ওঁ নমঃ শিবায়ঃ শান্তায় কারণত্রয় হে তবে
নিবেদয়ামি চাত্মানাং তং গতি পরমেশ্বর
শিবলিঙ্গ তো আমরা সকলেই ছোট্ট বেলা দেখে এসেছি। আমাদের সকলের আরাধ্য শিবঠাকুর তো শিবলিঙ্গ হিসেবেই পূজিত হন। শিবমূর্তি বা ফটো পূজোর চলন তো প্রায় নেই বললেই হয়। ঠাকুরের অবয়বের সাথে সাথে শিবপূজোর রীতিনীতিও অন্য যেকোনো পুজোর থেকে সম্পূর্ণই ভিন্ন। এই বিভিন্নতার কারণে হয়তো অনেকের মনে কতই না প্রশ্নই।
শিব লিঙ্গ কী ?
শিবলিঙ্গ কি তা জানার আগে সৃষ্টি তত্ত্ব কি জানা যাক। এই যে চোখের সামনে অপরূপা প্রকৃতি আর তার আকাশ, সূর্য্য, সমুদ্র, বিভিন্ন রকম উদ্ভিদ, বিভিন্ন প্রকার প্রাণী আমরা দেখতে পাই – প্রশ্ন আসে – এরা কোথা থেকে এলো ? কোন শক্তির আস্ফালনে এর উৎপত্তি আর বিনাশ সংঘটিত হয়ে থাকে ? জগৎ পরিবর্তনশীল তবে এই জগতের অস্থায়ী রূপের পেছনের স্থায়ী কারিগর কে ? এ প্রশ্ন শুধু আজকের নয়। বহুযুগ ধরে মুনি ঋষিরা ও আজকের বিজ্ঞান এর উত্তর খুঁজে চলেছেন। অর্থাৎ জীবন নামক যে চলন্ত ট্রেনএর কম্পাটমেন্ট এ আমরা বসে আছি, তা কাজ করছে ইঞ্জিন শক্তির জন্য। ইঞ্জিন এর ভূমিকা এখানে মুখ্য, ট্রেনের ভেতর বসে তা যেমন দেখা যায়না তেমনি এই অখিল জগতের স্রষ্টা যিনি তাকেও জানতে চাওয়া দুঃসাধ্য। মূলকথা – জগতের চালিকা শক্তির চাবিকাঠি যিনি তিনিই নামরূপে পরমেশ্বর শিব। নিরাকারে আবার তিনিই পরম তত্ত্বের প্রতীক শিবলিঙ্গ রূপে বিরাজমান।

লিঙ্গ শব্দটি সংস্কৃত লিঙ্গম শব্দ থেকে এসেছে। যার অর্থ পরম জ্ঞান। কিন্তু নিরাকার পরমতত্ত্বের মালিক যিনি তাকে আমরা সাধারণ মানুষ চিনবো কেমন করে ? তাই প্রতীক রূপে তিনি শিবলিঙ্গ রূপে বিরাজিত।
শিবতত্ত্ব ও আধুনিক বিজ্ঞান
হিন্দু দর্শন অনুযায়ী নটরাজ শিবের নৃত্যরত মূর্তি হল সৃষ্টি স্থিতি এবং প্রলয়ের প্রতীক আর তার ডমরু – শব্দ-কম্পাঙ্কের, যার থেকে জগৎ সৃষ্টি হয়েছিল মনে করা হয়। । বিগ-ব্যাং তত্ত্ব অনুযায়ী মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছিল কম্পাঙ্ক থেকে যা আজও প্রসারিত। শিবতত্ত্বের সৃষ্টি স্থিতি প্রলয় – আর বিজ্ঞানের সাইক্লিক কসমোলজি (এক্সপানশন কলাপ্স রিবার্থ ) এক কথা বলে। ডমরুর শব্দ যাকে আদিনাদ বলা হয়, বিজ্ঞানের ভাষায় তাইই কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশন এন্ড ভাইব্রেশন। উপনিষদের ব্যাখ্যায়, শব্দই ব্রহ্ম, বিজ্ঞানের ভাষায় এভরিথিং ইজ এনার্জি ওয়েভ। শিবের প্রলয় কান্ড – বৈজ্ঞানিক ভাষায় সুপারনোভা এক্সপ্লোশন। আশ্চর্য্য বিষয় হলো আজকের আধুনিক বিজ্ঞানের প্রামাণ্য পরীক্ষিত সত্য যে কথা বলে, আমাদের ঋষি গণ সেই একই সত্য বলে গেছেন বহুযুগ আগে।
শিবপুরাণ
জ্যোতির্লিঙ্গ – পুরাকালে নারদ যখন শিবলিঙ্গ দর্শন করে শিবতত্ব জানবার জন্য উদগ্রীব হলেন ব্রম্হা তখন বলেন – স্বয়ং ব্রম্হা বা বিষ্ণুও শিব তত্ত্ব সম্পর্কে অবগত নয়। একদা ব্রম্হা বিষ্ণুর মাঝে হঠাৎ এক উদ্গত আলোক রশ্মি প্রকাশিত হয়। তার কোথায় আদি কোথায় অন্ত খুঁজে পাওয়া যায় না। ক্রমে সেই আলোকের মাঝে সৎচিদানন্দ দেবাদিদেব মহাদেব নিজ রূপ উদ্ঘাটন করে বলেন -এই বিশ্বরূপ তাঁর অর্থাৎ সৎচিদানন্দের পরম রূপ জ্যোতির্লিঙ্গ। তিনিই সত্য জ্ঞান ও অনন্ত স্বরূপ ঈশ্বর। উজ্জ্বল আলোক জ্যোতি শিব-লিঙ্গকে নির্দেশ করে। তাই শিবলিঙ্গকে জ্যোতির্লিঙ্গও বলা হয়। বাণলিঙ্গ হলো রাজা বলির পুত্র বাণাসুরের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত শিব লিঙ্গ। জীবের মঙ্গলের জন্য বানাসুর, মহাদেব প্রেরিত অসংখ্য শিব লিঙ্গ ভারতের পাহাড়ে নদীতে জমিতে ছড়িয়ে দেন। তাই আজ হিমালয়ে বা নর্মদা নদী তীরে এতো সংখক লিঙ্গের সন্ধান পাওয়া যায়।
ভারতের পুন্য ভূমিতে আছে এমনই ১২ টি জ্যোতির্লিঙ্গ ও ৫ টি পঞ্চভূত লিঙ্গ। যেমন -১) হিমালয়ের কেদারনাথ ২)উত্তরপ্রদেশ বেনারসের কাশী বিশ্বনাথ ৩) গুজরাটের সোমনাথ ৪) অন্ধ্রপ্রদেশ হায়দ্রাবাদের শ্রী শৈল পর্বতের মল্লিকার্জুন ৫) মধ্যপ্রদেশ উজ্জ্বয়িনীর মহাকালেশ্বর ৬) মহারাষ্ট্রের ত্রম্বকেশ্বর ৭)মধ্যপ্রদেশের ওমকারেশ্বর ও অমলেশ্বর ৮) তামিলনাড়ু রামেশ্বরম ৯) দ্বারকায় নাগেশ্বর ১০)মহারাষ্ট্রের পারলে মতান্তরে দেওঘরে বৈদ্যনাথ ১১)মহারাষ্ট্রের ভীমাশঙ্কর ও ১২)মহারাষ্ট্রের ঘৃষ্ণেশ্বর

এছাড়া পঞ্চভূত লিঙ্গ গুলি হলো –
- কালহস্তিশ্বর,
- জম্বুকেশ্বর,
- অরুনাচলেশ্বর,
- একামবারেশ্বর ও
- চিদাম্বরম নটরাজ।
সাকার শিব ও তাঁর প্রতীক – শিবের মাথায় অর্ধচন্দ্র সময়ের সাথে আত্ম বিকাশ, ত্রিশূল– সৃষ্টি স্থিতি ও প্রলয়, জটা – সৃষ্টির গঠনগত দিক, গঙ্গা– জ্ঞানের প্রবাহ, ত্রিনেত্র– অভ্যন্তরীণ শক্তিদৃষ্টি, নীলকণ্ঠ– জগতের বিষ হরণকারী যা তাঁর স্পর্শে সকল অমঙ্গল দূর হয়ে মঙ্গল সূচক কার্য্যে পরিণত হয়, বাসুকি নাগ- নির্ভীকতা, রুদ্রাক্ষ– জ্ঞান ও ধ্যান, ডমরু– মহাজাগতিক সৃষ্টির শব্দ, ব্যাঘ্র চর্ম পশুবৃত্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ ও অর্ধনারীশ্বর রূপ ব্রহ্ম শক্তির প্রতীক।
শিবপুজো বিধি – পুজোর পূর্বরাত্রে ভক্ত সাত্ত্বিক আহার গ্রহণ করে। চতুর্দশী তিথি তে উপবাসের সাথে স্নান পূর্বক পবিত্র হয়ে সাধক পুজো শুরু করে। প্রথম প্রহরে দুধ, দ্বিতীয় প্রহরে দই, তৃতীয় প্রহরে ঘি এবং চতুর্থ প্রহরে মধু দ্বারা শিবলিঙ্গের স্নানাদি সম্পন্ন করা হয়। ধুতরা ফুল ও বেলপাতা মহাদেবের পুজোর অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। শুদ্ধ পবিত্রতাই শিব পুজোর প্রকৃত বিধি।
শিব মন্ত্র ও স্তোত্র
মহা মৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র
ওঁ ত্র্যম্বকং যজামহে সুগন্ধিম পুষ্টিবর্ধনম
উর্বারুকমিব বান্ধোনান মৃত্যুর-মুক্ষীয় মামৃতাৎ
মহা ঋষি মার্কন্ড দ্বারা রচিত শিব মন্ত্রটি একটি অতি শক্তিশালী মন্ত্র এবং মনে করা হয় এটি অকাল মৃত্যুও রোগ ভয় ও দুশ্চিন্তা বিনাশক।
বিভিন্ন শিব স্তোত্র এর মধ্যে লঙ্কাধিরাজ রাবন রচিত শিব তান্ডব স্তোত্রটি বিখ্যাত। মনে করা হয় এটি পাঠ করলে ভক্ত মানসিক শান্তি লাভ ও যেকোনো সমস্যা থেকে মুক্ত হতে পারে।
“ওঁ নমঃ শিবায়” কি মহামন্ত্র?
এটা জেনে সবাই আশ্চর্য হবেন যে মন্ত্র “ওঁ নমঃ শিবায়” কিন্তু মহামন্ত্র নয়। তবে এটি সর্বজনবিদিত মন্ত্র ও সকলের প্রিয়। তাই নিজের নিজের আধ্যাত্বিক স্তর নির্বিশেষে সকলেই এই মন্ত্রোচ্চারণ করতে পারেন, ও সুফল পেতে পারেন।
এই মানবশরীরের সকল আধ্যাত্মীক ধ্যানের মধ্যে শিবধ্যান সবচেয়ে আদী ও অনন্ত। আর মহাধ্যানের বীজমন্ত্রও সবচেয়ে প্রাচীন। তবে এটি গুপ্ত বীজমন্ত্র, তাই বিনা পরম্পরায় এই মন্ত্র ধারণ, ধ্যান ও আধ্যাত্মীক উপলব্ধি অসম্বব। মন্ত্রগুপ্তির কারণে এই বিষয়ে এটুকুই আলোচনা করা হল।

শিব পুজোর মাহাত্ম্য
শিব ও শক্তি বা পরম পুরুষ ও প্রকৃতির লীলা প্রত্যক্ষ করাই হলো সাধনের উদ্দেশ্য। শ্রী রামকৃষ্ণ বলেন -”শিব লিঙ্গের পুজো মানে মাতৃ স্থান ও পিতৃ স্থানের পূজা। ভক্ত এই বলে পুজো করে – ঠাকুর দেখো যেন আর জন্ম না হয়। শোনিত শুক্রের মধ্য দিয়ে মাতৃ স্থান দিয়ে আর যেন আসতে না হয়।”
সুত সংহিতায় ভগবান সূত বলেন – লিঙ্গ হলো পরম জ্ঞান। চিদ্রূপে তিনিই পরিব্যাপ্ত। তাঁর প্রকৃত রূপ জেনে মানুষ নিজেকে জানতে পেরে মুক্তি লাভ করে। তাই মুক্তিলাভকামী মানুষ মহাশিবরাত্রিতে জগতের সেই এক চৈতন্যকেসৎ চিৎ ও আনন্দ রূপে অনুভবের প্রেরণায় মহাসমারোহেশিবচতুর্দশী পালন করে থাকে।
মহাশিবরাত্রি ২০২৬
এই বছরের শিব চতুর্দশী শুরু হতে চলেছে ১৫ই ফেব্রুয়ারী রবিবার বিকেল ৫টা ৪ মিনিটে ও তিথি সমাপ্ত হবে ১৬ই ফেব্রুয়ারী সোমবার বিকেল ৫টা বেজে ৩৪ মিনিটে। রাত্রি প্রথম প্রহরের পূজা সময় ১৫ই ফেব্রুয়ারী সন্ধ্যা ৬টা ১১ থেকে ৯ টা ২৩ অবধি। দ্বিতীয় প্রহর রাত্রি ৯টা ২৩ থেকে ১২টা ৫৬ অবধি। তৃতীয় প্রহর ১২ টা ৩৫ থেকে পরেরদিন ভোর ৩টা ৪৭ অবধি এবং চতুর্থ প্রহর ১৬ই ফেব্রুয়ারী ভোর ৩টা ৪৭ থেকে ৬টা ৫৯ পর্যন্ত। নিশ্চিত কাল পূজা সময় ১৬ তারিখ রাত্রি ১২টা ৯ থেকে ১টা ১ পর্যন্ত।
ওঁ নমঃ শিবায়
শিবরাত্রি প্রহর কাল:
ইংরেজি ২০২৬ সালের শিবরাত্রি পড়েছে ১৫ ফেব্রুয়ারী রবিবার। আবার যাঁরা পরাহে ব্রত পালন করেন তাঁদের জন্য হবে ১৬ ই ফেব্রুয়ারী সোমবার।
যদিও সোমবার শিবরাত্রি শুনলে অনেকেই অত্যন্ত আনন্দ পান কিন্তু রবিবার শিবরাত্রির বিশেষ গুরুত্ব আছে।
আমরা সবাই জানি শিবরাত্রি রাত্রিকালীন পুজা এবং চার প্রহর ব্যাপী পুজা। কলকাতা এবং কাছাকাছি অঞ্চলে চার প্রহরের বিভাগ মোটামুটি নিম্নরূপ।Raise Your Concern About this Content
রাত্রী প্রথম প্রহর Time – 05:33 PM to 08:42 PM
রাত্রী দ্বিতীয় প্রহর Time – 08:42 PM to 11:50 AM
রাত্রী তৃতীয় প্রহর Time – 11:50 AM to 03:00 ( Feb 16 হয়ে যাচ্ছি ইংরেজি মতে )
রাত্রী চতুর্থ প্রহর Time – 03:00 AM to 06:08 AM, Feb 16
চতুর্দশী তিথি শুরু হবে – সন্ধ্যা 05:04 PM on Feb 15, 2026
চতুর্দশী তিথি শেষ হবে – 05:34 PM on Feb 16, 2026
শুধু নিশীথ কালে একবার পুজো করতে চাইলে ১৫ ই ফেব্রুয়ারী রাত্রী ১১:২৫ থেকে রাত্রী ১২:১৬ পর্যন্ত সময়ে করা যাবে।
সবটাই দৃকসিদ্ধান্ত মতের হিসেব।
ভগবান সদাশিব শুদ্ধ জ্ঞান প্রদায়ক হোন এই প্রার্থনা করি। তিঁনিই গুরু তিঁনিই ত্রাতা। তাঁর কৃপায় তাঁর নির্দেশিত তন্ত্রমার্গে ভগবতীর শ্রীচরণ প্রাপ্তি হয়।
তথ্যপঞ্জি
১) উইকিপিডিয়া
২) শ্রী শ্রী শিবলিঙ্গ বাণলিঙ্গ ও জ্যোতির্লিঙ্গ
৩) শিবলিঙ্গের বাস্তবিক অর্থ
৪) শিবগীতা



