সরস্বতী পুজো
সরস্বতী পূজো মানেই মনের মধ্যে ছুটে চলে আবেগ, প্রথম প্রেম, শাড়ি- পাঞ্জাবি। দেশে হোক বা বিদেশে, অফিস থাকুক আর না থাকুক মনের মধ্যে যে কত প্রজাপতি উড়ে চলে তা বলার কোনো সীমানা নেই। বাংলার সংস্কৃতিতে সরস্বতী পুজো সাধারণত ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে যুক্ত। স্কুল–কলেজে পুষ্পাঞ্জলি, হলুদ শাড়ি আর সাদা পাঞ্জাবির মধ্যেই এই পুজোর আয়োজন শেষ হয়ে যায়। গল্পের মত শুনতে লাগলেও একটা গোটা গ্রাম এই সরস্বতী পুজোতে মেতে উঠে। আপনারা ভাবছেন এমনটা আবার হয় নাকি, আরে হ্যাঁ মশাই এমনটাই হয় এই গ্রামে। দুর্গা পুজো কিংবা কালীপুজো না এই গোটা গ্রাম মেতে উঠে শুধুমাত্র বিদ্যার দেবীর পুজোতে। হ্যাঁ আপনি ঠিকই শুনছেন। মামুদপুরে এই চেনা ছবিটা সম্পূর্ণ বদলে যায়। এখানে সরস্বতী পুজো মানেই প্রস্তুতি শুরু হয় বহু দিন আগে থেকে ঠিক যেমনটা হয় শারদীয় দুর্গাপুজোর ক্ষেত্রে। গ্রামজুড়ে আলোর সাজ, ব্যস্ততা, চাঁদা তোলা, শিল্পীদের আনাগোনা সব মিলিয়ে উৎসবের আবহ তৈরি হয় বেশ কিছু দিন আগেই।
এই পুজো ঘিরে মামুদপুরের মানুষের আবেগ গভীর। বহু পরিবারে দুর্গাপুজোর চেয়েও সরস্বতী পুজোর গুরুত্ব বেশি। কারণ, এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বিদ্যা, সংস্কৃতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বপ্ন। কৃষিনির্ভর ও প্রাকৃতিক প্রতিকূলতায় লড়াই করা এই এলাকার মানুষ বিদ্যার দেবীর আরাধনাকেই জীবনের অগ্রগতির প্রতীক হিসেবে দেখেন। তাই সরস্বতী পুজো এখানে শুধু উৎসব নয়, আশার আর প্রার্থনারও নাম।

দুর্গাপুজোর আদলে সরস্বতী আরাধনা
মামুদপুরের সরস্বতী পুজোর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল এর আয়োজনের ধরন। এই পুজোকে দেখলে সহজেই মনে হয়, এটি যেন দুর্গাপুজোরই আরেক রূপ। পাড়া-পাড়া, ক্লাব-ক্লাব মিলিয়ে একাধিক পুজো অনুষ্ঠিত হয়, এবং প্রতিটি পুজোর মধ্যেই থাকে নিজস্ব পরিকল্পনা, থিম ও নান্দনিক ভাবনা।
প্রায় প্রতিটি ক্লাব সারা বছর ধরে অপেক্ষা করে এই একটি পুজোর জন্য। সদস্যরা বৈঠক করেন, থিম ঠিক করেন, বাজেট নির্ধারণ করেন, শিল্পী নির্বাচন করেন সবটাই হয় অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে। অনেক ক্ষেত্রেই বাজেট লক্ষাধিক টাকা ছাড়িয়ে যায়, যা কোনও ছোট গ্রামাঞ্চলের পুজোর ক্ষেত্রে সত্যিই ব্যতিক্রমী। প্রতিমা নির্মাণ থেকে মণ্ডপসজ্জা, আলোকসজ্জা থেকে নিরাপত্তা সব কিছুতেই থাকে পেশাদারিত্বের ছাপ।
এই পুজোর আরেকটি বিশেষ দিক হল, এলাকার সাধারণ মানুষদের সরাসরি অংশগ্রহণ। শুধু ক্লাব কর্তৃপক্ষ নয়, গ্রামের প্রবীণ থেকে শিশু সকলেই কোনও না কোনও ভাবে যুক্ত থাকেন এই আয়োজনের সঙ্গে। কেউ বাঁশ জোগাড় করেন, কেউ খাবারের ব্যবস্থা দেখেন, কেউ আবার অতিথি আপ্যায়নের দায়িত্ব নেন। ফলে সরস্বতী পুজো হয়ে ওঠে একটি সম্মিলিত সামাজিক কর্মকাণ্ড।
লক্ষাধিক টাকার বাজেট, থিমের বাহার

মামুদপুরের সরস্বতী পুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য তার থিম-নির্ভর আয়োজন। একাধিক ক্লাব সংগঠন প্রতিবছর লক্ষাধিক টাকার বাজেটে অভিনব থিমের মাধ্যমে বাগদেবীর আরাধনা করেন। শিল্পীরা নিখুঁত কারুকার্যে ফুটিয়ে তোলেন ভাবনা, ইতিহাস ও সংস্কৃতির নানা দিক। ফলে এই পুজো শুধু পূজার্চনা নয়, এক ধরনের প্রদর্শনীও বটে।
শহর-গ্রামের সেতুবন্ধন
এই থিমের মাধ্যমে একদিকে যেমন কলকাতার হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যকে স্মরণ করা হয়েছে, তেমনই অন্যদিকে শহর ও গ্রামের মধ্যে এক সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন গড়ে উঠেছে। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের শিশুদের কাছে এই আয়োজন হয়ে উঠেছে এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা যাদের অনেকেই ট্রাম বা হাত রিক্সা দেখেছে শুধু বই বা ছবিতে।
কলকাতার বড়ো বড়ো পূজোগুলোকে সম্পূর্ণ রূপে টেক্কা দেয় এই গ্রামের সরস্বতী পুজো। প্রায় ৫ দিন মত এখানে পুজোয় মেতে ওঠে মানুষ। হলুদ শাড়ি-পাঞ্জাবি, আনন্দ-উল্লাস, নতুন নতুন খেলা, গান, মেলা… কত কিছুই না দেখা যায়। আর সব থেকে বেশি দৃষ্টি আকর্ষণ করে, ঠাকুর ভাসান। যেমন তেমন করে এই গ্রামে ঠাকুরের বিসর্জন হয় না। গ্রামের পর গ্রাম, দেশ বিদেশে থেকে মানুষের ঢল নামে নদীর ঘাটে ঘটে। সকলে সকাল থেকে অপেক্ষা করে সন্ধ্যে নামার। তারপর শুরু হয়, আকাশ জুড়ে রঙের খেলা, কলকাতা থেকে আনা আতশবাজির প্রদর্শনী। শুধুমাত্র বিসর্জনের দিন খুলে দেওয়া হয় বাংলাদেশ বর্ডার। দুই প্রান্তের মানুষ ওই একটা মাত্র দিনে এক হয়, আলাপচারিতা বাড়ায় বিনা বাঁধায়। জিনিস আদান-প্রদান করে।
গ্রন্থপঞ্জি
১. লোকসংস্কৃতি পরিচয় — আশুতোষ ভট্টাচার্য
২. বাংলার লোকসংস্কৃতি — দুলাল চৌধুরী
৩. ভারতীয় লোকসংস্কৃতি — অশোক মিত্র
৪. লোকধর্ম ও লোকসংস্কৃতি — নির্মল সেন
৫. বাংলার ব্রত ও লোকাচার — যোগেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য
৬. লোকায়ত ভারত — দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
৭. লোকসংস্কৃতির স্বরূপ ও ধারা — সুব্রত মুখোপাধ্যায়
৮. বাংলার লৌকিক দেবদেবী — তারাপদ সাঁতরা
৯. গ্রামবাংলার লোকউৎসব — সুকুমার সেন
১০. লোকসংস্কৃতি ও সমাজচেতনা — গোপাল হালদার
১১. ভারতীয় সংস্কৃতির রূপরেখা — নীহাররঞ্জন রায়
১২. লোকসংস্কৃতি ও লোকসাহিত্য — যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য
১৩. বাংলার পূজা-পার্বণ ও লোকায়ত ধারা — অনিলকুমার নিয়োগী
১৪. লোকসংস্কৃতির নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি — কে. কে. চট্টোপাধ্যায়
১৫. লোকধারা ও গ্রামীণ সংস্কৃতি — পীযূষকান্তি বড়ুয়া
সম্পাদনা, সাংবাদিকতা, এবং সৃজনশীল লেখায় প্রায়োগিক অভিজ্ঞতা নিয়ে অদিতি এক উদীয়মান সাহিত্যিক কণ্ঠ। বাংলা সাহিত্যের প্রতি অগাধ ভালোবাসা এবং সুগভীর প্রতিভার অধিকারী এক তরুণ লেখিকা। বাংলা সাহিত্যে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করে, নিয়মিত বিভিন্ন পত্রিকা, ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল এবং সংকলনে তার লেখা প্রকাশ হয়েছে। তার লেখা একক বই এবং সম্পাদিত সংকলন কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় প্রকাশ পেয়েছে, তার “মৃত্যু মিছিল” বইটি পাঠকমহলে বেশ জনপ্রিয়। তার সৃষ্টিশীলতার প্রসার ঘটেছে আকাশবাণী এবং ফ্রেন্ডস এফএম-এ, যেখানে তার লেখা সম্প্রচারিত হয়েছে। অদিতির মতে, "বইয়ের থেকে পরম বন্ধু আর কেউ হয় না," এবং এই বিশ্বাস তাকে সাহিত্য জগতে প্রতিনিয়ত এগিয়ে নিয়ে চলেছে। বর্তমানে তিনি “বিশ্ব বাংলা হাব” -এ লেখক পদে কর্মরত।
আমি মৌমিতা ভৌমিক—একজন কনটেন্ট ম্যানেজমেন্ট ও ডিজিটাল মার্কেটিং পেশাজীবী, বর্তমানে বিশ্ব বাংলা হাব কন্সালটেন্সি সার্ভিসেস এল.এল.পি-তে কর্মরত। শিক্ষাগতভাবে আমি একজন বি.এস.সি গ্র্যাজুয়েট, তবে আমার আসল পরিচয় গড়ে উঠেছে সৃজনশীলতা, কনটেন্ট স্ট্র্যাটেজি এবং ডিজিটাল ব্র্যান্ডিংয়ের সমন্বয়ে। আমি বিশ্বাস করি, কনটেন্ট শুধু শব্দের সমষ্টি নয়—এটি একটি ব্র্যান্ডের কণ্ঠস্বর, বিশ্বাসযোগ্যতা এবং আবেগের প্রতিফলন। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সঠিক বার্তা, সঠিক ভিজ্যুয়াল এবং সঠিক সময় —এই তিনের সমন্বয়ই একটি সাধারণ আইডিয়াকে অসাধারণ করে তোলে। বর্তমানে আমি নিজেকে অ্যানিমেশন ও গ্রাফিক্সের দুনিয়ায় প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে চলেছি। ভিজ্যুয়াল স্টোরিটেলিং, মোশন গ্রাফিক্স এবং ডিজাইন-ভিত্তিক কমিউনিকেশন আমাকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায় এবং প্রতিদিন আরও উন্নত হতে অনুপ্রাণিত করে। একজন কনটেন্ট ম্যানেজার হিসেবে আমি জানি—ডিজিটাল দুনিয়ায় টিকে থাকতে হলে শুধু ট্রেন্ড ফলো করলেই হয় না, নিজেকেও নিয়মিত আপডেট করতে হয়।




