কথাকথিত সময়ে “নেতাজি” ও ট্রেন্ডে ভাসছে। আপামর বাঙ্গালীর কাছে তিনি সবসময় প্রাণপুরুষ। তিনি কে কিংবা তিনি কি কি করেছেন এটা আলাদা করে বলা চলে না। সারাজীবন কোনো মানুষ থাকে না কিন্তু তার কাজগুলো থেকে যায়। ১৯২৪ সাল থেকে ১৯৩১ সাল এই সময়পর্বে কলকাতা পুরসভায় সুভাষচন্দ্র বসুর উপস্থিতি শুধুই প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার হিসেবে কাজ শুরু করে ১৯৩০ সালের ২২ আগস্ট তিনি কলকাতা পুরসভার মেয়র হন। প্রশাসনের শীর্ষে বসেও তিনি নজর রেখেছিলেন পুরকর্মীদের দৈনন্দিন জীবনের দিকে। সেই ভাবনা থেকেই পুরসভার কর্মীদের খাবারের সংস্থান করতে চালু হয় পুরসভার ক্যান্টিন যা আজও তাঁর মানবিক দূরদর্শিতার সাক্ষ্য বহন করে।
খাদ্যরসিক নেতাজি
ব্যক্তিগত জীবনে নেতাজি ছিলেন স্পষ্টতই খাদ্যরসিক। তাঁর খাদ্য তালিকায় আহামরি কিছু ছিল না। খুব সাধারণ খাবার খেতেই তিনি বেশি পছন্দ করতেন। মধ্যাহ্নভোজে তিনি পছন্দ করতেন ভাত, ডাল ও তরকারি একেবারে বাঙালিয়ানার স্বাদে ভরপুর খাবার। খিচুড়ি ছিল তাঁর অন্যতম প্রিয় পদ। মিষ্টির প্রতিও তাঁর আলাদা দুর্বলতা ছিল। বিশেষ করে ভীমচন্দ্র নাগের সন্দেশের কথা বারবার উঠে আসে স্মৃতিচারণে। যদিও জীবনের শেষ দিকে লিভারের সমস্যার কারণে তাঁকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাসে থাকতে হতো লেবু, লবণ, চিনি আর জলেই কাটত দিন।
চা, সুপারি ও এক অদম্য অভ্যাস
নেতাজির সবচেয়ে প্রিয় পানীয় ছিল চা। শোনা যায়, দিনে ২০-২৫ বার পর্যন্ত চা খেতেন তিনি। মুখে থাকত সুপারির কুচো খেলার মাঠে, কাজের ফাঁকে সর্বত্রই। অনেক বারণ সত্ত্বেও এই অভ্যাস ছাড়তে চাননি। পরবর্তী সময়ে অবশ্য সুপারি ছেড়ে হরিতকি খাওয়া শুরু করেন। এই ছোট ছোট অভ্যাসই যেন তাঁকে আরও মানবিক করে তোলে ইতিহাসের পাতায়।

কলেজস্ট্রিট থেকে সূর্য সেন স্ট্রিট
প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াকালীন ছাত্র সুভাষের যাতায়াত ছিল কলেজস্ট্রিটের কফি হাউস থেকে সূর্য সেন স্ট্রিটের শরবতের দোকানে। কফির সঙ্গে কাটলেট ছিল তাঁর বিশেষ পছন্দ। সূর্য সেন স্ট্রিটের এক জনপ্রিয় কেবিনে চার নম্বর টেবিল ছিল তাঁর প্রিয় আসন। সেখানেই বসে তিনি শুনতেন কাজী নজরুল ইসলামের গান সংগ্রামী চেতনার সঙ্গে সংস্কৃতির এক অনন্য মেলবন্ধন। কলকাতার আনাচে কানাচে আজও তাঁর আভা অনুভব করা যায়।

স্বাধীন ভারত হিন্দু হোটেল
কলেজস্ট্রিটের স্বাধীন ভারত হিন্দু হোটেলেও যেতেন নেতাজি। এখানেই তিনি নিজের হাতে শতরঞ্চি পেতে বন্ধুদের নিয়ে দুবেলা ভরপেট মাছ-ভাত খাইয়েছেন বহুবার। এই দৃশ্য শুধু খাদ্যরসিকতার নয়, বরং বন্ধুত্ব, সমতা ও সহমর্মিতার এক অনুপম দৃষ্টান্ত।Raise Your Concern About this Content
স্মৃতি থেকে জীবিকার লড়াই
আজও কলকাতা পুরসভার সেই ক্যান্টিনে কাজ করেন ২৭ জন কর্মী। তাঁদের অনেকেই দশকের পর দশক ধরে যুক্ত সুধীর পাল (১৯৬৪ থেকে), বীরেন জানা (১৯৭১ থেকে) প্রমুখ। নেতাজির ছবিতে ফুল দিয়ে প্রণাম জানিয়ে তাঁদের কণ্ঠে একটাই কথা এই ক্যান্টিন তাঁদের রুজি-রুটির ভরসা। আধুনিক সংস্কার ও উন্নয়নের দাবি তাঁদের আশা ও প্রত্যাশারই প্রতিফলন।
গ্রন্থপঞ্জি
১. বাংলার লোকসংস্কৃতি — আশুতোষ ভট্টাচার্য
২. লোকসংস্কৃতি পরিচয় — দুলাল চৌধুরী
৩. ভারতীয় লোকসংস্কৃতি — শশিভূষণ দাশগুপ্ত
৪. বাংলার ব্রতকথা — আশুতোষ ভট্টাচার্য
৫. লোকধর্ম ও লৌকিক দেবতা — নীহাররঞ্জন রায়
৬. বাংলার লোকায়ত ধর্ম — হরিপদ চক্রবর্তী
৭. লোকসংস্কৃতির রূপরেখা — সুকুমার সেন
৮. বাংলার লোকসাহিত্য — দীনেশচন্দ্র সেন
৯. লোকসংস্কৃতি ও সমাজচেতনা — পবিত্র সরকার
১০. ভারতীয় লোকধারা ও সংস্কৃতি — রাধাকমল মুখোপাধ্যায়
১১. বাংলার লোকদেবতা ও পূজাপদ্ধতি — তরুণকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়
১২. লোকাচার ও লোকবিশ্বাস — নির্মলকুমার বসু
১৩. লোকসংস্কৃতি: তত্ত্ব ও প্রয়োগ — অমলেন্দু বসু
১৪. গ্রামীণ বাংলা ও তার সংস্কৃতি — বিনয় ঘোষ
১৫. লোকজীবন ও লোকশিল্প — গুরুসদয় দত্ত



