Homeউৎসব অনুষ্ঠানকিউট সরস্বতী! কুমোরটুলিতে নয়া ট্রেন্ড বাগদেবীর নয়া রূপ

কিউট সরস্বতী! কুমোরটুলিতে নয়া ট্রেন্ড বাগদেবীর নয়া রূপ

This entry is part 1 of 3 in the series সরস্বতী পুজো

সরস্বতী পুজো

কিউট সরস্বতী! কুমোরটুলিতে নয়া ট্রেন্ড বাগদেবীর নয়া রূপ

Bye Bye 2025 : Welcome 2026 | Photo Credit: Google Gemini

বিদায় ২০২৫ : স্বাগতম ২০২৬ সময়ের দরজায় দাঁড়িয়ে আমরা

বিদ্যার দেবীর পুজোতেই উন্মাদনা তুঙ্গে এই গ্রামে

আজকের বাঙালি বিশ্বাস করতে চায়, কিন্তু প্রশ্নও করে। শ্রদ্ধা জানায়, আবার নতুন করে দেখতে চায়। এই দ্বৈত চাহিদার মধ্যেই জন্ম নিচ্ছে দেবীর নতুন রূপ। সাবেকি শ্বেতবসনা বীণাবাদিনীর পাশে জায়গা করে নিচ্ছে আধুনিকতার স্পর্শ কখনও তা রঙে, কখনও গড়নে, কখনও মুখের অভিব্যক্তিতে। ‘কিউট’ সরস্বতী সেই পরিবর্তনেরই প্রতীক। তিনি আর দূরের, গম্ভীর দেবী নন; তিনি অনেক বেশি ঘরোয়া, শিশুসুলভ, যেন আগামী প্রজন্মের চোখে বিদ্যার দেবীকে আরও আপন করে তোলার এক আন্তরিক প্রয়াস।

বৈদিক যুগে সরস্বতী আরাধনা

ভারতীয় সভ্যতার আদি পর্যায়ে সরস্বতী কোনো মন্দিরবন্দি দেবী ছিলেন না, ছিলেন না মাটির মূর্তিতে আবদ্ধ কোনো প্রতিমা। তিনি ছিলেন প্রবাহ, দৃশ্য ও অদৃশ্যের মাঝখানে অবস্থান করা এক চিরন্তন সত্তা। বৈদিক যুগে সরস্বতী আরাধনার মূল ভিত্তি ছিল জ্ঞানচর্চা, বাকশুদ্ধি ও চিন্তার শুদ্ধতা। ঋগ্বেদের স্তোত্রে সরস্বতীকে একদিকে যেমন বলা হয়েছে ‘মহানদী’, তেমনই তাঁকে বর্ণনা করা হয়েছে বাক্ ও বুদ্ধির দেবী হিসেবে। এই দ্বৈত রূপই বৈদিক সরস্বতী চেতনার মূল বৈশিষ্ট্য।

ঋগ্বেদের একাধিক সূক্তে সরস্বতীর বন্দনা করা হয়েছে জ্ঞান ও প্রজ্ঞার উৎস হিসেবে। তিনি সেই শক্তি, যাঁর অনুগ্রহে মানুষ মন্ত্র উচ্চারণ করতে সক্ষম হয়, ভাষা পায় ছন্দ ও অর্থের গভীরতা। বৈদিক ঋষিদের বিশ্বাস ছিল, শব্দের মধ্যেই ব্রহ্মের বাস। আর সেই শব্দ, ‘বাক্’-এর অধিষ্ঠাত্রী সরস্বতী। ফলে তাঁর আরাধনা মানেই ছিল ভাষার সাধনা, চিন্তার শুদ্ধ অনুশীলন।

এই যুগে সরস্বতীর পূজা কোনো নির্দিষ্ট দিনে সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রতিটি যজ্ঞ, প্রতিটি স্তোত্রোচ্চারণই ছিল একপ্রকার সরস্বতী আরাধনা। অগ্নিকে সাক্ষী রেখে যজ্ঞবেদিতে উচ্চারিত মন্ত্রের প্রতিটি ধ্বনি যেন সরস্বতীর প্রতি নিবেদিত হতো। গৃহস্থ বা ব্রাহ্মণ সবাই জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হওয়ার জন্য দেবীর কৃপা প্রার্থনা করতেন। তখন বিদ্যা ছিল জীবনের মূল লক্ষ্য, আর সরস্বতী ছিলেন সেই লক্ষ্যের পথপ্রদর্শক।

বৈদিক যুগের শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল মৌখিক। গুরু শিষ্যকে পাঠ দিতেন শ্রুতি ও স্মৃতির মাধ্যমে। লিখিত পুঁথির পরিবর্তে মুখে মুখে রচিত ও সংরক্ষিত হত বেদ। এই মৌখিক জ্ঞানপরম্পরার কেন্দ্রে ছিলেন সরস্বতী। শিষ্য যখন মন্ত্র উচ্চারণে ভুল করত না, ছন্দ ভাঙত না, তখন তা দেবীর আশীর্বাদ বলেই মনে করা হতো। তাই বৈদিক আরাধনায় সরস্বতী মানেই ছিলেন স্মৃতিশক্তি, মননশীলতা ও ধ্যানের প্রতীক।

নদী হিসেবে সরস্বতীর ধারণাও এই আরাধনায় গভীর তাৎপর্য বহন করত। নদী যেমন ভূমিকে উর্বর করে, তেমনি সরস্বতী মানবমস্তিষ্ককে করে উর্বর। জ্ঞানের বীজ তাঁর স্রোতে সিঞ্চিত হয়ে বিকশিত হয়। বৈদিক সাহিত্যে সরস্বতী নদীকে বলা হয়েছে পবিত্রতম জলধারা, যার তীরে গড়ে উঠেছিল প্রাচীন সভ্যতা ও ঋষিকুল। এই নদীপূজার মধ্যেও লুকিয়ে ছিল জ্ঞান ও সভ্যতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।

পৌরাণিক যুগ ও শাস্ত্রীয় বিধান

পৌরাণিক যুগে সরস্বতী দেবীর রূপ আরও সুস্পষ্ট হয়। তিনি ব্রহ্মার পত্নী, শ্বেতবসনা, বীণাবাদিনী, হাঁসের উপর অধিষ্ঠিতা। বেদ, পুরাণ ও তন্ত্রশাস্ত্রে সরস্বতী পূজার নির্দিষ্ট নিয়মাবলি গড়ে ওঠে।
মাঘ মাসের শুক্লা পঞ্চমী শ্রীপঞ্চমী এই তিথিতে সরস্বতী পুজোর বিধান পাওয়া যায়। তখন থেকেই ছাত্রসমাজের মধ্যে “হাতেখড়ি”, পুঁথিপাঠ এবং বিদ্যার আরাধনা সরস্বতী পুজোর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে যায়।

বাঙালির ঘরে ঘরে সরস্বতী পুজো

বাংলায় সরস্বতী পুজো বরাবরই ছিল ঘরোয়া। দুর্গা বা কালীপুজোর মতো জাঁকজমক নয়, বরং শান্ত, সংযত, শিক্ষার আবহে মোড়া এক আরাধনা। শ্বেত বা পীত শাড়ি পরিহিতা দেবী, এক হাতে বীণা, অন্য হাতে পুস্তক—এই রূপই বহু দশক ধরে বাঙালির মনে গেঁথে আছে। পাড়ার ক্লাব থেকে স্কুল-কলেজ সর্বত্রই ছিল একই ছাঁচের সরস্বতী মূর্তি।

সময়ের বদলে বদলাচ্ছে দেবীর রূপ

এক সময় সরস্বতী মূর্তির রূপ ছিল প্রায় অপরিবর্তনীয়। শান্ত, সংযত মুখাবয়ব, দৃষ্টি অবনত, হাতে বীণা ও পুস্তক—এই প্রতিচ্ছবিই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাঙালির কল্পনায় গেঁথে ছিল। এই স্থিরতা ছিল প্রয়োজনীয়, কারণ তখন সমাজ চাইত ধারাবাহিকতা, চেনা ছাঁচে নিরাপত্তা। বিদ্যার দেবীকে ভাবা হত গাম্ভীর্যের প্রতীক হিসেবে যেখানে শাসন আছে, সংযম আছে, ভয়মেশানো শ্রদ্ধাও আছে।Raise Your Concern About this Content

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে শিক্ষার ধারণা, বদলেছে জ্ঞানের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক। বিদ্যা আর শুধুই গুরুগম্ভীর নয়, সে আজ প্রশ্ন করে, অনুসন্ধান করে, আনন্দের সঙ্গে শেখে। শিশুরা আজ আর ভয় নয়, কৌতূহল নিয়ে জ্ঞানের দিকে এগোয়। আর সেই পরিবর্তনের ছায়া পড়েছে সরস্বতীর রূপেও।

একবিংশ শতকে এসে শিল্পীরা আর দেবীকে কেবল শাস্ত্রের অনুবর্তী হয়ে গড়ে তুলতে চান না। তাঁদের তুলিতে ধরা পড়ে সময়ের স্পন্দন। দেবীর মুখে আসে কোমলতা, ভঙ্গিমায় আসে ঘরোয়া উষ্ণতা। গাল একটু ফোলা, চোখে শিশুসুলভ বিস্ময়, ছোট হাতে ছোট বীণা—এই সরস্বতী আর দূরত্ব তৈরি করেন না, বরং কাছে টেনে নেন। তিনি আর শুধু পূজার বেদিতে বসে থাকা দেবী নন, তিনি হয়ে ওঠেন শিশুর বন্ধু, ছাত্রছাত্রীর আপন অভিভাবক।

এই বদলকে অনেকেই আধুনিকতা বলে দেখেন, কেউ কেউ সাবেকিয়ানার বিচ্যুতি বলেও মনে করেন। কিন্তু গভীরে তাকালে দেখা যায়, এটি আসলে বিশ্বাসের অবক্ষয় নয়, বিশ্বাসের ভাষান্তর। দেবীর মহিমা কমছে না, বরং তার প্রকাশভঙ্গি মানবিক হয়ে উঠছে। সময় যেমন মানুষের মুখ বদলায়, তেমনই দেবীর মুখেও পড়ে সময়ের ছাপ।

দুর্গাপুজোর থিমভিত্তিক মণ্ডপ, কালীপুজোর আলো-ছায়ার খেলায় যেমন শিল্পভাবনার আধুনিকতা এসেছে, সরস্বতী পুজোও ধীরে ধীরে সেই স্রোতে ভেসে চলেছে। একসময় যে পুজো ছিল নীরব ও সংযত, আজ সেখানে দেখা যাচ্ছে রঙের সাহসী ব্যবহার, ভাস্কর্যের নতুন ভাষা, আর ভাবনার অভিনবত্ব। এরই ফলশ্রুতি ‘কিউট’ সরস্বতী যিনি সাবেকি ছাঁচ ভেঙে নতুন রুচির প্রতিনিধি হয়ে উঠেছেন।

‘কিউট’ সরস্বতীর আবির্ভাব

এই প্রেক্ষাপটেই কুমোরটুলিতে জন্ম নেয় ‘কিউট’ সরস্বতী। গাল একটু ফোলা, নাক সামান্য চাপা, ছোট ছোট হাতে ছোট বীণা, খুদে পায়ের নিচে হাঁসের ছানা—এই সরস্বতী যেন আর গম্ভীর দেবী নন, তিনি একেবারে শিশুর মতো স্নিগ্ধ ও প্রাণবন্ত। এই অভিনব ভাবনার নেপথ্যে রয়েছেন কুমোরটুলির বিশিষ্ট মৃৎশিল্পী দীপঙ্কর পাল। কলকাতার নামী দুর্গাপুজোয় তাঁর শিল্পকর্ম বহুদিনের পরিচিত হলেও, গত বছর মধ্য কলকাতার চোরবাগানে তাঁর তৈরি কিউট সরস্বতীই নজর কেড়ে নেয় সকলের। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে যায় সেই মূর্তি, প্রশংসায় ভাসেন শিল্পী।

বাজারের চাহিদা ও শিল্পীর ব্যস্ততা

আগামী ২৩ জানুয়ারি সরস্বতী পুজো। এবছর মৃৎশিল্পীদের দাবি, কিউট সরস্বতীর চাহিদা অভূতপূর্ব। পাড়া-পুজো থেকে স্কুল, এমনকি ব্যক্তিগত বাড়িতেও এই নতুন ধাঁচের সরস্বতী পৌঁছে দিতে ব্যস্ত কুমোরপাড়ার শিল্পীরা। দীপঙ্কর পালের মতো শিল্পীদের দম ফেলার ফুরসৎ নেই। তবে তাঁর মতে, সৃষ্টিশীলতায় স্থবিরতা চলতে পারে না। কিউট সরস্বতীর জনপ্রিয়তা থাকলেও, ভবিষ্যতে আরও নতুন ছাঁচে কাজ করতে চান তিনি।

বিদেশের মাটিতেও বাঙালির সরস্বতী

আজ সরস্বতী পুজো আর শুধুই বাংলার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। আমেরিকা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্য বিদেশের মাটিতেও বাঙালিরা আয়োজন করছেন সরস্বতী পুজোর।
অনেক ক্ষেত্রেই কুমোরটুলি থেকে তৈরি মূর্তি পাড়ি দিচ্ছে বিদেশে। আধুনিক, হালকা, শিশু-বান্ধব ‘কিউট’ সরস্বতী সেখানে বিশেষ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। নতুন প্রজন্মের কাছে দেবীকে আরও আপন করে তুলতেই এই রূপান্তর।

গ্রন্থপুঞ্জ

  • ঋগ্বেদ — অনুবাদক: বিভিন্ন
  • বেদ ও বাঙালির ধর্মচেতনা — সুকুমার সেন
  • ভারতীয় দেবদেবীর বিবর্তন — স্টেলা ক্রামরিশ
  • হিন্দু দেবদেবী: রূপ ও প্রতীক — দেবদত্ত পট্টনায়ক
  • বাঙালির পুজোপার্বণ — আশুতোষ ভট্টাচার্য
  • বাংলার লোকশিল্প ও মৃৎশিল্প — গুরুচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়
  • ভারতীয় সংস্কৃতিতে নদী ও নারীত্ব — নীহাররঞ্জন রায়
  • শিল্প ও ধর্ম: ভারতীয় ভাস্কর্যের ইতিহাস — রমাপ্রসাদ চন্দ
  • ধর্ম, সমাজ ও আধুনিকতা — রাধাকমল মুখোপাধ্যায়
  • বাংলার সংস্কৃতি ও ধর্মচর্চা — বিনয় ঘোষ
  • হিন্দু দেবদেবী ও পুরাণকথা — হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
  • বাংলার উৎসব ও লোকাচার — সুকুমার সেন
  • বাংলার শিল্পী ও সময়ের রূপান্তর — সুমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়

সরস্বতী পুজো সিরিজ :

সরস্বতী পুজো

বিদায় ২০২৫ : স্বাগতম ২০২৬ সময়ের দরজায় দাঁড়িয়ে আমরা
অদিতি
অদিতি
অদিতি — সাংবাদিকতা ও সৃজনশীল লেখায় প্রায়োগিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এক উদীয়মান সাহিত্যিক কণ্ঠ, যাঁর লেখা পত্রিকা, আন্তর্জাতিক জার্নাল ও সংকলনে প্রকাশিত। লেখিকা বাংলা সাহিত্যের প্রতি অগাধ ভালোবাসা আর সৃষ্টিশীল প্রতিভার ধারক।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

বাংলা ক্যালেন্ডার

- বিজ্ঞাপন -spot_img

Most Popular

Recent Comments