গানে উৎসবের আবহ তৈরি হয় আজও। উৎসবের মূল এলাকা সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে জওহরলাল নেহরু রোড পর্যন্ত, যা সম্প্রসারিত হয়ে মল্লিক বাজার ও সেন্ট পলস ক্যাথেড্রাল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে।

মেট্রো ও অন্যান্য যোগাযোগ ব্যবস্থা

  • নিকটতম মেট্রো: পার্ক স্ট্রিট
  • এসপ্ল্যানেড ও রবীন্দ্র সদন থেকেও সহজ যাতায়াত
  • বাস, ট্যাক্সি ও অ্যাপ-ক্যাব উপলব্ধ
  • ভিড়ের সময় হাঁটাই সবচেয়ে সুবিধাজনক

কাছাকাছি হোটেল

তথ্য সূত্র:

Avatar photo
+ posts

সম্পাদনা, সাংবাদিকতা, এবং সৃজনশীল লেখায় প্রায়োগিক অভিজ্ঞতা নিয়ে অদিতি এক উদীয়মান সাহিত্যিক কণ্ঠ। বাংলা সাহিত্যের প্রতি অগাধ ভালোবাসা এবং সুগভীর প্রতিভার অধিকারী এক তরুণ লেখিকা। বাংলা সাহিত্যে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করে, নিয়মিত বিভিন্ন পত্রিকা, ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল এবং সংকলনে তার লেখা প্রকাশ হয়েছে। তার লেখা একক বই এবং সম্পাদিত সংকলন কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় প্রকাশ পেয়েছে, তার “মৃত্যু মিছিল” বইটি পাঠকমহলে বেশ জনপ্রিয়। তার সৃষ্টিশীলতার প্রসার ঘটেছে আকাশবাণী এবং ফ্রেন্ডস এফএম-এ, যেখানে তার লেখা সম্প্রচারিত হয়েছে। অদিতির মতে, "বইয়ের থেকে পরম বন্ধু আর কেউ হয় না," এবং এই বিশ্বাস তাকে সাহিত্য জগতে প্রতিনিয়ত এগিয়ে নিয়ে চলেছে। বর্তমানে তিনি “বিশ্ব বাংলা হাব” -এ লেখক পদে কর্মরত।

অদিতি সিংহ
অদিতি সিংহ
সম্পাদনা, সাংবাদিকতা, এবং সৃজনশীল লেখায় প্রায়োগিক অভিজ্ঞতা নিয়ে অদিতি এক উদীয়মান সাহিত্যিক কণ্ঠ। বাংলা সাহিত্যের প্রতি অগাধ ভালোবাসা এবং সুগভীর প্রতিভার অধিকারী এক তরুণ লেখিকা। বাংলা সাহিত্যে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করে, নিয়মিত বিভিন্ন পত্রিকা, ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল এবং সংকলনে তার লেখা প্রকাশ হয়েছে। তার লেখা একক বই এবং সম্পাদিত সংকলন কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় প্রকাশ পেয়েছে, তার “মৃত্যু মিছিল” বইটি পাঠকমহলে বেশ জনপ্রিয়। তার সৃষ্টিশীলতার প্রসার ঘটেছে আকাশবাণী এবং ফ্রেন্ডস এফএম-এ, যেখানে তার লেখা সম্প্রচারিত হয়েছে। অদিতির মতে, "বইয়ের থেকে পরম বন্ধু আর কেউ হয় না," এবং এই বিশ্বাস তাকে সাহিত্য জগতে প্রতিনিয়ত এগিয়ে নিয়ে চলেছে। বর্তমানে তিনি “বিশ্ব বাংলা হাব” -এ লেখক পদে কর্মরত।

প্রাসঙ্গিক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here
Captcha verification failed!
CAPTCHA user score failed. Please contact us!

সাথে থাকুন

110FansLike
105FollowersFollow
190SubscribersSubscribe
- বাংলা ক্যালেন্ডার -
- বিজ্ঞাপন -spot_img

সাম্প্রতিক