কালীপুজো – দেওয়ালীর রেশ কাঁটতে না কাঁটতেই এসেগেল ভাইফোঁটা। ভারতবর্ষের বিভিন্ন জাগায় স্বারম্ভরে ভাইদুজ বা ভাইয়াদুজ পালন হলেও ভাইফোঁটা আজ বাঙ্গালীর জীবনের অনবদ্য অনুষ্ঠান। পারিবারিক রীতিরেওয়াজ মেনে মিষ্টিমুখ আর দশব্যাঞ্জনে খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন আর অন্যদিকে বিভিন্ন পাড়া ও সংস্থার গণ ভাইফোঁটার অনুষ্ঠান মিলে আজ ভাইফোঁটা ভাই – বোনের মিলনের এক অদ্বিতীয় অনুষ্ঠান।
ভাইয়ের কপালে দিলাম ফোঁটা,
আর কি আমি চাই?
নাইবা পেলাম পান্না চুনি,দুঃখ আমার কিছু নাই।।
ভাইফোঁটার বিশেষ দিনে প্রধান উপকরণই থাকে পান, সুপারি, দূর্বা আর মিষ্টি। বোনেরা তাদের ভাইয়ের মঙ্গল কামনায় এই বিশেষ দিনে মিষ্টির থালা সাজিয়ে দেয়,সঙ্গে থাকে আশীর্বাদ আর ভালোবাসা।
বিজয়া দশমী থেকেই বাঙালির ঘরে ঘরে মিষ্টি খাওয়ানোর যে রীতির সূচনা হয়, কালীপুজোর পর ভাইফোঁটায় থাকে তার বিশেষ আকর্ষণ। একটা সময় ছিল যখন বাড়িতেই তৈরি হতো মিষ্টি অথবা ঐতিহ্যমন্ডিত মিষ্টিগুলি ভাইদের থালায় দেখা যেত। মানুষের জীবনযাত্রা পরিবর্তিত হবার সাথে সাথে গতানুগতিক মিষ্টির ধারারও পরিবর্তন হয়েছে বর্তমানে। বাঙালি কখনোই তার মূলকে ভুলতে পারেনা, সেই চিত্রই মিষ্টির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তাই ঐতিহ্য এবং ফিউশন এর মেলবন্ধনে এই বছরের ভাইফোঁটা জমজমাট।
অতীতে বাড়িতেই ঘরোয়া মিষ্টি তৈরির চল

একটা সময় ছিল যখন সম্ভ্রান্ত বাড়িগুলিতে মিষ্টি ঘরে তৈরি করা হতো। শুধুমাত্র ভাইফোঁটা নয়, পয়লা বৈশাখে, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বাড়িতে মিষ্টি তৈরির চল ছিল। নারকেল, চিনি, গুড়, দুধ, ক্ষীর এইসব দিয়েই মিষ্টি তৈরি হতো। বিশেষ দিনটিতে অনেক সময় ভাইদের পাতে পিঠেপুলিও মিষ্টির ছাঁচে দেওয়া হতো। বর্তমানে কাজু, পেস্তা রোল,রাবড়ি, রসগোল্লা অনেকেই বাড়িতে তৈরি করে থাকেন। বোনেদের হাতের ছোঁয়ায় মিষ্টির স্বাদ বিখ্যাত কোন মোদকের মিষ্টির মতো না হলেও ভাইদের কাছে তা যেন অমৃত।
ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির সম্ভার
ফিউশনের যুগে যখন বাংলার মিষ্টির ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে বসেছে, ঠিক সেই সময়ই কলকাতার বেশ কিছু মিষ্টির বিপনী যারা তাদের ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছে। প্রাচীন আতা, নারকেল নাড়ু, নারকেলের ছাতা, তিলের খাজা, কদমা এগুলি প্রায় আজকে মিষ্টির দোকানে বিলুপ্ত। খুব কম দোকানেই এগুলো আজকে খুঁজলে পাওয়া যায়। তবে ঐতিহ্যশালী মিষ্টির তালিকায় জলভরা সন্দেশ, লবঙ্গলতিকা, শঙ্খ সন্দেশ ভাইফোঁটার বিশেষ দিনে খুবই জনপ্রিয়। মিষ্টি ছাড়া ভাইদের থালা অসম্পূর্ণ।
ফিউশনের যুগে বর্তমান প্রজন্মের মিষ্টির রেসিপি

বর্তমান প্রজন্ম অনেকেই মিষ্টি তেমন খুব একটা পছন্দ করে না,অথবা অনেকেই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। যাদের মিষ্টি খাওয়া বারণ।তাই মিষ্টির সঙ্গে অন্যান্য নানা স্বাদের মিশ্রণে ফিউশনের মিষ্টি মানুষের মনের কোণে জায়গা করে নিয়েছে। তাই সকলের কথা মাথায় রেখেই কখনো সুগার ফ্রী সন্দেশ, চকোলেট মিষ্টি, বেকড রসগোল্লা, খেলনা সন্দেশ, ক্ষীরের চপ, আমের ছাঁচে বিভিন্ন সন্দেশ, মিষ্টির ক্ষেত্রেও থিমের ব্যবহার চলে এসেছে। অবশ্যই এক্ষেত্রে মিষ্টির দাম কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও বোনরা কিন্তু ভাইদের দেওয়ার ক্ষেত্রে কোন কৃপণতা দেখান নি।
ভাইফোঁটার মিষ্টির কিছু উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠান

সময়ের সাথে সাথে বদলেছে শহর, সেজেছে রকমারী মিষ্টির দোকানগুলি। আপনারা এই বিখ্যাত মিষ্টিগুলি পেতে পারেন কলকাতার ইতিহাসখ্যাত সমস্ত মিষ্টির দোকান থেকে। সেই মিষ্টির দোকানের ঠিকানা দেওয়া থাকলো আপনাদের জন্য।
রকমারী বাঙ্গালী মিষ্টি আমরা পাই বাংলার সব কোনাতেই। পাশাপাশি আপনারা এই সমস্ত মিষ্টিগুলি পেতে পারেন কলকাতার বিখ্যাত কিছু মিষ্টির দোকান থেকেও। সেই মিষ্টিগুলির কিছু ঐতিহাসিক ময়রার দোকানের ঠিকানা দেওয়া থাকলো আপনাদের জন্য।
সন্দেশের জন্য
১। গিরিশচন্দ্র দে এন্ড নকুড়চন্দ্র নন্দী
📍ঠিকানা: ৫৬,রাম দুলাল সরকার স্ট্রীট,হেদুয়া, কলকাতা। বেথুন কলেজের পাশে।
রসগোল্লার জন্য
২। কেসি দাস
📍ঠিকানা: ১১এ, ধর্মতলা, টিপু সুলতান মসজিদের বিপরীতে।
বেকড রসগোল্লা এবং মিষ্টির জন্য
৩। বলরাম মল্লিক ও রাধারমন মল্লিক –
এনাদের দোকানের বিভিন্ন শাখা কলকাতায় আছে: পদ্মপুকুর রোড, ভবানীপুর, কলকাতা। এছাড়াও কসবা, নিউ আলিপুর, গরিয়াহাট ইত্যাদি এলাকাতেও শাখা রয়েছে।
ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি,লবঙ্গ লতিকা এবং খেলনা সন্দেশ এর জন্য বিখ্যাত
৪। সতীশ চন্দ্র দাস এন্ড সন্স –
📍ঠিকানা: এন-৩,ফতেপুর প্রথম সরণি, বাধা বটতলা মোড়, গার্ডেনরিচ, কলকাতা।
বর্তমানে ডিজিটাল যুগ। তাই এই প্রত্যেকটি মিষ্টির প্রতিষ্ঠানে আপনারা অনলাইনে ও অর্ডার করে মিষ্টি পেতে পারেন। প্রয়োজনে গুগলের সাহায্য নিয়ে ফোন নাম্বার ও পেতে পারেন।
ঐতিহ্যের সাথে দাঁড়িপাল্লায়ফিউশনকে রাখলে শারীরিক সুস্থতার কথা মাথায় রেখে ফিউশনের দিকে কিছুটা পাল্লা ভারী হলেও মুখের স্বাদের দিক থেকে যে ঐতিহ্যের কদর সব সময় বেশি হবে তা বাঙালিকে বলে দিতে হবে না। আর যারা প্রথমবার এই মিষ্টিগুলির স্বাদ নিতে চাইছেন তারা অবশ্যই আর দেরি না করে নিয়ে ফেলুন।
তথ্যসূত্র:
- নিজস্ব ওয়েব রিসার্চ
- লোকবিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক তথ্য


