ভারতবর্ষ শক্তিপীঠের দেশ। পুরাণে বর্ণিত সতীর দেহখণ্ড পতনের কাহিনীর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে এই শক্তিপীঠগুলির ইতিহাস। সেই ৫১টি শক্তিপীঠের অন্যতম এবং সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ একটি হলো কামাখ্যা মন্দির, যা আসামের গৌহাটির নীলাচল পাহাড়ে অবস্থিত। প্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত এই মন্দির ভক্ত, তান্ত্রিক, সাধক এবং পর্যটকদের কাছে সমানভাবে জনপ্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ। দেবী কামাখ্যা কেবলমাত্র এক পূজিত শক্তির প্রতীকই নন, তিনি উর্বরতার দেবী, সৃষ্টির উৎস এবং নারীত্বের মহিমার প্রতীক হিসেবেও পূজিত হন।
হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, সতী স্বামীর (মহাদেবের) বিরোধিতা করে পিতৃগৃহে যজ্ঞে যোগ দিতে গেলে অপমানিত হন এবং আগুনে আত্মাহুতি দেন। শোকে কাতর মহাদেব সতীর দেহ কাঁধে নিয়ে বিশ্বজুড়ে তাণ্ডব নৃত্য শুরু করেন। তখন বিশ্ববিধ্বংস ঠেকাতে বিষ্ণু তাঁর সুদর্শন চক্র দিয়ে সতীর দেহকে খণ্ড খণ্ড করে দেন। সেই খণ্ডিত অঙ্গ বিভিন্ন স্থানে পতিত হয়ে শক্তিপীঠে রূপান্তরিত হয়। বিশ্বাস করা হয়, নীলাচল পাহাড়ে সতীর গর্ভ ও যোনি পতিত হয়েছিল। এই স্থানেই দেবী কামাখ্যা রূপ ধারণ করেন।
যোনি হলো মাতৃত্ব ও সৃষ্টির উৎসস্থল। গর্ভের ভেতরেই শিশু নয় মাস ধরে লালিত হয় এবং সেখান থেকেই পৃথিবীতে আগমন করে। তাই এই স্থানকে বিশ্বসৃষ্টির প্রতীক এবং দেবীকে উর্বরতার দেবী বলা হয়। অন্যদিকে দেবীর বিশেষ এক রূপ, যিনি মাসিক ঋতুস্রাবকে প্রতীকীভাবে বহন করেন, তাঁকেই রক্তক্ষরা দেবী নামে পূজা করা হয়। এ কারণে কামাখ্যা মন্দির নারীর শক্তি ও প্রজননশক্তির এক গভীর প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

তান্ত্রিক সাধনার কেন্দ্র
কামাখ্যা মন্দির শুধু ভক্তদের তীর্থস্থান নয়, বরং তান্ত্রিক সাধনার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অসংখ্য তান্ত্রিক, যোগী এবং সাধক এখানে সাধনা করে আসছেন। এখানে অম্বুবাচী মেলা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বছরে একবার দেবীকে রজস্বলা বা ঋতুমতী হিসেবে ধরা হয়, এবং সেই সময়ে মন্দির বন্ধ থাকে। কয়েক দিন পর দেবীকে পুনরায় স্নান ও শুদ্ধিকরণের পর পূজা শুরু হয়। এই উৎসবকালে অসংখ্য তান্ত্রিক ও ভক্ত দূরদূরান্ত থেকে এখানে সমবেত হন।

স্থাপত্যশৈলী
কামাখ্যা মন্দিরের স্থাপত্যশৈলী অত্যন্ত অনন্য। ইতিহাস অনুযায়ী, মন্দিরটি অষ্টম থেকে নবম শতাব্দীর মধ্যে নির্মিত হলেও সময়ে সময়ে সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে।

মন্দিরের চারটি প্রধান কক্ষ রয়েছে—
গর্ভগৃহ
চলন্ত মন্ডপ
পঞ্চরত্ন মন্ডপ
নাটমন্দির
গর্ভগৃহটি পঞ্চরথ শৈলীতে নির্মিত এবং এটি ভূগর্ভস্থ একটি গুহার মতো। এখানে কোনো মূর্তি নেই। বরং একটি প্রায় ১০ ইঞ্চি গভীর যোনি-আকৃতির প্রাকৃতিক পাথর রয়েছে, যা ঝরনার জলে সর্বদা ভিজে থাকে। দেবী কামাখ্যা এই পাথরেই প্রতীকীভাবে পূজিতা হন।
মন্দিরের চূড়াগুলি মৌচাকের মতো দেখতে, যা উত্তর-পূর্ব ভারতের ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যশৈলীকে প্রতিফলিত করে। মন্ডপগুলিতে খাজুরাহো ও মধ্য ভারতের অন্যান্য মন্দিরশিল্পের মতো সূক্ষ্ম ভাস্কর্য খোদাই রয়েছে। এতে হিন্দু দেবদেবীর নানা প্রতিমূর্তি, পৌরাণিক কাহিনী এবং অলঙ্কারশিল্পের প্রভাব দেখা যায়।
ঐতিহাসিক পর্যালোচনা
মন্দিরটির ইতিহাস বহুমুখী। কামরূপের ম্লেচ্ছ রাজবংশ প্রথমদিকে মন্দিরের পৃষ্ঠপোষকতা করে। পরে পাল, কোচ এবং আহোম শাসকরা এর পরিচালনা করেন।
সপ্তম শতকে চীনা পর্যটক হিউয়েন সাং তাঁর ভ্রমণকাহিনীতে কামাখ্যা মন্দিরের উল্লেখ করেছেন। তখন কামাখ্যা ছিলেন এক ‘অভ্রমণ বিরাট উপাস্য দেবী’।
মন্দিরে পূজার প্রথা সময়ের সঙ্গে তিন ধাপে বিকাশ লাভ করে— ম্লেচ্ছদের শাসনে যোনি পূজা, পালদের আমলে যোগিনী পূজা, আর কোচ রাজাদের শাসনে শাক্ত পূজা।
মন্দিরটি মূলত শাক্ত ধর্মের দশমহাবিদ্যার উদ্দেশ্যে নিবেদিত, যা দেবী পূজার এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আধুনিক যুগে কামাখ্যা মন্দির
ঔপনিবেশিক শাসনামলে কামাখ্যা মন্দির একটি গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিতি পায়। ২০১৫ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়ে মন্দিরের প্রশাসন কামাখ্যা দেবতা বোর্ড থেকে বোর্দেউরিদের হাতে হস্তান্তর করে।
আজও প্রতিবছর লক্ষাধিক ভক্ত, সাধক ও পর্যটক এই মন্দিরে আসেন। বিশেষ করে অম্বুবাচী মেলার সময় গৌহাটি শহর ভক্তদের সমাগমে পূর্ণ হয়ে ওঠে।
সাংস্কৃতিক তাৎপর্য
কামাখ্যা কেবল একটি মন্দির নয়, বরং ভারতীয় সংস্কৃতিতে নারীত্ব ও মাতৃত্বের মহিমার প্রতীক। এখানে ঋতুচক্রকে অশুদ্ধ নয়, বরং সৃষ্টির উৎস হিসেবে দেখা হয়। এটি নারীর শক্তিকে পবিত্র হিসেবে প্রতিপন্ন করে। সমাজে নারীশক্তিকে যে সম্মান দেওয়া উচিত, কামাখ্যা মন্দির তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
উপসংহার
কামাখ্যা মন্দির ভারতের শক্তি উপাসনার এক অনন্য কেন্দ্র, যা পৌরাণিক, ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক দিক থেকে সমৃদ্ধ। সতীর যোনি পতনের কাহিনী থেকে শুরু করে আধুনিক অম্বুবাচী মেলা পর্যন্ত, এই মন্দির যুগে যুগে ভক্তদের আধ্যাত্মিক শক্তি ও নারীত্বের মহিমা উপলব্ধি করার সুযোগ দিয়েছে।
এটি শুধু একটি শক্তিপীঠ নয়, বরং ভারতীয় ধর্মীয় ঐতিহ্যের জীবন্ত প্রতীক, যেখানে দেবীকে পূজা করা হয় সৃষ্টির উৎস হিসেবে, নারীশক্তির প্রতীক হিসেবে এবং আধ্যাত্মিক সাধনার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে।




