Sanghamitra Bhattacharya.
লোটাস সিল্ক: মনিপুরের পদ্মতন্তুর স্বপ্নগাঁথা
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মনিপুরের হৃদয়ে লুকিয়ে আছে এক বিস্ময়—লোটাস সিল্ক, বা পদ্ম সিল্ক। এটি এমন এক বিরল প্রাকৃতিক তন্তু, যা পদ্ম ফুলের কাণ্ড থেকে তৈরি হয়। প্রকৃতির বুকে জন্ম নেওয়া এই সিল্ক আজ কেবল একধরনের কাপড় নয়, বরং এটি মনিপুরের সংস্কৃতি, নারী উদ্যোক্তা শক্তি ও পরিবেশবান্ধব শিল্পের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
লোটাস সিল্কের বিশেষত্ব
লোটাস সিল্ক হলো পদ্ম গাছের কাণ্ড থেকে সংগৃহীত সূক্ষ্ম তন্তু, যা দিয়ে তৈরি কাপড়ের স্পর্শ মসৃণ ও হালকা। এর প্রাকৃতিক উজ্জ্বলতা এবং শীতল অনুভূতি একে অন্যান্য সিল্কের তুলনায় আলাদা করে তোলে। সাধারণ রেশমের মতো চকচকে নয়, কিন্তু এর সৌন্দর্য মৃদু ও রাজকীয়।
এই তন্তু অত্যন্ত শ্রমসাধ্যভাবে প্রস্তুত করা হয়—এক কিলোগ্রাম লোটাস সিল্ক সুতো তৈরি করতে লাগে প্রায় ১ লক্ষ পদ্ম কাণ্ড। ফলে এটি বিশ্বের অন্যতম দামি ও বিরল প্রাকৃতিক ফ্যাব্রিক।
উৎপত্তির ইতিহাস
লোটাস সিল্কের উৎপত্তি প্রায় এক শতাব্দী আগে মায়ানমারের শান রাজ্যের ইনলে লেক থেকে। ১৯০০ সালে সা ও নামে এক ইন্হা জাতির নারী প্রথম পদ্মের কাণ্ড থেকে সুতো তৈরির কৌশল আবিষ্কার করেন। ধীরে ধীরে এই পদ্ধতি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশ যেমন থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম প্রভৃতিতে ছড়িয়ে পড়ে।
ভারতে লোটাস সিল্কের সূচনা
ভারতে লোটাস সিল্কের নবজন্ম ঘটে মনিপুরে, লোকটাক লেকের তীরে।
২০১৪ সালে মনিপুরের এক তরুণী উদ্ভিদবিদ বিজয় শান্তি টংব্রাম প্রথম পদ্ম তন্তু নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। ভোরবেলায় তিনি নৌকায় করে লোকটাক লেকে যেতেন পদ্মের কাণ্ড সংগ্রহ করতে। কাণ্ডগুলো তখনও ভেজা থাকতে হয়, কারণ শুকিয়ে গেলে তা ভেঙে যায় এবং তন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
২০১৯ সালে বিজয় শান্তি প্রথমবারের মতো ভারতের মাটিতে পদ্ম তন্তু ব্যবহার করে লোটাস সিল্ক ফ্যাব্রিক তৈরি করেন।
তিনি পরবর্তীতে ‘সনাজিং সানা থাম্বল’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে লোটাস সিল্ক দিয়ে তৈরি হয় স্কার্ফ, শাড়ি, নেকটাই, শাল এবং মাফলার। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় ৩০ জন গ্রামীণ মহিলা কর্মরত, যারা হাতে বুনন করে এই মূল্যবান তন্তু দিয়ে পণ্য তৈরি করেন।
লোটাস সিল্কের তৈরি পণ্যসমূহ
লোটাস সিল্ক থেকে তৈরি পণ্যগুলো শুধুমাত্র বিলাসবহুল নয়, বরং পরিবেশবান্ধব ও সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক। সাধারণত নিচের পণ্যগুলো সবচেয়ে জনপ্রিয়ঃ
- লোটাস সিল্ক স্কার্ফ
- মাফলার ও নেকটাই
- হ্যান্ডওভেন শাড়ি ও স্টোল
- শাল ও হোম ডেকোর আইটেম
এই পণ্যগুলো বর্তমানে মনিপুর ছাড়াও মুম্বাই, কলকাতা, দিল্লিসহ ভারতের বিভিন্ন শহরে বিক্রি হচ্ছে। এমনকি আন্তর্জাতিক বাজারেও লোটাস সিল্কের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে।
লোকটাক লেক: পদ্মের রাজ্য
লোকটাক লেক হলো মনিপুরের এক বিস্ময়কর প্রাকৃতিক হ্রদ, যার ভৌগোলিক স্থানাঙ্ক প্রায় ২৪°২৬′ উত্তর অক্ষাংশ ও ৯৩°৪৯′ পূর্ব দ্রাঘিমা।
এটি উত্তর-পূর্ব ভারতের বৃহত্তম স্বাদুপানির লেক এবং এখানকার সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো এর ভাসমান দ্বীপসদৃশ গঠন, যাকে স্থানীয়রা বলে “ফুমডি”।
এই ভাসমান স্তরগুলো মাটি, উদ্ভিদ ও জৈবপদার্থের মিশ্রণে তৈরি হয় এবং জলের উপর ভেসে থাকে। এখানেই জন্ম নেয় প্রচুর পদ্মগাছ, যা থেকে সংগ্রহ করা হয় লোটাস সিল্কের মূল কাঁচামাল—পদ্ম কাণ্ড।
লোকটাক লেকে রয়েছে কেইবুল লামজাও ন্যাশনাল পার্ক, যা পৃথিবীর একমাত্র ভাসমান জাতীয় উদ্যান এবং বিরল সংগ্রিলায় হরিণ বা ড্যান্সিং ডিয়ার–এর আবাসস্থল।
কলকাতা থেকে লোকটাক ভ্রমণপথ
কলকাতা থেকে মনিপুরের লোকটাক লেকে পৌঁছানোর সবচেয়ে সহজ উপায় হলো বিমান বা রেলযোগে ইম্ফাল যাওয়া।
- বিমানপথে: কলকাতা থেকে সরাসরি ফ্লাইটে প্রায় ২ ঘণ্টায় ইম্ফাল পৌঁছানো যায়।
- রেলপথে: গুয়াহাটি পর্যন্ত ট্রেনে গিয়ে সেখান থেকে বাস বা গাড়িতে ইম্ফাল আসা যায়।
ইম্ফাল থেকে লোকটাক লেকের দূরত্ব প্রায় ৪৫ কিলোমিটার। এখান থেকে ট্যাক্সি, ক্যাব বা স্থানীয় ভাগ করা যানবাহনে মইরাং শহর হয়ে সহজেই লোকটাক লেকে পৌঁছানো যায়। পথে মনিপুরের পাহাড়, সবুজ বন আর জলজ প্রকৃতি এক অনন্য অভিজ্ঞতা দেয়।
লোকটাক ভ্রমণের আকর্ষণ
লোকটাক কেবল একটি লেক নয়, এটি প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও কারুশিল্পের মিলনস্থল। এখানে আপনি দেখতে পাবেন—
- ভাসমান ফুমডি দ্বীপ
- নৌকা ভ্রমণ ও পাখি দেখা
- স্থানীয় হস্তশিল্প বাজার
- এবং পদ্ম থেকে তৈরি লোটাস সিল্ক বুননের লাইভ প্রদর্শনী
এছাড়া এখানে স্থানীয়দের সংস্কৃতি, ঐতিহ্যবাহী নৃত্য ও খাবারও ভ্রমণকারীদের জন্য আকর্ষণীয় অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে।
বিজয় শান্তির অবদান ও জাতীয় স্বীকৃতি
মনিপুরের এই তরুণ উদ্যোক্তা বিজয় শান্তি টংব্রাম শুধু একটি শিল্প নয়, বরং এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছেন। তাঁর প্রচেষ্টা দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজেও ‘মন কি বাত’ অনুষ্ঠানে প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেছেন, “মনিপুরের মহিলারা প্রকৃতিকে কাজে লাগিয়ে যেভাবে নতুন অর্থনৈতিক দিগন্ত তৈরি করছেন, তা দেশের জন্য অনুপ্রেরণা।”
ভবিষ্যতের পরিকল্পনা
বিজয় শান্তির প্রতিষ্ঠান এখন শুধুমাত্র পদ্ম তন্তু নয়, পদ্মের শেকড় ও পাতার ঔষধি ব্যবহার নিয়েও কাজ করছে। তাঁর পরিকল্পনা রয়েছে পদ্মপাতা ও শেকড় দিয়ে হারবাল চা এবং প্রাকৃতিক প্রসাধনী তৈরির।
উপসংহার
মনিপুরের লোটাস সিল্ক শুধু এক ধরনের ফ্যাব্রিক নয়, এটি এক প্রাকৃতিক বিপ্লবের গল্প।
পদ্মের কাণ্ড থেকে তৈরি এই সূক্ষ্ম তন্তু আজ নারীর পরিশ্রম, উদ্ভাবনশক্তি ও প্রকৃতির সুষমার এক প্রতীক।
লোকটাক লেকের শান্ত জলে ভেসে থাকা ফুমডিগুলোর মাঝে যেমন জীবনের সুর বয়ে চলে, তেমনি এই লোটাস সিল্কের আঁশে বোনা আছে এক অমর কাহিনি—মনিপুরের গর্ব, ভারতের গর্ব, প্রকৃতির গর্ব।




