ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সবুজে সবুজ ঢেকে থাকা এক রাজ্য হল আসাম। এই রাজ্য শুধু তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির জন্য নয়, বরং বিশ্বের কাছে ব্রহ্মপুত্র নদীর উপত্যকায় উৎপাদিত চায়ের জন্যও প্রসিদ্ধ। আসামের চা তার গাঢ়, ঘন ও শক্তিশালী স্বাদের জন্য দেশ-বিদেশে সমাদৃত। সাধারণত ব্রেকফাস্ট চা হিসেবে পরিচিত এই আসামের চা, ইংলিশ ব্রেকফাস্ট বা ব্রেকফাস্ট চার-এর মিশ্রণে ব্যবহার করা হয়।
আসামের চায়ের গল্প একেবারেই আলাদা। এটি ক্যামেলিয়া সাইন্যানসিস ভ্যার. আসামিকা উদ্ভিদ থেকে তৈরি হয়। এক সময় আসামের বাসিন্দারা চীনা জাতের চা রোপণের চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সফল হননি। এর ফলে আসাম চা তার স্বাদ, রঙ এবং ঘনত্বের জন্য স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য অর্জন করে। যদিও ব্রহ্মপুত্র নদীর দুপাশে ভুটান, বাংলাদেশ, মায়ানমার এবং চীনের বিভিন্ন জায়গায় এই ধরনের চা উৎপাদিত হয়, তবুও আসাম রাজ্য বিশ্বের বৃহত্তম চা উৎপাদনকারী অঞ্চল হিসেবে পরিচিত।
ইতিহাসে দেখা যায়, ১৮২৩ সালে সিংপুর অঞ্চলের মধ্য দিয়ে বাণিজ্য অভিযানে রবার্ট ব্রুস এই চা গাছের সঙ্গে পরিচিত হন। ওই সময় সিংফো ও খামতি সম্প্রদায়ের মানুষ এই গাছ ব্যবহার করে পানীয় ও খাবার তৈরি করত। এর ফলে আসামের চা একদিকে যেমন অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তেমনি তার স্বাদ ও গুণগতমানেও সারা বিশ্বের কাছে খ্যাতি অর্জন করে।
আসাম চায়ের মধ্যে ক্যাফেইন থাকে, তবে কফির মতো বড় পরিমাণে নয়। চায়ের এই ক্যাফেইন মাত্রা আপনাকে সারাদিন সতর্ক রাখে, কিন্তু এর কোনো ক্ষতিকর প্রভাব যেমন অনিদ্রা, উদ্বেগ বা হৃদস্পন্দনের বৃদ্ধি হয় না। তাই এটি চায়াপ্রেমীদের মধ্যে একটি প্রিয় সকালের পানীয়। বিশেষভাবে, আসাম ব্ল্যাক চা তার স্বাদ এবং ক্যাফেইনের দিক থেকে সবচেয়ে শক্তিশালী চায়ের মধ্যে গণ্য হয়। এর সম্পূর্ণ জার্ন ও শক্তিশালী স্বাদ এটিকে শক্তিশালী চা মিশ্রণ এবং চায়াপ্রেমীদের প্রিয় করে তোলে।
পর্যটকদের জন্যও আসামের চা বাগান এক অনন্য আকর্ষণ। ঋতুপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে চা বাগানগুলোতে সৌন্দর্যের এক অপরূপ দৃশ্য দেখা যায়। বর্ষাকালে যখন নতুন কুঁড়ি বেরোয়, গাছগুলি সবুজে সবুজ হয়ে যায়। খরামশুমে চা গাছের জল দেওয়ার পদ্ধতিও দর্শনীয়। চা শ্রমিকরা মাথায় ঝাঁকি নিয়ে দুই হাত দিয়ে পাতা তুলছেন, আবার তাদের ছোট্ট সন্তানরা বাগানে খেলাধুলা করছে। পাহাড়ের গায়ে ধাপে ধাপে বেড়ে ওঠা চা বাগান মনোমুগ্ধকর দৃশ্য উপহার দেয়। রেলপথ দিয়ে আসামের পথে চলার সময়, পর্যটকরা এই সবুজ ঢেকে থাকা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে চোখে উপভোগ করতে পারেন।
একটি চা গাছ থেকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষ জীবনধারণ করছে। চা শুধু একটি পণ্য নয়, এটি আসামের অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আসামের চা দেশের অন্যতম পর্যটন শিল্পের মুখ্য আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। ভারতের ছোট্ট এই রাজ্য তার সবুজ রঙ, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং গুণগতমানের জন্য সবার মন কেড়ে নিয়েছে।
সারসংক্ষেপে বলা যায়, আসাম চা শুধুমাত্র একটি পানীয় নয়, এটি ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং স্বাদের মিলনস্থল। প্রতিটি চায়ের পাত্রে আসামের ইতিহাস, শ্রমিকদের পরিশ্রম, প্রকৃতির সৌন্দর্য এবং উদ্ভিদের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে। এটি বিশ্ববাসীর কাছে ভারতীয় চায়ের এক গর্বিত পরিচয়।


