মহাত্মা গান্ধি রোডের ধারে সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যান্ডপার্টির দোকানগুলো ছিল ঠিক তেমনই এক জীবন্ত ইতিহাস। কলেজ স্ট্রিট মোড় থেকে সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউ পর্যন্ত বিস্তৃত এই অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে ছিল সুরের কারখানা, যেখানে প্রতিদিন তৈরি হত আনন্দের শব্দ, উৎসবের আবহ, আর জীবিকার নির্ভরতা।
এই দোকানগুলোর ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়ত দেয়ালে ঝোলানো ড্রাম, ট্রাম্পেট, স্যাক্সোফোন, ক্ল্যারিনেট, সানাই। কোথাও রাখা থাকত রংচঙে রাজকীয় পোশাক, ঝলমলে কোট, সোনালি বোতাম, লাল-নীল পাগড়ি। এগুলো শুধুই সাজসজ্জা নয়, ছিল একটি পেশার পরিচয়চিহ্ন। কলকাতার রাস্তার ইতিহাসে এই দোকানগুলো ছিল এমন এক অধ্যায়, যেখানে শব্দই ছিল ভাষা।
ঔপনিবেশিক কলকাতার সঙ্গে এই ব্যান্ডপার্টির ইতিহাস ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে। ব্রিটিশ শাসনকালে সামরিক কুচকাওয়াজ, রাজকীয় অভ্যর্থনা ও সরকারি অনুষ্ঠানে ব্যান্ড বাজানোর চল শুরু হয়। সেই সূত্র ধরেই বিহার ও উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে বহু দরিদ্র কিন্তু দক্ষ যুবক ভাগ্যান্বেষণে কলকাতায় এসে পৌঁছন। তাঁদের হাত ধরেই শহরে গড়ে ওঠে প্রথম ব্যান্ডপার্টিগুলো। ধীরে ধীরে এই পেশা হয়ে ওঠে পারিবারিক উত্তরাধিকার বাবার হাত থেকে ছেলের হাতে তুলে দেওয়া হয় ড্রাম স্টিক বা ট্রাম্পেট।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই পেশার বিস্তার আরও বাড়ে। বিয়ে, ধর্মীয় শোভাযাত্রা, দুর্গাপুজো, কালীপুজো, বিসর্জন, স্বাধীনতা দিবস, প্রজাতন্ত্র দিবস কলকাতার কোনও বড়ো অনুষ্ঠানই যেন ব্যান্ডের সুর ছাড়া সম্পূর্ণ হতো না। একসময় জানুয়ারি মাস মানেই ছিল ব্যান্ডপার্টির ব্যস্ততম সময়। দোকানের সামনে ভিড় জমাত খরিদ্দারদের। বাদকেরা তখন রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে বাজনা বাজিয়ে শোনাতেন, ড্রামের দ্রিমদ্রিম আর ট্রাম্পেটের পোঁ পোঁ শব্দে গমগম করত গোটা মহাত্মা গান্ধি রোড।
কালের নিয়মে বদল এসেছে। ক্যাসেট, ডিজে সংস্কৃতি, আধুনিক শব্দযন্ত্রের দাপটে লাইভ ব্যান্ডের চাহিদা কমতে থাকে। তার ওপর করোনাকালীন দীর্ঘ স্তব্ধতা এই দোকানগুলোর অস্তিত্বকে আরও বিপন্ন করে তোলে। বহু দোকানের ঝাঁপ নামিয়ে দিতে হয়েছে। যেসব দোকান এখনও টিকে আছে, তারা যেন অতীত আর বর্তমানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা স্মৃতিস্তম্ভ।
যখন কলকাতা বাজত লাইভ
একসময় জানুয়ারি থেকে মার্চ এই তিনটি মাসই ছিল কলকাতার ব্যান্ডপার্টির সোনালি সময়। বিয়ের মরশুম মানেই শহরের রাস্তায় রাস্তায় লাইভ সুরের দাপট। বিকেল নামলেই দেখা যেত, কোথাও বিয়েবাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ব্যান্ডের সারি, কোথাও আবার শোভাযাত্রার আগে শেষ মুহূর্তের রিহার্সাল। দুর্গাপুজোর বিসর্জন হোক বা কালীপুজোর রাত, স্বাধীনতা দিবসের প্রভাতফেরি কিংবা প্রজাতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজ লাইভ বাজনা ছাড়া কোনও আয়োজনই যেন সম্পূর্ণ হতো না।
এই লাইভ সুরের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল শহরের আবেগ। ডিজে বা রেকর্ডেড গানের মতো এটি কেবল শোনা নয়, দেখা ও অনুভব করার অভিজ্ঞতা। বাদকদের শরীরী উপস্থিতি, শ্বাসের ওঠানামা, হাতের তালে তালে ড্রামের ছন্দ সব মিলিয়ে সুর তখন জীবন্ত হয়ে উঠত। কলকাতার রাস্তা তখন শুধু চলাচলের জায়গা নয়, হয়ে উঠত এক চলমান মঞ্চ।

বাংলা সাহিত্যের সমাজচিত্রে যেমন আমরা পাই জীবনের ঘাম-মাটির গন্ধ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের শ্রমজীবী মানুষ, বিভূতিভূষণের গ্রামবাংলার সরলতা, কিংবা শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের শহুরে ক্লান্তি ঠিক তেমনই এই ব্যান্ডপার্টিরা ছিল শহরের এক শ্রেণির মানুষের জীবিকা ও আত্মপরিচয়ের প্রতীক। তারা গল্পের নায়ক না হয়েও শহরের প্রতিদিনের জীবনে অপরিহার্য ছিল। উৎসবের সামনে থাকলেও তাদের জীবন কাটত পর্দার আড়ালে।
সুরের আড়ালে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পাঠ
ব্যান্ডপার্টির ইতিহাসে লুকিয়ে আছে এক নিঃশব্দ সামাজিক পাঠ। শম্ভু চক্রবর্তী বা সেলিমদের কথায় উঠে আসে সেই বাস্তবতা এই পেশার ভেতরে জাত বা ধর্মের বিভেদ তেমন কখনও গুরুত্ব পায়নি। একই ব্যান্ডে হিন্দু ও মুসলিম বাদকেরা একসঙ্গে থেকেছেন, এক হাঁড়িতে রান্না খেয়েছেন, একই সুরে নিঃশ্বাস ফেলেছেন।
বিয়েবাড়ির মিছিলে যখন ট্রাম্পেট ওঠে, তখন কার আঙুলে সুতো বাঁধা, কার মাথায় টুপি সেই প্রশ্ন অর্থহীন হয়ে যায়। সুর তখন সবাইকে এক ছন্দে বেঁধে ফেলে। এটি ভারতীয় লোকসংস্কৃতির এক গভীর বৈশিষ্ট্য, যেখানে সংস্কৃতি ধর্মের সীমারেখা অতিক্রম করে যায়। সমাজতাত্ত্বিকদের মতে, এই ধরনের পেশাগত সহাবস্থানই ভারতের বহুত্ববাদী সংস্কৃতির বাস্তব ভিত গড়ে তোলে নীরবে, প্রচার ছাড়াই।
লাইভ সুরের পরাজয়
কালের স্রোতে এই লাইভ সুরের জায়গা ধীরে ধীরে দখল করে নেয় ক্যাসেট, সিডি আর ডিজে সংস্কৃতি। প্রযুক্তির সহজলভ্যতায় ‘রেকর্ডেড মিউজিক’ হয়ে ওঠে সস্তা ও ঝামেলাহীন বিকল্প। মানুষের উৎসবপ্রিয়তা কমেনি, কিন্তু উৎসবের ধরন বদলে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় আরও কিছু বাস্তব কারণ বিয়ের খরচ কমানোর প্রবণতা, শহরের রাস্তায় জায়গার অভাব, প্রশাসনিক অনুমতির জটিলতা ফলে ব্যান্ডপার্টি অনেকের চোখে হয়ে ওঠে ‘অপ্রয়োজনীয় খরচ’। লাইভ সুরের মানবিক অনিশ্চয়তার বদলে মানুষ বেছে নেয় বোতাম টিপে চালু করা নিশ্চিন্ত শব্দ।
যে সুর থেমে গেল, সে কি সত্যিই শেষ?
মহাত্মা গান্ধি রোডের ব্যান্ডপার্টিগুলোর ইতিহাস কেবল কয়েকটি দোকান বন্ধ হয়ে যাওয়ার গল্প নয়। এটি আসলে শহরের শ্রবণস্মৃতি হারিয়ে যাওয়ার কাহিনি। একসময় যে কলকাতা নিজে নিজেই বাজত রাস্তায়, মিছিলে, উৎসবে আজ সে কলকাতা অনেক বেশি নীরব, অনেক বেশি যান্ত্রিক। লাইভ সুরের জায়গা নিয়েছে রেকর্ডেড শব্দ, আর মানুষের জায়গা নিয়েছে যন্ত্র। তবু এই নীরবতার মধ্যেও সম্পূর্ণ মৃত্যু নেই। কারণ লোকসংস্কৃতি কখনও একদিনে শেষ হয় না। তা রূপ বদলায়, জায়গা বদলায়, প্রজন্ম বদলায়। আজ হয়তো মহাত্মা গান্ধি রোডে ট্রাম্পেট ঝোলে না, কিন্তু গ্রামবাংলার কোনও মেলায়, কোনও ছোট শহরের বিয়েবাড়িতে এখনও হঠাৎ ভেসে আসে সেই পরিচিত সুর। Raise Your Concern About this Content

আন্তরিক প্রচেষ্টা
তাই কখনো কখনো মনে হয়…আমরা কি পারিনা এই ইতিহাস রক্ষা করতে? ব্যান্ডপার্টিগুলিকে বাঁচার জন্য কিছু পরিমান অক্সিজেন দিতে? আসুন, আমরা নিয়ম করে নিজেদের বাড়ীর বা সংস্থার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এদেরকে আমন্ত্রণ জানাই, বঙ্গের এই ঐতিহ্যকে রক্ষা করতে কিছু সাহায্যের হাত বাড়াই। আর আপনার নজরে কোন মুমূর্ষু ব্যান্ডপার্টি বা শিল্পীদল থাকলে তাঁদের সম্বন্ধে আমাদের বিশ্ব বাংলা হাবকে বিস্তারিত জানান। অথবা বিশ্বের যে কোন প্রান্তে আপনার নিজেদের বাড়ীর বা সংস্থার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এদেরকে আমন্ত্রণ জানাতে “বিশ্ব বাংলা হাব” -এর সঙ্গে যোগাযোগ করুন। সময়ের অনেকটা পরিবর্তন হয়েছে, আজ আমরা উন্নত বিশ্বের সঙ্গে আর্থিক উন্নতির প্রতিযোগিতায় প্রায় শীর্ষ স্থানে। আজ সকলে মিলে আন্তরিকভাবে চেষ্টা করলে অবশ্যৈ আমরা বাংলার ঐতহ্যকে রক্ষা করতে পারবো, বাংলার গৌরবকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে পারব।
তথ্যপঞ্জি
লোকসংস্কৃতি পরিচয় — আশুতোষ ভট্টাচার্য
বাংলার লোকসংস্কৃতি — আশুতোষ ভট্টাচার্য
বাংলার ব্রতকথা — গুরুসদয় দত্ত
বাংলার লোকসাহিত্য — দীনেশচন্দ্র সেন
লোকসংস্কৃতি ও লোকধর্ম — নির্মলকুমার বসু
বাংলার লোকায়ত সংস্কৃতি — সুকুমার সেন
ভারতীয় লোকসংস্কৃতি — শশিভূষণ দাশগুপ্ত
লোকসংস্কৃতি ও সমাজ — অনিলকুমার নেহরু
ফোক কালচার অব ইন্ডিয়া — কে. শিবরামন
Folk Culture in India — A.K. Ramanujan
Speaking of Śiva — A.K. Ramanujan
The Folk Arts of Bengal — Gurusaday Dutt
Indian Folk Traditions — Jawaharlal Handoo
লোকজ সংস্কৃতি ও বাঙালি সমাজ — অমলেন্দু দে
বাংলার লোকসংগীত — দেবব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়



