উৎপল দত্ত তাঁর নাট্যনির্মাণে বারবার এই চিত্রকেই মঞ্চে জীবন্ত করে তুলেছেন। “টিনের তলোয়ার” এই নাটকে উনিশ শতকের কলকাতার সামাজিক বাস্তবতা, শ্রেণিবিভক্তি, সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব এবং তথাকথিত আধুনিক বাবু-সমাজের সংস্কৃতি- কেন্দ্রিক মনোভাবকে তীব্র বিদ্রুপ ও সংলাপের দ্বারাই ভেদ করেছেন। এই নাটকের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, এটি কোনো কল্পনার জগৎ নির্মাণ করে না, বরং সমাজের সেই অংশকে দৃশ্যমান করে তোলে, যা সাধারণত অবহেলিত, নিঃশব্দ, অন্তরালে রয়ে যায়।
পৃথিবী জুড়ে মানুষের শ্রেণিবিভাগ আজও এক নির্মম বাস্তবতা। উচ্চ, মধ্য ও নিম্ন এই তিন শ্রেণির মধ্যে উচ্চ শ্রেণির কথাই বেশি আলোচিত হয়, তারা সুনামের মুখোশে মোড়া, সভ্যতার কণ্ঠস্বর তাদের নিয়েই তৈরি হয়। উৎপল দত্ত ঠিক এই ফাঁকটিকেই চিহ্নিত করেছেন তাঁর নাটকে।
বেণী।। আপনি থিয়েটার দেখেন?
মেথর।। না।
বেণী।। কেন?
মেথর।। বুঝি না।
মেথর কলকাতার নিচের তলায় বাস করে—মানে সে শুধু জীবিকার দিক থেকে নিচে নয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও চরম অবহেলার শিকার। তার দৃষ্টিতে মাইকেল মধুসূদনের কাব্য “জঘন্য”, কারণ এই কাব্যে তার জীবন নেই, তার আর্তি নেই। তার প্রশ্ন: এই কাব্য দিয়ে সে কী করবে?

নিম্ন শ্রেণীর মানুষদের জীবনের প্রতি বেশি চাহিদা কিংবা লোভ নেই। তারা কেবল দু-মুঠো পেট ভরে খেতে চাই। পেটের দায় তাদের সমাজে অবস্থিত অনেক অসামাজিক কাজও করতে হয়। জীবনের প্রতি তাদের কোন অভিযোগ নেই, তারা নিজেদের ভালো রাখতে সমস্ত কাজই করে।
বেণীমাধবের লেখা “ময়ূরবাহন” নাটকটি কাশ্মীরের যুবরাজের প্রেমগাথা নিয়ে—সত্যি কথা বলতে গেলে, এই নাটক কলকাতার গঙ্গার ধারে থাকা মেথরের জীবনের সঙ্গে কতটা সম্পর্কযুক্ত? নেই বললেই চলে। বাবু সমাজ ইউরোপীয় আদর্শে অনুপ্রাণিত নাট্যচর্চায় ব্যস্ত, যেখানে দেশীয় গানের ধারা, নাট্যরীতি, লোকসংস্কৃতিকে ব্রাত্য করে দেওয়া হচ্ছে।
উৎপল দত্ত এই সাংস্কৃতিক সংকটকেই তুলে ধরেছেন। তিনি ব্যঙ্গ করেছেন সেই শিক্ষিত ব্রাহ্মণ ও বাবুদের, যারা নিজেদের কল্পনার জগতে বসে নাট্যচর্চা করছে, অথচ দেশের কোটি কোটি মানুষকে তারা ভুলে গেছে। এর মধ্য দিয়ে তিনি পরোক্ষভাবে সেই প্রশ্নই ছুঁড়ে দেন—নাটক যদি জনমানুষের কথা না বলে, তবে তা কাদের নাটক?
উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে যখন বাঙালির সমাজে ইউরোপীয় ধ্যানধারণার বিস্তার হচ্ছিল, তখন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছিল নিজের ভাঙা গলা, খ্যামটা, ঝুমুর, কবিগান, পাঁচালী, আখড়াই গান। গ্রামীণ ঐতিহ্য, লোকজ মঞ্চসাহিত্য ছিল অনেক বেশি জীবন্ত ও অন্তরগ্রাহী। অথচ সেই বাস্তবতাকে একদম অবজ্ঞা করে তথাকথিত শিক্ষিত সমাজ তৈরি করল নাটকের এক নব-পরিবেশ—যা ছিল সমাজের ঊর্ধ্বতলার রুচিকেন্দ্রিক।
এখানে উৎপল দত্তের বর্ণনায় দেখা যায় এক সুস্পষ্ট সাংস্কৃতিক সঙ্ঘর্ষ—শ্রেণিভিত্তিক ও মননভিত্তিক। নিম্নবর্গের মানুষ যেমন মেথর, তাঁরা ব্রাহ্ম-নাটকের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নন কারণ সেগুলো তাঁদের জীবনের বাস্তবতাকে অস্বীকার করে। আবার বাবু সম্প্রদায় তাদের অজ্ঞতা ও অশিক্ষাকে তুচ্ছ করে। এই শ্রেণিচেতনার সংঘাতটাই নাটকের প্রাণ।

এই নাটকটি শ্রেণিসংগ্রামের প্রতিফলক। এই নাটকে মেথর যে প্রতিবাদ জানায়, তা নিছক বিদ্রুপ নয়—তা এক সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ধ্বনি। সেই বিপ্লব, যেখানে নিম্নশ্রেণির মানুষের অবস্থান তুলে ধরা হবে, যার ভাষা হবে তাঁরই মতো, যার গান হবে তাঁর দুঃখ-কষ্টে ভরপুর।
“টিনের তলোয়ার” নাটক এক ঐতিহাসিক সময়ে দাঁড়িয়ে শিল্প ও সমাজের দ্বন্দ্বকে ব্যাখ্যা করে, প্রশ্ন তোলে। উৎপল দত্ত আমাদের সমাজের সেই ফাঁকটা দেখিয়েছেন, এবং মনে করিয়ে দিয়েছেন—শিল্প যতদিন না নিচুতলার মানুষের কথা বলবে, ততদিন তা সত্যিকার শিল্প হয়ে উঠবে না…
তথ্যসূত্র
- টিনের তলোয়ার — উৎপল দত্ত
- নানা থিয়েটারের কথা — উৎপল দত্ত
- বেঙ্গল থিয়েটার — উৎপল দত্ত
- উনিশ শতকের বাঙালি সমাজ — অমলেশ ত্রিপাঠী
- বঙ্গীয় নাটকের ইতিহাস — শচীন্দ্রনাথ মজুমদার
- বাঙালির নাটক — শম্ভু মিত্র
- শতবর্ষের বাংলা নাটক — সমরেশ বসু (সম্পাদনা)
- লোকনাট্য ও বাংলা থিয়েটার — আশুতোষ ভট্টাচার্য
- কলকাতার থিয়েটার : অতীত ও বর্তমান — অরুণ দত্ত
- বাঙালি সংস্কৃতি ও থিয়েটার — অজিত দত্ত
- উনিশ শতকের কলকাতা : সংস্কৃতি ও সমাজ — হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়
- লোকনাট্যের ইতিহাস — শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়
- মাইকেল মধুসূদন দত্ত : জীবন ও সাহিত্য — সুকুমার সেন
- বাবুসমাজ ও বাঙালি সংস্কৃতি — সুকান্ত ভট্টাচার্য



