১৯৪৭ সালের দেশভাগের সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারো মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই, হারানোর বেদনা, আর নতুন জীবনের অনিশ্চয়তা।
১৯৪৭ সালের দেশভাগ শুধু মানচিত্র বদলায়নি, বদলে দিয়েছে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন। স্বাধীনতার আনন্দে যখন মাতোয়ারা দেশ, তখন বাংলার বুকে চলেছে এক গভীর সঙ্কটময় অধ্যায়। মৃত্যুভয় আর বাঁচার লড়ায়ে জর্জরিত লক্ষ লক্ষ বাঙালী তখন ভিটেমাটি ছাড়া, সর্বস্ব ছেড়ে যাত্রা করেছিল অজানা ভবিষ্যতের পথে । শরণার্থী শিবিরের অমানবিক অবস্থা, ট্রেনে গাদাগাদি করে সীমান্ত পেরোনো, পদ্মা – গঙ্গার মতো নদী পেরোনোর জীবন-মরণ খেলা, আর ভিড়ভাট্টায় প্রিয়জনকে হারানোর স্মৃতি—সব মিলিয়ে সেই সময়টা ছিল গভীর বেদনার। আজও সেই গল্প বেঁচে আছে পরিবারের মুখে মুখে, পুরনো ট্রাঙ্কে রাখা হলুদ হয়ে যাওয়া চিঠিতে, আর হারিয়ে যাওয়া মুখের ফাঁকা জায়গায়। শুধু অতীত নয়, —এই ইতিহাস আমাদের পরিচয়ের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
- ট্রেনের যাত্রা: আশা ও ভয়ের মিশেল
- নদী পেরোনোর জীবন-মরণ খেলা
- ভিড়ভাট্টায় প্রিয়জন হারানোর বেদনা
- পুনর্বাসনের লড়াই ও নতুন জীবনের সূচনা
- সাংস্কৃতিক বিচ্ছেদ ও হারানো ঐতিহ্য
- নারী ও শিশুদের বিশেষ দুর্দশা
- অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও দারিদ্র্য
- পরিচয় ও শিকড় হারানোর বেদনা

শরণার্থী শিবিরের কষ্টকর জীবন
দেশভাগের পর কলকাতা, হাওড়া, শিয়ালদহে হাজার হাজার মানুষ এসে পড়ে। গাদাগাদি করে ছাউনির নিচে থাকা, খাবার ও পানিয় জলের অভাব, রোগের প্রাদুর্ভাব—সব মিলিয়ে জীবন ছিল অনিশ্চিত ও ক্লান্তিকর।
ট্রেনের যাত্রা: আশা ও ভয়ের মিশেল
শরণার্থীদের ভরা ট্রেনে সীমান্ত পেরোনো ছিল এক অনিশ্চিত যাত্রা। গন্তব্যে কী অপেক্ষা করছে কেউ জানত না। হাতে ছিল শুধু কয়েকটি ব্যক্তিগত স্মৃতি ও বেঁচে থাকার আশা।
নদী পেরোনোর জীবন-মরণ খেলা
পদ্মা বা গঙ্গা পেরোনো ছিল বিপজ্জনক। রাতে নৌকোতে করে বা সাঁতার কেটে সীমান্ত পার হওয়া মানে মৃত্যুকে সঙ্গে নিয়ে যাত্রা।
ভিড়ভাট্টায় প্রিয়জন হারানোর বেদনা
স্টেশন বা সীমান্তে বহু পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। শিশু বা বৃদ্ধরা হারিয়ে গিয়েছিলেন চিরতরে, আর সেই শূন্যতা আজও ভরেনি।
পুনর্বাসনের লড়াই ও নতুন জীবনের সূচনা
দেশভাগের পর যারা পশ্চিমবঙ্গে এসে পৌঁছেছিলেন, তাদের অনেককেই গ্রামীণ এলাকায় বা অজানা শহরে পাঠানো হয়েছিল। নতুন পরিবেশে কাজ খুঁজে পাওয়া, ঘর বানানো এবং স্থানীয়দের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।
সাংস্কৃতিক বিচ্ছেদ ও হারানো ঐতিহ্য
সীমান্ত পেরিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ শুধু ভিটেমাটি নয়, নিজের ভাষার ধরন, গান, লোকগাথা ও খাদ্যসংস্কৃতির একটি অংশও হারিয়েছিলেন।Raise Your Concern About this Content
নারী ও শিশুদের বিশেষ দুর্দশা
শরণার্থী শিবির ও সীমান্তপথে নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতা, অপমান, এবং শারীরিক-মানসিক আঘাতের বহু ঘটনা ঘটেছে, যা আজও প্রজন্মান্তরে মানসিক ক্ষত রেখে গেছে।
অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও দারিদ্র্য
যারা জমি বা ব্যবসা হারিয়ে এসেছিলেন, তারা শহরের ফুটপাথ বা অস্থায়ী ঘরে দিন কাটাতেন। কাজের অভাব ও দারিদ্র্য নতুন জীবনে এগিয়ে যাওয়াকে কঠিন করে তুলেছিল।
পরিচয় ও শিকড় হারানোর বেদনা
নতুন প্রজন্মের অনেকেই জানেন না তাঁদের পূর্বপুরুষের গ্রাম কোথায় ছিল, বা কেন তাঁরা রাতারাতি ঘর ছেড়ে এসেছিলেন। এই বিচ্ছেদ শুধু ভৌগোলিক নয়—মানসিকও।
দেশভাগ শুধু রাজনৈতিক ঘটনাই নয়—এটি এক গভীর মানবিক ট্র্যাজেডি। স্বাধীনতার আনন্দের পাশাপাশি এটি রেখে গেছে বিচ্ছিন্ন পরিবার, ভাঙা স্বপ্ন, আর চিরকালীন অভাববোধ। এই গল্পগুলো মনে রাখা মানে শুধু ইতিহাস জানা নয়, বরং সেই ত্যাগ আর বেদনার সম্মান জানানো।
এই লেখা পাঠককে দেশভাগের মানবিক দিক বোঝাতে সাহায্য করবে, যা শুধু পাঠ্যপুস্তকে নয়, আমাদের পারিবারিক স্মৃতিতে বেঁচে আছে। শিক্ষার্থী, গবেষক, কিংবা সাধারণ পাঠক—সবাই এ থেকে ১৯৪৭ সালের বাস্তব পরিস্থিতি, মানুষের মানসিক অবস্থা, ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের গভীরতা উপলব্ধি করতে পারবেন।
তথ্যসূত্র
আন্তর্জাতিক ও ইংরেজি গ্রন্থ
- The Great Partition: The Making of India and Pakistan – Yasmin Khan, Yale University Press
- Freedom at Midnight – Larry Collins & Dominique Lapierre
- Partition Museum, অমৃতসর – দেশভাগের মানবিক দিকের প্রদর্শনী
- Oral History Archives, Jadavpur University – শরণার্থী পরিবারের মৌখিক সাক্ষাৎকার
বাংলা ভাষার প্রামাণ্য গ্রন্থ ও সূত্র
5. দেশভাগ – অশোক মিত্র
6. দেশভাগের কাহিনি – সেলিনা হোসেন
7. দেশভাগের দিনগুলি – সেলিনা হোসেন
8. সীমান্তের গল্প – সেলিনা হোসেন
9. দেশভাগ: বাংলার শরণার্থীরা – চিত্তরঞ্জন মাইতি
10. দেশভাগের কথা – প্রতিভা বসু
11. পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার শরণার্থী পুনর্বাসন দপ্তরের সরকারি আর্কাইভ
12. বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের দেশভাগ সংক্রান্ত নথি ও প্রদর্শনী
13. লোকগাথা, পারিবারিক চিঠি ও ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ (মৌখিক সাক্ষাৎকার থেকে সংগৃহীত)




