মাগধী প্রাকৃত ভাষা থেকে উৎপন্ন আমাদের মাতৃভাষা বাংলাভাষা। এ ভাষা রাঢ়বঙ্গবাসীর কেবল কথা বলার মাধ্যম নয়; যূগ যূগ ধরে এইভাষা হয়েছে চেতনা, সংস্কৃতি, ইতিহাসের ধারক। এক সময় এই ভাষার জন্য প্রাণ উৎসর্গ করেছেন অসংখ্য মানুষ, যার সাক্ষী ১৯৫২ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর। অথচ আজকের প্রজন্মের কাছে বাংলার গুরুত্ব কমে চলেছে ক্রমাগত। কর্ম জীবনে ইংরেজি ও হিন্দির অতি–ব্যবহার, সামাজিক অবহেলা ও সরকার – সমাজের অমনোযোগিতায় “বাংলা” আজ এক অদ্ভুত দ্বন্দ্বে জর্জরিত— সংখ্যায় বড়, মর্যাদায় সংকুচিত। আজ অফিস, আদালত, সংবাদমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক আচার – ব্যবহারে শুদ্ধ বাংলার অবক্ষয় দৃশ্বমান সর্বত্র।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৮৫% মানুষ বাংলাভাষী (ভারত সরকারের জনগণনা, ২০১১)। বাংলাদেশে তো প্রায় সমগ্র জনগোষ্ঠীই বাংলা ভাষায় কথা বলেন। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে শহরাঞ্চলে বাংলার ব্যবহার ক্রমেই কমছে। পরিবারে, স্কুলে, এমনকি সামাজিক মাধ্যমে শিশুদের বাংলা জানার চেয়ে ইংরেজি ও হিন্দি জানা বেশি জরুরি মনে হচ্ছে। কলকাতা পুরসভার সমীক্ষা (২০২১) জানাচ্ছে — শহরের সাইনবোর্ডগুলোর মাত্র ২৫% বাংলা ভাষায় লেখা হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে বাংলা ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ইংরেজি ও রোমান হরফ–নির্ভরতা বাড়ছে ক্রমাগত।
বিদেশে বসবাসকারী বাঙালিদের মধ্যেও শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার প্রবণতা এখন দৃষ্টিকটু। সেখানে বাংলা সীমিত হয়ে যাচ্ছে কিছু ব্যক্তির ভালবাসা আর কিছু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্যে। অন্য ভাষাভাষী মানুষের ন্যায় পরবর্তী প্রজন্মকে মাতৃভাষা শেখাতে বাঙালী আর সচেষ্ট নন, তাই সঙ্কট বাড়ছেই।
বাংলা যেন কেমন-কেমন, খুউব দুর্বল প্যানপ্যানে
– ভবানীপ্রসাদ মজুমদার
শুনলে বেশি গা জ্ব’লে যায়, একঘেয়ে আর ঘ্যানঘ্যানে।
কীসের গরব? কীসের আশা?
আর চলে না বাংলা ভাষা
কবে যেন হয় ‘বেঙ্গলি ডে’, ফেব্রুয়ারি মাসে না?
জানেন দাদা, আমার ছেলের, বাংলাটা ঠিক আসে না।
প্রবাসী বাঙালির অভিজ্ঞতা:
রাশিয়ায় MBBS পাঠরত বকখালির ছেলে অনিক মাইতি‘র সঙ্গে এই বিষয়ে একটি দীর্ঘ আলাপচারিতা করা হয়েছিল। তিনি বাংলাভাষা নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি অকপটে প্রকাশ করেছেন।
প্রশ্ন: আপনার নাম ও জন্মস্থান কোথায়? শৈশব–কৈশোর কেমন কেটেছে? বর্তমানে কোন দেশে আছেন, কী করছেন?
অনিক: আমি অনিক মাইতি। জন্ম বকখালিতে। সমুদ্রের কাছে বড় হয়েছি, স্কুল–বাড়ি–বই–গল্প নিয়েই শৈশব কেটেছে। খুবই সুন্দর ছিল ছোটবেলা। প্রায় ৬ বছর ধরে রাশিয়ায় আছি। এখানে MBBS শেষ করেছি।
প্রশ্ন: ভারত ও বিদেশে শিক্ষাজীবনে ‘বাংলা’র ভূমিকা কেমন ছিল? ছোটবেলায় বাংলার সঙ্গে সম্পর্ক কীভাবে তৈরি হয়েছিল?
অনিক: ভারতে বাংলা মাধ্যমেই পড়েছি। বিদেশে আসার পর সবই ইংরেজিতে। স্থানীয়দের সঙ্গে রাশিয়ান ভাষায় কথা বলতে হয়। প্রচুর গল্প পড়তাম। স্কুলের শিক্ষক ও বাড়ির সবাই বাংলা বই পড়তে উৎসাহ দিতেন।
প্রশ্ন: বিদেশে গিয়ে বাংলার চর্চা কতটা বদলে গেছে? প্রবাসী বাঙালি সমাজে বাংলার ব্যবহার কেমন দেখেন?
অনিক: অনেক কমে গেছে। তবে নিজের মতো সময় করে গল্প পড়ার চেষ্টা করি। দেখা হলে নিজের মানুষের সঙ্গে কথা বলে ভালো লাগে। তবে এখানে খুব বেশি বাংলাভাষী মেলে না।
প্রশ্ন: নতুন প্রজন্মে বাংলা শেখার আগ্রহ আছে কি?
অনিক: না। ওদের মধ্যে বাংলার প্রতি আগ্রহ একদমই কম।
প্রশ্ন: বাংলা সংবাদ ও সাহিত্য কীভাবে পড়েন?
অনিক: প্রতিদিন অন্তত এক ঘণ্টা বাংলা খবর শুনি।
প্রশ্ন: আপনি মনে করেন বাংলাভাষা সংকটে আছে? কেন? বাংলা ভাষার মান ফিরিয়ে আনতে কী করা উচিত?
অনিক: হ্যাঁ। আমরা শিকড় ভুলে যাচ্ছি। শুধু ভাষাদিবসে স্ট্যাটাস দিলে হবে না। নিয়মিত গুরুত্ব দিতে হবে। সরকারকে দায়িত্ব নিতে হবে। পাশাপাশি আমাদেরও চেষ্টা করতে হবে।
প্রশ্ন: আপনার সন্তানদের বাংলা শেখাবেন?
অনিক: অবশ্যই শেখাব। এটা আমাদের দায়িত্ব।
প্রশ্ন: বাংলা ভাষা আপনার কাছে কী?
অনিক: আমার শিকড়, আমার পরিচয়। Raise Your Concern About this Content
সমীক্ষা থেকে তথ্য
- FICCI–EY রিপোর্ট (২০২৩): আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যমে বাংলা দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার (দক্ষিণ ভারতের তেলুগুর পরে)। কিন্তু পাঠকদের মধ্যে ৩৫% মনে করেন সংবাদপত্র ও টিভিতে শুদ্ধ বাংলা প্রায়শই অনুপস্থিত।
- পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির (২০২২) সমীক্ষা: কলকাতায় ৬০% সংবাদমাধ্যমকর্মী বাংলা ব্যাকরণের নিয়ম সম্পর্কে অনিশ্চিত, এবং ৪৫% সাংবাদিক ইংরেজি–হিন্দি মিশ্রিত বাংলা লিখতে ও বলতে অভ্যস্ত।
- PRCI (Public Relations Council of India) সমীক্ষা (২০২১): টেলিভিশন সংবাদে বাংলার চেয়ে ইংরেজি শব্দের ব্যবহার ৪৫% পর্যন্ত পৌঁছেছে।
সবশেষে বলা বাহুল্য বাংলাভাষা আমাদের শিকড়, আমাদের অস্তিত্ব। আমরা যদি নিজেরা সচেতনভাবে এর মর্যাদা রক্ষা না করি, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আর শিকড় চিনবে না। ভবানীপ্রসাদের ভাষায় —
“ভাঙনের ভয়ে নয়, বাঁচার প্রয়াসে কথা বলো।”
আমাদের সকলকে সেই প্রয়াসে যুক্ত হতে হবে — বাড়িতে, স্কুলে, অফিসে, মনের মধ্যে।
তথ্যসূত্র
৪। Public Relations Council of India (PRCI) Survey Report on Regional Language Media, 2021.
৫। পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি সমীক্ষা রিপোর্ট, ২০২২।
৬। ‘বাংলা ভাষা ও সাহিত্য: সংকট ও সম্ভাবনা’ — ড. নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুরি (২০০৫)।
৭। বাংলা ভাষার অবনতি ও এর সাংস্কৃতিক ভিত্তি রক্ষার বিষয়ে বিশ্লেষণ।
৮। ‘ভাষা ও জাতীয়তা’ — সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় (প্রথম প্রকাশ: ১৯৪৭)।
৯। ভারতীয় ভাষাগুলোর মধ্যে বাংলার স্থান এবং বিদেশি ভাষার প্রভাব নিয়ে একটি ক্লাসিক গ্রন্থ।
১০। ‘বাংলাভাষার ইতিবৃত্ত’ — সুকুমার সেন (প্রথম খণ্ড: ১৯৬০)।
১১। বাংলাভাষার ইতিহাস, বিকাশ ও বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপট নিয়ে একটি প্রামাণ্য কাজ।
১২। ‘বাংলাভাষা’ (কবিতা) — ভবানীপ্রসাদ মজুমদার, প্রকাশিত তাঁর ‘এক মুঠো ভাষা’ (১৯৬৫) কাব্যসংগ্রহে।
১৩। ‘আমার বাংলা, আমার ভাষা’ — শঙ্খ ঘোষ (১৯৯৯)।
১৪। বাংলা ভাষার মান ও মর্যাদা রক্ষায় একটি প্রাঞ্জল প্রবন্ধসংগ্রহ।



