সন ২০২৬। একবিংশ শতাব্দীর এই পর্যায়ে মানুষের জীবন আজ অনেক সহজ এবং উন্নত। এর প্রধান কারণ আমাদের বিজ্ঞানীদের দ্বারা কৃত কিছু নতুন আবিষ্কার; আর যার ফল স্বরূপ আমাদের দৈনন্দিন জীবন আজ যথেষ্ট উন্নত। কিন্তু হতাশার বিষয় হল, একদিকে অনেক কিছু বিষয়ে উন্নতি করার সাথে সাথে আমরা আমাদের চারপাশের পরিবেশের যথেষ্ট ক্ষতি করে চলেছি, অনেকটা জেনেশুনেই। আর মস্তিস্কপ্রসুত আমাদের এই সকল ক্রিয়াকলাপের জন্য প্রকৃতি ও পরিবেশের ক্ষতি হয়ে চলেছে, বিশেষ করে জলাভূমির, যা খুবই উদ্বেগের কারণ।
এমতবস্থায় এই বিপন্ন জলাভূমিগুলির উন্নতি, পরিবেশের যত্ন নেওয়া এবং প্রকৃতি রক্ষা করার গুরুত্ব সকল সমাজবাসীকে বোঝানো ও শেখানোটা আমাদের অর্থাৎ প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে এক খুবই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

তাই প্রতিবছর ২রা ফেব্রুয়ারী বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং আশঙ্কাজনক বাস্তুতন্ত্রাদির মধ্যে একটি – জলাভুমি বা জলাশয়ের সংরক্ষণকে সর্বাগ্রাধিকার ও এর তাৎপর্য স্মরণ করিয়ে দেবার উদ্দেশ্যে পৃথিবীর সকল পরিবেশবিদ তথা প্রকৃতজ্ঞরা একত্রিত হন। বিশ্ব জলাভূমি দিবস হিসেবে পরিচিত এই বিশ্বব্যাপী উদ্যোগ প্রকৃতি, মানুষ, সংস্কৃতি এবং সার্বিক ভবিষ্যতের জন্য এক তাৎপর্যপূর্ণ সামাজিক প্রচেষ্টা।
বিশ্ব জলাভূমি দিবস:
পটভূমি
এই দিনটিকে “বিশ্ব জলাভুমি দিবস” হিসেবে পালন করার কারণ হল ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ২রা ফেব্রুয়ারী ইরানের রামসারে অনুষ্ঠিত রামসার সন্মেলনে (Ramsar Convention) স্বাক্ষরিত একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি, যার লক্ষ্য ছিল ‘জলাভুমি সংরক্ষণ এবং স্থিতিশীল ব্যবহার (Conservation and sustainable use of wetlands)’। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি প্রথম আন্তর্জাতিক চুক্তি যার লক্ষ্য ছিল গুরুত্বপূর্ণ জলাভুমি সংরক্ষণ (আঞ্চলিক দৃষ্টিকোণ থেকে যারা বিশেষভাবে লক্ষণীয়), জলসম্পদ ব্যাবস্থাপনা। পরবর্তীকালে ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে এই সন্মেলনের ফলস্বারুপ ব্রিটিশ যুক্তরাষ্ট্রে ‘শুদ্ধজল আইন’ প্রবর্তিত হয়, এবং দুবছর বাদে আমাদের দেশে ভারতীয় জল ও জলদূষণ প্রতিরোধ আইনের প্রবর্তন হয়।
বিশ্ব জলাভূমি দিবসের তাৎপর্য:
বিশ্ব জলাভূমি দিবস উদযাপনের মাধ্যমে সারা বিশ্বে জলাভূমির ক্রমবর্ধমান ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে সমাজের সচেতনতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা করা হয়। বন জঙ্গলের চেয়ে তিনগুণ হারে দ্রুত বিলীন হয়ে যাচ্ছে জলাভূমি। এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমন ও অভিযোজন’এ জলাভূমির ভূমিকার উপর জোর দেয়া, বিশেষ করে জলাজমি এবং ম্যানগ্রোভ দ্বারা কার্বন সঞ্চয় এবং চরম আবহাওয়ার ঘটনা থেকে সুরক্ষা প্রদানের বিভিন্ন সুদিক গুলি জনমানসের সামনে তুলে ধরা হয়।

“জলাভূমি” বলতে আমরা কি বুঝি:
জলাভুমির বিজ্ঞানসম্মত সংজ্ঞা এবং অর্থবহ বর্ণনা পাওয়া যায় রামসার সন্মেলনের বিবরণী থেকে। ওখানে মূলত ‘জলাভূমি, জলাজমি, পিটল্যান্ড বা জলা অঞ্চল, প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম, স্থায়ী বা অস্থায়ী, স্থির বা প্রবাহিত জল, মিঠা, লোনা বা লবণাক্ত, সামুদ্রিক জলের অঞ্চল যার গভীরতা ভাটার সময় ছয় মিটারের বেশি হয় না’ এধরনের অঞ্চলকেই বোঝানো হয়েছে।
পৃথিবীর মোট স্থলভাগের শতকরা ৬ শতাংশ অধিকার করে আছে জলাভুমি, এবং পৃথিবীর সকল জলাভুমির ওপর নির্ভর করে রয়েছে সকল উদ্ভিদমণ্ডলের ৪০ শতাংশ।
বাস্তুতান্ত্রিক পরিষেবায় জলাভুমির ভুমিকা
জীববৈচিত্র্য হটস্পট – জলাভূমি মৎস্য, পক্ষী, উভচর, সরীসৃপ, অমেরুদণ্ডী প্রাণী এবং উদ্ভিদের আবাসস্থল এবং প্রজনন ক্ষেত্র প্রদান করে যা জৈবিক জলাধার হিসেবে কাজ করে যা জীবের জিনগত বৈচিত্র্য এবং বাস্তুতন্ত্রের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
তাই পরিযায়ী পাখির সংখ্যা এবং উক্ত জলায় জলজ প্রাণীর সমৃদ্ধির কারণে অনেক জলাভূমিকে ‘রামসার জলাভুমি’ (উদাঃ – লোকটাক হ্রদ, মণিপুর) অর্থাৎ আন্তর্জাতিক গুরুত্বের জলাভূমি হিসাবে মনোনীত করা হয়েছে।
জলাভুমি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা:
জলাভূমি প্রকৃতপক্ষে নীরবে অনেক তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যা বাস্তবে আমাদের জীবনকে সুচারুভাবে পরিচালনা করে। তাই আজ জলাভূমির সংরক্ষণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটা দূষিত জল পরিষ্কার করে, অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত শোষণ করে, বন্যা প্রবণতা হ্রাস করে, কার্বন সঞ্চয় করে এবং পাখি, মাছ এবং অসংখ্য অন্যান্য প্রজাতির আশ্রয় প্রদান করে। এই সবই বস্তুত মাছ ধরা এবং কৃষি কাজের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহের জন্য সহায়ক।
জলাভূমির বিলুপ্তি যে কতটা ভয়ানক রূপ ধারণ করতে পারে তা বর্তমানকালেও আমরা দেখেছি। বেঙ্গালুরু এবং চেন্নাইয়ের মতো শহরে সাম্প্রতিক নগরবন্যা আরও খারাপ আকার ধারণ করেছে কারণ হ্রদ এবং জলাভূমি আগ্রাসন করা হয়েছে, ভরাট করা হয়েছে, অথবা তাকে আকাশছোঁয়া ইমারতে রূপান্তরিত করা হয়েছে। যখন তীব্র বৃষ্টিপাত জলাভূমির পরিবর্তে কংক্রিটে আঘাত করে, তখন জল তা ভেদ করে ভূগর্ভে প্রবেশ করতে পারে না।
আজ সারাবিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বর্ষা, তাপপ্রবাহ এবং চরম আবহাওয়া আরও অনিয়মিত রূপ ধারণ করেছে। এই ধরনের পরিস্থিতিতে জলাভূমিকে প্রাকৃতিক ঘাত-প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে, শহর এবং গ্রামগুলিকে উভয়কেই রক্ষা করে। কেবল প্রকৃতির ক্ষতি নয়, এগুলো হারানো সরাসরি পানীয় জল, খাদ্য নিরাপত্তা, বন্যা সুরক্ষা এবং এমনকি আমাদের মানসিক সুস্থতার উপরও প্রভাব ফেলে। তাই পরবর্তী বন্যা, খরা বা সংকট আমাদের প্রভূত ক্ষতি করার আগেই আমাদের চারপাশের জলাভূমি রক্ষা করা উচিত।

বর্তমানে জলাভূমি কেন সংকটের মুখে?
জলাভুমির অপরিহার্য ব্যাবহার এবং গুরুত্ব থাকা সত্বেও এটিই বর্তমানে সবথেকে বেশি সংকটজনক বাস্তুতন্ত্রে পরিণত হয়েছে। এর বাস্তব কারণ গুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় –
- ১৯৭০ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী জলাভূমির আনুমানিক ৩৫% অদৃশ্য বা বিলুপ্ত হয়ে গেছে, যা বনের তুলনায় প্রায় তিন গুণ অধিক।
- একটি জনপ্রিয় প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে যদি পরিবেশ সুরক্ষায় যথেষ্ঠ বিনিয়োগ বৃদ্ধি না করা হয়, তবে ২০৫০ সালের মধ্যে জলাভূমির ক্রমাগত অবক্ষয়ের ফলে ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বাস্তুতন্ত্রের পরিষেবা নষ্ট হতে পারে।
- ‘কলিকাতা শহরের বৃক্ক’ পূর্ব কলকাতা জলাভূমি, যা পূর্বে পৃথিবীর বৃহত্তম দূষিত জল পরিশোধন ব্যবস্থা হিসেবে খ্যাত ছিল, আজ তার গুরুত্ব হারাতে চলেছে। যুগ যুগ ধরে প্রশাসনিক অবহেলার কারনে বর্তমানে এই জলাভূমির ৪৫ শতাংশ জায়গায় গড়ে উঠেছে ইমারত, জনবসতি এবং চাষাবাদ করার ভেড়ী।
বিশ্ব জলাভুমি দিবস ২০২৬ থিম/বিষয়:
এইবছর বিশ্ব জলাভুমি দিবস কে আরও তৎপূর্যপূর্ণ ভাবে পালন করার উদ্দেশ্যে UNESCO ‘জলাভূমি এবং ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান: সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য উদযাপন’ কে বিশ্ব জলাভুমি দিবস ২০২৬-র বিষয় নির্ধারণ করেছেন। স্থিতিশীল জলাভূমি তত্ত্বাবধান এবং সংরক্ষণের জন্য মানুষ-জলাভূমির পারস্পরিক মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নির্মিত ঐতিহ্যবাহী পরিবেশগত জ্ঞান কতটা অপরিহার্য তার গুরুত্ব এই বছরের নির্দেশিত বিষয়বস্তু থেকে আরও জানা যায়। দিনপঞ্জি দেখে জোয়ার-ভাটার সময় নির্ধারণ, চাষাবাদের জ্ঞান, জলদেবীর পুজা (গঙ্গাপুজ) এবং বিভিন্ন আচার ও ব্যবস্থাগুলি পালনের মাধ্যমে এই বিষয়-জ্ঞানগুলির আরও চর্চা সম্ভব।
জলাভূমি সংরক্ষণ
জলাভূমি সংরক্ষণের লক্ষ্য হলো কিছু বিপন্ন জলাভূমি রক্ষা করা যাতে তারা জীবন, জল সুরক্ষা এবং জলবায়ু স্থিতিস্থাপকতা বজায় রাখা যায়। ভারতবর্ষে এই প্রচেষ্টাকে বাস্তবে রূপ দেবার জন্য সরকার, বিজ্ঞান বিভাগ এবং জনসাধারণের একাধিক স্তরে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
জলাভূমি সংরক্ষণের জন্য নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ:
- ভারতবর্ষে জলাভূমি (সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা) আইন চালু করা হয়েছে। এই আইন বেআইনি দখল, নোংরা ও আবর্জনা ফেলা এবং অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণের মতো কার্যকলাপকে আইন দ্বারা সীমাবদ্ধ করে।
- অনেক গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমিকে রামসার সাইট ঘোষণা করে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং শক্তিশালী আইনি সুরক্ষা প্রদান করা হয়েছে (বর্তমানে ৯৬টি রামসার সাইট ভারতে অবস্থিত)।
- দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকে সমর্থন সুদৃঢ় করতে জাতীয় জলজ বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ পরিকল্পনা (NPCA) এর মতো কর্মসূচির পুনঃপ্রবর্তন করা হয়েছে। অন্যদিকে রাজ্যের জলাভূমি কর্তৃপক্ষ এখন উপগ্রহ তথ্য এবং মাঠ জরিপ পদ্ধতি ব্যবহার করে জলাভূমি সনাক্তকরণ এবং পর্যবেক্ষণের জন্য দায়ভারপ্রাপ্ত।
সংরক্ষণের সঠিক উপায়:
সংরক্ষণের লক্ষ্য কেবল জলাশয় নয়, সমগ্র জলাভূমি বাস্তুতন্ত্র রক্ষা করা। এর মধ্যে রয়েছে প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ বজায় রাখা, পয়ঃনিষ্কাশন ও শিল্প থেকে দূষণ রোধ করা, আক্রমণাত্মক প্রজাতি নিয়ন্ত্রণ করা এবং বন্যার সময় জলাভূমির স্থান প্রসারিত করার সুযোগ দেওয়া। বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ, সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ এবং প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধান কৃত্রিম সৌন্দর্যায়ন বা কংক্রিট বাঁধের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর।Raise Your Concern About this Content
কার্যকরী পদক্ষেপ:
মানুষ দলবব্ধ হয়ে
- জলাভূমিতে বর্জ্য, প্লাস্টিক বা পয়ঃনিষ্কাশন বর্জ্য ফেলা এড়িয়ে, দখলের বিরোধিতা করে এবং স্থানীয় সংরক্ষণ উদ্যোগগুলোকে সমর্থন করে সাহায্য করতে পারেন।
- দায়িত্বশীল পর্যটন, বাড়িতে জল সংরক্ষণ এবং জলাভূমির গুরুত্ব সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ সচেতনতার প্রচার করতে পারেন।
- নাগরিক মহলে সাকারত্মক আলোচনা করতে পারেন, জলাভূমিকে খালি জমির পরিবর্তে প্রাকৃতিক সম্পদ হিসাবে বিবেচনা করতে পারেন।
- সংরক্ষণের প্রচেষ্টা আরও শক্তিশালী এবং দীর্ঘস্থায়ী করার সুদৃঢ় পদক্ষেপ নিতে পারেন।
বিশ্ব জলাভূমি দিবস পালন কেবল একটি বার্ষিক উদযাপন নয় – এটি একটি পরিবেশগত স্বাস্থ্য এবং মানব কল্যাণের ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত এক বৈজ্ঞানিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক স্মারক। এর সুদূর প্রভাব বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং জল পরিশোধন থেকে শুরু করে জলবায়ু পরিবর্তন পর্যন্ত। এই সংস্কৃতি জলাভূমি ও পৃথিবীতে জীবন টিকিয়ে রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাস্তুতন্ত্র হিসেবে অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে। আজ এসবের মূল্য বোঝা এবং শর্তানুযায়ী কাজ করা আগামী দিনে পৃথিবীতে স্থিতিশীল, জীববৈচিত্র্য পূর্ণ এবং ন্যায়সঙ্গত সংস্কৃতি নিশ্চিত করতে পারে।
তথ্যপঞ্জি
- রামসার সন্মেলন: https://portals.iucn.org/library/sites/library/files/documents/EPLP-023.pdf
- জনপ্রিয় প্রতিবেদন: https://www.reuters.com/sustainability/climate-energy/world-risks-up-39-trillion-economic-losses-vanishing-wetlands-report-says-2025-07-15/?
- পূর্ব কলকাতা জলাভূমির দূষণ:
- জাতীয় জলজ বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ পরিকল্পনা: https://www.pib.gov.in/PressReleaseIframePage.aspx?PRID=1911129®=3&lang=2
- চেন্নাই ও বেঙ্গালুরুর বন্যায় জলাভুমির ভুমিকা: https://www.tncindia.in/content/dam/tnc/nature/en/documents/india/restoring-chennai-wetlands.pdf



