সময়টা ইং ১৮৮৬ সাল। বাংলায় তখন উপনিবেশিক শাসন, কলকাতা তখন ইংরেজদের বাণিজ্যিক মেরুদন্ড, এক ব্যস্ত বাতাবরণ। সাধারণ ব্রাম্ভ সমাজে - ঈশ্বর নিরাকার নাকি সাকার, তার অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব প্রকট। অধ্যাত্বিক সারমর্মের মূল স্রোত তখন বিপথগামী। ঠিক এমন একটি সঙ্কটময় সময়ে বাংলায় কল্পতরু রূপে ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণ দেবের আবির্ভাব ঘটে।
অভ্যুত্থানম অধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম্॥
পয়লা জানুয়ারী দিনটি ঠিক চলছিল অন্যান্য সালের ইংরেজি নববর্ষ এর মতোই। তবে ওই দিনই ঘটে গেলএক অভূতপূর্ব ঘটনা, সাক্ষী হয়ে রইল উত্তর কলকাতার কাশীপুর উদ্যানবাটী, আর একদল ভক্ত-বৃন্দ। মানব দেহে কর্কট রোগে আক্রান্ত, অসুস্থ শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস ঠাকুর কল্পতরু রূপে এদিন তাঁর ভক্তদের অকাতরে কৃপা বর্ষণ দ্বারা আশীর্বাদ করে বলেছেন - তোমাদের চৈতন্য হোক। আর তার পর থেকেই প্রত্যেক নতুন ইংরেজী বছরের প্রথম দিনটি কল্পতরু দিবস হিসাবে উদযাপিত হয়ে আসছে। সকল ভক্ত মাঝে ওই দিন ঠাকুর এই কল্পতরু রূপে ধরা দিয়েছিলেন বলেই দিনটি অঘোষিত কল্পতরু দিবস হয়ে উঠেছিল। সমগ্র মানব জাতির মঙ্গলের উদ্দেশ্যে এবং তাদের শুভ মনোবাঞ্ছা পূরণের আশীর্বাদ হেতু শ্রী শ্রী ঠাকুরের মর্ত্যলোকে আবির্ভাব ও কল্পতরু দিবসের স্মরণীয় উদযাপনের প্রাসঙ্গিকতা বর্তমান।
সেদিন হঠাৎই অকল্পনীয় ভাবে পরম প্রিয় ঠাকুর তাঁর ভক্ত হৃদয় ছুঁয়ে দিয়েছিলেন, জাগিয়ে দিয়েছিলেন চেতনাকে, তার সাথে সব পাওয়ার শেষ পাওয়া - এক পরম আনন্দকে। সেই ছোঁয়া আধ্যাত্মীক নব জাগরণের স্রোত রূপে, সময় কাল নির্বিশেষে চেতনা উন্মেষের লক্ষ্যে যেন এক ব্যাপ্তময় জ্যোতিরও জ্যোতি ভাবে বিরাজমান।
কল্পতরু কি ?
শ্রী রামকৃষ্ণদেবের কল্পতরু রূপ ও কল্পতরু দিবসের কথা প্রায় সকলেই অবগত। কিন্তু এই কল্পতরু ঠিক কি এবং এর উৎপত্তিই বা কোথায় ?
পৌরাণিক কাহিনী থেকে জানা যায় যে সমুদ্র মন্থনের সময় অমৃতের সন্ধান হেতু দেবতা ও অসুরগণ মন্দার পর্বত কে দণ্ড হিসাবে ব্যবহার করেছিলেন। আর এই মন্থনের সময়, সমুদ্রতল থেকে অমৃত এবং গরলের সাথে উঠে আসতে শুরু করেন - শ্রী লক্ষ্মী, ঐরাবত নামক হস্তী, কামধেনু, উচ্চৈঃশ্রবা নামক অশ্ব, শঙ্খ আর সাথে পারিজাত নামক এক আশ্চর্য্য বৃক্ষ ( ইন্দ্রের উদ্যান এর নন্দন কানন স্থানের পারিজাত বৃক্ষ যা’র কাছে যা চাওয়া যায় তাই পাওয়া যায়)। হরিবংশ পুরাণ থেকে আরও জানা যায় যে স্বর্গের সেই পারিজাতের একটি মর্ত্যলোকে বর্তমান উত্তরপ্রদেশের বারাবাঙ্কি জেলার কিন্টুর গ্রামে অবস্থিত। মহাভারতে মাতা কুন্তীর নামানুসারে গ্রামের নামকরণ এবং তাঁর চিতাভস্ম থেকে পারিজাত কল্পবৃক্ষ রূপান্তরিত হয়, এমনটি জানা যায়। অন্যদিকে শ্রীকৃষ্ণ, তাঁর পত্মীদ্বয় সত্যভামা ও রুক্মিণী কে স্বর্গ থেকে কল্পতরু পারিজাত উপহার করেন বলে কথিত আছে। Raise Your Concern About this Content
শ্রী শ্রী ঠাকুর রামকৃষ্ণ ও কল্পতরু
শ্রী শ্রী ঠাকুর রামকৃষ্ণ দেবের কথায় -ঈশ্বর কল্পতরু, তাঁর কাছে যেমনটি চাওয়া যায় তেমনটি পাওয়া যায়। কেউ সুখী সংসার, মোটা মাইনের চাকরি, সন্তানের মঙ্গল কামনা, নিজ নিজ ক্ষেত্রে সফলতা, খ্যাতি আবার কেউ চায় ভক্তি মুক্তি জ্ঞান। যার যেমন ইচ্ছে - সে তাই পায়। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের মানসপুত্র স্বামী ব্রম্ভানন্দের কথায় - দেবত্ব চাইলে দেবত্ব, পশুত্ব চাইলে পশুত্ব।
নেপথ্য কাহিনী
১৮৮৫, ১১ই ডিসেম্বর শ্যামপুকুর বাটী থেকে ঠাকুর পা রাখলেন কাশীপুর উদ্যানবাটীতে। ভগ্ন স্বাস্থ্য, প্রতিকূল পরিবেশ কারণ হিসাবে ধরে নিলে ডাক্তার মহেন্দ্রলালের পরামর্শে ও ভক্তগণের উদ্যোগে খোলামেলা উন্মুক্ত কাশীপুরের উদ্যানবাটীটি তাঁর সেবার জন্য নির্ধারণ করা হয়। গলরোগে শায়িত ঠাকুরের শ্রীদেহটি দেখলে ভক্ত হৃদয় যে হতাশা দুঃখের ঢেউ উদ্বেলিত হতো তা ব্যথিত চিত্তে তিনি অবগত ছিলেন। আর তার জন্যই হয়তো আগামী দিনের সূর্য্য উঠেছিল আশার আলোর প্রতীক হয়ে, এক দিব্য জ্যোতিকে উদ্ভাসিত করে। অবশেষে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ।
১৮৮৬ র ঠাকুরের কল্পতরু হওয়ার বিবরণ
স্বামী সারদানন্দ জী'র কথায়- “ ক্রমে পৌষ মাসের অর্দ্ধেক অতীত হইয়া ১৮৮৬ খ্রীষ্টাব্দের ১ লা জানুয়ারী উপস্থিত হইলো। ঠাকুর ওই দিন বিশেষ সুস্থ বোধ করায় কিছুক্ষণ উদ্যানে বেড়াইবার অভিপ্রায় প্রকাশ করিলেন। …ঐরূপে অপরাহ্ন ৩টার সময় ঠাকুর যখন উদ্যানে বেড়াইবার জন্য উপর থেকে নিচে নামিলেন তখন ত্রিশজনেরও অধিক ব্যক্তি গৃহমধ্যে অথবা উদ্যানস্থ বৃক্ষসকালের তলে বসিয়া পরস্পরের সহিত বাক্যালাপে নিযুক্ত ছিল। তাঁহাকে দেখিয়াই সকলে সসম্ভ্রমে উত্থিত হইয়া প্রণাম করিল … কেহ কোন কথা কহিবার পূর্বেই ঠাকুর সহসা গিরিশ্চন্দ্রকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, “গিরিশ, তুমি যে সকলকে এত কথা ( আমার অবতারত্ব সম্বন্ধে ) বলিয়া বেড়াও, তুমি ( আমার সম্বন্ধে ) কি দেখিয়াছ ও বুঝিয়াছ ?” গিরিশ উহাতে বিন্দুমাত্র বিচলিত না হইয়া তাঁহার পদপ্রান্তে ভূমিতে জানু সংলগ্ন করিয়া উপবিষ্ট হইয়া উর্দ্ধমুখে করজোড়ে গদগদ স্বরে বলিয়া উঠিল, “ ব্যাস-বাল্মীকি যাঁহার ইয়ত্তা করিতে পারেন নাই, আমি তাঁহার সম্বন্ধে অধিক কি আর বলিতে পারি।” গিরিশের অন্তরের সরল বিশ্বাস প্রতি কথায় ব্যক্ত হওয়ায় ঠাকুর মুগ্ধ হইলেন এবং তাহাকে উপলক্ষ্য করিয়া সমবেত ভক্তগণকে বলিলেন, “তোমাদের কি আর বলিব, আশীর্বাদ করি তোমাদের চৈতন্য হউক। “
কল্পতরু পরবর্তী আধ্যাত্মীক নবজাগরণ
ঠাকুরের চিকিৎসক সনামধন্য ডঃ মহেন্দ্রলাল সরকার মহাশয়ের কথায়- “ভবিষ্যৎ জগৎ বুঝিতে পারিল যে কাশীপুরের বাগানে কী এক অভূতপূর্ব ভাবের উৎস্য উঠিয়াছিল, যাহাতে সমস্ত জগৎ স্তম্ভিত হইয়া যাইলো। … ভিতরকার যত ভালোবাসা উচ্চভাব ও মহতীশক্তি একসঙ্গে প্লাবন স্বরূপ অল্পদিনের মধ্যে এই স্থানে বিকাশ করিয়া ছিলেন।"
স্বামী প্রভানন্দ জী'র কথায়- “কখন কখনও এই অপার্থিব ভালোবাসা উচ্ছলিত হয়ে উঠেছিল। এইরূপ বিশেষ একটি দিন ১৮৮৬ সালের ১ লা জানুয়ারি। সেদিন ভগবান শ্রী রামকৃষ্ণ সর্বজনসমক্ষে তাঁর ‘নিষ্কারণ ভকত-শরণ’ স্বরূপটি অপাবৃত করেছিলেন, তাঁর প্রেমভাণ্ডখানি ভেঙে দিয়েছিলেন।’"
বাস্তবিকই মানব কল্যাণ এর কারণ হেতু ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণ যেন স্বর্গের সেই কল্পতরু পারিজাতের মতো উদ্যানবাটির গাছের তলায় দাঁড়িয়ে ভক্তবাঞ্ছা কল্পতরু রূপে আত্ম প্রকাশে অভয় দান করেছিলেন।
১৮৮৬ থেকে শুরু হওয়া আধ্যাত্মীক জাগরণের সেই ঢেউ আরও বিস্তর আকারে সামুদ্রিক তুফান ঝড়ের মতো সিক্ত করে চলেছে অবিরাম। প্রত্যেক ইংরেজি নববর্ষে, ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে, ক্রমবর্ধমান রামকৃষ্ণ ভাবানুরাগী অনুরাগের অশ্রু দ্বারা কল্পতরু দিবসে যোগদান ও উদযাপন করে চলেছেন। দিনটিতে বৈদিক শান্তি মন্ত্র পাঠ, ঠাকুরের বিশেষ পূজা, ভজন-সঙ্গীত, ভোগারতি, ভক্ত সম্মেলন, কীর্তনাদি সম্পন্ন হয়ে থাকে। ধ্যান ভজন গান কীর্তন সব মিলিয়ে এক অপূর্ব আনন্দের বাতাবরণে রামকৃষ্ণ আশ্রমগুলি যেন স্বর্গভুমিতে রূপান্তরিত হয়। আধ্যাত্মীক আকাঙ্খিত হৃদয় এই বিশেষ দিনে রামকৃষ্ণ ভাবধারায় যেন বিন্দু রূপে ভাব সমুদ্রে মিশে যায়। আগামী ২০২৬ সালের ১লা জানুয়ারী কল্পতরু দিবস, অন্যান্য বছরের মতোই অনুষ্ঠিত হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ, ভারত বর্ষ সহ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে।
বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে কল্পতরু উৎসব পালন
কাশিপুর উদ্যানবাটি তো বটেই দক্ষিণেশ্বর মা ভবতারিনীর মন্দিরে, ঠাকুরের ঘর এ মহা সমারোহে,পূজা ও উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়াও কাশীপুর মহা শ্মশান, কাঁকুড়গাছি যোগোদ্যান মঠ, সারদা পীঠ,বেলুড় শ্রী রামকৃষ্ণ মঠসহ সারা ভারতবর্ষ ও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থিত রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন, বেদান্ত সোসাইট , বাংলাদেশ, আমেরিকা, কানাডা, রাশিয়া, সাউথ আফ্রিকা, ফ্রান্স, জার্মানি, আয়ারল্যান্ড, মালয়েশিয়া, নেদারল্যান্ডস, নিউজিল্যান্ড, ইউনাইটেড কিংডম এ কল্পতরু উৎসব উদযাপিত হয়ে থাকে।
References:
১. শ্রী রামকৃষ্ণের অন্ত্যলীলা / স্বামী প্রভানন্দ
২. শ্রী রামকৃষ্ণ লীলাপ্রসঙ্গ / স্বামী সারদানান্দ
৩. কথামৃত /শ্রী ম
৪. গুরুপ্রন রামচন্দ্রের অনুধ্যান
ছবি - কৃতজ্ঞতাস্বীকার:
১. বেলুড় মঠ, Photo credit:পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন
২. Birthplace By Alan Perry
৩. দ্য টাইমস
৪ . Printest India



